আমাদের দেশে, শুধু আমাদের দেশেই বা কেন! সারা বিশ্বের বাবা-মায়েরাই যখন বাচ্চাদের কান্না থামাতে ব্যস্ত, জাপানের একটি উৎসব আছে যেখানে বাচ্চাদের ইচ্ছাকৃতভাবে জোর করে কাঁদানো হয়। অদ্ভূত না! জাপানের “নাকিজুমো বেবি ক্রাইং ফেস্টিভ্যালে” বা “দ্যা ক্রায়িং সুমো ভেস্টিভ্যাল”এ বাচ্চাদের ইচ্ছকৃতভাবে কাঁদানো হয়। জাপানী ‘নাকিজুমো’ শব্দটির অর্থ ক্রন্দনরত সুমো।

জাপানের সুমো কুস্তিগীরদের কথা আমরা অনেকেই জানি। কাঁদানোর জন্য এই উৎসবে বাচ্চাদের সুমো কুস্তিগীরদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলেই, উৎসবের নাম “ক্রায়িং সুমো ফেস্টিভ্যাল”। প্রতি বছর এপ্রিলের চতুর্থ রবিবার সকালে এবং বিকেলে এই উৎসব পালন করা হয়। বিগত চারশ বছরেরও বেশি সময় ধরে জাপানে এ উৎসব পালিত হয়। এটি জাপানের একটি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। উৎসবের সময় জাপানী বাবা-মায়েরা তাদের এক বছর বয়সী বাচ্চাদের নিয়ে মন্দিরে হাজির হয়। তারা বাচ্চাদের বিচিত্র রকম রঙিন পোশাক এবং চুলের সাজে মন্দিরে নিয়ে আসে। তারপর বাচ্চাদের তুলে দেয় সুমো কুস্তিগীরদের হাতে। এ সময় সেই এক বছর বয়সী বাচ্চাদের মধ্যে এক ধরণের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

প্রতিযোগিতার এক রাউন্ডে দু’জন শক্তিশালী সুমো কুস্তিগীর দু’টি করে বাচ্চাকে তুলে নেয়। বাচ্চা দুটিকে তারা শুন্যে ঝুলিয়ে বা অন্য যত রকম উপায়ে সম্ভব কাঁদানোর চেষ্টা করতে থাকে। সুমো কুস্তিগীরদের কাছে, বাচ্চাদের কাঁদানোর ব্যাপারটা কুস্তিতে জিতার চেয়েও কঠিন। কুস্তিগীররা যখন তাদের ঝুলিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে তখন অনেক বাচ্চা ভয় না পেয়ে, বরং আনন্দে হাসতে থাকে। অনেকে আবার ঘুমিয়েও পড়ে। অনেক সময় বাচ্চাদের কাঁদানোর জন্য কুস্তিগীররা উপস্থিত অন্যদের সাহায্য নিয়ে থাকে।

প্রতিযোগিতার নিয়ম হলো, যে বাচ্চা আগে কেঁদে উঠবে সে-ই জয়ী হবে। আর যদি এমন হয় যে, দু’টি বাচ্চাই একসাথে কেঁদে উঠে, তবে সেক্ষেত্রেও আছে হারজিতের ভিন্ন পরিমাপক। যে বাচ্চা বেশি জোরে চিৎকার করে কাঁদতে পারবে তাকেই জয়ী ঘোষণা করা হবে।

আপাতদৃষ্টিতে, জাপানের এই নাকিজুমো উৎসবকে নিষ্ঠুর বলে মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে জাপানীদের অন্যরকম এক বিশ্বাস। জাপানীরা তাদের সন্তাদের মঙ্গল কামনায় এ উৎসব পালন করে থাকে। তারা বিশ্বাস করে, বাচ্চারা যখন জোরকেঁদে ওঠে তখন তাদের আশপাশ থেকে শয়তান পালিয়ে যায়। ফলে শয়তান শিশুর স্বাস্থ্যের কোন ক্ষতি করতে পারে না। শিশুর বিকাশ ঠিকমত হয় এবং তারা সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে।

দুনিয়ার অনেক দেশেই এমন ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, যে শিশুদের ফুসফুস যত সুস্থ-সবল তারা তত বেশি জোরে কাঁদতে পারে। তার অর্থ হলো, বাচ্চা ভালোভাবে বেড়ে উঠছে। বাচ্চা জোরে কাঁদতে পারছে মানে তারা দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের অধিকারী হবে। জাপানী বাবা-মায়েরা বিশ্বাস করে সুমো কুস্তিগীরেরা যদি তাদের বাচ্চাদের কাঁদাতে পারে, তাহলে তারা সুস্থ দেহের অধিকারী হবে। তারা এ উৎসবকে বাচ্চার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা বলে মনে করে। দ্যা ক্রায়িং সুমো ফেস্টিভ্যাল নিঃসন্দেহে টোকিওর সবচেয়ে অদ্ভূত উৎসবগুলোর একটি। বিশ্বের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এ উৎসব বিভিন্ন সময় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। জাপানজুড়ে বিভিন্ন ধর্মমন্দিরে এই উৎসব পালন করা হলেও, জাপানের রাজধানী টোকিওর সেনসুজি ও আসাকুসা মন্দিরের উৎসব সবথেকে বিখ্যাত।

Comments
Spread the love