একজন মানুষ কেন ‘লেখক’ হয় বা হতে চায়? খোলা চোখেই দেখা যায়, লেখালেখি পেশা হিসেবে আদর্শ নয় মোটেও। লেখালেখি করে অনেক অর্থ উপার্জন করা বা সম্মান অর্জন করা; দুটোই লটারির মত, লেখক মাত্রই এগুলো অর্জন করবে না। অনেক বিখ্যাত কালজয়ী লেখক-সাহিত্যিক আছেন যারা জীবদ্দশায় অর্থ-খ্যাতি কোনটাই অর্জন করতে পারেননি। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম কবিদের একজন জীবনানন্দ দাশ প্রচণ্ড অর্থাভাবে দিন কাটিয়েছেন, শুধু তাই নয় জীবিত অবস্থাতে তাঁর সাহিত্যিক খ্যাতিও ততটা ছিল না। শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্ব-সাহিত্যের দিকে তাকালেও একই চিত্র দেখা যাবে। লেখক মাত্রই এটা জানেন। কিন্তু তারপরেও কেন একজন মানুষ লেখক হতে চায়?

আসুন দেখা যাক সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী তুর্কি ঔপন্যাসিক ওরহান পামুক কেন লেখেন? এক স্মৃতিকথায় পামুক লিখেছেন,

“আপনারা জানেন আমরা লেখকেরা সচরাচর যে প্রিয় প্রশ্নটির সম্মুখীন হই তা হচ্ছে, আপনি কেন লেখেন? আমি লিখি, কারণ লেখার জন্য আমার অন্তর্গত তাড়না রয়েছে। আমি লিখি, কারণ আমি অন্যসব মানুষের মত সাধারণ কাজ করতে পারি না। আমি লিখি, কারণ যে ধরণের বই আমি লিখি তা পড়তে চাই।

আমি লিখি, কারণ আমি আপনাদের সবার ওপর, প্রত্যেকের ওপর আমি ক্ষুব্ধ। আমি লিখি, কারণ আমি একটি কক্ষে সারাদিন বসে থাকতে ভালোবাসি।

আমি লিখি, কারণ আমি সাহিত্যে বিশ্বাস করি, অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে উপন্যাসের কলাকৌশলে বেশি বিশ্বাস করি। আমি লিখি, কারণ এটা আমার অভ্যাস, আমার আবেগ। আমি লিখি, কারণ আমি কাগজ-কলম ও কালির গন্ধ ভালোবাসি।”

ওরহাম পামুক লেখার পিছনে তাঁর ব্যক্তিগত তাড়নার কারণ হিসেবে একটি নয়, অনেক গুলো বিষয়ের অবতারণা করেছেন। লেখক মাত্রই (তা সে অখ্যাত-বিখ্যাত যেমনই হন না কেন) পামুকের এই বক্তব্যের সাথে একমত হবেন।

ওরহান পামুক স্থাপত্য পড়েছেন তিন বছর। এরপর পড়া ছেড়ে দিয়ে পুরোদস্তুর লেখক হয়ে গেছেন ২২ বছর বয়সে। অর্থাৎ লেখালেখির জন্য তিনি একাডেমিক পড়াশুনাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের সবথেকে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদও লেখালেখিতে পূর্ণ মনোনিবেশ করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এমন উদাহরণ খুব বেশি নেই। আর বাস্তবতার চরম আক্রমণ উপেক্ষা করে কেবল অন্তর্গত তাড়না থেকে, লেখালেখির জন্য অন্য সব কিছু ছেড়ে দেয়ার মত দুঃসাহসিক কাজ সবাই করতে পারেনা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। নতুন একজন লেখক যাকে কিনা নিজের পয়সা খরচ করে কিংবা লোকজনের দুয়ারে ধর্না দিয়ে বই প্রকাশ করতে হচ্ছে, যে বই প্রাথমিক ভাবে বিক্রি হবে কেবল পরিচিত গণ্ডির মধ্যে এবং ফলশ্রুতিতে যে বই থেকে অর্থ উপার্জনের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়। সেখানে কেন একজন মানুষ লেখক হবার বাসনা থেকে বই বের করে? তাদের উত্তর পামুকের থেকে অবশ্যই ভিন্ন হবেনা, বলাই যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কি এই তাড়না সত্যিকার অর্থেই অন্তরে অনুভব করে তীব্র ভাবে? অনুভব করলেও তারা কি যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামে?

যেকোন খেলা, ধরুন ফুটবল। আপনার ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা আছে, খেলতে ভালোবাসেন খুব। কিন্তু শুধু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাই কি মাঠে আপনার ভালো খেলার নিশ্চয়তা দেবে? কখনোই না। আপনার ভালো খেলার নিশ্চয়তা দেবে আপনার প্রস্তুতি, আপনার প্রশিক্ষণ, আপনার ক্রমাগত চর্চা। এটা শুধু খেলার ক্ষেত্রে নয়, সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। লেখালেখির ক্ষেত্রে তো বটেই!

একটা কথা প্রচলিত আছে এরকম, যে সব কিছুতেই ব্যর্থ হয়, সে লেখালেখি করতে মনঃস্থ করে! অর্থাৎ এরকম ধারণা প্রচলিত যে, লেখালেখি করাটা খুবই সহজ ব্যাপার, যেকেউ চাইলেই লেখক হয়ে যেতে পারে। অনেকেই ভাবতে পারে, মনে মনে কাহিনী চিন্তা করা আর এমন কঠিন কী ব্যাপার! কত কাহিনীই তো মাথায় আছে, শুধু কাগজ-কলম নিয়ে বসে যাওয়ার অপেক্ষা। না মশায়, ব্যাপারখানা এমন নয়!

