ওয়ারিশ আজাদ চৌধুরী

কেনেডি স্পেস স্টেশনে লঞ্চ হওয়ার জন্য প্রস্তুত বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট। আর মাত্র কিছুক্ষণের অপেক্ষা।

বড় মেয়ে হাসুর হাত ধরে ধানমন্ডি ৩২ এর ড্রয়িং রুমে এসে বসলেন বঙ্গবন্ধু। ৯৮ বছর বয়সে চলাফেলা করার জন্যও অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হয়। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে অবসর নিয়েছেন প্রায় দেড় যুগ আগে। পাশে ছোট ছেলে রাসেলের ছেলেটা বসে আছে দাদার পাশে। বিজ্ঞানের ছাত্র, ভীষণ ব্রাইট। আজ এ দেশটার জন্য একটা বিশেষ দিন। আজকের দিনে বাংলাদেশ নামটা পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাকাশে যাবে। শেখ সাহেবের আর তর সইছে না। বারবার মেয়ে হাসুকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘মা রে. শুরু হবে কবে?’

মেয়ে উত্তর দেন, ‘ধৈর্য্য ধরো তো বাবা। রাত দুটোয় লঞ্চ’। 

গালে হাত দিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু। তার মনে পড়ে কিসিঞ্জার কী বলেছিল।

বাংলাদেশ একটি তলাবিহীন ঝুড়ি।

বয়সের ভারে কুচকানো চামড়ায় মুচকি হাসি ফুটে উঠে পিতার।

ঠিক একইসময়ে আমেরিকার কানেক্টিকাটে ছেলের বাসার ড্রয়িংরুমে টিভির চ্যানেল পাল্টানোর সময় সিএনএনের নিউজ হেইডলাইনে চোখ আটকে যায় ৯৪ বছর বয়স্ক হেনরি কিসিঞ্জারের্। হেডলাইনে লেখা,

“Bangladesh will launch their first satellite tonight.”

অবিশ্বাসে চোখ ঠিকরে আসে শীতল যুদ্ধে গেমচেঞ্জারের। ভিয়েতনামে আমেরিকার ইজ্জত যখন যায় যায়, এই ঘাগু পলিটিশিয়ান কিসিঞ্জারই পিস অফারের মাধ্যমে কোনমতে দেশের মুখরক্ষা করেছিল। দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে কিসিঞ্জারের। ‘বাংলাদেশ? স্যাটেলাইট? হাউজ দ্যট পসিবল’- আপন মনে বিড়বিড় করতে থাকে কিসিঞ্জার।

ঘড়ির কাঁটা বাংলাদেশ সময় রাত দুটো ছোঁয় ছোঁয়। লঞ্চ ভেহিকেলে চেপে আকাশে উড়াল দিতে প্রস্তুত বাংলার প্রথম স্যাটেলাইট। লঞ্চিং সিকোয়েন্স ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। স্টেজ ওয়ানে রকেটের জ্বালানির ধাক্কায় প্রায় ৫০ মাইল উঠে যাবে স্যাটেলাইট। তারপর শুরু হবে স্টেজ টু। সুললিত নারী কন্ঠে কাউন্টডাউন ঘোষণা হচ্ছে।

নাইন ,এইট ,সেভেন…

বত্রিশের বাড়িতে টিভির দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছেন বঙ্গবন্ধু। আফসোস হয় তার তাজউদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলামদের জন্যে। রাজনীতির সহকর্মীরা প্রায় সবাই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। তাজউদ্দিন সাহেব আজ বেঁচে থাকলে কত খুশীই না হতেন।

লঞ্চিং সিকোয়েন্স শেষের পর্যায়ে। বুস্টারের ধাক্কায় মাটি ছেড়ে আকাশে উড়ে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট। গায়ে লাল সবুজ বাংলাদেশ সরকারের লোগো।

এদিকে কানেক্টিকাটের বাড়িতে সোফায় বসে এ দৃশ্য দেখে ঘামাতে থাকে কিসিঞ্জার্। ভিয়েতনামকে বাগে আনলাম, রাশিয়াকে বাগে আনলাম, নিক্সনকে মুগ্ধ করলাম কিন্তু এই কোথাকার কোন বাংলাদেশের সাথে পেরে উঠলাম না। এই দেশের মানুষগুলো এমন কেন? হারতেই চায় না!

বাংলাদেশের স্যাটেলাইট তখন পেছনে অগ্নিস্ফুলিং রেখা টেনে উড়ে যাচ্ছে সুনীল আকাশের পানে।

কালো ফ্রেমের চশমাটা খুলে ভেজা চোখটা মুছেন পিতা মুজিব। কাঁধে হাত রেখে বাবাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন মেয়ে হাসু। মেয়ের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।

দেয়ালে টানানো আজীবনের ভালোবাসা সহযোদ্ধা মরহুম বেগম মুজিবের সাদা কালো পোট্রেটের দিকে অশ্রুসজল চোখে তাকিয়ে পিতা মুজিব মনে মনে বলেন, “রেনু! আমরা পেরেছি।”

Comments
Spread the love