ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

সময় সব কিছু ফিরিয়ে দেয়…

জোসেফ স্টালিন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতায় থাকা স্টালিন ক্ষমতা হারানোর ভয়ে তার বিরোধিতা করা কাউকেই বাঁচতে দেননি। সব সময় মনে করতেন ডাক্তাররা তার খাবারে বিষ মেশাতে পারে, ডাক্তারদের না মারলেও জেলে ঢুকিয়েছিলেন তার বিশ্বস্ত সহযোগীদের মৃত্যুর পিছে হাত থাকার সন্দেহসহ নানা অভিযোগে। যে ডাক্তার তাকে বলেছিল যে সুস্থ থাকতে হলে কাজ কমিয়ে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে, তাকেও জেলে ঢুকিয়েছিলেন গুপ্তচরবৃত্তির অভি যোগে। ইহুদিদের অপছন্দ ছিল বলে তাদের রাশিয়া থেকে সাইবেরিয়া পাঠানোর চিন্তাও করেছিলেন ১৯৫২’র দিকে!

বলশেভিক বিপ্লবের সময় হওয়া প্রথম পলিটব্যুরোর (কমিউনিস্ট পার্টির এক্সিকিউটিভ কমিটি) সাতজনের একজন ছিলেন স্টালিন। লেনিন মারা যাওয়ার পর তার স্থলাভিষিক্ত স্টালিন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সেই পলিটব্যুরোর ৩ জন কমরেড- কামেনেভ, জিনোভিয়েভ এবং ট্রটস্কিকে পার্টি থেকে বের করে দিয়েছেন শুধুমাত্র তার বিরোধিতা করার জন্য। খালি তাই-ই না, প্রথম দুইজনকে মিথ্যা অভিযোগে ১৯৩৫-৩৬ সালে লোকদেখানো ট্রায়াল(Show trials নামে পরিচিত) করে ফাঁসি দিয়েছেন। শেষেরজনকে বের করে দিয়েছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে এবং তাতেও ক্ষান্ত হননি, কয়েকবারের চেষ্টায় মেক্সিকোতে তাকে মেরেছেন লোক লাগিয়ে। কাকতালীয়ভাবে এই তিনজনই ছিলেন ইহুদি। এরপর আরো বেপরোয়া হয়ে যারাই তার স্টালিনিজম মতবাদের বিরোধিতা করতে পারে (এ্যন্টি-স্টালিনিজম), তাদের সরিয়ে দিতে The great purge করেছেন। লাখ লাখ মানুষ মারা গেছে এই সময়।

এখন আসি অন্য এক ঘটনায়। ১৯৫৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার রাতে সিনেমা দেখে, ড্রিংক করে খোশ মেজাজে ভোর ৫/৬টার দিকে ঘুমাতে যান স্টালিন। পরেরদিন রবিবার হওয়ায় প্রহরীদের উপর নির্দেশ ছিল তাকে যেন বিরক্ত করা না হয়, সেজন্য তারা কেউই স্টালিনের ঘরে ঢোকেনি, ঢোকার সাহসও ছিল না। অবশেষে রবিবার রাত ১০.৩০-এ যখন নিজের শোবার ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা মৃতপ্রায় স্টালিনকে উদ্ধার করা হয়, তখন তার সারা শরীর নিজের প্রস্রাবে ভেজা। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা আগে স্ট্রোক করা স্টালিন বাকিটা সময় একটু একটু করে প্রস্রাব করেছেন, নিজের প্রস্রাবের উপর গড়াগড়ি করেছেন, উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন, কাউকে ডাকার চেষ্টা করেছেন।

