৮ এপ্রিল ২০১৮

৯৮ বছর বয়সী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পিজি হাসপাতালে ভর্তি। ১৫ আগস্টের সে রাতে তারা তাকে মারতে পারে নি। শুধু একটা পা ভেঙ্গে নষ্ট করে দিতে পেরেছিলো। বুকে পিঠে ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া বুলেটও তাকে মারতে পারে নি। বেঁচে গেলেও দেশ ছাড়তে হয়েছিলো তাকে। লন্ডনে প্রায় দুই বছর ধরে চিকিৎসার পর তিনি মোটামুটি সুস্থ হন। তবে তাকে হুইল চেয়ারে বসে বাকি জীবন পার করতে হয়েছে।

তারপর থেকে তাকে আর এই দেশে ঢুকতে দেয়া হয় নি। তবে তার মেয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করে দেশে আওয়ামীলীগকে আবার প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। ৯৬ এর নির্বাচনে জয় লাভ করার পর শেখ হাসিনা তার পিতাকে প্রধানমন্ত্রী হতে বললেন। সারাদেশে বাঘের মত করে হেঁটে বেড়ানো মানুষটা হুইল চেয়ারে বসে আর বাঙ্গালীর সামনে আসতে চাইলেন না। প্রচণ্ড দাম্ভিক মানুষটা নিজেকে দেখিয়ে কারও সহানুভূতি পেতে চাইলেন না। আওয়ামীলীগের কোন পদেই তিনি আর রইলেন না। দেশ চালাতে দিলেন তার মেয়েকে।

প্রায় শতবর্ষ ধরে বেঁচে থাকা মানুষটা শেষ বয়সে এসে শেখ হাসিনাকে জানালেন তিনি দেশে আসবেন। বাংলা মায়ের বুকেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবেন। তারপর তিনি দেশে এলেন। তবে খুব বেশি মানুষকে জানতে দিলেন না সে কথা।

এদিকে এপ্রিলের আট তারিখ সারাদেশ কোটা সংস্কার আন্দোলনে উত্তাল। শাহবাগে গণজোয়ার। গণভবনে সন্ধ্যার পর পায়চারি করছেন শেখ হাসিনা। ওবায়েদুল কাদেরকে ডাকলেন তিনি,

– ছাত্ররা কি চাচ্ছে?
– কোটা বাতিল করতে চায় তারা।
– তারা কারা?
– তারা সাধারণ ছাত্র। তবে তাদেরকে হয়ত উস্কে দিয়েছে বিএনপি, জামাত। ছাত্রলীগের বহিরাগতরাও হতে পারে। কিংবা ছাত্রলীগের বিরোধী কোনো পার্টি, সামনে তো কাউন্সিল।
– কি করা যায় বল তো?
– দমন করতে হবে আপা। তা না হলে এটা সরকার বিরোধী আন্দোলন হয়ে যেতে পারে।

শেখ হাসিনা ভাবছেন। কাদের সাহেব তাকে ভাবাচ্ছেন। সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলেন তিনি কাদের সাহেবকে। বললেন, ওকে ফাইনাল, ক্যারি অন।

গণভবনে কী সিদ্ধান্ত হচ্ছে সে গুঞ্জন ছড়িয়ে গেছে পুরো আওয়ামীলীগে। সৈয়দ আশরাফ ফোন করলেন শেখ হাসিনাকে।

– আপা
– বলুন, আশরাফ সাহেব।
– ছেলেমেয়েরা কোটা সংস্কার চাচ্ছে, বাতিল না। তাদের দাবী যৌক্তিক। তাদের দাবী মেনে নিন। তা না হলে এই আন্দোলনে বিএনপি- জামাত এসে সুবিধা নেবে। তাদের উস্কে দিয়ে আন্দোলন সেদিকে নেবেন না।

লন্ডন থেকে ফোন করলেন সোহেল তাজ,

– আপা
– তাজ, বল ভাই
– মেনে নিন। ছাত্রদের শান্তিতে থাকতে দিন।
– ভাবছি…

এদিকে, বঙ্গবন্ধুর শারীরিক অবস্থা খুব বেশি খারাপ। পিজি হাসপাতালের আইসিইউ তে তাকে রাখা হয়েছে। তবুও শেখ মুজিব সেন্স হারান না। আইসিইউ তেও তিনি জেগে থাকেন। তিনি জেগে থাকলে জেগে থাকে বাংলাদেশ। আইসিইউ থেকেই তিনি যেন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন শাহবাগ থেকে আসা স্লোগান, “বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই”।

বেড থেকে নামলেন বঙ্গবন্ধু। চপ্পল পায়ে দিলেন। ডাক্তার, নার্সরা এগিয়ে আসতে চাইলে শুধু হাতের ইশারা দিলেন। তার মুখের কথা না, হাতের ইশারাও যেন অমান্য করার সাধ্য কারও নেই। একজন নার্স এসে হুইলচেয়ারটা ঠিকমত প্লেস করে দিচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, লাগবে না।

৪৩ বছর পর পুরোপুরি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু। মাটিতে পায়ের ছোঁয়া লাগার সাথে সাথেই টান টান হয়ে গেল তার শিরদাঁড়া। ডাক্তাররা ভাবছেন, কী অদ্ভুত! কী আশ্চর্য! পাঞ্জাবির উপর কোট চাপিয়ে তিনি বললেন, পাইপটা দে!

