কয়েকদিন আগে এক বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গেল,বহুদিন পর দেখা, আড্ডা দিচ্ছি, এমন সময় হঠাৎ একটা ফোন আসলো ওর। ধরার পর ওই প্রান্ত থেকে প্রথম কথাটা এক কিন্নরী কন্ঠের-

— আচ্ছা, কালকে তো ভ্যালেন্টাইন্স ডে, কি প্ল্যান করছো বলো তো?
— এক দিনের ভালোবাসা? আগ্রহ নাই।
— আরে ধুর, লেট’স হ্যাং আউট!
— কেন, তোমার বয়ফ্রেন্ডের কি হলো?
— আরে, ওইটা তো একটা অ্যাসহোল, ব্রেক আপ করছি সেই কবেই, ছাগল একটা…
— তোমাদের রিলেশন না একমাস আগে হইল? কি হ্যান্ডসাম ছেলে…
— সো হোয়াট? ইউ আর মোর হ্যান্ডসাম দ্যান হিম, ওর তো দাঁড়ায়ই না…
— মানে?
— তোমাকে না আমার খুব ভালো লাগে, কেন জানি তুমিই আমাকে বুঝতে পার, সবসময় আমার পাশে থাকো। দিনদিন তোমার উপর উইক হয়ে পড়ছি…
— কিন্তু সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিসে তো আমি উইক স্ট্রং কিছুই হই না। টু বি ফ্রাংক, আমার আগ্রহই নাই।

ওইপাশ থেকে ক্ষিপ্তগলার কিছু টুট টুট ভেসে আসলো, তারপর কট কইরা লাইনটা কেটে গেল।

বন্ধুর চোখ টিপ দেওয়া হাসি তাকে ফিরয়ে দিয়া বললাম, কি মামা, তুমি নাকি এই মাইয়ারে বুঝো? পাশে থাকো ওর? ভয় করে না তোমার?

দোস্ত বিরস গলায় বললো, আর বলিস না, এ এক ভয়ংকর চিজ। দুইদিন পর পর এমন করে পোলাগুলারে ফাঁদে ফালায়, কয়দিন খুব ঘুরে, ইচ্ছামত পকেট এবং পোলারে চুষে খায়, তারপর ছুঁড়ে ফেলে দেয়। আফ্রিদির বিশাল ভক্ত, একদিন ইচ্ছামত পচাইছিলাম এরে, লজ্জা নাই। কালকের জন্য মনে হয় এখনো কাউকে পায়নি,তাই আমাকে ফোন দিয়েছে…

এই হচ্ছে আজকালকার ভালোবাসা। কি ছেলে, কি মেয়ে, হাতে গোনা কিছু বিরল এক্সেপশন ছাড়া সবাই আজকে রেসের ঘোড়া, “খেয়ে ছেড়ে দেওয়ার” রেস। উপরের উদাহরণটা থেকে ছেলেদের ধোয়া তুলসী পাতা ভাবলে চরম ভুল হবে, বরং ক্ষেত্রবিশেষে ছেলেরা আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ভালোবাসার মিষ্টিমধুর বুলি আউড়ে আরো জঘন্য সব অপরাধ করে। আর এই পুরুষশাসিত সমাজে ভালোবাসার নামে প্রতারিত একটা মেয়ে রীতিমত অচ্ছুৎ আবর্জনাইয় পরিণত হয়, অপমান আর লাঞ্ছনার সবটুকুই সহ্য করতে হয় তাকে। কয়েকটা বিরল ব্যতিক্রম বাদে ভালোবাসার সম্পর্কের বিষয়টাই বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে আজ স্রেফ ডেটিং, হ্যাংআউট আর “দ্রুত খেয়ে দেওয়া”র চর্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে জঘন্য আর নোংরা ব্যাপারটা হচ্ছে কে কত মেয়েকে বা কে কত ছেলেকে “খেয়ে দিতে” পেরেছে, সেটা বন্ধুসমাজে আজ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্ট্যাটাসের বিষয়, মান-ইজ্জতের বিষয়, গর্ব করার বিষয়। কচু পাতার উপর পানি যেমন কয়েক মুহুর্তের বেশি থাকে না, তেমনি এই ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কগুলোও টেকে ঠিক ততদিন, যতদিন প্রেমিক বা প্রেমিকার খাওয়াতে পারে, শপিং-এ হাজী মোহাম্মদ মহসীনের মত উদারহস্তে টাকা খরচ করাতে পারে, ডেটিং-এ অভিজাত রিসোর্টে নিয়ে যেতে পারে। এগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রেমিক-প্রেমিকা কতটা কেয়ারফুল, সেটা মাপার পরিমাপকে। রিলেশন বলতে বোঝায় স্রেফ ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ, “ইটারনাল লাভ” শব্দটা জাদুঘরে যেতে বসেছে!

