নাদের চৌধুরী:

‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ শব্দটা অনেক ভারী! অনেক ওজনদার! অবশ্য ইদানীং পাতি নেতাও শখের বিদেশ ভ্রমণ শেষে যখন দেশের পা রাখেন তখনও ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ ট্যাগ দিয়ে তাকে এয়ারপোর্টে মহাসমারোহে রিসিভ করা হয়! পোস্টার আর ব্যানারে ছেয়ে যায় পুরো শহর। সাধারণ মানুষকে ট্রাফিক জ্যামে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকার আনন্দদায়ক কাজ উপহার দিয়ে বিশাল মোটরবাইক শো-ডাউন দিয়ে নিয়ে আসা হয় তথাকথিত নেতাকে। সেই নেতার প্রত্যাবর্তন ঠিক কতটা আনন্দের তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও সাধারণ মানুষ যে তাকে তাদের সাধ্যমত গালী দিতে ভুলেন না সেটা নিয়ে কোন সন্দেহ নাই। হাসি পায়! বড্ড হাসি পায়। কে জানে তখন হয়তো ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ‘ শব্দটাও অট্টহাসি হাসে! কারণ এই শব্দটা জানে তার গুরুত্ব কতটুকু। কারণ এই শব্দটাতো সেইদিনই গৌরবান্বিত হয়েছিলো যেইদিন প্রিয় নেতা পা রেখেছিলেন এদেশের মাটিতে।

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ১০ জানুয়ারী ১৯৭২। সময়ের হিসেবে মোট ২৫ দিন। অসম্পূর্ণ বিজয়ের ২৫ দিন। সবপেয়েও পুরোদমে না পাওয়ার আক্ষেপের ২৫ দিন। অভিভাবকহীনভাবে এগিয়ে চলার ২৫ দিন। এবং অবশেষে পূর্ণতা নিয়ে হাজির হলো ১০ই জানুয়ারি। দেশের মাটিতে পা রাখলেন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা। উপহার হিসেবে আবির্ভূত হলেন তিনি। জন্ম থেকেই ভয়কে পায়ে ঠেলে আসা মানুষটা সেদিন উঠে গেছিলেন এইসব পুছকে পিছুটানের অনেক উপরে।  সাথে নিয়ে এলেন এই অভাগা জাতিটির জন্য আরো এক অমূল্য উপহার! নিয়ে এসেছিলেন বৃহদাকার এক স্বপ্নের জাহাজ যে জাহাজে চড়ে বাংলাদেশ নামক দেশটা পারি দিবে প্রতিকূলতার সকল ঝড়। বাংলাদেশ পরিণত হবে স্বপ্নের সোনার বাংলায়।

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বাংলার মানুষ তখনও জানত না তাদের নয়নের মণি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জীবিত আছেন কিনা? তাই বিজয়ের মধ্যেও মানুষের মনে ছিল শঙ্কা ও বিষাদের ছাপ। এ ছাড়াও যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শারীরিক উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। তেজগাঁও বিমানবন্দরের রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে সারিবদ্ধ মানুষ। বিমানবন্দর ও রাস্তার দু’পাশে অপেক্ষমাণ জনতা। বাঙালীর মহান নেতা আসছেন। লাখো মানুষের কণ্ঠে তখন শুধু ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ আবেগে কেঁদেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কেঁদেছিলেন বিমানবন্দরে উপস্থিত অস্থায়ী সরকারের সদস্য, মুক্তিযোদ্ধাসহ সবাই। অশ্রুসজল নয়নে বরণ করা হয়েছিলো ইতিহাসের এই বরপুত্রকে।

খোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে জনসমুদ্রের ভেতর দিয়ে রেসকোর্স ময়দানে এসে পৌঁছাতে সেদিন সময় লেগেছিলো পাক্কা আড়াই ঘণ্টা । অবশেষে মঞ্চে উঠলেন পিতা। সেদিন শুরুটা করেছিলেন কবিগুরুর ভুলটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে। বলেছিলেন-

বিশ্বকবি তুমি বলেছিলে ‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি।’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তুমি দেখে যাও, তোমার আক্ষেপকে আমরা মোচন করেছি। তোমার কথা মিথ্যা প্রমাণিত করে আজ ৭ কোটি বাঙালী যুদ্ধ করে রক্ত দিয়ে এই দেশ স্বাধীন করেছে। হে বিশ্বকবি তুমি আজ জীবিত থাকলে বাঙালীর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে নতুন কবিতা সৃষ্টি করতে।

অশ্রুসিক্ত নয়নে দীপ্ত কন্ঠে বর্ণনা দিয়েছিলেন কারাপ্রকোষ্ঠের সেই কালো রাত গুলার কথা। গর্ব করে বলেছিলেন-