পিজি হাসপাতাল থেকে বের হয়ে শাহবাগের রাস্তা পার হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। তার পেছনে সব ডাক্তার নার্সরা ছুটছেন। পাইপ টেনে ধোঁয়া ছেড়ে রাস্তা পার হলেন শেখ মুজিব। রাস্তা পার হয়েই যেন হয়ে উঠলেন অন্য একজন। ফিরে গেলেন তার যৌবনে, হয়ে উঠলেন আমাদের বঙ্গবন্ধু।

তাকে দেখে মনে হচ্ছে, কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের সেই ছাত্রনেতা শেখ মুজিব যিনি দাঙ্গা থামাতে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সেই ছাত্র নেতা যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকার আদায়ে এইমাত্র রাস্তায় নেমেছেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সেই বঙ্গবন্ধু যিনি এই মাত্র ৬ দফা দাবী জানিয়ে লাহোর থেকে ফিরে এলেন।

তার চোখের লেন্সে পাওয়ারের পর পাওয়ার যোগ করা হয়েছে। বেশিক্ষণ একদিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ দিয়ে পানি পড়ে। জনস্রোতের দিকে এগিয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু। অবাক হয়ে রাস্তা ছেড়ে দিলো সবাই। “জয় বাংলা”, “জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগানে ভারী হয়ে উঠলো শাহবাগের আকাশ বাতাস। সে স্লোগান যেন শোনা যাচ্ছে টেকনাফ- তেতুলিয়া থেকে।

একদম মিছিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন শেখ মুজিব। সামনে বন্দুক তাক করে রাখা পুলিশের দেয়াল। পুলিশের পেছনে কাদের সাহেব। আন্দোলনের ছাত্রদের পেছনে লাঠিসোটা নিয়ে ছাত্রলীগের প্রাচীর। পুলিশকে অর্ডার দিলেন কাদের সাহেব, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট, ফায়ার…

বরাবরের মত তর্জনী উঁচু করে পুলিশের দিকে তাকিয়ে বাঘের মত করে চিৎকার করে বঙ্গবন্ধু বললেন,

আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার ছেলেদের উপর অত্যাচার চলে, মনে রাখবা, আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না…

শেখ মুজিবুরের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন তোফায়েল আহমেদ। নতুন করে “জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান ধরলেন তিনি। তোফায়েল সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলেন, ছাত্রদের আন্দোলনে আমার ছাত্রলীগ কই? তোফায়েল সাহেব মাথা নিচু করে রইলেন। তোফায়েল সাহেবকে অর্ডার দিলেন বঙ্গবন্ধু, নতুন করে এখান থেকে ছেলেদের নিয়ে ছাত্রলীগ বানাও। আমি আমার ছাত্রলীগ চাই, আই ওয়ান্ট দেম ব্যাক…

ভিসিকে ডাকলেন শেখ মুজিবুর রহমান, ‘কি রে ব্যাটা! এইগুলা তোর পোলা না? তুই পালায়া থাকোস কেন? কি ভাঙছে? আমি সব কিনা দেব। যা সবগুলারে ধইরা ক্লাসে নিয়া যা। পড়তে বসা। আজ, এই মুহূর্ত থেকে সব কোটা ফোটা বন্ধ।’

পুলিশের প্রাচীরের সবার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ওবায়েদুল কাদেরেরও পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধুর সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস তাদের নাই। তারা পালিয়েছে।

শেখ হাসিনাকে ফোন করলেন কাদের সাহেব।

– আপা, ঝামেলা হয়েছে।
– কী ঝামেলা?
– মিছিলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
– কে? বিএনপি?
– না আপা
– জামাত শিবির?
– না আপা
– তবে কি হেফাজত?
– না আপা
– কোনো জঙ্গি হামলা?
– না আপা
– তবে মিছিলের সামনে এসে কে দাঁড়ালো?
– বঙ্গবন্ধু

ফোন নামিয়ে রাখলেন শেখ হাসিনা। তার চোখে বন্যার মত পানি। অঝোরে কাঁদছেন তিনি। নিজের হারে কাঁদছেন নাকি পিতার জয়ে!

*

৯ এপ্রিল, ২০১৮। ভোর পাঁচটা।

এই স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেলো শেখ হাসিনার। ঘুম ভাঙার পরও তার চোখে পানি। চোখ মুছতে মুছতে ফোনের লক খুললেন শেখ হাসিনা।

নোটিফিকেশনে দেখলেন, ৫৬ মিসড কলস ফ্রম ওবায়েদুল কাদের…

Comments
Spread the love