১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ। ঢাকার রাজপথে ছাত্রদের তুমুল মিছিল, “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” শ্লোগানে মুখর সেই মিছিল দেখে অনেকেই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলো।

সেক্রেটারিয়েটের ফার্স্ট গেটের সামনে পুলিশ অফিসার শামসুদ্দোহা হান্টার হাতে মারমুখো পুলিশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ব্যানার আর ফেস্টুন হাতে মিছিল দ্রুত সেই ফার্স্ট গেটের দিকে এগিয়ে গেলো। এরপরের ঘটনায় জনতা, ছাত্ররা ও পুলিশ সহ সকলেই বেশ অবাক হয়ে গেলো। মিছিলের সবচেয়ে হ্যাংলা পাতলা, লম্বা গোছের ছেলেটি শামসুদ্দোহার সাথে পীচের রাস্তার উপর গড়াগড়ি খাচ্ছে। পুলিশ পর্যন্ত বিমুঢ় হয়ে রইলো, কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। মল্লযুদ্ধের শেষে দেখা গেলো দুইজনেরই হাত-পা ছড়ে গেছে। তখনই সে ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করা হলো। সে লম্বা-ঢ্যাঙ্গা-পাতলা গোছের ছেলেটির নাম শেখ মুজিবর রহমান।

কিছুদিন কারাগারে বন্দি থাকবার পর মুজিবকে মুক্তি দেয়া হয়। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্র। আজাদী লাভের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হলেও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের বেতন একই রইলো। ছাত্র সমাজ এই ঘটনায় বিরাট ক্ষুব্ধ হলো। তারা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য সকলকে আহবান করলো। সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে ছাত্রসমাজ ও সকল চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর এই আন্দোলন ভয়াল রুপ ধারণ করলো। ছাত্ররা চাঁদা তুলে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের পরিবারবর্গের ভরণ-পোষনের ব্যবস্থা করলো। এ অবস্থায় ঢাবি কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য ঢাবি বন্ধ ঘোষনা করলেন সাথে সাথে সংস্লিষ্ট চৌদ্দ ছাত্রনেতাকে বহিষ্কার করলেন। পরবর্তীতে ঢাবি কর্তৃপক্ষ জানালেন, বিশেষ মুচলেকায় দস্তখত করলে বহিষ্কার হওয়া ছাত্ররা নামমাত্র শাস্তির বিনিময়ে অব্যাহতি লাভ করবেন। ১৩ জন ছাত্রনেতা সে মুচলেকায় সই করে ১০-১৫ টাকা জরিমানা দিয়ে অব্যাহতি লাভ করলেন বহিষ্কারাদেশ থেকে। ঘাড়ত্যারা গোছের একজন বাকি রইলো, এরকম “দাস সুলভ” মুচলেকায় দস্তখত করতে তিনি অস্বীকার করলেন। এই ঘাড়ত্যারা ছেলেটিই শেখ মুজিবর রহমান। মুজিব সেদিন বললেন, “যদি কোনদিন সসম্মানে এই বিদ্যায়তনে ফেরত আসতে পারি, তবেই আসবো। নচেৎ নয়।” সেই ‘৪৮ এই শেখ মুজিবের ছাত্রজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটলো।

শেখ মুজিব তাঁর প্রতিজ্ঞা রেখেছিলেন। সুদীর্ঘ ২৪ বছরের মধ্যে তিনি আর ঢাবি’র আঙ্গিনায় যাননি। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ‘৭২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমানকে আজীবন সদস্যপদ দেয়া হয়। সেদিনকার সে অনুষ্ঠানে ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয় সকলের সামনে সেই ১৯৪৮ সালের বহিষ্কার আদেশ ছিঁড়ে ফেললেন।

এই হলো আমার নেতা, আমার জাতির পিতা এই বঙ্গবন্ধু। যে নিজের জীবনের পরোয়া করে নাই কোনদিন। যে স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির পিয়নকে আমরা একজন “মামা” হিসেবেই দেখি, সেই মানুষদের জন্য নিজের ছাত্রত্ব বাতিল করতেও একবার ভাবেন নাই।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

( সুত্রঃ আব্বা হুজুরের দেশে; এম আর আখতার মুকুল)

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-