বিষয়টি হয়ত ক্রিকেটীয় স্পিরিটের সাথে সাংঘর্ষিক, কিন্তু তারপরও পেশাদার ক্রিকেটে বল টেম্পারিং হরহামেশাই হয়ে থাকে। সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটে প্রায় সব দলেই এক বা একাধিক ক্রিকেটার থাকেন যারা এতটাই সূক্ষ্মভাবে, চতুরতার সাথে বল টেম্পারিং করতে সক্ষম যে তা কারও নজরেই পড়ে না।

কিন্তু নিউল্যান্ডে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টে ধরা পড়ে গেছেন ক্যামেরন ব্যানক্রফট। ব্রডকাস্টারদের ভিডিও ফুটেজের কল্যাণে বিশ্ববাসী হাতেনাতে পেয়েছে। কিন্তু কেন ধরা পড়লেন ব্যানক্রফট? অন্য আরও অনেক ক্রিকেটাররা তো মাঠের চারিদিকে বসানো অসংখ্য ক্যামেরার দৃষ্টি ফাঁকি দিয়েও দিব্যি বল টেম্পারিং করে যান, কেউ তাদের টিকিটিও ছুঁতে পারে না। তাহলে ব্যানক্রফটের কপাল পুড়ল কীভাবে?

গোটা বিষয়টি তলিয়ে দেখতে গিয়ে এটি এখন স্পষ্ট যে, ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়াটাই কাল হয়েছে ব্যানক্রফটের। তিনি যদি ভয় পেয়ে তার বিরুদ্ধের সব প্রমাণ ট্রাউজারের ভিতর চালান করে দেয়ার মত বোকামি না করতেন, তবে আজ হয়ত নিষিদ্ধ হতে হতো না তাকে, বা স্টিভ স্মিথ বা ডেভিড ওয়ার্নারকে। এমনটিই মনে করেন সদ্য শেষ হওয়া দক্ষিণ আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়া সিরিজের অফিসিয়াল ব্রডকাস্টার সুপার স্পোর্টের প্রোডাকশন হেড অ্যালভিন নাইকার।

বলে রাখা ভালো, নাইকারের অঙ্গুলি নির্দেশেই সর্বসম্মুখে এসেছে সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত এই স্ক্যান্ডালটি।

প্রথমবার ক্যামেরায় ব্যানক্রফটের হাতে যে কিছু একটা রয়েছে আর তিনি সেটি দিয়ে বলের উপর কারিকুরি করার চেষ্টা করছেন তা ধরা পড়লেও, সেটি যে শিরিষ কাগজ এবং তিনি বাস্তবিকই বল টেম্পারিংয়ের সাথে যুক্ত, সেটি প্রমাণের কোন উপায় ছিল না। কিন্তু পরে যখন তিনি জানতে পারেন যে ক্যামেরায় তার কুকর্ম ধরা পড়ে গেছে, তখন তিনি ভয় পেয়ে গিয়ে দ্রুত হলুদ রঙের টেপজাতীয় বস্তুটি তার ট্রাউজারের ভিতর দিয়ে অন্তর্বাসের ভিতর চালান করে দেন, এবং সেই ঘটনাটিও নজর এড়ায়নি ক্যামেরার। আর এর ফলেই গোটা ঘটনাটি চলে গেছে তার বিরুদ্ধে।

নাইকার বলেন, ‘প্রথমে আমরা কেবল দেখতে পেয়েছিলাম যে তার হাতে কিছু একটা রয়েছে, আর তিনি সেটি তার পকেটের ভিতর ঢুকালেন। কিন্তু আমরা জানতাম না সেটি কী। কিন্তু পরে যখন তিনি ভীত হয়ে পড়লেন, আর জিনিসটি তার অন্তর্বাসের মধ্যে চালান করে দিলেন, তখনই হলুদ টেপটি আমরা প্রথমবারের মত পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই।’

