সঞ্জয় মাঞ্জারেকার একটু হাসি ফোটালেন মুখে, যদিও তার হাসার কথা নয় এই মূহুর্তে, তার দল ভারত হেরে গেছে বাংলাদেশের কাছে। কিন্ত পেশাদারিত্বের খোলসে বাকী সবকিছু চেপে রাখতে হয়। সেটাই করলেন সঞ্জয়। মাইক্রোফোন হাতে তার পাশে দাঁড়ানো মানুষটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন, বললেন- ওয়েল ডান বাংলাদেশ, ইউ ডিজার্ভ ইট আতহার! মাঠের একপাশে তখন পুরস্কার বিতরণী মঞ্চের সামনে ছোটখাটো জটলা, মাশরাফি-সাকিবেরা হাঁটা ধরেছেন সেদিকে। মিরপুরের হোম অব ক্রিকেট ভেসে যাচ্ছে ফ্লাডলাইটের আলোয়, সেই আলোতে স্বর্গীয় দেবদূতের মতো হাসিতে বিকশিত মুখ নিয়ে চারপাশ উজ্জ্বল করে আছেন একটা মানুষ। তিনি বাংলাদেশ দলের অঘোষিত টুয়েলভথ ম্যান আতহার আলী খান, কমেন্ট্রি বক্সের নিঃসঙ্গ যোদ্ধা!

ক্রিকেটার থেকে ধারাভাষ্যকার হওয়াটা ক্রিকেটবিশ্বে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। তবে বাংলাদেশে এটা প্রথম করে দেখিয়েছিলেন আতহারই। খেলোয়াড়ি জীবনে ছিলেন ব্যাটিং অলরাউন্ডার। আমরা যারা নতুন শতাব্দীতে ক্রিকেট খেলাটাকে ভালোবেসেছি, তাদের অবশ্য ক্রিকেটার আতহারকে দেখার কোন সুযোগ নেই। উৎপল শুভ্র বলতেন, “আতহার সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাটিং অলরাউন্ডার। প্রয়োজনের সময় এতো চমৎকার সিম মুভমেন্ট করাতে পারে; প্রেমে পড়ে যাওয়ার মতো। আর ব্যাটিংটা নাই বা বললাম।” তার ব্যাটিঙের ভক্তের অভাব নেই, অনেকের মতে, বাংলাদেশের ক্রিকেটে সর্বকালের সবচেয়ে স্মার্ট আর স্টাইলিশ ব্যাটসম্যানদের একজন ছিলেন আতহার।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একটা ম্যাচে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখে নেমেছিলেন, দারুণ সব শটের পসরা সাজিয়ে নিজের নামের পাশে জড়ো করেছিলেন ৭৮ রান। দলের হেরে যাওয়া ম্যাচটাতেও দুর্দান্ত খেলে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন তিনি, সেটাই কোন বাংলাদেশী ক্রিকেটারের প্রথম ম্যাচসেরা হওয়া। তিনি হতে পারতেন বাংলাদেশের প্রথম ইন্টারন্যাশনাল সেঞ্চুরিয়ান। ১৯৯৭ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে দারুণ ব্যাটিং করছিলেন, মাঠের প্রতিটা প্রান্ত থেকে সমানভাবে বের করে আনছিলেন রান। কিন্ত ব্যক্তিগত ৮২ রানে থেমে যেতে হয়েছিল সেবার, পাওয়া হয়নি অধরা সেঞ্চুরী; আউটটা নিয়েও যথেষ্ট বিতর্ক ছিল। দারুন কভার ড্রাইভ করতে পারতেন, লেগ গ্ল্যান্সটা ছিল চোখে লেগে থাকার মতো। সেই আশি আর নব্বইয়ের দশকে উনিশটা ওয়ানডে ম্যাচ খেলে প্রায় ত্রিশ গড়ে আতহারের রান ৫৩২, বাংলাদেশের আশার ফুল-ফল-লতা-পাতা তকমাধারী খেলোয়াড়দের চেয়ে যেটা কোটিগুণ ভালো।

আতহার আলী খান, কমেন্ট্রিবক্স, ধারাভাষ্যকার, নিঃসঙ্গ শেরপা, বাংলাওয়াশ

ক্রিকেটার আতহারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে ১৯৯৭ সালেই। কখনও বিশ্বকাপ খেলা হয়নি তার, বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছে, তিনি তখন মাঠের ক্রিকেট থেকে সরে গিয়ে কমেন্ট্রিবক্সে জায়গা করে নিয়েছেন ক্রিকেট তো তার রক্তে মিশে ছিল, সেই ক্রিকেটের ডাক উপেক্ষা করে তিনি থাকেন কি করে! ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে আয়োজিত মিনি বিশ্বকাপেই কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে যোগ দিলেন কমেন্ট্রিবক্সে। এরপর থেকে বাংলাদেশের হয়ে খেলোয়াড়েরা ব্যাট-বল হাতে লড়াই করেন মাঠে, আর আতহার ওদের হয়ে লড়েন মাইক্রোফোন হাতে।

