খেলা ও ধুলা

পঞ্চপাণ্ডবে সওয়ার হয়ে বাংলাদেশের সিরিজ জয়!

সব কোলাহল থেমে গেছে তখন। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া ওয়ার্নার পার্কে আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। গ্যালারী ফাঁকা, মাঠকর্মীদের দেখাও মিলছে না আশেপাশে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল মাঠ থেকে বেরুনোর প্রস্ততি নিচ্ছে। বাংলাদেশের ড্রেসিংরুম থেকে ভিক্টোরি সং ‘আমরা করবো জয় ভেসে আসছে বেশ জোরেসোরে। কিংবা হয়তো চারপাশের নিস্তব্ধতার জন্যেই বিজয়ের গানটা এমন জোরালো শোনালো। সে যাই হোক, জয়ের দিনে জয়ের গান তো বাংলাদেশ গাইতেই পারে। স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আঠারো রানে হারিয়ে ওয়ানডে সিরিজটা ২-১ ব্যবধানে জিতে নিয়েছে মাশরাফির দল, তবে খর্বশক্তি নয়, এবার মোটামুটি পূর্ণশক্তির দলটাকেই তাদের মাটিতে হারালো বাংলাদেশ।

এই ম্যাচটা হতে পারতো নিয়মরক্ষার ম্যাচ। সিরিজটা বাংলাদেশ জিতে যেতে পারতো গায়ানাতেই। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে নিজেদের ভুলে এমন অদ্ভুতভাবে জয়টা হাতছাড়া না হলে সিরিজ জয়ের উৎসবটা সেখান থেকেই সেরে আসতে পারতো। কিন্ত সেই বিলম্বটা সইতে হলো বাংলাদেশ দলকে। জেসন হোল্ডারের ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সিরিজ হারিয়ে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিলো, টেস্ট-টি-২০ যেমন তেমন, পঞ্চাশ ওভারের ম্যাচে টাইগারেরা ছেড়ে কথা বলে না।

বাংলাদেশ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ওয়ানডে, মাশরাফি বিন মুর্তজা, তামিম ইকবাল

টসে জিতে ব্যাটিং, চেনা চিত্রনাট্য। ব্যাট হাতে আনামুল হক আরও একবার ব্যর্থ, এখানেও আশ্চর্য্য রকমের মিল। আগের দুই ম্যাচের মতোই শুরুর ধাক্কা সামলে তামিম একপাশ আগলে রেখে স্কোরটাকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন। সাকিব সাঁইত্রিশে কাটা পড়লেন, মুশফিকও টিকতে পারলেন না। টেস্ট আর ওয়ানডে মিলিয়ে ক্যারিবিয়ানে বাজে সময় পার করা মাহমুদউল্লাহ হয়তো প্রায়শ্চিত্ত করতে চাইলেন আজ, তার ব্যাটও ধারালো হয়ে উঠলো তামিমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। গায়ানায় ছিল স্লো আউটফিল্ড আর ধীরগতির উইকেট, রান তোলাটা সংগ্রামের মতোই ছিল সেখানে। তবে ওয়ার্নার পার্কের উইকেট খানিকটা ভিন্ন, ব্যাটে-বলে টাইমিং ভালো হচ্ছিল, আউটফিল্ডও যথেষ্ট ফার্স্ট।

ক্যারিয়ারের এগারোতম ওয়ানডে সেঞ্চুরী তুলে নিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরেছেন তামিম ইকবাল। একটা রেকর্ডও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছেন। এই প্রথম দেশের বাইরে টানা তিন ম্যাচে পঞ্চাশের বেশি রান করলেন কোন বাংলাদেশী ব্যাটসম্যান। সিরিজে তামিমের মোট রান ২৮২, এটাও দেশের বাইরে তিন ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশেএ হয়ে সর্বোচ্চ। তবুও আক্ষেপ জাগাবে ধীরগতির ইনিংসগুলো। তামিমের স্ট্রাইকরেটটা যে ২০১৮ সালের তুলনায় খানিকটা বেমানান!

বাংলাদেশ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ওয়ানডে, মাশরাফি বিন মুর্তজা, তামিম ইকবাল

দলের লোয়ার মিডল অর্ডারের অবস্থা তথৈবচ, অধিনায়ক তাই নিজেই ব্যাট-প্যাড নিয়ে নেমে পড়লেন ছয় নম্বরে! এই সিদ্ধান্তটাই খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিল অনেকটা। মাহমুদউল্লাহ’র সঙ্গে ৪২ বলে ৫৩ রানের দারুণ একটা জুটি গড়েছেন মাশরাফি, এরমধ্যে ৩৬ রানই তার! দলকে তিনশো পার করিয়েছেন রিয়াদ, দরকারের সময় জ্বলে উঠেছেন তিনি। ৪৯ বলে ৬৭ রানের দারুণ কার্যকর এক ইনিংস খেলে অপরাজিত মাঠ ছেড়েছেন তিনি। স্কোরবোর্ডে তখন জ্বলজ্বল করছে ৩০১ রানের সংগ্রহ।

টার্গেটটা সহজ কিছু নয়, আবার একদম অসম্ভবও নয়। গেইলের মতো দানব যে দলে আছেন, সেই দলের কাছে তিনশো রানের টার্গেট মামুলীই হবার কথা। একপাশ থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়েছেন এই বাঁহাতি। লুইস আর শাই হোপের ধীরগতির ব্যাটিং রানরেটটাকে বাড়তে দেয়নি, নইলে গেইল খেলেছেন তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই। রুবেলের বলে মিরাজ তার ক্যাচটা তালুবন্দী করার সাথে সাথেই ম্যাচের ভবিষ্যত লেখা হয়ে গিয়েছিল অনেকটা। তবে সেটা পাল্টে দেয়ার জন্যে একজন পাওয়েল ছিলেন।

বাংলাদেশ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ওয়ানডে, মাশরাফি বিন মুর্তজা, তামিম ইকবাল

বিশাল বিশাল একেকটা ছক্কায় বল আছড়ে ফেলেছেন গ্যালারির এখানে সেখানে। মুস্তাফিজের ওপর দিয়েই ঝড়টা বেশি গেছে। ৪১ বলে ৭৪ রানের ইনিংসে জয়ের সাথে ক্যারিবীয়দের ব্যবধানটা কমিয়ে আনছিলেন এই তরুণ। বাংলাদেশি পেসারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং সেটা হতে দেয়নি। রুবেল স্লগ ওভারে ভালো বোলিং করেছেন বেশ কিছুদিন পর। মুস্তাফিজও খরুচে বোলিঙের পর ফিরে এসেছেন ট্র‍্যাকে। মাশরাফি আস্থা রেখেছিলেন এই দুজনের ওপর, তারা সেটার প্রতিদান দিতে পেরেছেন ঠিকঠাক। আর তাতেই জয় নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশের। ম্যাচে মোটামুটি সারাক্ষণই ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভয়ও ধরিয়েছে, তবে আতঙ্কে পরিণত হতে পারেনি শেষমেশ। 

ফিল্ডিং ভালো হয়নি, ক্যাচ মিস হয়েছে একাধিক। ভালো লেগেছে দলের আত্মবিশ্বাস, জয়ের বাসনাটা। অধিনায়ক মাশরাফি মুগ্ধ করেছেন আরও একবার, সিরিজজুড়েই হতাশ করেছেন তরুণেরা। বাংলাদেশ যে এখনও পঞ্চপাণ্ডবের দল, সিনিয়র পাঁচজনের ওপর নির্ভরশীলতার পরিমানটা যে মাত্রাতিরিক্ত রকমের বেশি, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো এই সিরিজটা। সিনিয়রেরা দায়িত্ব নিয়ে খেলছেন, সেটা অবশ্যই দারুণ, কিন্ত তরুণ যারা আছেন, তারা ঠিকঠাক সাপোর্ট দিতে পারছেন না, এটা শঙ্কার ব্যাপার। বিজয়-সাব্বির দুজনই ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ, তাদের ব্যাপারে ভাবার সময় বোধহয় হয়েছে বোর্ডের। উদ্বোধনী জুটিতে তামিমের যোগ্য সঙ্গী খোঁজার সময়টা দীর্ঘায়িত হলো আরও।

বাংলাদেশ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ওয়ানডে, মাশরাফি বিন মুর্তজা, তামিম ইকবাল

এই ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে মাশরাফির অজস্র স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ২০০৭ এর ভারতবধের ঐতিহাসিক কাব্য, মাশরাফির সেই ‘ধরে দিবানি’ ডায়লগটা- এগুলো অমর হয়ে আছে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে। এখানেই ক্যারিয়ারের অনেক কিছু হারিয়েছিলেন মাশরাফি, চোটে আক্রান্ত হয়ে ভালোবাসার টেস্ট ক্রিকেট থেকে নির্বাসনে যেতে হয়েছিল সাত বছর আগে।

সেবারই ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় সারির দলটার বিরুদ্ধে প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। নয় বছর বাদে আরেকটা সিরিজে মাশরাফি বিন মুর্তজা একদম সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে জেতালেন বাংলাদেশকে। ম্যাচের আগে আনঅফিসিয়াল একটা ইন্টারভিউতে জোরগলায় বলেছিলেন, বাংলাদেশ জিতবে। মাশরাফি জোরগলায় যেটা বলেন, সেটা কি ভুল হতে পারে? একটা জিনিস ইদানিং মোটামুটি নিয়মে পরিণত হচ্ছে, মাশরাফির বাংলাদেশ দলটা হয়তো প্রতিটা ম্যাচ জেতে না, তবে মাশরাফিকে ছাড়া যে বাংলাদেশ একদমই জেতে না আজকাল!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close