ব্যানক্রফটের পকেটে কিছু একটা ঢুকানোর দৃশ্য যখন মাঠের বড় পর্দায় প্রথমবার দেখানো হয়, তখন অনফিল্ড আম্পায়ার নাইজেল লং ও রিচার্ড ইলিংওয়ার্থ তাকে ডাক দেন। তখন তিনি আম্পায়ারদের সামনে একটি ছোট কালো কাপড়ের টুকরা বের করে দেখান, যেটি তিনি তার সানগ্লাস মোছার কাজে ব্যবহার করে থাকেন। আম্পায়াররা ওই মুহূর্তে কালো কাপড়টি দেখে সন্তুষ্টই হয়েছিলেন।

নাইকারের বিশ্বাস, ব্যানক্রফট যদি হলুদ টেপটি তার পকেটেই রেখে দিতেন, এবং ওই অবস্থায়ই আম্পায়ারদেরকে ওই কালো কাপড়টি দেখাতেন, তাহলেও পুরো ঘটনাটি ওখানেই মিটে যেত। কারণ তার বিরুদ্ধে বড় কোন প্রমাণই তখন পর্যন্ত ছিল না।

‘যেই মুহূর্তে তিনি প্যান্টের ভিতর প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা করলেন, তখনই আমরা বুঝে যাই যে ঘটনাটি কত বড় হতে চলেছে। তার আগ পর্যন্ত আমরা বিষয়টি নিয়ে একদমই নিশ্চিত ছিলাম না।’

নাইকার আরও জানান যে ক্যামেরাম্যানরা আলাদা করে ব্যানক্রফটের ওপর কখনোই নজর রাখছিলেন না। বরং সবসময়ই তারা যেটি করে থাকেন তা হলো, পুরো ফোকাসটি রাখেন বলের উপর। বল যখন যে খেলোয়াড়ের হাতে যায়, ক্যামেরায় তখন সেই খেলোয়াড়ের সকল কর্মকান্ড ধারণ করা হয়।

‘মাঠে আমাদের সর্বমোট ৩০টি ক্যামেরা থাকে। এর মধ্যে সাতটি ক্যামেরা আমরা ব্যবহার করি কেবল বলের উপর ধরে রাখার জন্য। খেলা চলুক বা না চলুক, ওই ক্যামেরাগুলো বলকে অনুসরণ করতে থাকে।’

সুপার স্পোর্টের ক্যামেরাম্যানরা আরেকটি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। সেটি হলো, তারা একদম সঠিক সময়ে ক্যামেরা অস্ট্রেলিয়ান ড্রেসিংরুমে কোচ ড্যারেন লেহম্যানের উপর তাক করেছিলেন। ‘ওই ঘটনার পর (প্রথমবার ব্যানক্রফটের হাতে কিছু একটা দেখা যাওয়ার পর) আমাদের ক্যামেরাম্যানরা খুব স্মার্টলি অস্ট্রেলিয়ান কোচিং স্টাফদের অনুসরণ করতে থাকেন, এবং তখনই আমরা দেখতে পাই কোচ লেহম্যান ওয়াকি-টকিতে অতিরিক্ত খেলোয়াড়টিকে (পিটার হ্যান্ডসকম্ব) কিছু একটা বললেন, আর তারপর ওই খেলোয়াড় দৌড়ে মাঠে প্রবেশ করে ব্যানক্রফটের সাথে কথা বললেন। তখনই ব্যানক্রফট আতঙ্কিত হয়ে ভুলটি করে বসেন।’

নাইকারের দাবি, সব টেস্টেই তারা ‘ফলো দ্য বল’ পলিসি অনুসরণ করে থাকেন, এবং এর মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া দলের বিপক্ষে না হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা দলের বিপক্ষেও যদি কোন অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যেত, তারা অবশ্যই সেটি প্রচার করতেন।

‘আলাদা করে অস্ট্রেলিয়া দলের পেছনে লাগার কোন উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না। কোন দক্ষিণ আফ্রিকানের বিরুদ্ধেও যদি এরকম কোন অপরাধের ফুটেজ পাওয়া যেত, আমরা সেটি প্রচার করতাম। কারণ আমাদের প্রথম কাজ বিনোদন দেয়া হতে পারে, কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে আমাদেরকে নীতিবোধের জায়গায়ও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়, এবং সেজন্য যেকোন পরিস্থিতিতে আমরা নিরপেক্ষতা বজায় রাখি।’

Comments
Spread the love