ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

আওয়ামী লীগ বড় কোনো ভুল করে ফেললো না তো?

দুয়ারে কড়া নাড়ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, এখনও সেটার উত্তাপ সেভাবে গায়ে না লাগলেও, সময় ঘনিয়ে আসছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আগামী মাসের(অক্টোবর) মাঝামাঝিতেই নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। দুর্নীতির মামলার রায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া আছেন জেলে, বিএনপিও মোটামুটি মৃতপ্রায়। ফলে মাঠের রাজনীতি বা ভোটের রাজনীতি, দুটোতেই বিএনপির চেয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কিন্ত নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের কি আসলেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ আছে?

যেকোন জাতীয় বা আঞ্চলিক নির্বাচনে সেদেশের ছাত্রসমাজ, বা তরুণ ভোটারেরা একটা বিশাল অবদান রাখেন। বাংলাদেশের মোট ভোটারের প্রায় ত্রিশ শতাংশেরই বয়স বিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে। এদের মধ্যে প্রথমবার ভোট দেবেন, এরকম ভোটারও আছেন কোটির ওপরে। এদের বেশিরভাগই আবার সুইং ভোটার, তাদের মন-মানসিকতা সময় বা ঘটনার সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিশাল অঙ্কের ভোটাদের অনেকেই যে আওয়ামী লীগের ওপরে বিরক্ত, সেটা কি দলটার নীতিনির্ধারকেরা জানেন?

আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের হামলা, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, জাতীয় নির্বাচন

গত ছয় মাসের মধ্যে বড়সড় দুটো ছাত্র আন্দোলন হয়েছে। একটা সরকারী চাকুরীতে কোটা সংস্কারের দাবীতে, অন্যটা নিরাপদ সড়কের দাবীতে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, দুটো আন্দোলনেই শেষমেশ ছাত্রদের মুখোমুখি প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগ, একটা পর্যায়ের পরে দুটো আন্দোলনকেই সরকার পতনের আন্দোলন হিসেবে দেখেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকবার, হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের পায়ের হাড় ভেঙে ফেলা হয়েছে, শহীদ মিনার চত্ত্বরে প্রকাশ্যে পেটানো হয়েছে কোটা সংস্কারের দাবীতে মানববন্ধনে দাঁড়ানো কয়েকজন ছাত্রকে, উঠেছে শ্লীলতাহানীর অভিযোগও। কারা পিটিয়েছে, সেটা বলে না দিলেও চলছে। কয়েক দফা গ্রেফতার আর রিমান্ডের শিকার হয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্ররা।

আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের হামলা, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, জাতীয় নির্বাচন

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনটা ছিল একদমই কলেজ পড়ুয়া ছাত্রদের আন্দোলন। বেপরোয়া এক ড্রাইভারের বাসচাপায় সহপাঠী খুনের বিচার চেয়ে পুরো ঢাকা শহরের সবগুলো কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা নেমে এসেছিল রাজপথে, ঢাকা শহরের নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নিয়েছিল তারা। সেই আন্দোলনটার লাভের গুড় খাওয়ার জন্যে তক্কে তক্কে ছিল বেশ কয়েকটা পক্ষই। সংবাদমাধ্যমের নিস্ক্রিয়তার সুযোগে সমানে গুজব ছড়ানো হয়েছে, ছাত্রদের ক্ষেপিয়ে তোলা হয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে।

সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার, সরকারপন্থী সংগঠনগুলোও তখন ছাত্রদের ক্ষোভ উপশম না করে বরং পাল্টা আক্রমণের পথ বেছে নিয়েছিল। একদিকে যখন ছাত্রলীগের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক রাস্তায় নেমে ছাত্রদের বাড়ি ফিরে যাবার অনুরোধ করছেন, সেই একই সময়ে হেলমেট পরিহিত দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়েছে ছাত্রদের ওপর, আহত হয়েছে ছাত্ররা, আহত হয়েছে ছাত্রলীগ বা স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মীরাও। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হামলা চালানো হয়েছে, আবার সহিংসতার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরই! তাদের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে, অথচ গ্রেফতার হয়নি পুলিশের পাশে দাঁড়িয়ে হামলা চালানো লুঙ্গি-হেলমেট পরিহিত হামলাকারীরা!

আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের হামলা, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, জাতীয় নির্বাচন

পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন বা কোটা সংস্কার আন্দোলনে আটক হওয়া ছাত্রদের সবাই জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, স্বাভাবিক জীবনেও ফিরে গিয়েছেন অনেকেই। কিন্ত যে ব্যাথাটা তারা পেলেন, যে বেদনাটা নিয়ে তারা ঘরে ফিরলেন, সেটা ভুলে যাওয়া কি তাদের পক্ষে সম্ভব? সেই ক্ষত সারিয়ে তোলার কোন তাগিদ কি আওয়ামী লিগের আছে?

