অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যঅনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

এভা ক্লার্ক: বিরল জেনেটিক ডিজঅর্ডারকে জয় করা ছোট্ট পরী!

জন্মের পর পরই নীলচে-সবুজ চোখের মণি, উজ্জ্বল গোলাপী ঠোঁট, অস্বাভাবিক ফর্সা ত্বক আর কোঁকড়া ছোট ছোট সোনালী চুলের মেয়েটিকে দেখেই বোঝা  গিয়েছিল, সে আর দশজনের থেকে আলাদা। সুন্দর হলেও, সুস্থ-স্বাভাবিক নয়,  এভা ক্লার্ক নামের মেয়েটি।

আমেরিকার মিসিসিপিতে জন্ম নেওয়া এভা ক্লার্কের বয়স বছর দশেক। এতটুকু বয়সেই সে সেখানকার নামকরা মডেল। আমেরিকার বেশ নামী-দামী ম্যাগাজিনের মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে সে। অনেক সেলিব্রেটি ফটোগ্রাফারের সাথে কাজ করেছে। এমনকি একটি সিনেমায়ও অভিনয় করেছে।

ভাবছেন, এ তো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা! এ বয়সে কি? এর চেয়ে কত কম বয়সেও তো কত বাচ্চারা মডেল হয়, অভিনয় করে বিখ্যাত হয়! তাইতো?

হুম, করে। অনেক বাচ্চারাই মডেলিং করে, অভিনয় করে, বিখ্যাত হয়- অনেকেই হয়। তবু এই এভা ক্লার্ক মেয়েটা আলাদা। স্বতন্ত্র। কেননা, সে আর দশটা বাচ্চার মত স্বাভাবিক নয়। স্বাভাবিক হয়ে জন্মেনি। জন্মেছে জটিল এক ব্যাধি সঙ্গে নিয়ে।

এভা ক্লার্ক যে ব্যাধি সঙ্গে নিয়ে জন্মেছে, তার নাম, “অ্যালবিনিজম”। অ্য়ালবিনিজম একটি জেনেটিক ডিসঅর্ডার। এ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত শিশুদের ত্বক, চুল এবং চোখে রঞ্জক পদার্থের অভাব থাকে, যে কারণে এসবের রং হয় অস্বাভাবিক। ক্ষেত্রবিশেষে দৃষ্টিশক্তি হয় দুর্বল, ত্বক হয় স্পর্শকাতর। সূর্যের আলোতে ত্বকের খুব ক্ষতি হয়। মোট কথা মারাত্মক শারীরিক জটিলতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে অ্যাবনিজমে আক্রান্ত শিশুরা।

অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত অন্য শিশুদের মত এভা ক্লার্কও জন্মের পর বেশ অস্বাভাবিকতা নিয়ে বড় হতে থাকে। খুব অল্প বয়স থেকেই তাকে যেতে হয় জটিল সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর চিকিৎসার মধ্যে দিয়ে। ডাক্তাররা বলতো, বড় হয়ে  অন্ধ হবার সম্ভাবনা আছে ক্লার্কের।  কিন্তু না, শেষ পর্যন্ত অন্ধত্ব গ্রাস করতে পারেনি মেয়েটিকে। সে ভালভাবেই বেড়ে উঠেছে। অস্বাভাবিকতা বলতে কেবল, চশমা ছাড়া বাইরে বেরুতে পারে না সে। তাছাড়া আর সব কিছু স্বাভাবিকই রয়েছে, স্বাভাবিক শিশুদের মত স্কুলেও যেতে পারে এভা ক্লার্ক।

এভা ক্লার্কের জীবন-যাপনের কথা জেনে অনেকে হয়তো মনে করতে পারেন অ্যালবিনিজম রোগটা তেমন জটিল কিছু নয়। যারা এমন ভাবছেন, তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, এভা ক্লার্ক মেয়েটা ভাগ্যবতী। জেনেটিক ডিসঅর্ডার সাথে নিয়ে জন্মালেও সে জন্মেছে যুক্তরাষ্ট্রে। জন্ম থেকেই সঠিক চিকিৎসা, যত্ন আর সেবা পেয়েছে। পেয়েছে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা। বোনাস হিসেবে মডেল হয়ে গড়ে ওঠার জন্য সঠিক মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণও করতে পেরেছে। কিন্তু অ্য়ালবিনিজমে আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষের ভাগ্য এতটা সু্প্রসন্ন হয় না।

আফ্রিকার অনেক দেশে, বিশেষত মালাউ এবং তানজানিয়াতে অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত কেউ জন্মালে তাদের পরিণতি হয় ভয়াবহ। সেসব দেশে অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মনে করা হয় অভিশপ্ত। সেখানকার কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষরা অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে দেয় না কোন ভাবেই। অস্বাভাবিকতা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর কটু কথা তো আছেই, তার ওপর আবার সেসব দেশে অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মনে করা হয় জাদুবিদ্যার খোরাক। অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জাদুকরী ক্ষমতা আছে মনে করা হয়। একারণে সেসব দেশের লোকেরা অ্যালবিনিজমে আক্রান্তদের বাঁচতে দেয় না। তাদেরকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়, কিডন্যাপ করে, মেরে ফেলে, তারপর শবচ্ছেদ করে সেগুলো জাদুকর ডাক্তারদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এমনকি, মৃত্যুর পরেও সেসব দেশে অ্যালবিনিও ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত মানুষদের শান্তি নেই। কবর থেকে তাদের লাশ চুরি করা হয়।

কয়েক বছর আগে, ২০০৯ সালের দিকে তানজানিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, সেদেশে অ্যালবিনিজম ডিসঅর্ডারের শিকার ব্যক্তিদের নিরাপত্তার কথা ভেবে, বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নেন। তিনি সেসময় তানজানিয়ার সকল  জাদুকর ডাক্তারদের লাইসেন্স বাতিল ঘোষণা করেন এবং অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরের অংশ নিয়ে জাদুবিদ্যার সব রীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ফলে, সেদেশে অ্য়ালবিনিজমে আক্রান্ত মানুষদের জীবনের নিরাপত্তা খানিকটা নিশ্চিত হয়। অবশ্য আজও আফ্রিকার দেশগুলোতে অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঠিক স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হয় না। জীবনের নিরাপত্তা খানিকটা থাকলেও, স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা আজও পৃথিবীর অনেক দেশেই নেই এ বিরল জেনেটিক ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের।

তাই, আমেরিকার এভা ক্লার্ক নামের অ্যাবনিজমে আক্রান্ত ছোট্ট পরীর মত অসাধারণ চেহারার মেয়েটি বিশ্বের অন্যান্য আবনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাছে দৃষ্টান্ত হতে পারে। ক্যামেরার সামনে স্বতস্ফূর্ত মেয়েটিকে দেখে কে বলবে এতবড় অস্বাভাবিকতা নিয়ে জন্ম হয়েছে তার! এভা ক্লার্ক যে শুধু ক্যামেরার সামনেই স্বতস্ফূর্ত এবং শুধু মডেলিংয়েই পারদর্শী তা কিন্তু নয়, সে পড়াশুনা, ব্যায়াম, দৌড়, ব্যালে ড্যান্স এবং অভিনয়েরও পটু। তাই এভা ক্লার্কের এমন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, সমাজের চোখটাটানি, কুসংস্কার সবকিছু অগ্রাহ্য করে নিজের পরিচয়ে পরিচিত হতে পারার সৌন্দর্যটা, সত্যিই অন্যরকম কিছু!

তথ্যসূত্র- ইয়াহু

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close