আজাদ নামে একটা ছেলে ছিল, মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পড়তে গিয়েছিল করাচী। বিদেশ বিভূঁইয়ে মা এবং পরিবার ছেড়ে নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করার সময় হঠাৎ একদিন এক মেয়েকে দেখে তার প্রেমে পড়ে যায় সে। মেয়েটার নাম মিলি, পরীর মত সুন্দর। প্রত্যেকটা দিন মেয়েটাকে বাসায় পৌছে দিতে সে তার বাসার উল্টো দিকে যেত, শহরের শেষ প্রান্তে, অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতো বিচিত্র সব কারণকে। কারণ একটাই মিলির সাথে স্রেফ আর কিছুটা সময় বেশি যদি থাকা যায়!

প্রচণ্ড ভালোবাসতো মিলি আজাদকে, ভালোবাসি কথাটা বলা হয়নি তবুও। বলবার সুযোগটাও পাওয়া গেল না। হুট করে একদিন জেনে গেলেন বাবা-মা, কোনভাবেই মানবেন না এ সম্পর্ক। আজাদের অপরাধ, তার পিতা ইউনুস চৌধুরী বহুগামী, চরিত্রহীন। মিলিকে তারা আটকে রাখলেন ঘরে, কৌশলে আজাদকে জানিয়ে দেওয়া হল, মিলির বিয়ে হয়ে গেছে। মিলি চাইলে ওর হৃদয়টা খুলে দিতেও দ্বিধা করত না আজাদ, কিন্তু যেই মুহুর্তে শুনলো, মিলির বিয়ে হয়ে গেছে, ভয়ংকর যন্ত্রণায় ওর পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, নিকষ অন্ধকার। কিন্তু মিলির ইস্পাতকঠিন দৃঢ় ভালোবাসার কাছে শেষতক হার মানতে হল মা-বাবাকে। কিন্তু ততদিনে বড্ড দেরী হয়ে গেছে। আজাদের ঠিকানা জানে না সে, অনেক খুঁজে খুঁজে জানতে পারল আজাদ মগবাজারের দিকে থাকে, কিন্তু একজ্যাক্ট ঠিকানাটা পাওয়া গেল না। আজাদ যে তখন মুক্তিযোদ্ধা, ১৯৭১ সালে ঢাকায় পাকিস্তানীদের নাভিশ্বাস তুলে দেওয়া ক্র্যাক প্লাটুনের অন্যতম সদস্য। আগস্টের শেষদিকে একদিন আজাদের কাজিন বাশার বলল, “খবর শুনছস, মিলি তো এখন ঢাকায় থাকে। দেখা করবি নাকি?”

কথাটা শুনে আজাদের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছিল, এক অনির্বচনীয় অভিমান দলা পাকিয়ে উঠেছিল ওর ভেতরে। একটাবার না জানিয়ে, কোন খবর না দিয়ে একেবারেই হঠাৎ বিয়ে করে ফেলেছিল মিলি, যেন আজাদ নামের কারো সাথে কখনো পরিচয়ই হয়নি তার। ভালোবাসার মানুষকে হারানোর চেয়েও আজাদের বুকে এই অবহেলা আর অপমানটার ব্যাথা বেশি বেজেছিল। হায়, আজাদ তো আর জানতো না, কত অদ্ভুত এক ভুলবোঝাবুঝির স্বীকার হয়েছিল তাদের ভালোবাসা!

আজাদ সেদিন বাশারের প্রশ্নের কোন জবাব দেয়নি সেদিন, তারপর আর কখনো সুযোগ আসেনি জবাব দেবার। সেই রাতেই আলবদর কমান্ডার মতিউর রহমান নিজামী এবং সেকেন্ড ইন কমান্ড আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের নিরলস চেষ্টায় পাকিস্তানীদের গুপ্তচর আলবদর কর্মী কামরুজ্জামানের দেওয়া তথ্যে মগবাজারের বাসায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রেইড চালায়, ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য আজাদ তার বন্ধু জুয়েল, বাশার, টগরের সাথে ধরা পড়ে। আরেক বন্ধু কাজী কামালুদ্দিন পাকিস্তানিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হাতাহাতি লড়াই করে পালিয়ে যায়। একইসাথে ঢাকার নানা জায়গায় রেইড হয়, একে একে ধরা পড়তে থাকে ছেলেটার সহযোদ্ধারা- রুমী, বদি, বকর, ইঞ্জিনিয়ার নজরুল, আলতাফ মাহমুদ! তার দুদিন পর শেষপর্যন্ত মগবাজারের বাসার খোঁজ পায় মিলি, কিন্তু আজাদকে আর খুঁজে পায়নি। সেই যে গেল আজাদ, আর কখনো মিলির সাথে তার দেখা হয়নি, আজাদ আর ফিরে আসেনি।

‘চাচি, আল্লাহর কাছে শোকর করেন। আমি আছি বইলাই আজাদরে ছাইড়া দেওয়ার একটা সুযোগ আইছে। উনারে ক্যাপ্টেন সাব পাঠাইছে। কি কয় মন দিয়া শুনেন।’

সাদা শার্ট-কালো প্যান্ট পড়া আর্মি ছাটের চুলের মানুষটা সাফিয়া বেগমের দিকে ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তার গলার স্বরটা ততোধিক ঠাণ্ডা শোনায়,

–আজাদের সাথে দেখা করতে চান?
–জি।
–ছেলেকে ছাড়ায়ে আনতে চান?
–জি!
–আজকে রাতে আজাদকে রমনা থানায় নিয়ে আসবে। দেখা করায়া দিব ওর সাথে। বুঝলেন?
–জি।
–তার সাথে দেখা করবেন। দেখা করে বলবেন, সে যেন সবার নাম বলে দেয়। অস্ত্র কোথায় রেখেছে, তা বলে দেয়।
–জি?
–সে যদি সব বলে দেয়, তাকে রাজসাক্ষী বানানো হবে। ছেলেরে যদি ফিরে পাইতে চান, তারে সব বলতে বলবেন।
আজাদের মা লোকটার পাথুরে মুখের দিকে তাকান। তার চোখে নিঃস্পন্দ শুন্য দৃষ্টি।
গরাদের ওপারে দাড়িয়ে থাকা আজাদকে তার মা চিনতে পারেন না। প্রচণ্ড মারের চোটে চোখমুখ ফুলে গেছে, ঠোঁট কেটে ঝুলছে, ভুরুর কাছটা কেটে গভীর গর্ত হয়ে গেছে।
–’মা, কি করব? এরা তো খুব মারে। স্বীকার করতে বলে সব। অস্ত্র-ট্রেনিং আসার রুট জানতে চায়। সবার নাম বলতে বলে।’
–বাবা, তুমি কারোর নাম বলোনি তো?
–না মা, বলি নাই। কিন্তু ভয় লাগে, যদি আরও মারে, যদি বলে দেই…
–বাবারে, যখন মারবে, তুমি শক্ত হয়ে থেকো। সহ্য করো। কারো নাম বলো না।
–আচ্ছা মা। ভাত খেতে ইচ্ছে করে। দুইদিন ভাত খাই না। কালকে ভাত দিয়েছিল, আমি ভাগে পাই নাই।
–আচ্ছা, কালকে যখন আসব, তোমার জন্য ভাত নিয়ে আসব।

সাফিয়া বেগমের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। হায়ে হাত তোলা তো দূরে থাক, ছেলের গায়ে একটা ফুলের টোকা লাগতে দেননি কোনোদিন। সেই ছেলেকে ওরা এভাবে মেরেছে… এভাবে…

মুরগির মাংস, ভাত, আলুভর্তা আর বেগুনভাজি টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে পরদিন সারারাত রমনা থানায় দাঁড়িয়ে থাকেন সাফিয়া বেগম, কিন্তু আজাদকে আর দেখতে পাননি। তেজগাঁও থানা, এমপি হোস্টেল, ক্যান্টনমেন্ট-সব জায়গায় খুজলেন, হাতে তখন টিফিন ক্যারিয়ার ধরা, কিন্তু আজাদকে আর খুঁজে পেলেন না…

১৯৮৫ সালের ৩০শে আগস্ট মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আজাদের মা সাফিয়া বেগম আর কখনো বিছানায় শোননি। শক্ত মেঝেতে মাথার নিচে একটা ইট দিয়ে ঘুমিয়েছেন। কারন নাখালপাড়া ড্রাম ফ্যাক্টরী সংলগ্ন এম.পি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে তার ছেলেকে তিনি মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন, কাঁটাছেঁড়া ক্ষতবিক্ষত শরীরে পড়ে ছিল একটা জীবন্ত লাশ। আর একটাবারের জন্যও কোনোদিন ভাত মুখে তোলেননি সাফিয়া বেগম, বেঁচে থাকার জন্য রুটি খেয়েছেন, পানি দিয়ে ভিজিয়ে পাউরুটিও খেয়েছেন কখনও, কিন্তু ভাত না। তার আজাদ যে ভাত খেতে চেয়েও ভাত খেতে পায়নি…

আর মিলি? ১৬ই ডিসেম্বর যখন মুক্তিযোদ্ধারা একে একে ফিরে আসছে প্রিয়জনের বাহুডোরে, পুরানা পল্টনের একটা বাসার ছাদে বসে চুপচাপ অপেক্ষা করছে মিলি, আজাদের জন্য। মিলির অপেক্ষা শেষ হয়নি, নীরব অশ্রুর ফোঁটায় ফোঁটায় মিলির নিঃশব্দ কান্না নীল বিষাদ হয়ে কেবলই ঝরে গেছে, আজাদ আর ফিরে আসেনি।

নতুন প্রজন্মের দেহভিত্তিক ভালোবাসায় মগ্ন পোলাপানের কাছে আজকে আজাদ-মিলি’র অসমাপ্ত ভালবাসার গল্প স্রেফ পুরান ইতিহাস মাত্র। সেকেন্ডে মিনিটে বয়ফ্রেন্ড- গার্লফ্রেন্ড পাল্টায় আজকালের ভ্যালেন্টাইনরা, কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এভাবেই আজাদের জন্য অপেক্ষা করে ছিল মিলি, অপেক্ষার পালা আর ফুরোয়নি…

Comments
Spread the love