সিনেমা হলের গলি

অভিধান আজম খান

আজম খানের সমগ্র জীবন নিয়ে একটি জাদুঘর নির্মাণ করা উচিত। লালন আখড়ার কথা জানি, চাইলে ওটাকে জাদুঘর বলা যেতে পারে। জাদুঘর শব্দটাই আদতে বিভ্রান্তিকর এবং কিছুটা শিশুতোষ। ছেলেবেলায় প্রথম যখন শব্দটা শুনি, একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আমার ধারণা ছিলো জাদুঘর মানে যেখানে জাদু দেখানো হয়। তার চাইতে ইংরেজি মিউজিয়াম শব্দটা বরং তাৎপর্যপূর্ণ; মিউজিয়াম শুনলে সিম্পোজিয়াম, অনারিয়াম তো মাথায় আসেই, মিউজিক এর ফ্লেভারটাও উহ্য থাকে।

বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জীবন-কর্ম নিয়ে সংগ্রহশালা কিংবা আর্কাইভ তৈরি বিশ্বব্যাপীই একটি জনপ্রিয় কালচার। বাংলাদেশেও মুষ্টিমেয় ব্যক্তিবর্গ এই কালচারের অধীনে আসতে পেরেছেন। সেই তালিকায় আজম খান এখনো ঢুকতে পারেননি, নিকট ভবিষ্যতে ঢুকবেন সেই লক্ষণও দেখতে পাচ্ছি না।

আজম খানকে নিয়ে ভাবতে গেলে তার ব্যক্তিত্বের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ মানুষ পাই দুজন- চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান, লেখক আহমদ ছফা। তারেক মাসুদ এসএম সুলতানকে নিয়ে ‘আদমসুরত’ নামে একটা ডকুমেন্টারি নির্মাণ করেছিলেন, পরবর্তীতে আরো অনেকেই তাঁকে নিয়ে কাজ করেছেন। যে কারণে তার সম্বন্ধে সমঝদার মহলে ভক্তি, মিথ দুটোই আছে। আহমদ ছফাও অত্যন্ত প্রভাবশালী; বিশেষত তিনি তাঁর একটি অনুসারী গোষ্ঠী সৃষ্টিতে সমর্থ হয়েছেন, যারা বৌধিক উৎকর্ষে তুলনামূলক উচ্চস্তরে বিলং করেন। এদের মধ্য সলিমুল্লাহ খান তাঁকে অনেকটাই অতিমানব ইমেজ দিয়ে ফেলেছেন তাঁর নামের পূর্বে ‘মহাত্মা’ বিশেষণ স্থায়ীভাবে বসিয়ে। ২০০৭-০৮ এর দিকে ক্যাটস আই গলিস্থ এশিয়ান শিল্প ও সংস্কৃতি সভায় সুইডিশ ভাষার একটা শর্ট কোর্স করেছিলাম, যেটি পরিচালনা করেছিলেন সলিমুল্লাহ খান। তখন তিনি এখনকার মতো এতোটা পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, আমিও তাঁর লেখা ‘আহমদ ছফা সঞ্জিবনী’ বইটি পড়িনি তখনও, যে কারণে ‘মহাত্মা’ বিশেষণ সম্বন্ধে অবগত ছিলাম না। কিন্তু ‘মহাত্মা’ বিশেষণটি ভীষণ উদ্ভট এবং ওভারগ্লোরিফাইং মনে হয়। মানুষ আবার মহাত্মা হয় নাকি? একইভাবে, দুরাত্মা বলতেও কিছু থাকা উচিত নয়। মানুষমাত্রই মহাত্মা-দুরাত্মার সার্বক্ষণিক যোগসাজশ।

আহমদ ছফা

আজম খানের ভাগ্যে সেই এনলাইটেনমেন্ট, এস্টাব্লিশমেন্ট মুভমেন্ট জুটেনি। ব্যান্ডপ্রিয় কিছু মানুষ তাকে পপসম্রাট উপাধি দিয়ে খুশি, কেউ কেউ তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে সামনে নিয়ে আসেন, সাময়িক আবেগ চর্চা করেন, যদিও আবেগের মেরিট খুব চোখা লাগে না। গুগলে আজম খান লিখে সার্চ দিলে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়; তেমন সমৃদ্ধ কোনো লেখাই পাওয়া যায় না। ব্যান্ডশিল্পী মাকসুদ ইংরেজিতে একটি চমৎকার আর্টিকেল লিখেছিলেন; বলতে গেলে এটাই আজম খানকে নিয়ে পাঠযোগ্য একমাত্র লিখিত কনটেন্ট। খুচরো সংবাদ আছে কিছু, সেগুলোকে পাঠযোগ্য বলতে চাচ্ছি না।

