গতকালের ম্যাচ শুরুর আগে এক উদ্ভট পরিসংখ্যানের সামনে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ-শ্রীলংকা দুই দলই। যেই হারবে, তাকেই বরণ করতে হবে টি-২০ খেলুড়ে দেশগুলো মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে ৫০টি ম্যাচ হারের লজ্জা। অর্থাৎ সোজা বাংলায় বললে দুই দলই দাঁড়িয়েছিল তাদের পঞ্চাশতম হারের সামনে। আচ্ছা বলুন তো, গত বছরের ৬ই এপ্রিল যে দল শেষ টি-২০ ম্যাচ জিতেছিল, যে দল এরপর হেরেছে টানা ১৩টি ম্যাচ, সেই বাংলাদেশ দলের পক্ষে আপনারা ক’জন বাজি রেখেছিলেন?

হয়তো অনেকেই আশা ছাড়তে পারেননি, হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। আপনাদের দোষ দেওয়া যায় না। যুক্তির হিসাবে বাজি ধরার কথাও না! তার উপর যখন প্রথমে ব্যাট করতে নেমে গত দুই সিরিজে ম্যাচের পর ম্যাচ জেতা প্রবল আত্মবিশ্বাসী শ্রীলংকা ২১৪ রানের বিশাল পাহাড় সমান স্কোর দাঁড় করিয়ে ফেললো, তখন বাংলাদেশ সম্মানজনক হারটাও অর্জন করতে পারবে কিনা সেটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সবচেয়ে বড় প্রশ্ন! যে ফরম্যাটে আফগানিস্তানের মত দল আমাদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে, সেই ফরম্যাটে আসলে আশায় বুক বাঁধা পাগলামীরই সামিল। অথচ কি অবিশ্বাস্য ব্যাপারটাই না ঘটে গেল!

এই লিটন দাসকে স্যার, লর্ড ইত্যাদি কত বিশেষণেই না বিশেষায়িত করেছে আমাদের দেশের আপামর ক্রিকেট বোদ্ধারা! সবচেয়ে জঘন্য ছিল উগ্র ধর্মান্ধদের “লিটন হিন্দু কোটায় খেলে” এই বাণী। কতটা নির্লজ্জ কীট হলে লিটন-সৌম্যের মত দেশের সম্পদদের এইভাবে অপমান করা যায়? দিনের পর দিন এটাই করে গেছে আমাদের তথাকথিত ফ্যানবেজ। অথচ এদের দরকার ছিল স্রেফ একটু সাপোর্ট, একটু সমর্থন। গতকাল মাত্র ১৯ বলে ৪৩ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেছেন লিটন দাস, ২২৬ স্ট্রাইক রেটে এই ইনিংসটায় লংকান বোলারদের লাইনলেংথ এলোমেলো হয়ে যাওয়া ছাড়াও সবচেয়ে অসাধারণ দিক ছিল সম্ভবত বোলারদের মনোবল, আত্মবিশ্বাস দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া। পাঁচটা ছয় মেরেছেন লিটন, যা বাংলাদেশের হয়ে টি-২০ তে এক ইনিংসে নাজিমুদ্দিন, জিয়াউর রহমান এবং তামিম ইকবালের সাথে সর্বোচ্চ ছয়ের রেকর্ড। এই ছয়ের মারগুলো এতোটাই নিখুঁত আর অসাধারণ ছিল, টাইমিং-হ্যান্ডআই কোঅর্ডিনেশন-রিফ্লেক্স-প্লেসমেন্ট এতোটাই অসামান্য ছিল যে চোখে দেখেও বিশ্বাস হতে চায় না। তাকে যারা লর্ড বলে গালাগাল দিয়েছিল এতোদিন, খুব একটা মিথ্যা বলেনি আসলে। একজন বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে এমন অভিজাত আর রাজকীয় ব্যাটিং এর আগে আর কবে দেখেছে বিশ্বক্রিকেট?

জয়ের দিনে ব্যর্থতাগুলো তুচ্ছ হয়ে যায়। তবুও বলতে হচ্ছে, এবার অন্তত সাব্বির আর তাসকিনকে নিয়ে লম্বা সময় ঘরোয়া ক্রিকেটে কাজ হোক! জঘন্য ছিল আজকের পারফরম্যান্স! একেবারেই জঘন্য! বিশেষ করে সাব্বিরের রানটা পূর্ন করার মত, ব্যাটটা প্লেস করতে একটা ডাইভ দেওয়ার মত আগ্রহটুকুও ছিল না। আর তাসকিনের ব্যাপারে আর কিছু বলার নাই। দুইজনই আমাদের অ্যাসেট হবার কথা ছিল লাস্ট তিন-চার বছরে, তার বদলে তারা হয়ে গেছে বারডেন। আজকের জঘন্য পারফরম্যান্সের পরেও কি তাদের স্পেশাল কেয়ার নেওয়া হবে না? দল থেকে বাদ দিয়ে আরেকজনের ব্যর্থতায় আবার দলে ঢুকিয়ে আখেরে আসলে লাভটা কি হবে?

