খেলা ও ধুলা

যে কষ্ট এখনো বুক শেল হয়ে বিঁধে…

গ্লাভসের উল্টোপাশ দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। চোখের ওপর দিয়েও বুলিয়ে নিলেন বাম হাতের গ্লাভস। টেলিভিশনের সামনে আমরা তখন স্তব্ধ হয়ে বসে আছি, ভাবছি, এটা কি হলো! মিরপুরের হোম অফ ক্রিকেটে তখন হাজার বিশেক দর্শক, কেউ নির্বাক, কেউবা শোক চেপে রেখে বেরিয়ে যাচ্ছেন মাঠ ছেড়ে। আবেগের একটুকরো কালো মেঘ অনেকক্ষণ ধরেই ঝুলে ছিল শেরে বাংলার ঠিক ওপরে। মুশফিক মাঠে নামতেই বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়লো সেটা।

দু’দিন বাদে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শুরু। সিলেবাসের দন্ত্য-স টাও শেষ হয়নি তখনও। তাতে আমাদের থোড়াই কেয়ার! ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে আড্ডার আসর, পাকিস্তানের ইনিংস শেষে চাঁদা তুলে তড়িঘড়ি করে গ্রীল আর নান নিয়ে আসা হয়েছে। বাড়ি থেকে ফোন এসেছে, মোবাইলটা ফ্লাইট মুডে দেয়া। ২৩৭ রান করলেই বাংলাদেশ হয়ে যাবে এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন, অমন ম্যাচের আগে অতসব জিপিএ ফাইভের সমীকরণ নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আছে নাকি? গোল্লায় যাক পড়াশোনা, নাউ ইটস টাইম টু ক্রিকেট!

শেষ দুই বলে চার রানের সমীকরণ মিললো না। আইজাজ চীমার ইয়র্কার লেন্থের বলটা খেলতেই পারলেন না শাহাদাত হোসাইন। নন স্ট্রাইকিং এন্ড থেকে অসহায় চোখে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ তাকিয়ে দেখলেন, নায়ক হতে হতেও কিভাবে ট্র‍্যাজিক হিরো হয়ে যাচ্ছেন তিনি! ড্রেসিংরুমে তখন রাজ্যের নিস্তব্ধতা, সাকিব তাকিয়ে আছেন মাঠের দিকে, কিছু দেখছেন বলে মনে হচ্ছে না। সাজঘরের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন তামিম ইকবাল, উঠে দাঁড়ালেন সাকিবও, চোখেমুখে হতবিহ্বল একটা দৃষ্টি!

এশিয়া কাপ ফাইনাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, সাকিব আল হাসান,

‘মাহমুদউল্লাহ যতো নষ্টের গোড়া!’ কেউ একজন বলে ওঠে পাশ থেকে। ‘কি দরকার ছিল তিন রান নেয়ার? দুই রান নিলেই তো স্ট্রাইকে থাকে, একটা বাউন্ডারি মারলেই ম্যাচ পকেটে…’ আশপাশ থেকে জ্ঞাণীগুণী কমেন্ট ভেসে আসতে থাকে ধীরে ধীরে। নাজিমউদ্দিন কিংবা নাসিরের মুণ্ডুপাত করা হয়, মাহমুদউল্লাহ’র পিণ্ডি চটকানো হয় সেখানে। আমরা দুয়েকজন চুপচাপ বসে থাকি, কথা রোচে না আমাদের মুখে। দৃষ্টি কখন ঝাপসা হয়ে আসে, আমরা টের পাই না। সেই ঝাপসা দৃষ্টিতেই অদ্ভুত একটা দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে রই আমরা!

দুই পা ছড়িয়ে মাঠেই বসে পড়েছিলেন মুশফিক, শরীরটাকে দাঁড় করিয়ে রাখার শক্তি যেন নেই বাংলাদেশ অধিনায়কের। আনামুল হক বিজয়ের চোখে তখন বান ডেকেছে, মুশফিকের চোখেও জমেছে জল। কান্না ব্যাপারটা নাকি সংক্রামক, একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায়। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলে আসা নাসির তখন নখ কামড়াচ্ছেন আনমনে, দু’চোখে ভরসা হারানো দৃষ্টি। সাকিব এসে দাঁড়ান জটলার মাঝে, মুশফিককে হাত ধরে টেনে তোলেন তিনি। ভরসার একটা আশ্রয়স্থল পেয়ে মুশফিক যেন ভেঙে পড়লেন এবার, এতক্ষণ ধরে গলতে থাকা মেঘটা থেকে এবার ভারী বর্ষণ শুরু হলো, সেই বর্ষণে সিক্ত হলো মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়াম, সিক্ত হলো পুরো বাংলাদেশ!

