বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের স্বত্ব বেক্সিমকোর, মালিক বেক্সিমকো, অর্থনৈতিক সব হিসাবও বেক্সিমকোই দেখবে, টেকাটুকা সব বেক্সিমকোর একাউন্টে যাবে— ইত্যাদি বিচিত্র আর উদ্ভট সব গুজব ঘুরে বেড়াচ্ছে হোমফিডে। বাংলাদেশ সরকার নাকি জনগণের টাকায় স্যাটেলাইট বানিয়ে বেক্সিমকোর কাছে বেচে দিয়েছে, এমন ক্যাপশনে আপ করা ভিডিও শেয়ার হচ্ছে ঝড়ের গতিতে। ঘটনা কি জানার চেষ্টা করতেই দেখি এবারো সেই একই ব্যাপার, রাজার ছেলে শ্যামলা হয়ে জন্মেছে, এক কান দুই কান করে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়লো, রাণী আসলে একটা কালো কাক প্রসব করেছেন!

মূল ঘটনাতে আসা যাক। পৃথিবীর ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হওয়া বাংলাদেশ একই সাথে এই স্যাটেলাইটটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বটাও নিজেরাই নিচ্ছে। অর্থাৎ আমাদের স্যাটেলাইট আমরাই পরিচালনা করবো, অন্য কোন দেশের কোন প্রতিষ্ঠান নয়। যেহেতু এটা একেবারেই নতুন একটা ব্যাপার, সুতরাং এই পরিচালনার কাজে বিটিআরসিকে রাখা হবে না। একেবারেই নতুন একটি প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি পরিচালনা করবে। সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড’। এটি পরিচালিত হবে ইতিমধ্যে কোম্পানিতে কারিগরি লোকবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষন দেয়া সম্পন্ন হয়েছে। (তথ্যসুত্রঃ ১০ই মে ২০১৮, বাংলাদেশ প্রতিদিন) স্যাটেলাইটটি পরিচালনা করা হবে বাংলাদেশ থেকে।

এর গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে গাজিপুরের জয়দেবপুরে এবং রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়া থেকে। এজন্য ইউরোপ, আমেরিকা থেকে যাবতীয় যন্ত্রপাতি কিনে এনে স্থাপন করে সম্পুর্ন করা হয়েছে। সুতরাং যারা বলছে বেক্সিমকোর কাছে স্যাটেলাইট বিক্রি করে দিয়েছে সরকার, তাদের মিথ্যাচারে কান না দিয়ে খুব সহজেই গুগল করে জেনে নিতে পারেন সত্যটা!

এবার আসা যাক এই পুরো প্রজেক্টের সাথে বেক্সিমকোর সম্পর্কের ব্যাপারে! আপনার বাসার টিভিটায় যে অজস্র চ্যানেল দেখেন, কিভাবে? ক্যাবল টিভি অপারেটরদের কাছ থেকে লাইন নিয়ে, রাইট? তারা কিভাবে আনে? তারা বিভিন্ন স্যাটেলাইট কোম্পানির কাছ থেকে ব্যান্ডউইথ কিনে তার মাধ্যমে বাইরের টিভি চ্যানেলগুলো আমাদের কাছের পৌছে দেয়। আরেকটু সহজ করে বললে, টাটা স্কাই, ডিশ এদের কাছ থেকে সেট টপ বক্স কিনে ছাদে ছোট ডিশ বসিয়ে টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখি, এটা দেখতে পারি কারণ টাটা স্কাই বা ডিশ এরা স্যাটেলাইট থেকে ব্যান্ডউইথ কিনে অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করে। খুব মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করেন, ভাড়া নিচ্ছে, স্যাটেলাইটের মালিক কিন্তু তারা না! স্যাটেলাইটের মালিক আর স্যাটেলাইট থেকে ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করা একেবারেই ভিন্ন জিনিস!

বেক্সিমকো এবং আরো কিছু কোম্পানি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কিছু ব্যান্ডউইথ কিনেছে। তারা আরো আগে থেকে বাসাবাড়িতে ক্যাবল টিভি সংযোগ ব্যাবসার সাথে জড়িত। আগে তারা ব্যান্ডউইথ কিনতো বিদেশী স্যাটেলাইটের কাছ থেকে, এখন তারা কিনলো দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ থেকে। বেক্সিমকো কিনেছে DTH মানে বাসাবাড়িতে ডিশের মাধ্যমে টিভি চ্যানেল দেখার লাইন ভাড়া দেওয়ার জন্য। আমরা এই ডিশ লাইনের জন্য এখন যেমন নানা ক্যাবল কোম্পানির কাছ থেকে চড়া দামে মাসিক ক্যাবল কানেকশন নিয়ে থাকি, সেই জায়গায় বেক্সিমকো এবং অন্য কোম্পানিগুলো দেশীয় স্যাটেলাইট থেকে এই টিভি লাইনের ব্যান্ডউইথ ভাড়া নিয়ে ব্যাবসা করবে। ফলে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় আমরা সুলভে ক্যাবল সেবা পাবো।

এই ব্যান্ডউইথ ভাড়া দেওয়ার পুরো কার্যাবলী দেখভালের জন্য আলাদা করে আরেকটা কোম্পানীই গঠিত হয়েছে, মালয়েশিয়ায় অফিস নেওয়া হয়েছে এর মার্কেটিং-এর জন্য। অর্থাৎ এখন কেবল এই ব্যান্ডউইথ শুধু আমাদের দেশের বেক্সিমকো কিংবা বড় বড় কোম্পানিগুলোও নয়, কিনতে পারবে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোও। আমাদের স্যাটেলাইট শুধু মহাকাশে ঘুরবে না, যথাসাধ্য টাকাও ঊপার্জনের চেষ্টা করবে। এর ফলে আসবে বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা।

তো, এতক্ষণ যারা কষ্ট করে এই ভ্যাজর ভ্যাজরখানা পড়লেন, অনুগ্রহ করে এই অধমকে একটু বুঝিয়ে বলেন তো, এই দেশের তথ্যপ্রযুক্তির ইতিহাস বদলে দিতে যাচ্ছে যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, তার রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক অসংখ্য কর্মকান্ডের ছোট্ট একটা অংশ হচ্ছে ক্যাবল অপারেশন চালানোর জন্য ব্যান্ডউইথ ভাড়া দেওয়া, যার কিছু অংশ ভাড়া নিয়েছে বেক্সিমকোসহ অন্যান্য কোম্পানীগুলো। যদি তাই হয়, তাহলে এই সামান্য ব্যান্ডউইথ ভাড়া নিয়ে কিভাবে বেক্সিমকো কিংবা অন্য কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের প্রায় ৩০০০ কোটি টাকার স্যাটেলাইটের মালিক হয়ে গেল? কিভাবে কোন যুক্তিতে আমরা এই ধরণের নির্লজ্জ আর জঘন্য মিথ্যাচার বিশ্বাস করি? 

Comments
Spread the love