সাধারণত জীবদ্দশায় উপেক্ষিত আর্টিস্টরা মৃত্যুর পরে এস্টাব্লিশমেন্টের আস্বাদ লাভ করে। জীবনানন্দ, কাফকা, কিংবা টেসলার উদাহরণ দিই যদি, কথাটা আরো চাঙ্গা হয়ে যায়। এসএম সুলতানকেও এই দলে রাখা যায়। তবে এই সমস্ত উদাহরণে ছোট্ট একটা ফাঁকিবাজি আছে। আর্টিস্ট যাদের উদাহরণ দিয়েছে এরা হয় সাহিত্য, অথবা পেইন্টিং, অথবা বিজ্ঞানের শাখায় অবদান রেখেছেন, যেগুলোকে আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার স্বীকৃতি মাধ্যম হিসেবে নির্দ্বিধায় মেনে নিই। মিউজিক, ফিল্ম, স্পোর্টস- এগুলো আমাদের গড় বিবেচনায় অনেকটাই এন্টারটেইনমেন্ট, যা খুবই স্থানিক এবং কালিক ব্যাপার, যেগুলোকে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হিসেবে আমরা মঞ্জুর করতে নারাজ। তবে বব ডিলানের সাহিত্যে নোবেল পাওয়াকে আমি বুদ্ধিচর্চার ইতিহাসেই একটি চরমতম প্যারাডাইম শিফট হিসেবে গণ্য করতে চাই। এতে করে লিরিকও যে সাহিত্য হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে, এই বার্তাটি প্রবলভাবে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। লালন, রাঁধারমণ, হাসনরাজা, উকিল মুন্সী, শাহ আব্দুল করিম, কিংবা সলিল চৌধুরী, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়রা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর বোদ্ধামহলে নিছকই গীতিকবির বাইরে দার্শনিক-সাহিত্যিক হিসেবে গণ্য হবার একটা প্রেক্ষাপট পেয়ে গেলেন। গল্প-কবিতা না লিখলে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলকেও হয়তোবা এই দলভুক্ত হতে হতো।

আজম খান নিজে খুব বেশি গান লিখেননি বা কম্পোজ করেননি; তাঁর পরিচিতির পুরোটাই গায়কসত্তাভিত্তিক। ফলে বব ডিলানের নোবেল পাওয়াতে তার অবস্থানে বিশেষ পরিবর্তন আসার মতো কিছু ঘটেনি। আজম খানের ক্যারিয়ার এবং তৎকালীন বাংলাদেশের মিউজিক মুভমেন্ট বুঝতে হলে ফিরোজ সাঁই, ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজ প্রমুখ ব্যক্তিত্ব, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী, জিঙ্গা শিল্পী গোষ্ঠী, গণঅভ্যুত্থান, রাজনৈতিক পট-পরিক্রমা, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ প্রভৃতি দৃষ্টিকোণগুলো মাথায় রাখতে হবে। আজম খান কি নিছকই এক ব্যান্ডশিল্পী, নাকি আদ্যন্ত পলিটিক্যাল ফিগার, যিনি মিউজিকের মধ্য দিয়ে পলিটিক্যাল এসেন্সকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন? তার পূর্বাপর জীবনযাপন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে কোনোভাবেই তাকে বেসামরিক আমজনতার এন্টারটেইনার বলার সুযোগ নেই, তিনি অতিমাত্রায় পলিটিক্যাল; বিশেষত ‘রেল লাইনের ওই বস্তিতে জন্মেছিলো একটি ছেলে, মা তার কাঁদে, ছেলেটি মরে গেছে, হায়রে হায় বাংলাদেশ’- যে গানটি তার অন্যতম সিগনেচার টোন, এই লিরিকটা নিয়ে কাঁটাছেড়া করলেই তাকে পলিটিক্যাল পোয়েট বলা যায়। জন লেনন বা বব মার্লির মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতি হয়তোবা তাঁর পক্ষে পাওয়া সম্ভব হয়নি, কিন্তু যুদ্ধকালে জর্জ হ্যারিসনের ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামে যে গানটি তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো, আজম খানের ‘বাংলাদেশ’ গানটিকে আমি তার প্রত্যুত্তর হিসেবে দেখি। জর্জ হ্যারিসন আর আজম খান গানের সূত্রে পত্রমিতালি পাতিয়েছেন, গান দুটো পরপর শুনলেই ক্লু’ টা ধরে ফেলা যায়।

জর্জ হ্যারিসন

আজম খানকে পলিটিক্যাল পোয়েট বললে কিছুটা অতিরঞ্জন লাগতে পারে। কারণ ‘পলিটিক্যাল পোয়েট’ উপমাটা সবচাইতে মানানসই সম্ভবত পাবলো নেরুদার জন্য, কিংবা হাংরি জেনারেশনের মলয় রায় চৌধুরীকেও বলা যেতে পারে; সেই আঙ্গিকে আজম খানের মনোনয়নটা আরোপিত লাগতে পারে। কিন্তু আমি যে সেন্সে উপমাটা দিয়েছি, সেটা একটু স্পষ্ট করা উচিত। আজম খান পলিটিক্যালি সেন্সিবল একজন মানুষ, যিনি তার দর্শন বা বক্তব্যকে লেখার মাধ্যমে নয়, বাদ্যযন্ত্রের সমণ্বয়ে সুরের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। অধিকাংশ গানের গীতিকারই হয়তোবা তিনি নন, অন্য কেউ, কিন্তু যেহেতু তাঁর কণ্ঠের মাধ্যমেই সেইসকল বক্তব্যের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটেছে, তাকেও কবি বলতে পারি, যিনি কাব্য লিখেন না, সাধারণ কথামালা বা ভীষণ রোমান্টিক কথাগুলোও যখন তাঁর গান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, সেটা রোমান্টিসিজম পেরিয়ে পলিটিক্যাল হয়ে উঠে। ‘আমি যারে চাইরে, সে থাকে মোরই অন্তরে, আমি তারেও পেয়েও হারাইরে’- এই গানটা যখন অন্য কোনো শিল্পী কভার করে এটাকে সফট রোমান্টিক কিংবা কিছুটা সুফীবাদী/মরমী ঘরানার লাগে, কিন্তু আজম খানের কণ্ঠে শুনলে এই স্টেটমেন্টটাই একটা প্রার্থিত সমাজব্যবস্থার ইশতেহার মনে হয়।

