অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

‘সত্যিকারের ক্যুল আসলে অন্য কিছু’- আয়মান সাদিক

ছোটবেলায় পোকেমন মাস্টার হতে চাওয়া আয়মান সাদিক এখন পুরোদস্তুর স্কুল মাস্টার! তাও আবার যেনতেন স্কুলের মাস্টার নন। দেশের প্রায় সবকটা জেলার স্কুল-কলেজ, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া হাজারো শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস করে তাঁর প্রতিষ্ঠিত টেন মিনিট স্কুলে। ভিডিও কিংবা লাইভ ক্লাসের মাধ্যমে শেখে শিক্ষা ও সহশিক্ষামূলক নানান কিছু। এই উদ্যোমী মানুষটির কাছে এবারে আমরা হাজির হয়েছিলাম কিছু ভিন্নধর্মী প্রশ্ন নিয়ে। সাথে ছিলেন আনজিলা জেরিন আনজুম

পড়াশোনা ব্যাপারটা কি কখনো খারাপ লেগেছে?
– হ্যাঁ। আগে অনেক খারাপ লাগতো। একেবারেই পড়াশোনা করতে চাইতাম না। আমার বাসা ছিল ক্যান্টনমেন্টে। ফুটবল, বাস্কেটবল, টেনিস আরো অনেক রকম খেলাধুলার সুযোগ ছিল। লেখাপড়ার প্রতি তেমন আকর্ষণ ছিল না। বাবা-মায়ের চাপের কারণেই আসলে পড়তাম।

পরীক্ষা যে আবিষ্কার করেছে তাকে কি কখনো শত্রু মনে হয়েছে?
– নাহ! কেউ যে পরীক্ষা জিনিসটা আবিষ্কার করেছে, সে কথাই কখনো মনে হয়নি। পরীক্ষা দেওয়া ব্যাপারটা অনেকটা রুটিনের মতো ছিল। যেমন নিয়মিত খেতে হয়, ঘুমাতে হয়, তেমন পরীক্ষাও দিতে হয়!

স্কুল পালিয়েছেন কখনো?
– অবশ্যই। সবাই তো পালায়! বেশিরভাগ সময় ক্লাস বাদ দিয়ে ফুটবল খেলতাম। প্রায়ই গেমস পিরিয়ডের জন্য এপ্লিকেশন করতাম। আবেদন মঞ্জুর না হলে টিফিন টাইমে ফুটবল নিয়ে বের হয়ে যেতাম, আর ক্লাসে ঢুকতাম না!

গল্পের বই পড়ার ব্যাপারে কী মতামত? কেমন গান শোনেন?
– আমি ভিডিও অনেক বেশি দেখি। গল্পের বই জীবনে খুব কম পড়া হয়েছে। ছোটবেলায় বন্ধুরা ভীষণ পচাতো গল্পের বই পড়ি না বলে। তখন এক বন্ধুর কাছ থেকে তিন গোয়েন্দার বই নিয়েছিলাম। তিন গোয়েন্দা সিরিজের সবচেয়ে ছোট বইটার নাম ছিল ‘গরমের ছুটি’, সেটা পড়ে শেষ করেছিলাম। ব্যস্ততার কারণে গানও ইদানিং কম শোনা হয়। আগে অনেক শুনতাম। ছোটবেলায় প্রিয় ব্যান্ড ছিল ব্ল্যাক, আর এখন আর্টসেল। নেমেসিস, আর্বোভাইরাস, অর্থহীনও ভালো লাগে।

কতক্ষণ সোশ্যাল মিডিয়া, কতক্ষণ পড়াশোনা? আগে পত্রিকায় যারা স্ট্যান্ড করতো দেখা যেত তারা দিনে ষোল ঘন্টা করে পড়ে, এই যুগের একটা ভাল ছাত্র দিনে কত ঘন্টা পড়বে?
– আমার তো মনে হয় না দিনে ষোল ঘন্টা পড়ার কোনো প্রয়োজন আছে। অনেকে পরীক্ষার আগের রাতে পড়ে ভাল করে ফেলে। অনেকে সারা দিনরাত পড়েও ভাল করে না। এটা আসলে যার যার ওপর নির্ভরশীল। আর সোশ্যাল মিডিয়াটা এইচএসসি লাইফ পর্যন্ত একটু নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। দিনে আধা ঘন্টা হলে ভাল হয়। তুমি যখনই এক ঘন্টা পার করবে, পরের ঘন্টাগুলোও কিভাবে পার হয়ে যাবে নিজেও বুঝবে না।

