অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

সবার ভুল ভাঙালেন আয়মান সাদিক

আয়মান সাদিক– দেশের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত এখনও ছাত্রজীবনের গন্ডি পেরোয়নি এমন কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের কাছে খুবই প্রিয় একটি নাম। টেন মিনিট স্কুলের মাধ্যমে দেশে অনলাইনভিত্তিক শিক্ষাদান পদ্ধতির যে জাগরণ তিনি সৃষ্টি করেছেন, তাতে করে ইতিমধ্যেই ইতিহাসের পাতায় নিজের নামটি স্বর্ণাক্ষরে খোদাইয়ের ব্যবস্থা করে ফেলেছেন তিনি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তার জনপ্রিয়তায় কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে। তার নামের পাশে লেগে গেছে কলঙ্কের কালিমা।

কারণ দেশে সর্বশেষ যে দুইটি গণ আন্দোলনের দেখা মিলেছে, একটি কোটা সংস্কারের দাবিতে এবং অন্যটি নিরাপদ সড়কের দাবিতে, সে দুইটিই এসেছে দেশের ছাত্রসমাজের হাত ধরে। এবং আয়মান সাদিক যেহেতু বৃহদার্থে দেশের ছাত্রসমাজেরই প্রতিনিধিত্ব করেন, তাই অনেকেই আশা করেছিল যে এই দুইটি আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন। সরাসরি সামনে থেকে নেতৃত্ব না দিলেও, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে তাদেরকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জোগাবেন, যেটি তিনি বরাবরই করে থাকেন। কিন্তু যেকোন সীমাবদ্ধতার কারণেই হোক না কেন, শুরু থেকেই এইসব আন্দোলনে আয়মান সাদিকের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। বরং ছাত্রসমাজের রোষানলে পড়ে কিছুটা দেরি হলেও তিনি যখন নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামলেন, তখনও তাকে শিকার হতে হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে ছুটে আসা বক্রোক্তির।

অনেকেই শ্লেষাত্মক ভাষায় বলেছে, আয়মান সাদিক নাকি মন থেকে কাজটি করেননি, করেছেন নিজের ফ্যান-ফলোয়ার-সাবস্ক্রাইবার বাঁচানোর তাগিদে। এবং সেই একই সমান্তরালে আবারও নতুন করে উঠে এসেছে সেই অভিযোগটি, যা নিজের পথচলার সূচনালগ্ন থেকেই আয়মান সাদিককে কমবেশি শুনে আসতে হয়েছে। সেটি হলো, তিনি নাকি কেবল মুখেই বলেন যে তার টেন মিনিট স্কুল সম্পূর্ণ ফ্রি, তিনি কোন রকম স্বার্থ ছাড়াই দেশের ছাত্রসমাজকে বিনামূল্যে শিক্ষাদানে ব্রতী হয়েছেন, কিন্তু আসলে তিনি যা করছেন সবই অর্থের লোভে পড়ে করছেন। টাকাটাই তার কাছে সব, ছাত্রসমাজের চাওয়া-পাওয়া, সুবিধা-অসুবিধা প্রভৃতির কোন মূল্যই নেই তার কাছে।

এমতাবস্থায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছে, টেন মিনিট স্কুলের আয়ের উৎস আসলে কী? আয়মান সাদিকের নিজেরই বা আয়ের উৎস কী? ইউটিউব থেকে তিনি কত টাকা আয় করেন? তিনি যেসব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ডগুলো পেয়েছেন, সেগুলোর পাশাপাশি অর্থ পুরস্কারও কি জিতেছেন? টেন মিনিট স্কুলের প্রকৃত উদ্দেশ্য আসলে কী? তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাই বা কী? এইসব প্রশ্নের সদুত্তর দিতে একটি নতুন ভিডিও তৈরী করেছেন তিনি, যেখানে একে একে উত্তর দিয়েছেন প্রতিটি প্রশ্নেরই