তবে অধিকাংশ পলিটিক্যাল বুদ্ধিজীবীর মতো আজম খানের পলিটিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গিও কিছুটা বামঘেঁষা। ‘সারা রাত জেগে জেগে কত কথা আমি ভাবি, পাপড়ি কেন বোঝে না, তাই ঘুম আসে না’- এইটুকু শুনলে নিশ্চিত হওয়া যায় এটা একটা বিরহী গান, এবং কণ্ঠশিল্পী আগুন আজম খানের এই গানটা সম্বন্ধে এক টিভি প্রোগ্রামে এরকমটা বলেছিলেন: ‘আমি আজম চাচাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম চাচা পাপড়িটা আসলে কে। সে খুব কাচুমাচু করে জবাব দিয়েছিলো, ভাতিজা এই বয়সে আর লজ্জা দিয়ো না’। ইউটিউবে এই একই গানের নিচে কমেন্ট সেকশনে বেশ কয়েকজন কমেন্ট লিখেছেন- ‘পাপড়ি নামে আজম খানের এক প্রেমিকা ছিলো; তার বিয়ে হয়ে যাওয়ায় শিল্পী মনের দুঃখে গানটা লিখেছিলো’। এইসব স্টেটেমেন্টের সত্যাসত্য যাচাই করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি যখন এই গানেই এরকম কিছু লাইন পাই- ‘এই মায়া ভরা পৃথিবী ছেড়ে, চলে যাবো চিরতরে, সবাই চলে যায়- কতটুকু বা পায়; পাপড়ি কেন বোঝে না, তাই ঘুম আসে না’। এটা কোনোভাবেই কোনো বিরহী গানের লাইন হতে পারে না, প্রচণ্ড মেটাফরিকাল একটা লাইন; এর মধ্যে বৈষম্যপূর্ণ পৃথিবীর বাস্তবতা এবং বৈষম্যহীনতার প্রত্যাশা দুটোই একইসঙ্গে নিহিত। পাপড়ি কোনো নারী থাকে না, সে হয়ে পড়ে গড়মানুষের ফ্যান্টাসির প্রতীক। কিংবা ‘প্রেম চিরদিন দূরে দূরে একই থাক না, মিললেই যে ফুরিয়ে যাবে’- এই গানের মধ্যেও রোমান্টিকতা পাই না, বরং প্রেমকে প্রতীকায়িত করতে ইচ্ছা করে ‘অভাব কিংবা প্রাচুর্যহীনতা’কে মহিমাণ্বিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে। নজরুলের ‘হে দারিদ্র তুমি মোরে করেছো মহান, তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান’- পঙক্তির সাথে আজম খানের উল্লিখিত গানের মধ্যে ভাবার্থগত দারুণ সাদৃশ্য পাওয়া যায়, কেবলমাত্র ‘প্রেম’ মেটাফোরকে ‘অভাব’ হিসেবে দেখতে পারলেই হলো। ফলে তার গানগুলোকে পলিটিক্যাল রোমান্টিসিজম মনে হয় তখন, খুব সহসাই।

তবে এরকম ইন্টারপ্রেটেশনের বিপজ্জনক বা সীমাবদ্ধ দিকটি হলো, এভাবে দেখতে গেলে জগতের সকল গান-কবিতা-উপন্যাসকে পলিটিক্যাল মেটাফোর মনে হবে; ফলে মেটাফোরের আতিশয্যে সকল বক্তব্যই ওজনদারিতা হারিয়ে ফেলবে। ‘সেই তুমি কেন এতো অচেনা হলে’ কিংবা ‘কী ছিলে আমার, বলো না তুমি, আছি তো আগেরই মতো এখনো আমি’ জাতীয় গানগুলোকেই অবলীলাক্রমে পলিটিক্যাল ইশতেহার হিসেবে প্রমাণ করে ফেলা যায়। করলে খুব দূষণীয় কিছু হবে তাও না; কারণ বিবাহ, পরিবার, প্রেম, কাম সবকিছুই প্রচণ্ড পলিটিক্যাল। আপনি যদি পলিটিক্স বলতে কেবলমাত্র সরকার গঠন, বিরোধী দল, নির্বাচন, মিটিং-মিছিল বুঝে থাকেন, সেটা আপনার দায়; পলিটিক্স এর চাইতেও অনেক জটিল এবং সুগভীর।

আজম খানের গানগুলোকে আলাদাভাবে পলিটিক্যাল বলার পেছনে তার বেড়ে উঠা, তার লাইফস্টাইল, উত্থান, স্থবিরতা এবং শেষ বয়সে ক্রাউন এনার্জির বিজ্ঞাপন, বাংলা সিনেমার ভিলেন হওয়া প্রভৃতি পয়েন্টগুলো খুবই তীক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণের অধীনে আনতে হবে। আমি কতটুকু আনতে পারবো জানি না, তার পূর্বে কিছুক্ষণ ভিন্ন আলাপ সেরে নিই। লেখার বাকি অংশকে কোরিলেট করতে এই অনুচ্ছেদটুকু অনিবার্য মনে করছি।

