অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

কাছে আসার অদ্ভুত এক গল্প!

অবিনাশ কুমার চাকুরী করেন দিল্লির একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে, সেখানকার কোয়ালিটি কন্ট্রোল ম্যানেজার তিনি। বিয়ে করেছেন পাঁচ বছর আগে। স্ত্রী থাকেন বিহারের রাঁচীতে, সেখানে একটা রেডিও স্টেশনে আরজে হিসেবে কাজ করেন তিনি। রাঁচী থেকে দিল্লি ট্রেনে করে যেতে দেড়দিন সময় লাগে প্রায়, প্লেনে করে গেলে যাওয়া-আসায় যে খরচটা পড়ে, সেটাও তাদের একজনের মাসিক বেতনের প্রায় অর্ধেক। স্বল্প আয়ের এই দুজন মানুষের তাই সাধ্য হয় না মাসে মাসে দেখা করার। তবে বিয়ের পরে গত পাঁচ বছরে একসঙ্গে বিশ দিনও কাটাননি এই দম্পতি, এটা শুনলে অবাকই হতে হয়! ভারতের জনপ্রিয় টিভি রিয়েলিটি শো ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’- তে প্রতিযোগি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন অবিনাশ কুমার, সেখানেই তিনি শুনিয়েছেন তার জীবনের গল্পটা।

একত্রে থাকেন না বলে পাড়া-প্রতিবেশি থেকে আত্নীয় স্বজন, সবাই কটুকথা শোনায়, সহকর্মীরা টিপ্পনি কাটে। বাচ্চাকাচ্চা নেয়ার তাগাদা দেয় পরিবারের লোকজন। ওরা জবাব দিতে যান না, সাফাই দেয়ারও চেষ্টা করেন না কাউকে। চেষ্টা করেন, সবকিছু এড়িয়ে যাওয়ার, না শোনার ভান করে পাশ কাটিয়ে দেয়ার। তবুও মাঝেমধ্যে কিছু কথা হয়তো খুব গায়ে লাগে, মন খারাপ হয়। তখন কারো কাঁধে মাথা রেখে কান্না করার জন্যেও তো একজন আরেকজনকে পাশে পান না। খারাপ লাগাটা আরও বেড়ে যায় তখন। 

প্রশ্ন উঠতে পারে, যে চাকুরী দুজনকে এত দূরে ঠেলে দিচ্ছে, সেটা করার দরকার কি? কেউ একজন চাকুরী ছেড়ে দিয়ে একসঙ্গে থাকলেই তো পারেন তারা। সমস্যা আছে। দুজনের মাথার ওপরে বিশাল ঋণের বোঝা, সেটা শোধ না করে স্থির হতে চান না তারা। বাড়ির ঋণের সঙ্গে আছে অবিনাশের বাবার চিকিৎসা আর বোনের বিয়ের জন্যে ধার নেয়া টাকাও। অঙ্কটা কম কিছু নয়, প্রায় আঠারো লক্ষ রূপি! দুজনেই বেতন থেকে মাসে মাসে অল্প অল্প করে টাকা জমাচ্ছেন ঋণ শোধ করার জন্যে। আর তাই চাইলেও একসঙ্গে থাকার ইচ্ছেটা পূরণ করতে পারছেন না তারা।

অবিনাশ আর তার স্ত্রী স্বপ্ন দেখতেন, সব ঋণ শোধ করে একদিন মাথা উঁচু করে হাঁটবেন ওরা, থাকবেন একই বাড়িতে। সমাজের চোখে আদর্শ স্বামী স্ত্রী’রা যেমন হয়, ওরাও তেমনই হবেন। লোকে আর কটুকথা বলবে না তাদের নিয়ে, ‘বাচ্চা নাও, বাচ্চা নাও’ বলে কান ঝালাপালা করবে না কেউ। পৃথিবীতে তাদের সন্তানেরা আসবে, বড় হবে, ছুটোছুটি করবে ঘর জুড়ে। মানুষের জীবন কত বিচিত্র, কত রকমের সমস্যার ভারে জর্জরিত, ভাবতেও অবাক লাগে।

সনি টেলিভিশনে প্রচারিত ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’তে অংশগ্রহণ করেছিলেন অবিনাশ। ইচ্ছে ছিল, সেখান থেকে বড় অঙ্কের কোন পুরস্কার পেলে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের পথে অনেকটাই এগিয়ে যাওয়া যাবে। তবে কেবিসি’র হটসিটে বসে অবিনাশ যেটা করেছেন, সেটা হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি শুরুতে। পঞ্চাশ লক্ষ রূপি জিতে নিয়েছেন তিনি, দিয়েছেন বারোটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর। অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন অবিনাশের স্ত্রী’ও। স্বপ্নপূরণের আনন্দ যে কতটা তীব্র হতে পারে, সেটা অনুষ্ঠান শেষে দুজনের হাসিমুখ দেখেই অনুমান করা যাচ্ছিল। 

