শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বীতাটা টিকে ছিল দুজনের মধ্যে- অস্ট্রেলিয়ান ডেন স্যাম্পসন, আর বাংলাদেশের আবদুল্লাহ হেল বাকী। শেষ শটে স্যাম্পসন স্কোর করলেন ৯.৩, স্বর্ণপদক জয়ের হাতছানি তখন বাকীর সামনে। সমীকরণটা সহজ, শেষ শটে ১০.১ স্কোর করতে পারলেই স্বর্ণজয়ীর আসনে বসবেন বাকী। টেলিভিশনের সবগুলো ক্যামেরার চোখ তখন এই বঙ্গসন্তানের দিকে! সীমাহীন চাপ এড়িয়ে বাকীর শরীরী ভঙ্গী তখন অদ্ভুত রকমের স্থির। রাইফেলের ট্রিগ্রারে আঙুল চেপে দাঁড়িয়ে আছেন অর্জুনের মতো!

শেষমেশ পারলেন না বাকী। দশ মিটার এয়ার রাইফেলের ফাইনালে শেষ শটে স্কোর করলেন ৯.৭, সবমিলিয়ে বাকীর স্কোর হলো ২৪৪.৭, তার চেয়ে মাত্র ০.৩ পয়েন্ট বেশী স্কোর করে স্বর্ণ জিতে নিলেন স্যাম্পসন। গুলিটা কানের ঠিক পাশ দিয়েই যেন গেল এই অস্ট্রেলিয়ানের। সামান্যের ব্যবধানে বাকীর জেতা হলো না স্বর্ণপদক। ষোল বছর আগে, ২০০২ সালের কমনওয়েলথ গেমসে আসিফ হাসান খান বাংলাদেশের হয়ে শুটিঙে স্বর্ণ জিতেছিলেন ম্যানচেস্টারে। সেটাই সবশেষ হয়ে রইলো, একটুর জন্যে আজ স্বর্ণপদক গলায় ঝোলানো হলো না বাকীর।

কমনওয়েলথ গেমস, শুটিং, আবদুল্লাহ হেল বাকী, বিকেএসপি

দশমিকের ব্যবধানে আজ দ্বিতীয় হলেন বাকী, দ্বিতীয় হয়েছিলেন চার বছর আগের গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসেও। দূর দেশে বিশ্বপ্রতিযোগে আবদুল্লাহ হেল বাকীর কৃতিত্বে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাটা উড়ছে পতপত করে। অথচ এই বাকীর শুটার হবার কথা ছিল না। হতে চেয়েছিলেন ফুটবলার, হতে চেয়েছিলেন কাজী সালাহউদ্দীন। কিন্ত বিকেএসপিতে ফুটবলে ভর্তি হতে পারলেন না, জিমন্যাস্টে সুযোগ এলো। সেখানে আবার ঘটলো আরেক ট্র্যাজেডি!

বিকেএসপিতে ভর্তি হবার দুই বছর পরে শরীরে ধরা পড়লো জণ্ডিস। ডাক্তারেরা বললেন, এই শরীর নিয়ে জিমন্যাস্ট চালিয়ে যাওয়া যাবে না। বিকেএসপিতে শুটিঙে তখন ছাত্র ভর্তি করানো হচ্ছে। খেলাপাগল বাকী তাতেই ভর্তি হয়ে গেলেন। ফুটবল নিয়ে কারিকুরি দেখাতে চেয়েছিলেন, তার পরিবর্তে হাতে উঠলো বন্দুক আর গুলি।

২০০২ সালে আসিফ যখন স্বর্ণপদক জিতলেন ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথে, বাকী তখন বিকেএসপির ছাত্র। চোখের সামনেই আসিফ ভাইদের প্রশিক্ষণ দেখেছেন, ওদের সেরা সময়টার সাক্ষী ছিলেন তিনি। আসিফের সাফল্যই সম্ভাবনার একটা নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল তার সামনে, নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল। সেই স্বপ্নটাকে বুকে চেপে রেখে এগিয়ে গেছেন বাকী।