কোটা সংস্কার আন্দোলন বা নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, দুটোই যৌক্তিক দাবীতে হয়েছিল। সেই যৌক্তিক দাবীগুলোর বিপরীতে সরকার বা আওয়ামী লীগের এমন বিপরীতধর্মী অবস্থানের কারণ কি? এই যে ছাত্রদের ওপর হামলা হলো, তাদের রাস্তায় ফেলে পেটানো হলো, মামলা দেয়া হলো, রিমান্ডে নেয়া হলো, সেসব তো মানুষ ভুলে যায়নি। ছাত্ররা বাড়ি ফিরে গেছে, সবকিছু হয়তো শান্ত দেখাচ্ছে এখন, কিন্ত যারা ভোগান্তির শিকার হয়েছে, যারা হুমকি ধামকি পেয়েছে, তাদের মনের ভেতরে কি আওয়ামী লীগের প্রতি একটা বিরূপ ভাব জন্ম নেয়নি?

আওয়ামী লীগ নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দল বলে দাবী করে সবসময়, সেই দাবীর সঙ্গে বিরোধ করার মতো কোন কারণ ঘটেনি। আমরা আওয়ামী লীগকে বলি মন্দের ভালো, কারণ বাকীরা সবাই পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে অনেক আগেই, তাদের গা থেকে দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে। কিন্ত শেষ আশ্রয়স্থল আওয়ামী লীগ যখন অযথাই যৌক্তিক আন্দোলনে বাগড়া দেয়, তাদের ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা যখন ন্যায়সঙ্গত দাবী নিয়ে রাস্তায় নামা ছাত্রদের বেধড়ক পেটায়, তখন আমাদের আসলে যাওয়ার কোন জায়গা থাকে না আর। পুরো একটা প্রজন্মের তরুণদের মনে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের প্রতি কি পরিমাণ ক্ষোভ জমা হয়েছে, সেটা কি এই দলটা বা দলের অঙ্গসংগঠনের নেতারা খোঁজ নিয়ে দেখেছেন কখনও?

আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের হামলা, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, জাতীয় নির্বাচন

নিজেদের অর্থায়নে গড়া পদ্মা সেতু দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়ে এখন চার লেনের প্রশস্ত সড়ক। দেশের জিডিপি বাড়ছে, দারিদ্র‍্যতা কমছে, দুর্নীতিতে টানা চ্যাম্পিয়ন হবার সময়টা আমরা পেরিয়ে এসেছি- এসবকিছুই আওয়ামী লীগ সরকারের অর্জন। কিন্ত সমস্যা হচ্ছে, দিনশেষে এগুলো মানুষ মনে রাখবে না। মানুষের মনে পড়ে যাবে, নিরীহ ছাত্রদের মাসকয়েক আগে কিভাবে হেনস্থা করা হয়েছে। ছাত্ররাও তো এরকম কিছু আশা করেনি সরকারের তরফ থেকে। তারা নিজেদের দাবীদাওয়া আদায় করতেই রাস্তায় নেমেছিল, সেটার বিনিময়ে যে তাদের হাতুড়ির বাড়ি হজম করতে হলো, মামলা-জেল-রিমান্ডে যেতে হলো, সেটা কি তারা মন থেকে মুছে ফেলতে পারবে? ভুলে যাওয়া কি এতই সহজ?

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন বলুন, কিংবা কোটা সংস্কার আন্দোলন, সরকার কিন্ত দিনশেষে ছাত্রদের দাবীদাওয়া মেনে নিয়েছে, নিচ্ছে। সড়ক পরিবহন আইনে খানিকটা পরিবর্তন আনা হয়েছে, সরকারী চাকুরীতে কোটা শিথিলের ব্যাপারটাও সমাধানের পর্যায়ে আছে। সব দাবী যখন মেনে নেয়ার মতোই, তাহলে কেন আন্দোলনের শুরুতেই ছাত্রদের ঘরে ফেরানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি? কেন এই আন্দোলনগুলো থেকে বিরুদ্ধ শক্তিকে ফায়দা লোটার সুযোগ দেয়া হয়েছিল? কেনই বা আন্দোলন দমনের নামে ছাত্রদের ওপর মামলা-হামলা আর রিমান্ড চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল?

আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের হামলা, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, জাতীয় নির্বাচন

ছাত্রদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক বা সামরিক সরকারই সুবিধা করতে পারেনি, তাদের দাবীর কাছে মাথা নত করতে হয়েছে সরকারকে। আওয়ামী লীগের ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যাবে, তরুণেরাই এই দলটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে। সেই ১৯৬৯-৭০ এর উত্তাল আন্দোলন, ৯৬ এর নির্বাচন বা ২০০৮ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার পালে হাওয়া দিয়েছিল তরুণ ভোটারেরাই।

সামনে আরেকটা নির্বাচন, আওয়ামী লীগ পারতো, এই দুটো ছাত্র আন্দোলন থেকেই সুফল ঘরে তুলে নিতে। কিন্ত বাস্তবে এর উল্টোটাই ঘটতে দেখেছি আমরা। এই যে ছাত্রদের মধ্যে একটা অ্যান্টি-আওয়ামী মেন্টালিটি ঢুকে গেছে গত কয়েক মাসে, সেটা কি খুব সহজেই দূর করা যাবে? কিংবা ছাত্রদের সেই পুঞ্জিভূত ক্ষোভগুলো প্রশমনের ব্যবস্থা কি তারা করেছেন? আমাদের খুব জানতে ইচ্ছে করে…

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close