প্রশ্নফাঁসের যুগে ছাত্রদের কি করণীয়? কিছু প্র্যাকটিকাল এডভাইস…
– দোষটা কিন্তু আমাদেরও। আমরাই প্রশ্নগুলো খুঁজি। তো আমরা যদি প্রশ্নগুলো খোঁজা বন্ধ করে দেই, ফেসবুকে হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার করা বন্ধ করে দেই, তাহলে কিন্তু এটা অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে। প্রশ্নফাঁস হলে কখনো কখনো অভিভাবকরাও চাপ দেন। তখন আমাদের উচিত তাদের বোঝানো যে এভাবে প্রশ্ন নিয়ে যদি পরীক্ষা দেই, তাহলে আমাদের শিক্ষাটার অর্থ কী দাঁড়ালো! ছেলেমেয়েরা যদি সত্যি সত্যি অভিভাবকদের এ কথা বলে, তাহলে কিন্তু তাদের আসলেই বিবেকে বাঁধবে, অন্তত আমার তাই মনে হয়।

কম্পিউটারে টেন মিনিট স্কুল দেখলেও বাবা মা বলে ফেসবুক ইউটিউব বন্ধ করতে, এক্ষেত্রে একটা ছাত্র কি এক্সকিউজ দিতে পারে?
– ওহ হ্যাঁ, লাইভ ক্লাসগুলো তোমাদের বাবা-মাকেও দেখাতে পারো। তাদের বোঝাতে পারো আসলে কী করছো। এটা আমি টেন মিনিট স্কুলের শিক্ষার্থীদের সবসময়ই বলি।

টেন মিনিট স্কুল বাদে ইন্টারনেটে আর কী কী দেখতে সাজেস্ট করবেন?
– ইউটিউবে প্রচুর ভিডিও দেখি আমি। স্কুল অফ লাইফ, খান একাডেমি, টেডেক্স টক ইত্যাদি অনেক চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করা আছে। তোমরাও চাইলে দেখতে পারো।

ভিডিও গেমস জিনিসটার মাঝে কি শিক্ষণীয় কিছু আছে বলে মনে করেন?
– ছোটবেলায় অনেক ভিডিও গেমস খেলেছি। তবে মাঠে গিয়ে খেলতেই বেশি আগ্রহ বোধ করতাম। তাই এক পর্যায়ে ভিডিও গেমস খেলা ছেড়েই দিয়েছি। খেলা বন্ধ না করলে হয়তো বলতে পারতাম শিক্ষণীয় কিছু আছে কিনা!

ফেসবুকের পোক বাটন সম্পর্কে মতামত…?
– পোক বাটন ইজ ডায়িং। এটা সরিয়ে ফেলা এখন সময়ের দাবি।

যদি টেন মিনিট স্কুল ব্যর্থ হতো, তাহলে কী করতেন?
– এখন অনলাইনে পড়াচ্ছি, তখন অফলাইনে পড়াতাম। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চাইতাম। বিবিএ পড়াতাম।

ইদানিং ফেসবুকে সেলিব্রিটি হওয়ার অশুভ একটা প্রবণতা দেখা যায় কিশোরদের মাঝে। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?
– আমরা ছোটবেলা থেকে সে কাজগুলোই করতে চাই যেগুলো অনেক ক্যুল। আমি যখন ক্লাস এইট-নাইনে পড়তাম, তখন চুলে স্পাইক করা খুব ক্যুল ছিল। তখন সবাই চেষ্টা করতাম স্পাইক করতে। তারপর এক সময় সবার গিটারের প্রতি একটা আকর্ষণ জন্মালো। এরপর এলো ডিএসএলআর। তো আমার মনে হয় আমরা সবাই ক্যুল কিংবা ট্রেন্ডি হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু একটু বড় হলে দেখবে সত্যিকারের ক্যুল আসলে অন্য কিছু। এই যেমন কিছুদিন আগে আমার একজন মানুষের সাথে দেখা হয়েছে যে কিনা আটচল্লিশ বছর ধরে প্রতিদিন একটা করে গাছ লাগায়। তারপর এমন একজন মানুষ আছে যে প্রতিদিন একজন মানুষকে খাওয়ায়। অথবা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে অপরিচিত মানুষের নানা কাজে সাহায্য করে তাদের বন্ধু হয়ে যায়। এসব মানুষের এই কাজগুলোই হলো সত্যিকারের ক্যুল। তাই ভার্চুয়ালি সেলিব্রেটি হবার চেষ্টা করে আসলে কোনো লাভ নেই।

আরও পড়ুন-

‘স্টুডেন্ট লাইফ থেকেই স্বপ্নের পিছনে দৌড়াতে শুরু করো’- আয়মান সাদিক
Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close