মানুষের প্রধান আগ্রহের জায়গা, টেন মিনিট স্কুলের আয়ের উৎস কী? আয়ের প্রসঙ্গে না হয় না’ই গেলাম। এখানে যেসব ভিডিও, কুইজ, লাইভ ক্লাস, স্মার্ট বুক ইত্যাদি পাওয়া যায়, এ ধরণের কনটেন্ট নির্মাণের জন্যও তো প্রচুর পরিমাণে অর্থের প্রয়োজন হয়। সেই অর্থ আসে কোত্থেকে? আয়মান সাদিকের উত্তর হলো, এই সব অর্থই তারা পেয়ে থাকেন স্পন্সরের কাছ থেকে। অবশ্য ২০১৪ সালে যখন তাদের যাত্রা শুরু হয়, তখন এসবের কিছুই ছিল না। সম্বল বলতে ছিল কেবলই একটি ফেসবুক পেইজ। ২০১৫ সালে অফিসিয়ালি লঞ্চ করা হয় টেন মিনিট স্কুল। শুরুর সেই সময়টায় তাদের কোন স্পন্সরই ছিল না। আয়মান সাদিক তখন টিউশনি করে যে অর্থোপার্জন করতেন, সেই অর্থ দিয়েই মেটানো হতো টেন মিনিট স্কুলের যাবতীয় খরচ।

আয়মান সাদিক, আয়মান সাদিক শিক্ষামন্ত্রী

এরপর একটু একটু করে তাদের টিমের আকার বাড়তে থাকে এবং সেই সাথে বেড়ে যায় খরচের পরিমাণও। ঠিক তখনই, ২০১৬ সালে, তাদের স্পন্সরশিপের জন্য এগিয়ে আসে টেলিকম অপারেটর রবি। এরপর তাদের স্পন্সর করেছে ম্যাটাডোরও। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সরকারের আইসিটি ডিভিশনও। এভাবে টেন মিনিট স্কুলের নতুন একেকটি প্রোডাক্ট হাজির হয়, আর তার সাথে সাথে যোগ হয় নতুন স্পন্সরও। তবে এখানে একটি কথা না বললেই নয় যে, শুরুর দিকে যারা টেন মিনিট স্কুলের সাথে ছিলেন তাদের কেউই কিন্তু বিনিময়ে কোন পারিশ্রমিক নিতেন না, পুরোপুরি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে টেন মিনিট স্কুলের পাশে ছিলেন তারা।

এবার আসা যাক আয়মান সাদিকের ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে। অনেকেই মনে করেন, আয়মান সাদিকও হয়ত দেশের অন্যান্য কতিপয় মোটিভেশনাল স্পিকারের মত টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন ইভেন্টে গিয়ে কথা বলেন। কিন্তু এ ধারণা সর্বৈব ভুল। তিনি বিভিন্ন ইভেন্টে গিয়ে কথা বলেন বটে, এবং সেই সাথে ছাত্রছাত্রীদের সামনে বিভিন্ন মোটিভেশনাল স্পিচও দেন, কিন্তু তার বিনিময়ে তিনি কোন টাকা নেন না। তিনি যেসব ইভেন্টে অংশ নেন, তার অধিকাংশই হয়ে থাকে নন-পেইড ইভেন্ট। তবে পেইড কিছু ইভেন্টেও তিনি অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন, কারণ সেসব ইভেন্টে বক্তা হিসেবে তিনি ছাড়াও আরও অনেকেই ছিলেন। ফলে তার একার পক্ষে ওইসব ইভেন্টকে নন-পেইড ইভেন্টে রূপান্তরিত করা সম্ভব ছিল না।

তাহলে আয়মান সাদিকের জীবিকার উৎস কী? তার নিজের ভাষ্যমতে, এইসব ইভেন্টের বাইরেও তিনি বিভিন্ন কর্পোরেট সেক্টরে স্পিচ দেন, ট্রেনিং দেন- যার মাধ্যমে তিনি আয় করে থাকেন। এছাড়াও যখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, তখন থেকেই অনেককে পাওয়ার পয়েন্ট বানানো, প্রেজেন্টেশন দেয়া ইত্যাদি শিখাতেন। এখনও তিনি বড় বড় কর্পোরেট অফিসে তিনি এসবের ট্রেনিং দিয়ে থাকেন। এছাড়াও তিনি বেশ কিছু সফট-স্কিলসেরও ট্রেনিং দেন। এগুলোর বিনিময়ে তিনি পঞ্চাশ হাজার, এক লাখ, এমনকি কখনও কখনও এর চেয়ে বেশিও টাকা পেয়ে থাকেন। পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সংস্থাকে ডিজিটাল কনসাল্টেন্সি সাপোর্টও দেন। তাদেরকে ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা দেন। এর বিনিময়েও তিনি বড় অংকের টাকা আয় করে থাকেন।