লেখক হবার জন্য তাড়না থাকাটা প্রাথমিক শর্ত, তবে সেটাই সব নয়। বিশ্বের সব বিখ্যাত, প্রতিষ্ঠিত, মহৎ লেখকরা হুট করে লেখক হয়ে যাননি। এর পিছনে তাদের পরিশ্রম ছিল, নিজেদের তৈরি করে নেয়ার ব্যাপার ছিল, প্রশিক্ষণও ছিল। এই প্রশিক্ষণ মানে ‘তিন দিনে ইংরেজি শিক্ষা’র মত কোন কোর্স নয়, এই প্রশিক্ষণের ব্যাপারটা সম্পূর্ন নিজস্ব এবং এর কোন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেই বলেই, সাধারণেরা এটা ধরতে ব্যর্থ হয়।

লেখক হবার প্রধাণ শর্ত ‘ভালো পাঠক’ হওয়া। তবে সাধারণ পাঠকের বই পড়া, আর একজন লেখকের বইপড়ার মধ্যে বিস্তর তফাৎ রয়েছে। সাধারণ পাঠক বই পড়বে আনন্দের জন্য, লেখক বই পড়বে আনন্দ আহরণের পাশাপাশি শেখার জন্যও। ধরুন আপনি একজন লেখক (বা লেখক হতে চাচ্ছেন)। আপনি কোন একটি উপন্যাস পড়ছেন। একজন সাধারণ পাঠক উপন্যাসে মগ্ন হবে, সেখান থেকে রসটুকু নেবে। আর আপনি রসটুকু নিয়ে, ছিবড়েটা নিয়ে গবেষণা করবেন! এই উপন্যাসটি কোন পুরুষে লেখা হল, ক্রিয়াপদের কোন কাল ব্যবহার করা হল, কোন বাচ্যে লেখা হল। একই গল্প, একই কাহিনী- পুরুষ, ক্রিয়ার কাল, বাচ্য ভেদে সম্পূর্ণ অন্য রকম হয়ে যায়। আপনি যখন লিখতে বসবেন, তখন আপনাকে আগে থেকেই এটা বের করে নিতে হবে আপনি কোন পুরুষে লিখবেন, কোন কালে লিখবেন, কোন বাচ্যে লিখবেন।

এরপর আপনাকে দেখতে হবে, এই উপন্যাস বা গল্পে লেখকের অবস্থান কোথায়? লেখক কি নিজেই উপন্যাসের চরিত্র না সে কেবল বর্ণনাকারী? নিজেই যদি চরিত্র হয় তাহলে তাঁর গল্প বলার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যাবে। সে যদি বর্ণনাকারী হয় তাহলে কিছু সুবিধা নিতে পারবে। লেখার সময় আপনাকে এটাও ঠিক করে নিতে হবে। নিজেকে কোথায় স্থাপন করলে গল্পটা সব থেকে সুন্দর করে বলা যাবে।

যেমন রবীন্দ্রনাথের ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে লেখক নিজেই গল্পের একটি চরিত্র। তিনি যদি নিজে চরিত্র না হয়ে, নিজেকে বর্ণনাকারীর ভূমিকায় স্থাপন করতেন তাহলে গল্পটি কি এত সুন্দর হত? লেখক হিসেবে এই ব্যাপার গুলো আপনাকে ভাবতে হবে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। আর এগুলো পরীক্ষা করার সব থেকে ভালো উপায় হচ্ছে প্রচুর পড়া। এবং পড়ার সময় মহৎ লেখকরা কীভাবে এই বিষয় গুলো নিয়ে কাজ করেছেন, সেটা খুব ভালো করে লক্ষ করা। এভাবে পড়তে পড়তে আপনি বিষয় গুলো আরো ভালো ভাবে অনুধাবন করতে পারবেন।

আপনি একটু কষ্ট করে খুঁজে দেখুন, বিখ্যাত-মহৎ সকল লেখকদের মধ্যে একটি জিনিস আপনি নিঃসন্দেহে ‘কমন’ পাবেন, তাদের প্রচুর পড়ার অভ্যাস। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাদের একালের লেখকরা নাকি পড়ার সময় পান না!

সত্যিকারের লেখক হবার প্রক্রিয়াটি একটি কষ্টকর প্রক্রিয়া। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বিখ্যাত লেখক হবার আগে, অনেক লেখালেখি করেছেন পত্র-পত্রিকায়। তাঁর সেসব লেখার কথা কিন্তু আমরা জানিনা। কিন্তু ঐ লেখা গুলোই ছিল তাঁর প্রস্তুতি পর্ব। কাজেই প্রচুর পড়া, পড়তে পড়তে বিশ্লেষণ করা, সেখান থেকে শেখা, নিজের লেখায় সেগুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। এরকম অনেক কাজের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় একজন লেখক, আসলেই লেখক হয়ে ওঠেন।

পরের পর্বের আলোচনা করব কয়েকজন বিখ্যাত লেখকের লেখক হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে এবং নতুন লেখকদের জন্য তাঁদের পরামর্শ নিয়ে।

সে পর্যন্ত ফাগুনের এই আগুনে অগ্নিস্নান করে পবিত্র হয়ে উঠুন, নতুন লেখকদের বই কিনুন, তাদের উৎসাহ দিন। আর প্রচুর পড়ুন…

আগের পর্বটি পড়ুন এই লিংকে ক্লিক করে

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-