এনামুল হক জুনিয়রের বলে ক্যাচ তুললেন ক্রিস পফু, মোহাম্মদ আশরাফুল মজুদ ছিলেন সিলি পয়েন্টে, ক্যাচটা তালুবন্দী করতে একটুও ভুল হলো না তার। বল হাতে জমিয়েই তিনি ছুটলেন, ছুটলো পুরো বাংলাদেশ দল। চট্টগ্রামে ক্রিকেট মানেই তখন এম এ আজিজ স্টেডিয়াম, সেদিকে তাকিয়ে থাকা লক্ষকোটি চোখ তখন অশ্রুসিক্ত। কত গঞ্জনা, কত অপমানের পর একটা জয় ধরা দিয়েছে, এই জয়ের মহিমা বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের চেয়ে বেশী কে জানেন! এই একটা জয়ের মূল্য বাংলাদেশের ক্রিকেটভক্তদের চেয়ে ভালো কে বোঝেন! জাতীয় পতাকা নিয়ে দলবেঁধে মাঠের মধ্যে চক্কর দেয়া, হাসি আর অশ্রুসিক্ত চোখগুলো এক এক করে ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়া- দশই জানুয়ারীর দিনটা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে মহিমান্বিত দিনগুলোর একটা হয়ে আছে সেই কবে থেকেই!

২০০৫ সাল, জানুয়ারীর এক শীতল সকাল। সেই সময়ে তাপমাত্রার খোঁজখবর রাখা হতো না সেভাবে, সকালে ঘুম ভেঙেই বাইরে কুয়াশার পুরু সাদা আস্তরণ চোখে পড়তো। হাইস্কুলের গণ্ডিতে পা রেখেছি সবে, ক্লাস তখনও শুরু হয়নি, সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার তাড়া নেই তাই। তবে দশই জানুয়ারীর সকালটা একটু অন্যরকম ছিল, আমার মতো আরও অনেক কিশোর-তরুণ-যুবা কিংবা পূর্ণবয়স্ক বাঙালীর জন্যেই সেই সকালটা ছিল স্পেশাল। অন্তত যারা সেই সময়ে ক্রিকেটের খোঁজখবর রাখতেন, ক্রিকেটকে ভালোবাসতেন, তাদের জন্যে তো সেই দিনের সূর্যটা ঈদের আনন্দ নিয়ে আকাশের পূর্ব কোণে হেসেছিল।

জয়ের জন্যে জিম্বাবুয়ের সামনে লক্ষ্যটা বিশাল। আগের দিনেই টানা দুই ওভারে দুই উইকেট নিয়ে কাজটা খানিকটা এগিয়ে রেখেছিলেন তাপস বৈশ্য। তিন উইকেটে ছেচল্লিশ রান নিয়ে দিন শুরু করা জিম্বাবুয়ের সামনে তখন ড্র করে ম্যাচ বাঁচানোটাই মূল লক্ষ্য। আর বাংলাদেশ? তারা তো সিরিজ শুরুর আগেই জয়ের স্বপ্ন চোখেমুখে এঁকে খেলতে নেমেছেন চট্টগ্রামে। অভিষেকের পরে পাঁচটে বছর কেটে গেছে, ৩১টা পরাজয়, তিনটে ড্র আর কতশত বিনিদ্র রাত পার হয়েছে সাদা পোষাকের রাজকীয় ক্রিকেটে একটা অধরা জয়ের প্রতীক্ষায়!

জিম্বাবুয়ের এই দলটা কিছুদিন আগেও সমীহ জাগানিয়া একটা প্রতিপক্ষ ছিল, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্র্যান্ড ফ্লাওয়ার, হিথ স্ট্রিকরা খেলা ছেড়েছেন হুট করেই। অস্ট্রেলিয়া-পাকিস্তানকে ঘোল খাওয়ানো জিম্বাবুয়ে তখন খানিকটা খর্বশক্তির। কিন্ত বাংলাদেশ? যারা টানা চার বছরের বেশী সময় একটা ওয়ানডে ম্যাচই জিততে পারেনি, যাদের ক্রিকেট ইতিহাসে কোন টেস্ট জয়ের রেকর্ড নেই, তারা তো এই খর্বশক্তির দলটার সামনেও আন্ডারডগই!

নিজেদের ইতিহাস বদলে দেয়ার শুরুটা বঙ্গোপসাগরের পাড়েই। চট্টগ্রামেরই ছেলে নাফীস ইকবাল, জুটি বাঁধলেন জাভেদ ওমরের সঙ্গে। মাথার ওপর সীমাহীন একটা চাপ, এই সিরিজটা খোয়ালেই আবারও কটাক্ষ শুনতে হবে ক্রিকেটবিশ্বের, আবারও প্রশ্ন উঠবে টেস্ট স্ট্যাটাস নিয়ে। সেই চাপের সামনে দাঁড়িয়ে এই দুই ওপেনারের সে কি আত্মবিশ্বাসী প্রতিমূর্তি! ৯১ রানের ওপেনিং জুটিটাই বোধহয় ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছিল খানিকটা।

বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে, বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়, টাটেন্ডা টাইবু, হাবিবুল বাশার

সেঞ্চুরী থেকে ছয় রান দূরে থাকতে ফিরলেন অধিনায়ক হাবিবুল বাশার, তিন অঙ্কের এগারো রান দূরে থামলেন রাজিন সালেহও। ব্যক্তিগত হতাশার চাদরে প্রলেপ দিলো দলীয় সংগ্রহ, নিজেদের টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪৮৮ রান জমা হলো টাইগারদের স্কোরকার্ডে। খানিকটা কি মন খারাপ হয়েছিল বাশার-রাজিনের? হওয়াটাই তো স্বাভাবিক!

