মুশফিক তখন হেরাথের বলে পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে হাঁটা ধরেছেন প্যাভিলিয়নের পথে, টিভি ক্যামেরায় ধরা পড়লো এক দর্শকের বিরক্ত মুখ। ছুটির দিনটা বাসায় ঘুমিয়ে কাটালেই ভালো করতেন, কেন যে এসব ছাইপাঁশ দেখতে এসেছেন, এমনটা ভেবে বোধহয় নিজেকেই গালমন্দ করছিলেন তখন। ওই ভদ্রলোক তো মাঠে গিয়েছেন, ঘরে বসে টিভি পর্দার সামনে বসে যারা খেলা দেখেছেন, পুরোটা সকাল নষ্ট হলো ভেবে আফসোসে পুড়তে পারেন তারাও।

টেস্ট সিরিজটা শুরুর আগেই সহজ একটা সমীকরণ ছিল বাংলাদেশের সামনে, একটা টেস্ট জিতলেই, বা সিরিজ ড্র করলেই ভগ্নাংশের ব্যবধানে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পেছনে ফেলে টেস্ট র‍্যাঙ্কিঙের আটে উঠে যাবে বাংলাদেশ দল। তবে সেটা করতে ঘোর আপত্তি ছিল টাইগারদের। টেস্ট টেম্পারমেন্ট ব্যপারটা যাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র নেই, দুয়েকজন ব্যাটসম্যান ছাড়া গোটা দলে যেখানে টেস্ট শব্দটার মর্যাদা বোঝেন না কেউ, সেই দলটা ভুলে র‍্যাঙ্কিঙের আটে উঠে গেলে তো টেস্ট ক্রিকেটকেই অপমান করা হতো!

না, বাংলাদেশের ক্রিকেটারেরা ক্রিকেটের অভিজাত এই সংস্করণটাকে কলঙ্কিত করতে চাননি একটুও। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরে তারা দেখিয়ে দিলেন, বাইশ গজে আত্মাহুতি কতরকম ভাবে দেয়া যায়। কত অদ্ভুত উপায়ে আউট হওয়া যায়, প্রশ্নবিদ্ধ টেকনিক আর ফুটওয়ার্ক নিয়েও টেস্ট দলের সদস্য হওয়া যায়, সমশক্তির, বা নিজেদের চেয়েও অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ঘরের মাঠে কিভাবে আত্মসমর্পন করা যায়!

কোন দিকটায় বাংলাদেশ ভালো ছিল ঢাকা টেস্টে? প্রতিটা জায়গায়, প্রতিটা বিভাগে ডমিনেট করেছে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশকে পাত্তাই দেয়নি ওরা। অথচ এটা সাঙ্গাকারা-জয়াবর্ধনের শ্রীলঙ্কা নয়, এই দলে মুরালি-ভাসরা নেই। খেলা দেখে অবশ্য সেটা মনে হয়নি। রোশান সিলভা বা কুশল মেন্ডিজেরা এখানে সাঙ্গা-মাহেলা হয়ে গেলেন, হেরাথের মধ্যে মুরালির ছায়া, লাকমল যেন চামিন্দা ভাসের চেয়েও ভয়ঙ্কর বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কাছে! অদ্ভুত না?

বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কা, টেস্ট টেম্পারমেন্ট

টপ অর্ডার থেকে টেল-এন্ডার, উইকেটে আসা যাওয়া করেই কাটিয়েছেন সবাই। দুই ইনিংস মিলিয়ে নিজেদের হোম অব ক্রিকেটে কোন দল ২৩৩ রান করলে, তারা টেস্ট ম্যাচ জেতাটা ডিজার্ভ করে না কোনভাবেই। আমাদের ব্যাটসম্যানদের টেকনিকের অভাব আছে, এটা বিশ্বাস করি না। যেটা আছে, সেটা টেম্পারমেন্টের ঘাটতি। যে তামিম ইকবালকে নিয়ে আমরা গর্ব করি, তিনিও চার ইনিংসেই সুপারফ্লপ। তাকে বোকা বানানোটা শ্রীলঙ্কান বোলারদের জন্যে ‘বাম হাতের খেল’ বলে মনে হয়েছে প্রতিবার। দলের সেরা ব্যাটসম্যানের এমন অবস্থা হলে, সেই দল সোয়া দুই দিনে টেস্ট হারবে না তো কি করবে?