কোনো গুণী ব্যক্তি যিনি জাগতিকভাবে খুব বেশি অর্থবিত্তের দেখা পাননি বা রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা কম পেয়েছেন, সেই সমস্ত মানুষকে নিয়ে লিখতে গেলে অধিকাংশ লেখকই আক্ষেপ টোন বেছে নেন। তিনি বৈষয়িক চিন্তায় কতটা উদাসীন ছিলেন, মানুষকে ভালোবেসে কেমন অকাতরে কাজ করেছেন, তাকে কতজনে ভাঙ্গিয়ে খেয়েছে, শেষ জীবনে কেমন অবহেলা-অযত্নে সময় কাটিয়েছেন সেইসকল দুঃখবোধে তাকে একজন ভিক্টিম এবং সমগ্র রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থাকে নিপীড়ক হিসেবে প্রমাণের প্রবণতা লক্ষণীয়। এতে করে, মানুষটির স্ট্রাগল-স্যাক্রিফাইস যেমন বোঝা যায় না, অনুরূপভাবে তার মনোজগতের দার্শনিকতাকেও স্পর্শ করা হয় না। বিশেষত, ক্রিয়েটিভিটির সাথে ফাইনান্সের এক অমীমাংসিত সংঘাত জিইয়ে রাখা হয় অনন্তকালব্যাপী। ক্রিয়েটিভ মানুষমাত্রই তখন ফাইন্যান্সকে বুর্জোয়া, পুঁজিবাদ প্রভৃতি নেগেটিভ ট্যাগ দিয়ে জীবনযাপনকে গভীর সংকটে ফেলে দেয়। তারা তখন না পারে সিস্টেমে মানিয়ে নিতে, না পারে ক্রিয়েটিভ সত্তাকে বিকশিত করতে। ফাইন্যান্স, ইকোনমিক্স, কমার্শিয়াল প্রভৃতি কনসেপ্টগুলো যে একে অপরের সাথে কোনোভাবেই সম্পর্কযুক্ত নয়, বরং মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ; এই সূক্ষ্ম বোধগুলো কাজ করে না। ধনী হওয়ার তরিকা আর স্বচ্ছল থাকা যে এক নয়, এই বোধহীনতাই জগতের অন্যতম মর্মান্তিক আইরনি। ধনী হতে গেলে বাছ-বিচার-এথিক্স-নান্দনিকতা অনেক কিছুর ব্যাপারেই ছাড় দিতে হয়, কিন্তু সবগুলোর ব্যাপারেই চরমভাবে কঠোর থেকেও স্বচ্ছল জীবনযাপন করা যায় নির্বিঘ্নে।

মানসিক এই দৈন্যই আমাদের ঋত্বিক ঘটক, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু প্রমুখ ব্যক্তিবর্গকে আমাদের কাছে সিমপ্যাথেটিক হিসেবে উপস্থাপন করে; তাদের জীবনযাপন হয়ে উঠে বিশুদ্ধ শিল্পচর্চার প্রামাণ্য দলিল। অথচ শিল্পের সংঘাতটা হওয়া উচিত ছিলো রুচি নির্মাণ ও বিনির্মাণ ইস্যুতে। পপুলার না হয়েও ইমপ্যাক্ট তৈরি করা যায় কীভাবে, সেই চিন্তা আর ক্রাইসিসেই সময় দিনমান হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ, ক্রিয়েটিভ মানুষকে চিন্তা করতে হয় বাড়িতে উনুন জ্বলছে কিনা, বাড়িওয়ালাকে ভাড়া দিতে পারছে কিনা, বাচ্চার দুধ আছে কিনা প্রভৃতি জৈবিকতার প্রাত্যহিকতা পূরণ সংক্রান্ত সংকট নিরসনে। এটা যে সমগ্র সোস্যাল ইকোসিস্টেমের জন্য ক্ষতিকর এই বোধটা কে জাগাবে? একজন মানুষ কি সারাদিন লেখালিখি করবে, কিংবা দিনভর গান-বাজনা করবে? এই চিন্তাটাই তো অস্বাস্থ্যকর। তাকে বড় পরিসরে যুক্ত হওয়ার তাড়না দ্বারা চালিত হতে হবে, যা তার লেখালিখিকে সমৃদ্ধ করবে, তার গানের বৈচিত্র্যে সহায়তা করবে। তা না করে দরজা-জানালা বন্ধ করে সে শিল্পচর্চা করলে সেই শিল্প তো অচিরেই জরাজীর্ণ আর পুনরাবৃত্তির দাসত্বে কঙ্কালসার হবে। সুতরাং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় টাকার অভাবে বস্তিতে গিয়ে থাকলে, জীবনানন্দ একের পর এক চাকরি ছাড়লে সেই দায় ক্রিয়েটিভিটি সংক্রান্ত তাদের ভুল কনসেপ্টের, কোনোভাবেই রাষ্ট্র বা সমাজের নয়। ‘if you are not mentally smart enough, probably you are not that much creative; you are pretending only’; ‘মেন্টাল স্মার্টনেস’ শব্দবন্ধটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ক্রিয়েটিভ মানুষ আত্মনিমগ্ন হবে, উদাসীন হবে, বিস্মৃতপরায়ণ হবে, কিংবা বৈষয়িক দক্ষতাগুলো ভোঁতা থাকবে, এটাই নিয়ম। কিন্তু তার জীবিকার সংস্থান নড়বড়ে হবে কেন? পেটে টান পড়লে মাথা কি সচল থাকে? চাহিদা আর সম্পদপ্রিয়তা তো এক না। সে যদি চাহিদাটুকুই পূরণে সামর্থ্যবান না হয়, তার জগত ভাবনা-জীবন ভাবনাকে আমলে নেয়ার যৌক্তিকতা আছে কি আদৌ? কিংবা ক্রিয়েটিভ মানুষের সংসার করাই উচিত না, এরকমও বলেন অনেকে। এই কথা বলে ক্রিয়েটিভিটিকে যে মাকাল ফলে রূপান্তরিত করা হয় সেটা কি লক্ষ্য করা হচ্ছে?