এই বছর তিনি একজন লেখক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছেন। বইমেলায় এসেছে তার রচিত বই ‘নেভার স্টপ লার্নিং’। এই বইয়ের রয়্যালটি হিসেবে তিনি এক মাসে পান সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকা, যার পুরোটাই তিনি ব্যয় করেন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য শিক্ষাসামগ্রী পৌঁছে দেয়ার কাজে। এই কাজে তিনি সাহায্য পাচ্ছেন ম্যাটাডোরের কাছ থেকেও। তিনি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন, ঠিক সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ম্যাটাডোরও। তার ইচ্ছা রয়েছে ভবিষ্যতে টেন মিনিট স্কুলের জন্য নতুন নতুন যেসব প্রোডাক্ট ও প্রোজেক্ট লঞ্চ করা হবে, সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগানের উদ্দেশ্যে তারা আরও কিছু বই প্রকাশ করবেন, টি-শার্ট বিক্রি করবেন, বাজারে স্টেশনারি আইটেমও ছাড়বেন।

তৃতীয় যে প্রশ্নটির সম্মুখীন আয়মান সাদিককে সবচেয়ে বেশি হতে হয় তা হলো, ইউটিউব থেকে তিনি কত টাকা আয় করে থাকেন। এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ইউটিউব থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ খুবই কম। বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব পেশাদার ইউটিউবার আছেন, তাদের কারোই মূল অর্থের উৎস ইউটিউব নয়। টেন মিনিট স্কুলও প্রথম আড়াই বছর ইউটিউবে মনিটাইজই করেনি, অর্থাৎ সেই সময়ে তাদের কোন ভিডিওর মাঝে বিজ্ঞাপন দেখানো হতো না। কারণ তারা নাকি সেই সময়ে মনিটাইজ কীভাবে করতে হয় তা জানতেনই না! এরপর অবশ্য তারা মনিটাইজ করেন, এবং প্রথম মাসে তাদের আয় হয় ১৯ হাজার টাকা। এই নগণ্য পরিমাণ অর্থ দেখে তার এক টিম মেম্বার বলেছিলেন, এই টাকা দিয়ে নাকি তাদের এক দিনের খিচুড়ির খরচই উঠবে না! সুতরাং বুঝতেই পারছেন, বর্তমানে টেন মিনিট স্কুলের টিম মেম্বারের সংখ্যা ঠিক কত বেশি। এখন অবশ্য তারা ইউটিউব থেকে মাসে ৪০ হাজারের মত টাকা পেয়ে থাকেন, যা আয়মান সাদিকের ভাষ্যমতে, তাদের মাসিক খরচের ১%-ও না। এর অর্থ দাঁড়ায়, বর্তমানে টেন মিনিট স্কুলের পেছনে প্রতি মাসে খরচ হয় ৪০ লক্ষ টাকারও বেশি। কে জানে, অর্থের পরিমাণটি ৫০ লক্ষ ছুঁই ছুঁইও হতে পারে!

