বঙ্গবন্ধু আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন পাকিস্তানীরা সব লুট করে নিয়ে গেছে, রেখে গেছে কিছু চোর। আমি পাইছি চোরের খনি… তার এই সম্বোধন মোটেও সৈয়দ নজরুল ইসলাম কিংবা তাজউদ্দিন আহমেদ কিংবা ক্যাপ্টেন মনসুর আলি কিংবা আবু সাঈদ চৌধুরীদের উদ্দেশ্যে ছিলো না। তার এই সম্বোধন তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাকদের উদ্দেশ্যে ছিলো না। শেখ মনি, মহিউদ্দিন আহমেদ, আবদুল মালেক উকিলদের বিরুদ্ধে ছিলো না। দেওয়ান ফরিদ গাজী, আতাউল গনি ওসমানীদের বিরুদ্ধে ছিলো না। তিনি এটা বলছিলেন প্রশাসনিক লুটেরা শ্রেণীর উদ্দেশ্যে, হাইব্রিড রাজনৈতিক লুটেরা শ্রেণীর উদ্দেশ্যে।

স্বাধীনতার পর রাতারাতি এক শ্রেণীর লোক আওয়ামী লীগ হয়ে গেলো। কুখ্যাত রাজাকার, দালাল, মুসলীম লীগার এবং এরকম স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির পোষ্যরা জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগানে চারদিক বিদিক করে তুললো। এরা ছিলো পরীক্ষিত নেতাদের চেয়ে বেশী বড় আওয়ামী লীগার। শুধু আওয়ামী লীগ সাইনবোর্ড ব্যবহার করে এরা একসঙ্গে অনেকগুলো উদ্দেশ্য পূরণ করতে পেরেছিলো। এবং তাদের মূল মিশন ছিলো আওয়ামী লীগকে ডোবানো। জয় বাংলা বলে লুটতরাজ, খুন, ধর্ষণ তারা করেছে, আইন তাদের ছোঁয়নি।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর তাদের স্বরূপ বোঝা গিয়েছিলো। কিন্তু এদের কারণে বঙ্গবন্ধুকে স্বজনপ্রীতির দুর্নাম সইতে হয়েছিলো। নইলে তার লুটেরা স্বজন কই? বড় মেয়ের বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারেননি, জেলে ছিলেন। আটপৌঢ়ে সে বিয়েতে শুধু চিঠিতে লেখা আশীর্বাদই ছিলো উপহার। শেখ কামাল, শেখ জামাল শেখ রাসেলরা তো লুটেরা নন। শেখ মনি, শেখ নাসেররা লুটেরা নন। তারপরও বঙ্গবন্ধু স্বজনপ্রীতির দুর্নাম নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। এই স্বজনেরা তার প্রিয় আওয়ামী লীগের সদস্য। হাইব্রিড সদস্য। আচমকা হাজির হয়ে নাম লেখানো সদস্য যাদের অতীত যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি কেউ কখনও।

এত বড় ভুলের পর, এত বড় খেসারতের পরও তা সংশোধন হয়নি। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে একমাত্র দল যেখানে গতকাল খালেদা জিয়ার পা ছুয়ে সালাম করা লোকটি আপনার এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশকে ডিজিটাল যুগে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্বে কীর্তিমান দলটি নিজেরাই ডিজিটাল নয়। সদস্যভুক্তি, তার রেকর্ড রাখা, কোনো কমিটিতে নির্বাচিত সদস্যদের অতীত, দলের জন্য ত্যাগ এসব কিছুই আমলে নেওয়া হয় না। ছাত্র শিবির নেতাকে অবলীলায় একজন সাংসদ সার্টিফাই করে দেন নিজের চেনা এবং দলের ত্যাগী কর্মী বলে। এসব আওয়ামী লীগেই সম্ভব।

আর এ কারণেই দলটিতে অন্তর্ঘাত অবিরত। দলের রাজনীতি পুরাপুরি নির্বাচনী এলাকা ভিত্তিক। সব এলাকাতেই দুটো তিনটি উপদল আছে। আওয়ামী লীগ আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ নয় এমন কোনো অঞ্চল নেই, জেলা নেই, বিভাগ নেই। আর এই যুযুধান পক্ষরা দল ভারী করতে চোর ডাকাত লম্পট বাটপার নিয়ে আওয়ামী লীগার বানিয়ে দেন। নিজেকে শক্তিশালী করতে দলের এই যে সর্বনাশ তারা করেন এর জের রয়ে যায় বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টো হাইকমান্ডের অজান্তেই বদলে যায় তৃণমূল পর্যায়ে। দল ক্ষমতায় এলে সবচেয়ে ত্যাগী নেতাকে সবচেয়ে নিগৃহীত হতে হয়।

অথচ আমাদের নেতারা কখনও বোঝেন না, তাদের আশপাশ ঘিরে থাকা, হাত কচলিয়ে জ্বি হুজুর বলা, সব কুচ ঠিক হ্যায়, কাজ হয়ে যাবে ভাই বলা লোকগুলা আওয়ামী লীগ না। বাঙালী জাতীয়তাবাদে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একটা বড় অরাজনৈতিক শক্তির আশাভরসার জায়গা আওয়ামী লীগ। দলের প্রচণ্ড দুর্দিনেও এরা মাটি কামড়ে লড়ে যান, নিজের ভাবমূর্তির বারোটা বাজিয়ে দলের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে মরিয়া লড়েন। এবং দিন শেষে সবসময় সরকারী দলে থাকা লোকগুলো তাদের পা মাড়িয়ে জয় বাংলা ডাকে সহী আওয়ামী লীগ হওয়ার সার্টিফিকেট বিতরণ করে।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আওয়ামী লীগে একমাত্র আমাকেই (শেখ হাসিনা) কেনা যায় না। কোনো প্রতিবাদ ওঠেনি। তার আশেপাশে থাকা একটা মানুষও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাড়িয়ে বলেনি, না আপা, আমি নিজেকে বিকিয়ে দেইনি, আমার আত্মা বিকাইনি, স্বার্থের জন্য দলকে বিকাইনি। একজনও না! শেখ হাসিনা কথাগুলো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যেই বলেছিলেন… 

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-