শুনতে যতোটা সহজ শোনায়, আসলে কাজটা সেরকম সহজ কিছু ছিল না। বাংলাদেশ তখন ক্রিকেটবিশ্বের তলানীর দল। বছরের পর বছর ধরে ম্যাচ জেতে না। কালেভদ্রে যাও দুয়েকটা জয় আসে, তারপর আবার বিশাল ব্যবধানে হার। পারফরম্যান্সে নেই কোন ধারাবাহিকতা, বড় দলগুলোর বিপক্ষে অবস্থা তথৈবচ। সেই সংকটময় মূহুর্তটায় আতহার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন কমেন্ট্রিবক্সে। কত কঠিন সময় পার করতে হয়েছে তাকে, সেসব তিনি ছাড়া আর কেউ হয়তো জানে না। বাজে ব্যাটিং-বোলিঙের জন্যে অন্যান্য ধারাভাষ্যকারেরা যখন ধুয়ে দিতেন বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের, তখন ঢাল-তলোয়ারবিহীন নিধিরাম সর্দারের মতো তাদের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে লড়ে যেতেন আতহার। বারবার তিনি আত্মবিশ্বাসী গলায় বলতেন, বাংলাদেশ একদিন ক্রিকেট মানচিত্রে মাথা তুলে দাঁড়াবেই, এই দলটা একটা সময়ে পরাশক্তি হবে।

২০০৩ সালে বাংলাদেশ গিয়েছিল পাকিস্তানে পূর্ণাঙ্গ সফরে। মুলতান টেস্টে অলক কাপালির ব্যাটে চুমু খেয়ে পেছনে যাওয়া বলটাকে মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়ে ক্যাচ বলে দাবী করেছিলেন উইকেটরক্ষক রশিদ লতিফ, আম্পায়ারও আউট দিয়েছিলেন। ধারাভাষ্যকক্ষে আতহার তখন চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, ‘দিস ইজ নট ফেয়ার, দিস ইজ চিটিং’ বলে। পাশ থেকে রমিজ রাজা আতহারকে বলেছিলেন, টিপিক্যাল বেঙ্গলি স্টাইল। আতহার জবাব দিয়েছিলেন, ‘অ্যান্ড লতিফ ডিড হোয়াট ইজ টিপিক্যাল পাকিস্তানী স্টাইল।’

আতহার আলী খান, কমেন্ট্রিবক্স, ধারাভাষ্যকার, নিঃসঙ্গ শেরপা, বাংলাওয়াশ

বাংলালিঙ্কের বিজ্ঞাপনের মতোই এখন দিন বদলে গেছে। বাংলাদেশ এখন প্রতিপক্ষকে বলেকয়ে হারায়, ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়াকে ডেকে এনে ধ্বসিয়ে দেয়, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডকে পেছনে ফেলে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে পৌঁছে যায়। কমেন্ট্রিবক্সে আতহার আলী খানকেও আগের মতো দুর্বিষহ পরিস্থিতে পড়তে হয় না, মাঠের ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সে এখন সেখানেও বাংলাদেশীদের সবাই সমীহ করে। এর পুরোটা কৃতিত্বই আতহার আলী খান ক্রিকেটারদের দেন, বলেন, তাদের অবদানেই এই সম্মানটুকু পাচ্ছেন তিনি। সঞ্জয় মাঞ্জারেকার তাকে ২০০৪ সালের পুরনো কাসুন্দি মনে করিয়ে দিলে তিনি সরাসরি বলে দেন, এটা ২০১৫ সাল, ২০০৪ নয়!

রুবেল হোসেন কাইল মিলসের স্ট্যাম্প উপড়ে ফেলে পাখির মতো ডানা মেলতে চান আকাশে, আবেগে রুদ্ধ হয়ে আসা গলায় আতহার আলী চিৎকার করতে থাকেন ‘বাংলাওয়াশ! বাংলাওয়াশ!’ বলে, তার হাত ধরে বাংলা অভিধানে জন্ম নেয় নতুন একটা শব্দ! বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে নকআউট পর্বে যাত্রা করে টাইগারেরা, আতহার আলী খান নিজেকে কমেন্ট্রিবক্সে বেঁধে রাখতে পারেন না, ব্যালকনিতে এসে বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে চিৎকার করে গলা ফাটান। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ‘ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরী’র কীর্তি শুনতে মাঝেমধ্যে বিরক্ত হয়ে উঠি, সেসব নিয়ে ফেসবুকে ট্রল হয়; আবার অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারানোর পর এই আতহারের কণ্ঠেই ‘বাংলাদেশ ক্রিয়েটস হিস্ট্রি’ শুনে আবেগে আপ্লুত হই। ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরীর কথামালা তো আতহারের বিশুদ্ধ আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ! এই মানুষটা পাগল, একটু না, অনেকখানি পাগল।