আজম খান প্রসঙ্গে ফিরি আবার। দেশ টিভির পক্ষ থেকে কলকাতার কবির সুমন আজম খানের সাথে এক ঘরোয়া আড্ডার প্রোগ্রাম করেছিলেন। খুবই ইনফরমাল আলোচনা। তাঁর বিভিন্ন গান সৃষ্টির ইতিহাস বা গল্পগুলোই উঠে এসেছে সেখানে। দেখা গেছে, তার জনপ্রিয় গানগুলোর বেশিরভাগই সৃষ্টি হয়েছে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারতে মারতে, তার পেছনে বিশেষ কোনো দার্শনিকতা কাজ করেনি। যেমন, আলাল-দুলাল গানটি করা হয়েছিলো তার দুই বন্ধুকে টিপ্পনি কাটতে গিয়ে, চানখারপুল, হাজী চান প্রভৃতি প্রসঙ্গগুলো লিরিকের খাতিরেই চলে এসেছে। সত্যি সত্যিই পুরান ঢাকার এক ব্যবসায়ী পাওয়া যায় এই নামে, যে তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছিলো। কিংবা ‘ওরে সালেকা, ওরে মালেকা’ গানটাও মোড়ের দোকানে আড্ডা মারতে মারতেই সুরের উপর কথারোপ করা হয়েছিলো। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সৃষ্টিকর্মই খুবই ক্যাজুয়াল ভাবনাধারা থেকে জন্ম নেয়, পরে তাতে দার্শনিকতা আরোপ করে শিল্প সমালোচকগণ, যেগুলো হয়তোবা শুরুতে শিল্পীর ভাবনাতেই থাকে না, বা থাকলেও সে সচেতনভাবে উপলব্ধি করতে অসমর্থ হয়।

২০০০ সালের আগে যারা কৈশোর পার করেছেন তারামাত্রই বুঝতে পারবেন, স্কুল বা কলেজের সময়টাতে ডানপিটে কিছু তরুণ থাকতো সব পাড়া-মহল্লাতেই, যারা খেলাধুলায় তৎপর, বিশেষ উপলক্ষ্যে ডাব-মুরগী চুরি করা, লুকিয়ে বিড়ি-সিগারেট খাওয়া (কিন্তু মুরব্বি কাউকে দেখলেই সিগারেট ফেলে দিতো), কিংবা ঈদ-পূজা-পার্বনে অনুষ্ঠান করায় এই গ্রুপগুলো খুবই সক্রিয় থাকতো। মুরব্বিরা এদের বলতো বাপে খেদানো, মায়ে তাড়ানো বেদ্দপ পোলাপান। আজম খানও মূলত কৈশোরে ওরকম একজন মানুষ ছিলেন। তিনি যে দুরন্ত প্রকৃতির সরসিক মানুষ ছিলেন তার ইন্টারভিউগুলো শুনলেই নিশ্চিত হওয়া যায়। যুদ্ধে যাওয়ার ক্ষেত্রেও সম্ভবত এরকম দুরন্তপনাই কাজ করেছিলো; ‘কী আর হবে, গুলি খাইয়া মইরা যামু, এর বেশি কিছু না তো’- আমার ধারণা এমন অবলীলাতেই সে অমোঘ সত্যকে মেনে নেয়ার সাহস রেখেছিলেন। যে কারণে গ্রেনেড বিস্ফোরণে শ্রবণক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াটাকেও আহামরি কিছু মনে হয় না তাঁর, বরং খালেদ মোশাররফের অধীনে যুদ্ধকালে নিয়মিত সহযোদ্ধাদের গান গেয়ে উজ্জীবিত রাখাটাকেই তার কাছে বেশি আনন্দের লাগে।