এবার আসা যাক অ্যাওয়ার্ড থেকে তিনি কোন টাকা পান কি না সে প্রসঙ্গে। আয়মান সাদিক বলছেন, এসব অ্যাওয়ার্ড বা সম্মাননা থেকে তিনি এক কানাকড়িও পাননি। এ বছর তিনি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে অ্যাওয়ার্ডটি পেয়েছেন তা হলো অস্কার অফ আইসিটি আপিকটা অ্যাওয়ার্ড। এছাড়া ব্রিটেনের রাণী এলিজাবেথের হাত থেকে তিনি পেয়েছেন কুইন্স ইয়াং লিডার অ্যাওয়ার্ড। এর কোনটির তরফ থেকেই তিনি কোন অর্থ পুরস্কার পাননি। এছাড়া তিনি এ বছর ফোর্বস থার্টি আন্ডার থার্টির তালিকায়ও ছিলেন। সেখান থেকেও তিনি কোন অর্থ পুরস্কার পেতেন না। বরং সেটির পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি হয়েছিল হংকংয়ে, যেখানে যাওয়া-আসার খরচ তাকে নিজেকেই বহন করতে হতো। এজন্য তিনি সেই পুরস্কার আনতে যানইনি। কারণ তার কাছে মনে হয়েছে, এত টাকা খরচ করে পুরস্কার আনতে যাওয়ার চেয়ে এই টাকায় টেন মিনিট স্কুলের জন্য আরও দশ-বারোটি নতুন ভিডিও বানালেই বরং সকলে উপকৃত হবে।

এর বাইরেও আয়মান সাদিক কথা বলেছেন টেন মিনিট স্কুলের যাত্রা শুরুর ব্যাপারে, এবং ভবিষ্যতে টেন মিনিট স্কুলকে ঘিরে তার স্বপ্ন ও কর্মপরিকল্পনা কী সে সব বিষয়েও। যেহেতু এই দুইটি বিষয়ে তিনি এর আগেও বহুবার কথা বলেছেন, তাই তার অনুসারীরা প্রায় সকলেই এগুলো সম্পর্কে অবগত। সে জন্য আর এই দুইটি বিষয়ে তিনি কী বলেছেন তা উল্লেখ করে এই লেখাকে অহেতুক প্রলম্বিত করার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। বরং আমরা ইতি টানতে পারি তার দেয়া প্রথম চারটি উত্তরের সূত্র ধরেই।

এতদিন টেন মিনিট স্কুলের আর্থিক ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে অনেকের মনেই অনেক ভ্রান্ত ধারণা ছিল, যা নিশ্চিতভাবেই এখন দূর হবে। প্রকাশ্যের নিজের সংস্থার আর্থিক বিষয়াদি নিয়ে এতটা খোলামেলা কথা বলে সত্যিই এক বিরল নজির গড়লেন আয়মান সাদিক। কিন্তু কেন আজ তিনি তা করলেন বা করতে বাধ্য হলেন, তা আমরা খুব সহজেই আন্দাজ করতে পারি। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার জের ধরে তার ব্যাপারে প্রতিনিয়ত যেসব অভিযোগ উঠছিল, সেগুলোকে থামিয়ে দেয়াটা দরকার ছিল। নিজের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি কতটা স্বচ্ছ, সে ব্যাপারটিও সকলের সামনে তুলে ধরা ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। আর সে-জন্য আয়মান সাদিক যে সাহসী পদক্ষেপ নিলেন, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। আশা করা যায়, আজকের পর তাকে কেন্দ্র করে ভুল বোঝাবুঝির কিছুটা হলেও অবসান ঘটবে।

তবে পুরোপুরি অবসান ঘটানোর জন্য আয়মান সাদিককে নির্দ্বিধায় বলতে হতো কেন তিনি সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোর সাথে একমত পোষণ করলেও সেগুলোতে সরাসরি অংশগ্রহণ করেননি, বা করলেও দেরিতে করেছেন। তা তিনি বলেননি। ধরে নিতে অসুবিধা হয় না যে সরাসরি সরকারের আইসিটি ডিভিশন টেন মিনিট স্কুলের সাথে সম্পৃক্ত থাকায়, এসব ব্যাপারে তার হাত-পা অনেকটাই বাঁধা। ঠিক যে কারণে তিনি আন্দোলনগুলোতে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারেননি, ঠিক একই কারণেই এ প্রসঙ্গে সোজাসাপটা কোন উত্তরও তিনি এই ভিডিওতে দেননি। ভবিষ্যতে কোন এক সময় তিনি সবধরণের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে প্রকৃত অর্থেই দেশের আপামত ছাত্রসমাজের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে, সেই কামনা করছি। শুভকামনা রইল আয়মান সাদিক ও তার স্বপ্নের সংগঠন টেন মিনিট স্কুলের প্রতি।

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close