সিনেমা হলের গলি

আর কতবার এটিএম শামসুজ্জামানকে মেরে ফেলব আমরা?

আবারো বর্ষীয়ান অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানকে ফেসবুকে মেরে ফেলেছি আমরা। গতকাল রাতে হঠাৎ করেই ফেসবুকে এক আইডি থেকে পরিকল্পিতভাবে এটিএমশামসুজ্জামানের মৃত্যু সংবাদ ছড়ানো হয়। এরপরেই অনেক সাধারণ ফেসবুক ইউজার থেকে শুরু করে নানা চেনা-পরিচিত মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব সামান্য ক্রসচেক কিংবা ভেরিফাই করবার অপেক্ষা না করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন এই নোংরা গুজবটি।

তবে তার চেয়েও জঘন্য কাজটা করে কিছু টিভি চ্যানেল। একাত্তর টিভি, চ্যানেল ২৪ সহ বেশকিছু চ্যানেল ব্রেকিং নিউজ স্ক্রলে প্রচার করে এই গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে জাতীয় পর্যায়ে! অথচ আর কেউ ভেরিফাই করুক না করুক, অন্তত টিভি চ্যানেলগুলোকে তো অন্তত ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে হবে পেশাগত দায়িত্বের কারণেই! কিন্তু তারা সেই প্রয়োজনটাও বোধ করেনি!

এই পুরো ঘটনাটিতে প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছেন এটিএম শামসুজ্জমান। ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি গতকাল ফেসবুক লাইভে এসে বলেন,

“চ্যানেল একাত্তর বাংলাদেশের অনেক চ্যানেলের মধ্যে অন্যতম, দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল। এর আগে ৮-৯ বার যারা মেরেছে, তারা ইতর প্রাণী। কিন্তু একাত্তরের মত চ্যানেলে না জেনে, না শুনে কি করে তারা এই ধরণের একটা নিউজ দিতে পারে এটা আমার মাথায় আসে না। আমার বাড়ির নম্বর হচ্ছে ৪৭১১৩৪৫৫। ল্যান্ডফোনে একটা ফোন করলেও তো পারতো তারা, না জেনে কিভাবে এই কাজটা করলো তারা?”

এরপর সংবাদমাধ্যমের সাথে কথা বলার সময়েও ক্ষুব্ধ এটিএম বলেন, ‘এর আগেও ৭-৮ বার মৃত্যুর গুজব ছড়ানো হয়েছে। করে তো লাভ নাই। যারা মৃত্যুর গুজব ছড়িয়েছে তারা গাঁজা, ইয়াবা খায় মনে হয়। যেদিন মারা যাবো, সেদিন তো আর কেউ বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না।’ 

তার পরিবারের একজন সদস্য বলেন, ‌‌‘আমরা যারা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে খবর ছড়াই, তাদের সচেতন হওয়া জরুরি। এমন খবর ছড়ানো উচিৎ নয়। মৃত্যুর মতো বিষয় কিভাবে মানুষ মজা করতে পারে?’

অদ্ভুত ব্যাপারটা হচ্ছে এর আগে এটিএম শামসুজ্জামানের মৃত্যুগুজব ছড়ানো হয়েছিল বাঁশেরকেল্লা পেইজ থেকে, ২০১৩-২০১৪ সালের দিকে! গেরিলা মুভিতে অসামান্য দীপ্তিতে রাজাকারদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অভিনয়ের জন্যই তার উপরে ক্ষিপ্ত ছিল জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা, ফলে তখন বেশ কয়েকবার তিনি মারা গেছেন বলে গুজব ছড়ায় ফেসবুকে বাঁশেরকেল্লা টাইপের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাকিপ্রেমী পেইজগুলো। এমনকি কয়েকদিন আগেও এই গত এপ্রিলে এটিএম শামসুজ্জামান অভিনীত একটা নাটকে তার মৃত্যুদৃশ্যকে অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়ে প্রচার করা হয় যে তিনি মারা গেছেন। অনেকেই এটি বিশ্বাস করে গুজবের পালে হাওয়া দিয়েছিল তখন! আর এবার তো এতে যোগ দিল দেশের প্রথমসারির টিভি চ্যানেল থেকে শুরু করে স্বনামধন্য মিডিয়া ব্যক্তিত্বরাও! কি বিচিত্র এবং নির্লজ্জ এক সমাজে বাস করি আমরা, পচে যাওয়া শকুনের দলে যোগ দিচ্ছে সবাই!

শুধু এটাই না, এর আগেও নানা সময়ে অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক, টেলিসামাদ, সঙ্গীতশিল্পী ও বাঁশিবাদক বারী সিদ্দিকী এবং মেয়র মো. আনিসুল হকসহ অসংখ্য সেলিব্রেটি বেঁচে থাকা অবস্থায়ও এমন ভুয়া মৃত্যুর সংবাদ ফেসবুকে দেয়া হয়। বছর তিনেক আগে প্রয়াত অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাকের মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। রাজ্জাক তখন ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এসময় তার পরিবারকে অনেকেই ফোন দিতে থাকেন বিষয়টা জানার জন্য। পরে নায়কের পরিবার থেকে সবাইকে আশ্বস্ত করা হয় যে, তিনি সুস্থ আছেন।