পাগলা বা উড়াধুরা কিসিমের মানুষ জনপ্রিয় হয় কীভাবে, এটা এক রহস্যই। আমার কাছে, জনপ্রিয়তা ব্যাপারটা বরাবরই ডিপ্লোম্যাটিক একটা ব্যাপার মনে হয়, যার সাথে অনেকগুলো যদি-কিন্তু জড়িত থাকে সবসময়ই। আজম খান ‘উচ্চারণ’ নামে যে ব্যান্ডটি গঠন করেছিলেন, জনপ্রিয়তায় সেটি শীর্ষে ছিলো দীর্ঘদিন, কিন্তু জীবিকা ভাবনা তাকে খুব বেশি তাড়িত করেনি, বরং ‘নাচো-গাও-ফূর্তি করো, আনন্দে বাঁচো’ ষ্টাইলে চলতে গিয়ে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই আজম খানের কদর কমে গেছে। আজম খানের ক্যারিয়ারের একটা বড় সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। ১৯৭২-১৯৮১, এই দশকটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই সাপ-লুডুর মতো অবস্থা, পরের দশকেও উন্মাতাল অবস্থা। বাংলাদেশের স্বাভাবিক রাজনৈতিক চর্চার কাল, আমার মতে, ১৯৯১-২০০৭, পর্যন্ত ১৬ বছর। মোট ৪৭ বছরের মধ্যে ৩১ বছরই রাজনৈতিক অপ্রকৃতিস্থতা এদেশের নিয়তি। এরকম এক জনপদে পলিটিক্যালি সেনসিবল একজন মানুষ, যে কিনা একইসঙ্গে মরমিবাদ দ্বারা প্রভাবিত, তার পক্ষে তারকা হওয়াটাই বিস্ময়কর বরং; এন্টারটেইনার হয়তোবা হওয়া সম্ভব। নির্বিচারে শো করো, ক্যাসেট বা এলবাম বের করো, কামাই করো- পলিটিক্স নিয়ে ভেবো না, এমন মানসিকতা নিয়ে এন্টারটেইনার হওয়া সম্ভব, কিন্তু পলিটিক্যাল পোয়েট্রি ডেলিভার করা দুঃসাধ্য। আজম খান যে দৈন্যদশায় দিনাতিপাত করে জীবন কাটিয়ে দিলো সেটা কি তার এন্টারটেইনার হওয়ার অনীহা, নাকি ডিপ্লোম্যাটিক হওয়ার যোগ্যতাহীনতা- এই অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না।

আজম খানের বাবরি চুল, মাদকাসক্তি এসবের গল্প আমরা বড়োদের মুখে শুনেছি, আমাদের শৈশবে দেখা (১৯৯০ পরবর্তী) আজম খান সাধারণ হেয়ার কাটের লিকলিকে একজন মানুষ, যে গান গাওয়ার সময় অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে, যা দেখে হাসিই আসতো সেসময়। বরং আগের প্রজন্মের রুচিবোধ নিয়ে প্রশ্ন জাগতো; এই লোকের গান কেন শুনতো তারা? একে তো কমিক্স ক্যারেক্টার মনে হয়! জেমসের দুঃখিনী দুঃখ করো না কিংবা লেইস ফিতা লেইসের পাশে ‘চুপ চুপ অনামিকা চুপ, কথা বলো না, তুমি আমি এখানে কেউ জানে না’ কিংবা ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না গো, হে আল্লাহ হে আল্লাহ হে’ জাতীয় গানগুলো কোনোভাবেই আগ্রহ জাগাতে পারতো না। তবু আজম খানকে কেন গুরু ডাকে মানুষ, কেন পপসম্রাট বলে প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতাম না।

কলেজে উঠার পর আজম খানের প্রতি মনোভাব বদল হয় তার গানের কারণে নয়, বাংলালিংক তাঁকে ট্রিবিউট জানিয়ে একটা বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেছিলো, তাতে সঞ্চালক ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। বিজ্ঞাপনে আইয়ুব বাচ্চুর শক্তিশালী কিছু সংলাপ ছিলো- ‘৭১ এ উনার বন্দুক বেজেছিলো গিটারের মতো, আর তারপর উনার গিটার বেজেছে বন্দুকের মতো। উনি আমাদের আজম খান, গুরু তোমায় সালাম। এমন সন্তানের জন্ম দিয়েছো মা, তোমায় সালাম’। সেই বিজ্ঞাপনটি আজম খানকে নতুনভাবে বুঝতে সহায়তা করে আমায়। তারই কিছুদিন পর বুয়েটে ঢোকা এবং ‘পাপড়ি’ নামক এক ক্যারেক্টারের গভীর অবসেসনে ঢুকে পড়া, এবং একসময় জানতে পারি ‘পাপড়ি কেন বোঝে না’ গানটাও আজম খানেরই গাওয়া। তারপর থেকেই আজম খান অভিমুখে যাত্রার শুরু আমার। বুয়েট ছাড়ার পূর্বেই পৃথিবীর সাথে লেনদেন চুকে যায় তাঁর, ফলে তাঁর সাথে সামনাসামনি কথা বলাটা হয়ে উঠেনি আর।