উদ্ধারের পরই তার চিকিৎসা হয়নি, পরেরদিন সকাল ৭টায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয় তার শারীরিক অবস্থার কথা। তারপর একজন চিকিৎসককে ঠিক করা হয় তাকে দেখার জন্য কারণ স্টালিন ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ থাকায় অনেক ডাক্তার তখন জেলে, অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অবশেষে যখন একজন ডাক্তার স্টালিনকে প্রথম দেখেন ততক্ষণে তার রক্তচাপ ছিল ১৯০/১১০, তার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেছে এবং ডানপাশ পুরাপুরি পক্ষাঘাতগ্রস্থ। পরের চারদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বাধিনায়ক হাসপাতালে পড়ে থাকলেন নিথর, বাকশক্তিহীন হয়ে। ৫ মার্চ সকালে স্টালিন রক্তবমি করেন এবং তার পাকস্থলী হ্যামারেজ হওয়া শুরু করে, ঐদিন রাত ৯.৫০-এ তিনি মারা যান। স্টালিনের মেয়ে সভেতলানা বলেছিলেন, ‘মৃত্যুর আগে বাবা চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসার মতো এক বীভৎস দৃষ্টিতে তাকান। সেই চোখ ছিলো একজন ক্রুদ্ধ এবং মৃত্যুভয়ে ভীত মানুষের চোখ’। সবচেয়ে আয়রনি ব্যাপার হলো যে ডাক্তারেরা তাকে দেখেন, তাদের অনেকের ব্যাপারেই ঐসময় ইনভেস্টিগেশন চলছিলো দেশদ্রোহীতার।

স্টালিনকে অনেকেই যেমন চেনে খুনি হিসাবে তেমনি অনেকেই তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন মহান নেতা হিসাবে মানে। তার ৩০ বছরের শাসনামলে কতজন মারা গেছে বা তার মৃত্যু কি স্বাভাবিক নাকি বিষপ্রয়োগে মারা হয়েছিল, সেসব নিয়ে মতবিরোধ আছে, তবে এইগুলোর কোনোটাই দেখার বিষয় না। বিষয় হলো ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় প্রবল পরাক্রমশালী, ধরাকে সরা জ্ঞান করা, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাওয়া, চিকিৎসকদের দেশ থেকে বের করে দিতে চাওয়া স্টালিন শেষ পর্যন্ত মারা গেছেন প্রায় বিনা চিকিৎসায়। আমরা ছোট মানুষ, আমাদের ক্ষমতা কম তাই আমাদের ভুলের ইমপ্যাক্টও ছোট। ক্ষমতাবান মানুষদের সামান্য ভুলের ইমপ্যাক্টও অনেক বড় হয়।

স্টালিনের ঘটনাটা পড়ে ক্ষমতায় থাকাকালীন তৎকালীন বিরোধীদলের নেত্রীকে মেরে ফেলতে চাওয়া স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরের কথা মনে হলো। উনি কি কখনো ভেবেছিলেন যে একদিন আসবে যে এই গ্রেনেড হামলার কারণে তাকে মৃত্যুদণ্ড পেতে হবে? ড্রয়ারে হাজার শার্ট থাকা বাবর কি কখনো ভেবেছিলেন যে তাকে বছরের পর বছর জেলে থাকতে হবে শুধু সাদা শার্ট পরে? ক্ষমতায় থাকার সময় মানুষ ভুলে যায় যে ক্ষমতা চলে যেতে পারে এবং আজ যাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে কাল তারাই ক্ষমতা হাতে পেতে পারে।

এই বিএনপিই কি কখনো ভেবেছিলো যে একসময় তাদের হাতে থাকা ক্ষমতাই আওয়ামী লিগের হাতে যাবে এবং এমনভাবে যাবে যে সেই ক্ষমতা দিয়েই তারা বিএনপির ক্ষমতায় আসা আটকে দেবে? এই কথা শুধু কোনো ব্যক্তি/দলের জন্য না, সবার জন্যই প্রযোজ্য। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ইতিহাস থেকে কেউই শিক্ষা নেয় না। ইতিহাসের আরেকটা বড় ব্যাপার হলো ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হতে ভালোবাসে।

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close