অথচ ঠিক একই অবস্থা ঘটেছিল সঙ্গীতশিল্পী বারী সিদ্দিকীর বেলায়। ভীষণ অসুস্থ অবস্থায় স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ছিলেন তিনি। তার জীবনের এমন চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় যখন তার জন্য প্রার্থনা করছিল ভক্ত-শুভানুধ্যায়ীরা, ঠিক সেই মুহুর্তে ফেসবুকে স্রেফ লাইক-কমেন্টের ধান্দায় একদল অমানুষ ছড়িয়ে দেয় তার মৃত্যুর সংবাদ। যেন দুটো লাইক-শেয়ারের জন্য তাকে মরার আগেই মেরে ফেলতেও কোন আপত্তি নাই এদের।

তবে অভিনেতা টেলিসামাদের মৃত্যু সংবাদও ছড়িয়ে পড়লে তিনি নিজেই সাংবাদিকদের ডেকে বলেছিলেন, আমি বেঁচে আছি, এখনো মরিনি। জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব মেয়র আনিসুল হক লন্ডনে চিকিৎসারত অবস্থায় বেশ কয়েকবার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এসময় পরিস্থিতি আরো নোংরা করে তোলে অনলাইনভিত্তিক কিছু নামসর্বস্ব নিউজ পোর্টাল ক্রমাগত তার মৃত্যুর খবর প্রচার করে। পরবর্তিতে তার মালিকানাধীন বেসরকারি টেলিভিশন নাগরিক টিভির সিইও আব্দুর নূর তুষার ফেসবুকে স্ট্যাটাসে বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে থামেন। আমি, রুবানা হক, আনিস ভাইয়ের ছেলে-মেয়েরা সবাই পালাক্রমে তাকে প্রতিদিন হাসপাতালে দেখতে যাই। এক মিনিট আগে আমি রুবানা হকের সাথে কথা বলেছি। তিনি তাকে হাসপাতালে দেখে ডাক্তারদের সাথে কথা বলে এসেছেন। আপনারা এত হৃদয়হীন যে, প্রতিদিন তার মৃত্যুর গুজব ছড়াচ্ছেন।’

সম্প্রতি চলচ্চিত্র অভিনেতা ডিপজলের হার্টের বাইপাস সার্জারি হয় সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে। সেখান থেকে সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আপডেট খবর জানাচ্ছিলেন তার মেয়ে ওলিজা মনোয়ার। বাবাকে নিয়ে এতই ব্যস্ত যে, ওলিজা সবসময় ইন্টারনেটে থাকতে পারেন না। এরই মাঝে একদিন ছড়িয়ে পড়ে ডিপজল মারা গেছেন। সোস্যাল মিডিয়াজুড়ে দ্রুত তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। অথচ ডিপজলের সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। কয়েকদিন পর সুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন তিনি। অথচ ফেসবুক ইউটিউবের লাইকজীবী, ভিউজীবী কীটগুলো স্রেফ ভিউয়ের ধান্দায় তাকে আগেই কবরে পাঠিয়ে দিয়েছে!

এর মূল কারণটা হচ্ছে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় হিটের ধান্দা! কে কার আগে ব্রেকিং নিউজ দিয়ে একটু হিট হবে এই আশায় আমরা আজ হারিয়ে ফেলছি ন্যুনতম মানবিক বোধটাও! বিবেক বা কমনসেন্স তো বহুদূরের কথা, জলজ্যান্ত মানুষটাকে ফেসবুকে মেরে ফেলতেও, ডাহা মিথ্যা গুজব ছড়াতেও বাধছে না আমাদের, আর কারো ওয়ালে এমন কিছু দেখা মাত্র কোনদিকে না তাকিয়ে কোন সুত্র থেকে নিশ্চিত না হয়ে, সামান্য ভেরিফাইটাও না করে দুম করে নিজেই ওয়ালে সেই তথ্যটা পোস্ট করে সবার আগে দুটো লাইক-শেয়ার কামিয়ে নিতে চাচ্ছি আমরা। ফলে জীবিত মানুষ পরিণত হচ্ছে মৃতে, তাকে ফেসবুক লাইভে এসে প্রমাণ করতে হচ্ছে যে তিনি মারা যাননি, আইসিইউতে থাকা সংকটাপন্ন মানুষকে মরার আগেই মেরে ফেলছি আমরা, অপারেশন থিয়েটারে থাকা চিকিৎসাধীন মানুষকে কবরে পাঠিয়ে তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে ফেলছি আমরা ফেসবুকে, ওদিকে সে হয়তো সাকসেকফুল অপারেশন শেষে সুস্থ হয়ে দেশে ফিরেছে!

আর এসব কাজে এতোদিন হয়তো সস্তা হিটসিকাররা করতো, কিন্তু এখন এতে যোগ দিয়েছেন স্বনামধন্য মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আর একাত্তর, নিউজ ২৪ এর মত টিভি চ্যানেলগুলো। অথচ এরা কত সহজে ভুলে যান যে এদের ফলো করে অসংখ্য মানুষ, এদের কাছ থেকে পাওয়া একটা সংবাদ অনেকেই দ্বিতীয়বার খোঁজ না নিয়েই বিশ্বাস করে ফেলবে। তবুও এরা, সরাসরি যোগাযোগ করে নিশ্চিত হবার সুযোগ থাকলেও স্রেফ হিটের সবার আগে সর্বশেষ সংবাদ পৌঁছে দিতে গিয়ে আসলে ডেলিভারী দিচ্ছে সবার চেয়ে দ্রুত নোংরামি!

দুইটা লাইক-শেয়ার, ভিউ আর হিটের আশায় আর কত নিচে নামব আমরা?

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close