‘নারী, শিশু, কিশোর বালকের বিপরীতে অস্ত্র তাক করার মতো কাপুরুষ নই আমরা’

গতকাল ঢাকার আশকোনায় অসাধারণ দক্ষতার সাথে জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে কাউন্টার টেরোরিজম পুলিশ।   অভিযানের নানান দিক নিয়ে ফেসবুকে নিজের প্রোফাইলে স্ট্যাটাস দিয়েছেন ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম এন্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ইউনিটের এডিসি মোঃ ছানোয়ার হোসেন ( Sunny Sanwar ); এগিয়ে চলোর পাঠকদের জন্য তাঁর স্ট্যাটাসটি সরাসরি তুলে ধরা হলো- 

Ad

গতকাল ঢাকার আশকোনায় কাউন্টার টেরোরিজম পুলিশের জঙ্গি বিরোধী অভিযানটির বেশ কিছু বিশেষত্ব রয়েছে যা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।

এই ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ এবং কৌশলগত পদ্ধতিতে অভিযান পরিচালনা করে সাফল্য পাওয়ার ঘটনা বিশ্বে একেবারেই বিরল। বিশ্বের সব দেশেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে অস্ত্রগোলাবারুদ দিয়ে এইসব সমস্যার সমাধান করা হয়। কেননা, জঙ্গি দমনে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতেই সবাই অভিযান পরিচালনা করে থাকে। এক্ষেত্রে কো-লেটারাল ড্যামেজ ছাড়া কোন গত্যান্তর থাকে না।

প্যারিস, বোস্টন, গুলশান, কল্যাণপুর প্রভৃতি অভিযানে একই পদ্ধতি অবলম্ব করা হলেও গতকাল এই প্রচলিত পদ্ধতি অবলম্বন করা আমাদের কাছে মনোমত হয়নি। তিন(০৩) জন নারী, তিন(০৩) জন শিশু এবং এক(০১)জন কিশোর বালকের বিপরীতে বিশাল বাহিনী নিয়ে অস্ত্রশস্ত্র তাক করার মত অদক্ষ এবং কাপুরুষ আমরা নই। তাই মাঝরাতে আস্তানা ঘেরাও করার পরও দীর্ঘ সময় নিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় কিছু কৌশল প্রয়োগ করে এই অভিযানটি পরিচালনা করা হয়। নিশ্চিত মৃত্যুর আতংকে ভুগা জঙ্গিদের কাছাকাছি গিয়ে কথা বলার মত পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।

জঙ্গি বিরোধি অভিযান পরিচালনার নানা পদ্ধতির উপর আমাদের প্রশিক্ষণ থাকলেও সব থেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতেই আমরা গতকাল বেশি সফলতা পেয়েছি। সে দিক বিবেচনা করলে গতকালের অভিযানটি শুধু মাত্র বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, বিশ্বের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা।

গতকাল থেকে নানা দেশের অনেক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহনীর সদস্যরা বিভিন্নভাবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করছে গতকালের অভিযানে গৃহীত কৌশলগত ধাপগুলো জানার জন্য।

যে সকল কারণে এটি একটি বিশেষ অভিযান হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে:

১. দুই(০২)জন খুব গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গি সদস্যের স্ত্রী যারা জঙ্গি মতবাদের উপর সর্বোচ্চ বিশ্বাস তাদেরকে আত্মসমর্পণের জন্য সম্মত করানো।

২. সুইসাইডাল ভেস্ট (বোমা) পরিহিত নারী জঙ্গিদের সাথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে নিগোশিয়েশন চালিয়ে যাওয়া।

৩. ডায়ালগের ক্ষেত্রে জঙ্গিদের পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা নেয়া।

৫. কোন প্রকার গোলাগুলি ছাড়াই প্রায় ১৬ ঘন্টা ব্যাপী (২৩ ডিসেম্বর রাত ১১.৩০টা থেকে ২৪ ডিসেম্বের বিকেল ৩.৩০টা পর্যন্ত) একটানা ডায়ালগ চালিয়ে যাওয়া।

৬. সর্বশেষ নারী জঙ্গি সদস্য সবাইকে ধোকা দিয়ে গুটিকয়েক পুলিশ সদস্যকে সুইসাইডাল বোমায় হতাহত করার পরিকল্পনা করে। সে ০৭ বছরের একটি মেয়ে শিশুকে (অপর এক জঙ্গির মেয়েকে) হাত ধরে পুলিশের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আমরা শিশুটিকে একা এগিয়ে দিতে অনুরোধ করি এবং তাকে দু’হাত মাথার উপরে তুলে এগিয়ে আসার আহবান জানালে একসময় সে বোতাম টিপে সুইসাইডাল ভেস্টটি ব্লাষ্ট করে। কংক্রিট দেয়ালের আড়ালে অবস্থানরত আমরা প্রায় এক ডজন কাউন্টার টেরোরিজম পুলিশ (সোয়াটসহ) অল্পের জন্য বেঁচে যাই। অত:পর সোয়াট সদস্যরা মেঝেতে পরে থাকা মারাত্মকভাবে আহত মেয়েশিশুটিকে ট্যাকটিল্যাক ফার্স্টএইড দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়।

এই মেয়েটিকে সেই নারী জঙ্গি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

যা হোক, মোস্তাফিজ- সাকিবের উইকেট পেলে আর তামিম- কায়েসদের সেঞ্চুরি করলে যদি কোটি মানুষের হৃদয় কেড়ে নিতে পারে, তবে এই কাউন্টার টেরোরিজম পুলিশের ঝুঁকিপূর্ণ সাফল্যও কোটি কোটি মানুষের মন জয় করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। (যদি না কারও চোখের কোন রঙিলা চশমায় দেশের সবুজকে কালো মনে হয়)

দেশকে, দেশের মানুষকে ভালবেসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করা আমাদের এই কাজে শুধু দেশপ্রেম আর পেশাদারিত্ব ছাড়া কিছুই নেই।

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 2.00 out of 5)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

Ad