কমনওয়েলথ গেমস, শুটিং, আবদুল্লাহ হেল বাকী, বিকেএসপি

শুটিং ফেডারেশনও বাংলাদেশের আর দশটা স্পোর্টস ফেডারেশনের মতোই। হাজারটা সমস্যায় জর্জরিত। আর্থিক সমস্যা তো আছেই, ভালোমানের ট্রেনার নেই, বিদেশী কোচ নেই, আর একারণে প্রতিভা উঠে আসার পরিমাণটাও কম। আসিফ-বাকীদের মতো দুয়েকজন যারা শত প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে উঠে আসেন, তারাও যোগ্য সাহচর্যটা পাননা ঠিকঠাক। প্রতিভার মূল্যায়নও হয় না ঠিকঠাক। কমনওয়েলথে স্বর্ণপদক জিতেও পুলিশের মার খেয়ে হাত ভাঙতে হয় আসিফকে, সম্ভাবনাময় একটা প্রতিভা ধ্বংস হয়ে যায় চোখের সামনেই।

১৯৯০ সালের জানুয়ারীতে অকল্যান্ড কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশের হয়ে শুটিঙে প্রথম স্বর্ণপদকটা নিয়ে এসেছিলেন আবদুস সাত্তার নিনি আর আতিকুর রহমান। তার একযুগ বাদে আসিফের স্বর্ণজয়, এরপরে টানা দুই কমনওয়েলথে বাকী’র রৌপ্যপদক প্রাপ্তি- অর্জনের পাল্লাটা খুব আহামরি কিছু নয়। আটাশ বছর আগের প্রথম স্বর্ণজয়ের কীর্তিটা হতে পারতো অনুপ্রেরণা, আসিফের স্বর্ণজয়ের পরেও শুটিং এগিয়ে যেতে পারতো অনেকটা, কিন্ত সেটা হয়নি। ব্যর্থতার কারণ হয়তোবা খোঁজার চেষ্টাও করেনি কর্মকর্তাদের কেউ।

কমনওয়েলথ গেমস, শুটিং, আবদুল্লাহ হেল বাকী, বিকেএসপি

এশিয়ান গেমস বা অলম্পিকে শুটিঙে আমাদের সাফল্যের ফল্গুধারা বইতে পারতো, যদি নীতিনির্ধারকেরা খেলা আর খেলোয়াড়দের প্রতি যত্নশীল হতেন। কিন্ত বাস্তবতাটা কল্পনার চেয়ে অনেক বেশী আলাদা। চীন-জাপান-কোরিয়ায় একজন প্রতিযোগীকে স্পন্সর নিয়ে ভাবতে হয় না। অথচ আমাদের শুটারদের গুলি ছোঁড়ার সময়টাতেও ভাবনায় থাকে পরিবারের কথা, আর্থিক টানাপোড়েনের কথা! আমাদের আসিফ হোসেন খান যে অভিনব বিন্দ্রাকে হারিয়ে কমনওয়েলথে স্বর্ণ জিতেছিলেন, সেই বিন্দ্রা পরে অলিম্পিকে স্বর্ণ জিতেছেন, নিজের দেশ ভারতের পতাকা উড়িয়েছেন বিশ্বমঞ্চে। আর আসিফ পুলিশের মার খেয়ে আহত হয়ে হারিয়েছেন নিজের সেরা সময়টা। কি অদ্ভুত বৈপরিত্য!

এবারের কমনওয়েলথ গেমসে আবদুল্লাহ হেল বাকীর অংশগ্রহণটাই খানিকটা চমকপ্রদ ছিল তার কাছে। টুর্নামেন্টের কয়েকদিন আগেও তিনি জানতেন না, অস্ট্রেলিয়াগামী বিমানে ওঠার সুযোগ তার হবে কিনা। কোচ ক্লাভ ক্রিস্টিয়েনসেন আরেক প্রতিযোগী রিসালাতুল ইসলামকেই এগিয়ে রেখেছিলেন এই প্রতিযোগীতার জন্যে। কিন্ত রিসালাতুলের খারাপ পারফরম্যান্সের সুবাদেই সুযোগটা এসে যায় বাকী’র সামনে। বাকিটা তো ইতিহাস! বাছাইয়ে ষষ্ঠ হয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন তিনি; সেখানে ভগ্নাংশের ব্যবধানে স্বর্ণপদকটা হাতছাড়া হলো বলে, নইলে কম রূপকথার জন্ম তো দেননি আবদুল্লাহ হেল বাকী!

Comments
Spread the love