একসময় আশ্চর্যাণ্বিত হই, আব্দুর রহমান বয়াতি আর আজম খানকে আমার একই ধরনের মানুষ মনে হতে থাকে; কেন এই পরিবর্তন টের পাই না। ‘মন আমার দেহঘড়ি, সন্ধান করি, কোন্ মিস্তরি বানাইয়াছে’- রহমান বয়াতির এই গানের সাথে আজম খানের ‘হাইকোর্টের ওই মাজারে’ কিংবা ‘দায়রা জজের আদালতে, বন্ধু আমার কেস ঠুকেছে, টেনশনে কইলজা শুকায় যায়’ গানগুলোকে আলাদা কিছু মনে হয় না। আদ্যন্ত পলিটিক্যাল পোয়েট আজম খান তখন একজন মরমি বাউল হয়ে উঠেন, ‘পাপড়ি কেন বোঝে না’ এর পাপড়ি তখন আর পলিটিক্যাল প্রেক্ষাপট হয়ে থাকে না; পাপড়িকে মনে হয় ‘রিপুমুক্তির সাধনা’, এবং খুব সহজেই এই মেটাফোর দিয়ে পুরো গানটা ইন্টারপ্রেট করে ফেলা যায়। ফকির আলমগীর অসুস্থ্য আজম খানকে দেখতে গিয়েছিলেন, তাঁর স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেন, ‘আমাকে দেখে সে বলে, দোস্ত পেঁপে খা; ফেরদৌস ওয়াহিদরে খবর দে; একলগে আড্ডা মারি’। যে কারো কাছে এই সংলাপকে নিছক অতিথিপরায়ণতা বা বন্ধুবাৎসল্য মনে হবে, কিন্তু ‘পেঁপে খা, ফেরদৌস ওয়াহিদরে খবর দে’ দুটো বাক্যকে আলাদাভাবে চিন্তা করলে হিউমার সেন্সটাই প্রখর হয়ে উঠে; একজন ক্যান্সারের রোগী মৃত্যুর প্রহর গোণা ছাড়া যার করণীয় কিছু নেই তেমন, তবুও মৃত্যুকে সে হাসাতে চায়, অবলীলায় পেঁপে খাওয়ার প্রস্তাব দিতে পারে বন্ধুকে, এবং আরো এক বন্ধুকে খবর পাঠাতে বলে। পুরোটার মধ্যে মৃত্যুকে উপহাস করার এক ধরনের ঔদ্ধত্য লক্ষ্য করা যায়। ‘মরুমই তো, পেঁপে খাইয়া লই’- মৃত্যুর প্রতি এটাই ছিলো প্রচ্ছন্ন বার্তা। মানুষের সামনে মৃত্যুই যেন অসহায়!

আজম খান মিউজিয়ামে কী থাকবে আসলে? তার গান, ইন্টারভিউ, বন্ধুদের স্মৃতিকথা- এসব? ধুর, এগুলো তো সব মিউজিয়ামেই থাকে; আজম খান মিউজিয়াম তাহলে আলাদা হলো কোথায়! আজম খান মিউজিয়ামে মূলত তার ভক্তরা তাঁর প্রতি বিভিন্নভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করবে; হতে পারে সেটা তাকে নিয়ে সাহিত্য রচনা করে, কিংবা তাকে নিয়ে গান লিখে বা শর্টফিল্ম বানিয়ে। অর্থাৎ, এমন একটা মিউজিয়াম যেখানে গিয়ে মানুষ আজম খানকে জানবে তাঁর কর্মনৈপুণ্য দ্বারা নয়, বরং শত-সহস্র মানুষের তাঁর প্রতি ট্রিবিউটগুলো দেখে সেখান থেকে পাওয়া ইমপ্রেসনের ভিত্তিতে। এরকম ইউনিক মিউজিয়াম চালাবে কে, আর অর্থায়নই বা হবে কীভাবে? সর্বোপরি, আজম খানের মার্কেট ভ্যালু এখন আর সেভাবে নেই’ই বলতে গেলে, সুতরাং এরকম মিউজিয়ামের কমার্শিয়াল রিটার্ন না থাকলে সেটা টাকার অপচয় হবে। মিউজিয়ামটা আজম খানের পরিবারের কপিরাইট ইস্যু ধরে যে কেউই শুরু করতে পারে, এমনকি সেটা আমি নিজেও হতে পারি, যদি ২০২৯ নাগাদ প্রাত্যহিকতার চাহিদা পূরণের পরও খরচ করার মতো টাকা থেকে যায়। সুস্থ্য থাকলে স্বাবলম্বীতাও চলে আসবে আশা করি।

কিন্তু এরকম একটা মিউজিয়াম গড়ার জন্য আজম খান কেন? বাংলাদেশে সে ব্যান্ডধারার গান জনপ্রিয় করেছিলো এটাই কি কারণ? আমি অন্তত তা মনে করি না। তার ব্যক্তিত্বে সাদা-কালো এর বাইরে গ্রে বা ধূসর অঞ্চলগুলো আমাকে আকৃষ্ট করে বেশি। ব্যান্ড সঙ্গীত বাংলাদেশে চলে আসতোই, আজম খান না করলে অন্য কেউ করতো; এটা তাই একক ব্যক্তির কৃতিত্ব না বলে আমি একটি প্রজন্মের কৃতিত্ব হিসেবে দেখতে চাই। ‘সিম্পলিসিটি’ জগতের কমপ্লেক্স এবং ক্রিটিকালতম যোগ্যতা, যা রপ্ত করতে কালোঘাম বের হয়ে যায়। অথচ যতবার আজম খানকে দেখি বা শুনি, মনে হয় সিম্পলিসিটিই তো সৌন্দর্য। আজম খান মিউজিয়ামে সিম্পলিসিটি কালচারটাই বেশি বেশি চর্চিত হোক। সিম্পলিসিটিও হয়ে উঠতে পারে পলিটিক্যাল পোয়েট্রির অপরূপ বহিঃপ্রকাশ।