রোশান সিলভা দুটো ইনিংসেই হাফসেঞ্চুরী করেছেন। এই উইকেটে সেই ৫৬ আর ৭০ রানের ইনিংসগুলো ডাবল সেঞ্চুরীর মতোই মহামূল্যবান। মাহাত্ম্যটা আরও বেড়ে যাচ্ছে আরেকটা কারণে, বারবার টেলএন্ডারদের নিয়ে ছোট ছোট জুটি গড়ে দলের রান বাড়িয়েছেন রোশান, বাংলাদেশের ফিল্ডারেরা তাকে সুযোগ দিয়েছেন, তিনিও সেই সুযোগের পরিপূর্ণ সদ্যবহার করেছেন। প্রথম ইনিংসে শ্রীলঙ্কার ষষ্ঠ উইকেটের পতন ঘটেছিল ১১০ রানে, অথচ তারাই শেষ চার উইকেটে তুলেছে ১১২ রান! যেখানে দেড়শোর আগে গুটিয়ে ফেলা উচিত ছিল শ্রীলঙ্কাকে, সেখানে তারাই পেরিয়েছে দুইশোর কোটা। আর বাংলাদেশ দল ১০৭/৫ থেকে অলআউট হয়েছে ১১০ রানে!

দ্বিতীয় ইনিংসেও একই অবস্থা, ১৭৮ রানে অষ্টম উইকেটের পতনের পরেও একপ্রান্ত আগলে রেখে দলকে টেনেছেন রোশান, নবম উইকেটেই এসেছে ৪৮ রান! এটাই টেস্ট টেম্পারমেন্ট, যেটা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে অনুপস্থিত।

বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কা, টেস্ট টেম্পারমেন্ট

রোশান সিলভা তো কোন সুপারম্যান নন, জাদুকরী মেধার অধিকারীও নন। তবে তিনি ক্রিকেটটা বোঝেন, টেস্ট ক্রিকেট কিভাবে খেলতে হয় সেটা জানেন। উনত্রিশ বছর বয়সে টেস্ট অভিষেক হয়েছে তার, সাদা জার্সিটা গায়ে জড়ানোর আগে খেলে ফেলেছেন একশোর বেশী ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ। পার্থক্যটা এখানেই। মুমিনুল আর ইমরুল ছাড়া আমাদের এই দলটার কে কয়টা ফার্স্টক্লাস ম্যাচ খেলেছেন সেটা আঙুলে গুণে দেয়া যাবে। টেস্ট টেম্পারমেন্ট ব্যপারটা তাই আমাদের মধ্যে অনুপস্থিত, ধরে খেলবো না মেরে খেলবো নাকি ছেড়ে খেলবো, এই চক্করেই পড়ে থাকতে হয় সারাবছর। দশ-বারো বছর ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে ক্রিকেট খেলেও এমন জঘণ্য ব্যাটিং প্রদর্শনী উপহার দিলে দর্শক হিসেবে ধৈর্য্যধারণ করাটা খুব কঠিণ।

রাহুল দ্রাবিড়ের একটা কথা আমার খুব প্রিয়, তার ভাষায়- “একজন কমপ্লিট ব্যাটসম্যানকে সব অবস্থায় ব্যাটিঙের জন্যে প্রস্তত থাকতে হবে। তাকে জানতে হবে ২৫০/৩ স্কোরে কিভাবে ব্যাটিং করতে হবে, আবার বিশ রানে চার উইকেট পড়ে গেলে কিভাবে হাল ধরতে হবে, সেটাও তার জানা থাকতে হবে, সেখান থেকে দলকে উদ্ধার করতে হবে।” আর এখানেই ধরা খেয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানেরা। একারণেই রোশান সিলভা দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন, তামিম-মুশফিকরা উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসেন। ছোট ছোট ব্যপারগুলোই এভাবে বড় বড় পার্থক্য গড়ে দেয়, জয় আর পরাজয়ের মাঝে ব্যবধান তৈরী করে।