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে দেশে ফিরছে মাশরাফির দল, ষড়যন্ত্রতত্ত্বে তখন উত্তাল সারাদেশ। বিমানবন্দরে সাংবাদিক আর বোর্ড কর্তাদের ভীড়, এরমধ্যে বৃটিশদের মতো লম্বা আর দারুণ হ্যান্ডসাম একটা মানুষকে দেখা গেল ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনিও বাংলাদেশ দলকে শুভকামনা জানাতে এসেছেন, ধন্যবাদ দিতে এসেছেন। নকআউট পর্ব নিশ্চিত হবার পরেই আতহার ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘ফলাফল যাই হোক, তোমরা বিজয়ী। আমি লাল গোলাপ নিয়ে বিমানবন্দরে হাজির হবো।’ আতহার তার কথা রাখতে ভোলেননি। বিজয়ের দিনগুলোতে যেমন তিনি ফুল হাতে পাশে থাকেন, ঠিক তেমনই কষ্টের বিষণ্ণ বিকেলগুলোতেও তাকে দেখা যায় অদৃশ্য একটা ছাতা হাতে সমালোচনার বৃষ্টির ধারা থেকে আমাদের ক্রিকেটারদের রক্ষা করতে।

আতহার আলী খান, কমেন্ট্রিবক্স, ধারাভাষ্যকার, নিঃসঙ্গ শেরপা, বাংলাওয়াশ

আতহার জাতীয় দলের নির্বাচক ছিলেন, ম্যানেজারের দায়িত্বও পালন করেছেন একটা সময়ে। সাকিব-তামিম-মুশফিকেরা যখন জাতীয় দলে ঢুকছেন বা থিতু হচ্ছেন, তখন আতহারই ছিলেন ওদের অভিভাবক। অথচ এদের সবাইকেই আতহার আলী খান ‘আপনি’ করে সম্বোধন করেন। সাক্ষাৎকার বা লেখনীতেও কখনও ক্রিকেটারদের ব্যপারে ‘উনারা’, ‘উনি’ ছাড়া অন্য কোন সর্বনাম ব্যবহার করেছেন বলে দাবী করতে পারবে না কেউ, সেটা বিশ্বসেরা সাকিবের প্রসঙ্গেই হোক, কিংবা নতুন অতিথি মিরাজ-মোসাদ্দেকের ব্যপারেই হোক। ক্রিকেটারদের তিনি যথাযথ সম্মানটা করতে জানেন, যেটা বোধহয় বাংলাদেশের ৯৯ ভাগ মানুষই দিতে জানেন জানেন না।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে খারাপ দিন আসে, ভালো দিন আসে। আতহার আলী খান সাক্ষী থাকেন সবকিছুর। অর্জন বা ব্যর্থতা যাই হোক, মাইক্রোফোন হাতে তিনি চেষ্টা করেন ক্রিকেটারদের আগলে রাখতে। যৌক্তিক সমালোচনা জিনিসটা তিনি করতে জানেন, সেইসঙ্গে পারেন প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের প্রশংসা করতেও। এশিয়া কাপ বা ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট শিরোপার নিঃশ্বাস দূরত্ব থেকে ফেরার কষ্টটা ক্রিকেটারদের একলা নয়, আতহারও কষ্ট পান। একদিন নিশ্চয়ই এসব ব্যর্থতাকে মুছে দিয়ে বড় কিছু জিতবে বাংলাদেশ দল, এশিয়া কাপ জিতবে, বিশ্বকাপ জিতবে, দেশের বাইরে টেস্ট সিরিজ জিতবে বড় দলগুলোর বিপক্ষে। অনাগত সেইসব দিনেও কমেন্ট্রিবক্সে আতহার আলী খানকে চাই, তার ভরাট গলায় বিজয়ধ্বনি শুনতে চাই বারবার!

শুভ জন্মদিন আতহার আলী খান, কমেন্ট্রি বক্সে আমাদের নিঃসঙ্গ এক শেরাপার মতো যিনি লড়াই করে যান নিরন্তর!

তথ্যসূত্র কৃতজ্ঞতা- দেবব্রত মুখোপাধ্যায়।

Comments
Spread the love