কিন্তু আজম খানের স্বকীয়তা বা নিজস্বতা এখানেই যে, তিনি ডিপ্লোম্যাসির মতো সুবিধাবাদী এবং সুবিধাভোগী আচরণ রপ্ত করেননি কখনো। তিনি ক্রিকেট খেলেছেন, সাঁতার শিখিয়েছেন, আবার দেদারছে মাদক সেবন করেছেন। মাদক অধ্যায়টাকে চাইলেই উপেক্ষা করতে পারতাম, কিন্তু করছি না, কারণ স্পোর্টসম্যানশিপ দিয়ে যেমন মাদকাসক্তিকে হালাল করা যায় না, অনুরূপভাবে মাদকাসক্তির কারণে স্পোর্টসম্যানশিপ কলঙ্কিত হয় না। প্রতিটি ক্ষেত্র আলাদা, কর্মফল-স্বীকৃতিও আলাদাই হওয়া উচিত। এই পৃথকীকরণে অক্ষমতার কারণেই আমরা কোনো মানুষকে অন্তর থেকে দীর্ঘদিন শ্রদ্ধা করতে পারি না, তার কোনো একটা স্খলনকে চিরস্থায়ী পতন হিসেবে দেখি। এককালে প্রবাদ ছিলো- সিড়ি দিয়ে উপরে উঠা যতটা কঠিন, নিচে নামাটা ততটাই সহজ। এই প্রবাদে বড়ো গলদ আছে। এটা মানুষকে চরমপন্থী মানসিকতার বানিয়ে দেয়। তার চাইতে সহজ উদাহরণ হলো, লিফট। প্রবাদটা হওয়া উচিত এমন- লিফট দিয়ে উপরে উঠতে বা নামতে সময় একই লাগে, কেবলমাত্র লিফটটা সচল কিনা সেটাই মাথায় রাখুন সবসময়।

আজম খানের গায়কী, গানের কথা, পরিবেশনা- কোনোকিছুই হয়তোবা এখনকার তরুণদের আকৃষ্ট করার মতো নয়। সেটা তেমন জরুরী কিছুও নয়। কিন্তু আজম খান যদি একটি অভিধান হয়, তাহলে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি আচরণই আপনাকে ভিন্নভাবে জীবন দেখবার চ্যালেঞ্জ জানাবে। আপনি যদি আজম খানের ‘বধুয়া কি গাইতে জানে গান, দূর থেকে ভালোবাসা, কাছে পাওয়ার বেদনা’ গানটি শুনে থাকেন দেখবেন এর মধ্যে এক আনন্দময় বিষণ্নতা আছে, তাঁর বাকি সকল গানের চাইতে কম্পোজিশন একেবারেই আলাদা, অনেকটাই সিনেমাটিক। এই গানের নান্দনিকতাকে আপনি ব্যাখ্যা করতে পারবেন না, বা চাইবেন না, এটাও হয়তোবা জানা ছিলো আজম খানের, যে কারণে শুনতে পাই- ‘অভিমানী তুমি কোথায় হারিয়ে গেছো, তুমিতো বোঝাবে, তুমিতো মানাবে’

কে এই অভিমানী? আপনি, আমি, নাকি আজম খান স্বয়ং? এর উত্তরের ইঙ্গিত মেলে তাঁর গাওয়া এক গানে, যা রাজনৈতিক বার্তাবহও বটে, এমনকি নিজের জীবনের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।

‘সময় এখন বর্ষাকাল,
হরিণ চাটে বাঘের গাল,
এ কি হইলো দুনিয়ার হাল,
ব্যাঙে দৌড়ায় সাপের পাল…’

ছোট্ট বেলায় যখন আমি ইস্কুলে যাইতাম
বাপ মার কাছে আবদার করলে
সবই তো পাইতাম।
দিনে দিনে যখন আমি বড় যে হইলাম
বন্ধু বান্ধব আপন জন সবি চিনিলাম
হায়রে হায় মহাকাল
একেই বলে কলিকাল।।

যৌবন কালে যখন আমি গান ধরিলাম
গুরু-সম্রাট কতো কি উপাধি পাইলাম
জীবন যৌবন গানের পিছে সবই তো দিলাম
সব হারাইয়া সইরষা ফুল চোখে দেখিলাম
হায়রে হায় ভাটি কাল
নদী শুখায় হইলো খাল’।।

এরপরও কি আজম খান উদাসীন, আত্মভোলা মানুষ, নাকি জীবনকে নির্বিকারচিত্তে গিনিপিগ বানানো নির্মোহ এক প্রাজ্ঞ ও তাত্ত্বিক গবেষক? মিউজিয়ামটা হোক, সন্তোষজনক উত্তর নিজেই পেয়ে যাবেন। তবে সন্তুষ্টি একটি বায়বীয় ধারণা, তাই পাবেন কি পাবেন না, সেই দায়ভার একান্তই আপনার থাকুক।

‘জমিনের বাসিন্দা আমি, তুমি থাকো আসমানে, বিশাল ব্যবধান আছে তোমার আমার মাঝখানে, তোমায় পাওয়ার সাধ্য আমার নাই নাইরে, চাইলে কি প্রেম করা যায়’!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close