এশিয়া কাপ ফাইনাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, সাকিব আল হাসান,

‘জীবনে কোনদিন যদি আর বাংলাদেশের খেলা দেখসি!’ একজন রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে দাঁত কিড়মিড় করে উচ্চারণ করলো লাইনটা। ডাহা মিথ্যে কথাটা শুনে এত কষ্টের মাঝেও হাসি পেলো কেন যেন! আমি জানি, এই ছেলে বাংলাদেশের পরের ম্যাচেই টিভির সামনে বসে থাকবে, নইলে মোবাইলে বারবার স্কোর চেক করবে। টিভির পর্দায় চোখ যায় আবার, গ্যালারির শোকস্তব্ধ দর্শকদের খুঁজে নেয় ক্যামেরার চোখ। কাদের কষ্টটা বেশি আসলে? ওদের, নাকি আমাদের?

গ্যালারীতে তখন পিনপতন নীরবতা, সাগরের ফেনীল ঢেউ আছড়ে পড়ছে সমর্থকদের চোখেমুখে। কাঁদছেন বিজয়, মুশফিক, নাসির। ড্রেসিং রুম থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন পঁচাত্তর নম্বর জার্সিধারী। মুশফিকের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাংলাদেশ অধিনায়কের চোখে তখন বান ডেকেছে, তাঁর আশ্রয় হলো সাকিবের বুকে। ষোলকোটি মানুষের বত্রিশ কোটি চোখ অবাক বিস্ময়ে দেখলো, আবেগহীন বলে সবাই যে ছেলেটাকে জানে, সেই সাকিব আল হাসানের চোখ চিকচিক করছে! অশ্রুজলে হারের ক্ষত ধুয়ে দেয়ার খানিকটা চেষ্টা হয়তো। সেই অশ্রুর বিন্দুগুলোর মূল্য জানে কেউ? কোটি টাকার হীরের বিনিময়েও তো পাওয়া যায় না মুক্তোর মুতো চিকচিক করা সেই চোখের জল!

এশিয়া কাপ ফাইনাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, সাকিব আল হাসান,

প্লেট আর চামচের টুংটাং শব্দ হয়, সেই মৃদু শব্দটাও যেন কানে জ্বালা ধরায়। গ্রীল ঠান্ডা হয়ে গেছে, নানরুটি শক্ত হয়ে আছে, দাঁত দিয়ে টেনে ছেঁড়া দায়। সরাসরি সম্প্রচার ততক্ষণে শেষ, টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমাদের মধ্যে সস নিয়ে কাড়াকাড়ি হয় না, মেয়োনেজের ভাগ নিয়ে ঝগড়া হয় না সেদিন। আনমনে রুটি চিবিয়ে খেতে খেয়ে ভাবি, সবটাই কি ভ্রম? এরকম কোন ফাইনাল।ম্যাচ আজ হয়নি, বাংলাদেশ দুই রানে হারেনি, আমাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়নি, হারের বেদনায় নীল হতে হয়নি আমাদের… গলা দিয়ে খাবার নামে না, একটা অব্যক্ত বেদনা যেন দম বন্ধ করে মেরে ফেলতে চায় আমাদের!

সেই ম্যাচটার পরে কতগুলো বছর পেরিয়ে গেল! আমাদের ক্রিকেট কত এগিয়ে গেছে এই ছয়টা বছরে, এরপরেও কত ক্লোজ ম্যাচ আমরা হেরেছি, কতশত ম্যাচ জিতেছি, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছি, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল খেললাম, ঘরে মাঠে পাকিস্তান-ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকাকে উড়িয়ে দিলাম, ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারালাম, আরও একবার এশিয়া কাপের ফাইনাল খেললাম… তবুও সেই ফাইনালটা ভুলতে পারিনি। যতোবার এশিয়া কাপ আসে, আমার শুধু শক্ত হয়ে যাওয়া গ্রীল আর নানরুটির কথা মনে পারে, সাকিবের বুকে মাথা রেখে মুশফিকের কান্নার ছবিটা চোখে ভাসে। কে জানে, সেই হারের কষ্টটা বোধহয় ভোলার মতোই নয়!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close