গতকাল যদি আমরা হেরে যেতাম, তাহলে তাসকিনকে সবাই চোখ বন্ধ করে দোষারোপ করতো। অথচ ম্যাচের পর ম্যাচ চার ওভারে মিনিমাম ৪০ রান করে উদারহস্তে দান করা, চরম এলোমেলো বোলিং করা যদি তাসকিনের দোষ হয়, তার চেয়েও অনেক বেশি দোষ যারা দল নির্বাচন করেন তাদের। কারণ আমাদের দেশে দলে ঢুকতে ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে হয় না, স্রেফ অন্য একজনকে খারাপ করতে হয়। এই সিরিজে তাসকিনের খেলার কোন যুক্তি নেই, কারণ শেষ যেবার তাসকিন বাদ পড়েছিলেন, তারপর তিনি নিজেকে নিয়ে এমন কোন কাজ করেননি বা আহামরি কোন পারফরম্যান্স দেখাননি ঘরোয়া ক্রিকেটে যে তার জোরে তিনি দলে ঢুকবেন। ফলে ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচেই সেই ছন্নছাড়া বোলিং, এলোমেলো লাইন-লেংথে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়। থোড় বড়ি খাড়া খাড়া বড়ি থোড়!

একই কথা খাটে সাব্বিরের বেলাতেও। অসদাচরণের কারণে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিষিদ্ধ করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলিয়ে যাওয়ার মত চরম উদ্ভট সিদ্ধান্ত নেওয়া নির্বাচকেরা এখনো পরিষ্কার করে বলতে পারেননি যে এতো বাজে পারফরম্যান্সের পরেও কেন সাব্বিরকে বিশ্রাম দিয়ে তাকে নিয়ে আলাদা করে কাজ করা হচ্ছে না। এমন অসাধারণ জয়ের পর আসলে তিক্ত বিষয়ে কথা বলতে বা শুনতে ভালো লাগে না। কিন্তু যদি আমরা আদৌ নিয়মিত ভালো ফলাফল চাই, সত্যিই যদি এই ধরণের ম্যাচ আরো জিততে চাই, তাহলে সাব্বির-তাসকিনদের মত প্রতিভাগুলোর যত্ন নিতে হবে, ম্যাচের পর ম্যাচ আত্মবিশ্বাসহীন, ফর্মহীন থাকা সত্ত্বেও জোর করে খেলিয়ে, প্রতি ম্যাচে ৪-৫ জন করে তরুণ প্রতিভাকে ডেব্যু করিয়ে পরের ম্যাচে ছুঁড়ে ফেলে এই সম্ভবনাগুলো এভাবে অঙ্কুরেই নষ্ট করা যাবে না। আমাদের নির্বাচকেরা কি আদৌ টের পান? টের পাবেন?

দুই মাস আগেও টি-টোয়েন্টিতে ছিল না তাঁর কোনো ফিফটি। টি-টোয়েন্টি দলে তাঁর জায়গা হওয়া উচিত কি না, এমন একটা প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছিল। কাল মুশফিকুর রহিম যে ইনিংস খেললেন, এরপর সেই প্রশ্ন হয়তো চিরতরেই ধামাচাপা পড়ে গেছে। এই টুর্নামেন্টের আগে মুশফিকের টি-২০ অ্যাভারেজ ছিল মাত্র ১৫ বা ১৬! কতজনই বলেছিল যে, মুশফিক কেন টি-২০ খেলে! আমি নিজেও মুশফিককে স্রেফ ওয়ানডে আর টেস্টে চেয়েছিলাম, কারণ আমার মনে হচ্ছিল টি-২০টা ওর সাথে যাচ্ছে না। ওর ব্যাটিং প্রতিভা ওয়ানডে আর টেস্টেই সবচেয়ে বেশি দরকার আমাদের।

কি অবিশ্বাস্য মানসিক দৃঢ়তা আর অনমনীয় হার না মানা পরিশ্রমে আমার মত হাজারো মতকে হাস্যকর প্রমাণ করে দিল ছেলেটা! বাংলাদেশের টি-২০ খেলার সক্ষমতাই যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছিল ম্যাচের পর ম্যাচ হারতে হারতে, লিটনের আনবিলিভেবল ব্যাটিং আর তামিমের দায়িত্ব নিয়ে খেলা ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে কি অসামান্য ইনিংসটাই না খেললো মুশফিক! কি অসাধারণ! কি অসাধারণ! মাত্র ৩ বলে ২ রানে নিতে পারি নাই আমরা, এরজন্য কত গালি খাইতে হয়েছে ওকে, এতো বড় একটা অভিশপ্ত চাপ মাথায় উপর রেখে প্রত্যেকটা গালি, প্রত্যেকটা অপমানের জবাব কি অনন্যসাধারণ ভাবেই না দিল!

তার ৩৫ বলে ৫ চার ও ৪ ছয়ে ৭২ রানের ইনিংসে মাত্র ৪টা ডট বল। শেষ ১৯ বলে একটাও ডট বল নাই! স্রেফ এদ্দুরই বলে দিচ্ছে কতটা ক্ষুধার্থ আর নিখুঁত ছিল এই আহত বাঘ! আসলে আহত বাঘের চেয়ে ভয়ংকর তো আর কিছু নাই, তাই না?

এইভাবে ভুল প্রমাণ হবার জন্যই বেঁচে থাকি! দাঁতে দাঁত চেপে এমন লড়াই দেখার জন্যই বেঁচে থাকি! হারতে হারতে, লজ্জায় অপমানে মাটির সাথে মিশে যাওয়ার মুহুর্তে এইভাবে বুক চিতিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিজয়ের মালা ছিনিয়ে আনতে দেখার জন্যই বেঁচে থাকি!

অসংখ্য ধন্যবাদ মুশফিকুর রহিম! অসংখ্য ধন্যবাদ লিটন দাস, সৌম্য সরকার, তামিম ইকবাল! এমন একটা মুহুর্ত উপহার দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ বাংলাদেশ টাইগার্স!

Comments
Spread the love