‘আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমি বাঙালী, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, একবার মরে দুইবার মরে না। আমি বলেছিলাম, আমার মৃত্যু এসে থাকে যদি আমি হাসতে হাসতে যাব। আমার বাঙালী জাতকে অপমান করে যাব না। তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব না এবং যাবার সময় বলে যাব, জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালী আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।’

এই কাঁদা আর কাঁদানোর ফাকে তিনি শুনিয়েছিলেন আশারবাণী। দিয়েছিলেন স্বপ্নের বার্তা। জানিয়েছিলেন – ‘ এই বাংলাদেশে হবে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা, এই বাংলাদেশে হবে গণতন্ত্র, এই বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।’ বাতলে দিয়েছিলেন সফল হওয়ার বার্তা। ২৯০ দিন পাকিস্তানের কারাগারে মৃত্যুযন্ত্রণা শেষে মুক্ত স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে ফেরা মানুষটা জানিয়েছিলেন এইখানেই শেষ না। জানিয়েছিলেন কাজ এখনো পুরোটা বাকি। বলেছিলেন – ‘আজ থেকে আমার অনুরোধ, আজ থেকে আমার আদেশ, আজ থেকে আমার হুকুম ভাই হিসেবে, নেতা হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, আমি তোমাদের ভাই, তোমরা আমার ভাই, এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি আমার বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়, এই স্বাধীনতা পূর্ণ হবে না। যদি এ দেশের মা- বোনেরা ইজ্জত ও কাপড় না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণতা হবে না যদি এ দেশের মানুষ, যারা আমার যুবক শ্রেণী আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়।’

দেশের উন্নয়নের জন্য ডাক দিয়েছিলেন এইভাবে- ‘যথেষ্ট কাজ পড়ে রয়েছে। আপনারা জানেন, আমি সমস্ত জনগণকে চাই, যেখানে রাস্তা ভেঙ্গে গেছে, নিজেরা রাস্তা করতে শুরু করে দেও। আমি চাই জমিতে যাও, ধান বোনাও, কর্মচারীদের বলে দেবার চাই, একজন ঘুষ খাবেন না, আমি ক্ষমা করব না।’ মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর প্রতিহিংসাপরায়ণবশে অনেক সহিংস ঘটনার বিরুদ্ধে সর্তকবাণী উচ্চারণ করেন এই বলে যে – ‘আজ আমার কারও বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা নাই, একটা মানুষকে তোমরা কিছু বলো না, অন্যায় যে করেছে তাকে সাজা দেবো। আইনশৃঙ্খলা তোমাদের হাতে নিও না।’

আরও পড়ুন- কেন বঙ্গবন্ধুর জানাজায় মাত্র ৩৫ জন উপস্থিত ছিল?

এরপরে কেটে গেছে প্রায় ৪৭ বছর। প্রিয় নেতা মারা যাওয়ারও হয়ে গেছে ৪২ বছর। তাও আজও নানা ত্যাগ-তীতিক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়া এই জাতিটাকে এতোটা স্বপ্ন আর দেখাতে পারেননি কেউই। বঙ্গবন্ধুর সেদিনকার ভাষণটাই ছিলো দেশ গড়ার ডাক । সে ভাষণটিই ছিলো নতুন দেশ পুনর্গঠনের নক্সা ও ভবিষ্যত বাংলাদেশের রূপরেখা। পূর্বপ্রস্তুতিহীন সেই সংক্ষিপ্ত ভাষণই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদৃষ্টির।

এ সংক্ষিপ্ত ভাষণেই বাঙালী জাতি ও ভবিষ্যত বাংলাদেশ গড়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পেরেছিলেন তিনি। বাংলার রাজনীতির মুকুটহীন সম্রাট সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবের হাত ধরে সেদিনই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রবেশ করে গণতন্ত্রের এক আলোকিত অভিযাত্রায়। শেষ করি মানুষটার আরেকটা স্বপ্নের কথা বলে। যে স্বপ্ন আজও অধরা। যে স্বপ্ন আজও দুঃস্বপ্ন হয়ে কাদায়। পিতা চেয়েছিলেন – ‘ এই বাংলাদেশে হবে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা, এই বাংলাদেশে হবে গণতন্ত্র, এই বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। আমি দেখায় দেবার চাই দুনিয়ার কাছে শান্তিপূর্ণ বাঙালী রক্ত দিতে জানে, শান্তিপূর্ণ বাঙালী শান্তি বজায় রাখতেও জানে।’

আরও পড়ুন- বঙ্গবন্ধুকে যে ভয় পেত সৌদি আরব!

Comments
Spread the love