বোলিং কি মনমতো হয়েছিল? উইকেট পড়েছে, একইসঙ্গে বাজে বল করে গেছেন বোলারেরা। স্ট্যাম্পের মাইক্রোফোনে শোনা যাচ্ছিল, লিটন বারবার শর্ট বল দিতে নিষেধ করছিলেন স্পিনারদের। অথচ তাইজুল-রাজ্জাক মিলে শর্ট বলের মেলা বসিয়ে দিচ্ছিলেন, যেন শর্ট বল না দিলে প্রাণ যাবে! উইকেট পেলেই যে বোলিং ভালো হয়েছে, এমনটা সত্যি নয় সবসময়। আর ফিল্ডিং! এটার কথা যতোই বলা হবে ততোই মনে হয় শব্দের অপচয়। ‘রেস্ট ইন পিস’ বলে ক্ষান্ত দেয়াই ভালো।

বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কা, টেস্ট টেম্পারমেন্ট

মোসাদ্দেক দলে নেই। তাকে স্কোয়াডেই রাখা হয়নি, অথচ তিনি খেলছেন ডিপিএলে। ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে ‘বিশেষ’ একটা দলের খেলোয়াড় তিনি, যে দলের হর্তাকর্তারা আবার বোর্ডেরও কর্তাব্যক্তি। তাই বোর্ড তাকে ছেড়ে দিয়েছে ঘরোয়া লিগে খেলার জন্যে। মোসাদ্দেক দলে থাকলে ফলাফল উনিশ-বিশ হতো, এমন দাবী করছি না। কিন্ত সিস্টেমের গলদটা তো চোখে আঙুক দিয়ে দেখানো যায়। টেম্পারমেন্টের দিক থেকে মোসাদ্দেক বাংলাদেশের অন্যতম সেরা, সেই খেলোয়াড়টাকে শুধুমাত্র ক্লাবের স্বার্থে জাতীয় দলের হয়ে খেলতে দেয়া হলো না।

মোসাদ্দেকের জায়গায় খেলানো হলো সাব্বিরকে। কারণ সাব্বির ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে নিষেধাজ্ঞায় আছেন, তার ব্যপারে এই মূহুর্তে এমন ব্যক্তিস্বার্থ নেই কারো। আর সাব্বিরকে টেস্টে নেয়ার অজুহাত হিসেবে প্রধান নির্বাচক জানিয়েছেন, টি-২০ সিরিজের জন্যে প্রস্তুত রাখতেই নাকি দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সাব্বিরকে। টেস্ট ক্রিকেটটা কি ঠাট্টা ফাজলামির জায়গা? হাথুরুসিংহে যুগে নির্বাচকেরা ছিলেন কলের পুতুল, এখন স্বাধীনতা পেয়ে অদ্ভুত সব সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন নিজেদের! ক্রিকেটের উন্নয়ন করাটা যাদের কাজ, তারা যদি জাতীয় দলের স্বার্থ দেখা বাদ দিয়ে নিজ নিজ ক্লাবের স্বার্থ দেখতে থাকেন, জিম্বাবুয়ের মতো পরিণতি হতে দেরী হবে না খুব বেশী।

শ্রীলঙ্কাকে ধন্যবাদ, লঙ্গার ভার্সনের ক্রিকেটে আমাদের শ্যুন্যতার নগ্ন চেহারাটা সামনে নিয়ে আসার জন্যে। এই সিরিজটা বার্তা দিয়ে গেল, বাংলাদেশ আসলেই টেস্ট সিরিজ জেতার মতো উপযুক্ত দল হয়ে উঠতে পারেনি এখনও। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হয়তো মাইনফিল্ড বানিয়ে জেতা যায়, কিন্ত উপমহাদেশের দলগুলোর বিপক্ষে এমন উইকেট বানালে সেটা এভাবেই বুমেরাং হয়ে ফেরত আসে।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-