বিপর্যয়ের মুখে পড়া জিম্বাবুয়েকে একাই টেনেছিলেন অধিনায়ক টাইবু, ৩১২ রানে থেমেছিল সফরকারীদের ইনিংস। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে পুরনো সেই রোগের শিকার বাংলাদেশ। এম এ আজিজের গ্যালারীতে, কিংবা টিভি পর্দার সামনে আমরা হতাশ বদনে তাকিয়ে দেখি একের পর এক ব্যাটসম্যানের প্যাভিলিয়নের দিকে ফিরে আসা। দ্রুত রান করতে হবে, সেইসঙ্গে জিম্বাবুয়েকে বড় একটা টার্গেটও দিতে হবে- এই দুইয়ের সমীকরণ মেলাতে গিয়ে হিমশিম দশা বাংলাদেশের, আবারও ভরসার প্রতিমূর্তি হয়ে দাঁড়ালেন বাশারই। তার হাফ সেঞ্চুরীতে উদ্ধার পেল বাংলাদেশ, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম আমরা।

লক্ষ্যমাত্রা ৩৮১, চতুর্থ ইনিংসে মোটেও সহজ কিছু নয়, জিম্বাবুয়েকে তাই রক্ষণেই মন দিতে দেখা গেল বেশী। পঞ্চম দিনের সমীকরণটা সোজা, জিততে হলে বাংলাদেশের চাই সাত উইকেট, জিম্বাবুয়ের দরকার ৩৩৫ রান। আগের দিন তাপস দুই উইকেট নিয়েছেন, প্রথম ইনিংসে মোহাম্মদ রফিকের শিকার ছিল পাঁচটে, মাশরাফির তিন; আজ কি হবে? কে নেবে জিম্বাবুয়ের উইকেটগুলো?

তাপস-রফিক-মাশরাফি কেউই নন, শেষ দিনের সবটুকু আলো কেড়ে নিলেন আনকোরা এক তরুণ। জাতীয় দলের হাওয়া গায়ে লেগেছে আরও বছর দেড়েক আগেই, তবুও তিনি প্রায় নতুনই। সেই এনামুল হক জুনিয়র তার প্যান্ডোরার বাক্স খুলে বসলেন সেদিন চট্টগ্রামে। উনিশ বছর বয়েসী এই বাঁহাতির স্পিনে বিভ্রান্ত আফ্রিকান দলটার ব্যাটসম্যানেরা! আগের দিন শেষ বিকেলে মাতসিকেনেরিকে বোল্ড করে এই টেস্টে উইকেটের খাতা খুলেছিলেন, পরদিন সকালে একে একে তুলে নিলেন টেইলর, টাইবু, মাসাকাদজা আর ক্রেমারকেও। লাঞ্চের খানিক পরে, ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন দুপুর ১২টা বেজে ৫৩ মিনিট। এনামুলের বাঁহাতি অর্থোডক্সে বিভ্রান্ত হলেন শেষ ব্যাটসম্যান পফু। একটা মহাকাব্যের জন্ম হলো তার হাত ধরে, যে মহাকাব্যের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে পুরো বাংলাদেশ দলের বিজয়গাঁথা!

নিজেদের ইতিহাসের প্রথম টেস্ট জয়, পাঁচ বছরের অপেক্ষার পরে, হাজারো কটুক্তি আর নিন্দার ঝড় সহ্য করার পরে, বড় দলগুলোর কাছে লজ্জার আড়াই ডজন পরাজয়ের পরে! প্রথম টেস্ট জয়ের জন্যে আরও অনেক দলকে অনেক বেশী সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে, আরও অনেক বেশী ম্যাচও খেলতে হয়েছে। কিন্ত বাংলাদেশের মতো বারবার টেস্ট খেলার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি কারো, অন্য কোন দলের টেস্ট স্ট্যাটাস কেড়ে নেয়ার পক্ষে বিদগ্ধ মত দেয়নি ক্রিকেটের কুলীন সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মুখের ওপর জবাবটা দেয়া হয়েছিল, আজ থেকে ঠিক তেরো বছর আগে!

এরপরেও বাংলাদেশ হেরেছে, বাজেভাবে টেস্ট ম্যাচে হেরেছে, সিরিজ হেরেছে, হোয়াইটওয়াশ হয়েছে। কিন্ত জয় কি জিনিস সেটাও বুঝতে শিখে গিয়েছিল টাইগারেরা, সেদিন চট্টগ্রামে। এরপর জয় এসেছে মিরপুরে, জয় এসেছে কলম্বোয়, সেন্ট লুসিয়ায়, হারারেতে। টাইগারের ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রতিপক্ষকে টেস্টে নাস্তানাবুদ করেছে ঘরের মাঠে, বাংলাদেশ এখন সফরকারী দলগুলোর কাছে এক বধ্যভূমির না, হোক সেটা টেস্ট কিংবা ওয়ানডে। আর সেই বধ্যভূমির জ্জন্মের শুরুটা হয়েছিল চট্টগ্রামেই, তের বছর আগে, এক ইতিহাসগড়া জয় দিয়ে!

Comments
Spread the love