প্রথম দিন সাড়ে বারো লক্ষ রূপিতে থাকা অবস্থায় পর্ব শেষ হয়েছিল। পরেরদিন সেখান থেকেই শুরু করেছেন অবিনাশ। সাড়ে বারো লক্ষ থেকে অঙ্কটা নিয়ে গেছেন পঞ্চাশ লক্ষে। আরেকটা প্রশ্নের উত্তরটা দিতে পারলে এক কোটি রূপি পকেটে নিয়ে ফিরতে পারতেন, তবে জবাবটা জানা ছিল না তার। আর সেকারণে সেখানেই খেলা থামিয়ে দিয়েছেন তিনি, তার নামের পাশে তখন পঞ্চাশ লক্ষ রূপির প্রাইজমানি লেখা হয়ে গেছে।

এমনিতে অবিনাশ খুব মজার মানুষ। হাসিঠাট্টায় মাতিয়ে রাখতে জানেন। হটসিটে বসে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে তিনি ভাগাভাগি করেছেন নিজেদের কষ্টের কথা, শুনিয়েছেন সংসার জীবনের মজার ঘটনাগুলোও। বিয়ের পরে অবিনাশের স্ত্রী তাকে ‘বাবু’ বলে ডাকতো, অবিনাশের ধারণা ছিল বাচ্চাদেরই কেবল বাবু নামে ডাকা হয়। ভালোবেসে যে স্বামী-স্ত্রী একে অন্যকে বাবু ডাকতে পারে, সেটা তার মাথায়ই ছিল না! পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছেন, বিয়ের পরে সব স্বামীই তাদের স্ত্রীর হাতের বাবু হয়ে যায়! অবিনাশের কথা শুনে হেসে গড়িয়ে পড়েছেন অমিতাভ বচ্চন।

লং ডিসট্যান্স রিলেশনশীপগুলো যেমন হয়, অবিনাশ আর তার স্ত্রীর সম্পর্কটাও তেমনই। ফেসবুক মেসেঞ্জার আর হোয়াটসঅ্যাপেই যোগাযোগ বেশি হয়। ভিডিও কলে দুজন দুজনকে দেখেন প্রতিদিনই, কিন্ত স্পর্শের তীব্র আকাঙ্ক্ষাটা তো তাতে মেটেনা। বিয়ের পাঁচ বছরের মধ্যে মাত্র বিশ দিন পাশাপাশি কাটিয়েছেন দুজনে, বছরে চারদিনও নয়! কখনও হয়তো টানা এক-দেড় বছর দেখা হয়নি। সম্পর্কটা ভেঙে যেতে পারতো, দুজন দু’দিকে চলে যেতে পারতেন, পারতেন অন্য কোন সম্পর্কে জড়িয়ে যেতে। কিন্ত একের প্রতি অন্যের বিশ্বাসটা ভীষণ শক্ত ওদের মধ্যে, সেটা কোনদিন ভাঙবেন না বলেই পণ করেছেন তারা। আর তাই হাজার মাইলের দূরত্বও কিংবা বছরের পর বছর ধরে দেখা না হওয়াটাও তাদের সম্পর্কে কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি এখনও। 

অবিনাশ কবিতা লেখেন, তার কবিতার বইও বেরিয়েছে। সেই বইয়ের একটা কপি তিনি উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন অমিতাভ বচ্চনের জন্যে। জানিয়েছেন, স্ত্রী যখন রাগ করেন, তখন ফোনের ওপাশ থেকে কবিতা আবৃত্তি করে তার মান ভাঙান তিনি। কেবিসি’র মঞ্চেও স্ত্রীর জন্যে নিজের লেখা একটা কবিতা পড়ে শুনিয়েছেন অবিনাশ। সেই মূহুর্তটা অদ্ভুত রকমের স্বর্গীয় ছিল। দর্শক সারি থেকে জীবন সঙ্গীনীকে ডেকে নিয়েছেন অবিনাশ, দুজনে হাত ধরে আছেন, কবিতা আবৃত্তি করতে করতেই প্রিয় মানুষের স্পর্শসুখে ধন্য হচ্ছেন তারা, যে স্পর্শের জন্যে প্রতিটা মানুষের হৃদয় তৃষিত হয়ে থাকে!

কৌন বনেগা ক্রোড়পতি থেকে কোটিপতি হয়ে বেরুতে পারেননি অবিনাশ। তবে নিজের সমস্যাগুলোর সমাধানের চাবিকাঠিটা তিনি পেয়ে গেছেন। এই পঞ্চাশ লক্ষ রূপির পুরস্কারটা ভীষণ কাজে আসবে তার। হাজার মাইলের দূরত্বটা ঘুচিয়ে দেবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে। চাকুরির সুবাদে আর দুই রাজ্যে থাকতে হবে না, শুনতে হবে না আত্নীয় স্বজনের গালমন্দ, করতে হবে না অকারণে মন খারাপ। জীবন কত অদ্ভুত হয় ভাবতে পারেন? নইলে একটা টিভি রিয়েলিটি শো যে এই দম্পতিকে এক ছাদের নীচে বসবাসের সুযোগ করে দেবে, এটা কে জানতো? অবিনাশ বা তার স্ত্রীও কি কল্পনা করেছিলেন কখনও, বছরের পর বছর ধরে চলে আসা সমস্যাটার সমাধান এমন আকস্মিকভাবেই হয়ে যাবে? ভাগ্যের লীলা বোঝা যে বড় দায়! 

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles