কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির আশফাকুস সামাদ আশফি, বড় ভাইকে তখন হাত পা নেড়ে নেড়ে তারাবো পর্যন্ত চলে আসা দুই ট্রাক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যের খবর দিচ্ছে ফতেহ। শান্ত শিষ্ট ভদ্র ছেলে একটা ছেলে আশফি, কিন্তু তখন সেই মুহূর্তে ফতেহ ওকে চিনতে পারে না। “পাঞ্জাবীগুলা এইভাবে মানুষ মারলো? বিনা কারনে,বিনা অপরাধে এতগুলা মানুষ এইভাবে মারা গেল? নো, আই কান্ট টেক ইট এনিমোর, লেট’স ফাইট ব্যাক”। যুদ্ধে যেতে উন্মুখ হয়ে আছে ফতেহও, কিন্তু কিভাবে কোথায় যাবে, পরিচিত কেউ যাচ্ছে কিনা, জিজ্ঞাসা করছিল সে। চিবিয়ে চিবিয়ে আশফি বললো, “বদি, বাদল, বকুল, বাচ্চু সবাই বের হয়ে যাইতেছে যুদ্ধে, আর তুই অখনো বইসা বইসা  *** ফালাইতাছস? আরে শালা, বাইর না হইলে ক্যামনে বুঝবি কই যাইতে হইব? আগে বাইর হ”। আশফির চোখ দিয়ে রীতিমত আগুন ঝরছে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর ঠিক এভাবেই বন্ধু, সহযোদ্ধা ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা ফতেহ আলী চৌধূরীকে ধাক্কা দিয়েছিলেন আশফাকুস সামাদ আশফি। আশফির কথাটায় বোধহয় বারুদ মেশানো ছিল, তাই কয়েকদিন পরেই ফতেহ, মায়া (মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, বীর বিক্রম), গাজি (গাজি গোলাম দস্তগীর বীর উত্তম), সিরাজ সহ ছয়-সাতজন গেরিলা রওনা দিয়েছিলেন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ট্রেনিং নেবার জন্য। ওদিকে ২৭ তারিখ সকালে ঢাকায় কারফিউ ওঠার পরেই বের হয়ে গিয়েছিল আশফাকুস সামাদ আশফি এবং বদিউল আলম, শহিদুল্লাহ খান বাদল, আর মাসুদ। ফোর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাম্পের খবর পেয়ে আগরতলা হয়ে চলে যায় মতিনগর। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ওয়ার কোর্সের যোগ দেওয়া আশফি ছিল প্রথম ট্রেইনড হওয়া ব্যাচের একজন মুক্তিযোদ্ধা! ট্রেনিং শেষ করার পর লেফট্যানেন্ট পদে প্রমোশন পায় আশফি, তাকে পাঠানো হয় সেক্টর ছয়ে সাব সেক্টর কমান্ডার হিসেবে! কে ছিলেন এই লেঃ আশফি?

শহীদ লেফট্যানেন্ট আবু মঈন মোহাম্মদ আশফাকুস সামাদ বীরউত্তম ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর ছয় এর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, আমাদের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তার ডাকনাম ছিল নিশরাত। বাসায় সবাই ডাকতো তানি নামে, কিন্তু কাছের বন্ধুদের কাছে সেই নিশরাতই পরিচিত ছিল আশফি নামে। তার জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার সতেরো দরিয়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম আ ম আজিমুস সামাদ এবং মায়ের নাম সাদেকা সামাদ। আবু মঈন আশফাকুস সামাদ ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে সম্মান শ্রেণীতে পড়তেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। প্রশিক্ষণ শেষে ৬ নম্বর সেক্টরের সাহেবগঞ্জ সাব সেক্টরে যুদ্ধ করেন। তিনি একটি কোম্পানির নেতৃত্বে ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্র আশফি ভারতের মুর্তিতে ট্রেনিং নিতে যাওয়ার পর তাকে সবাই সামাদ নামেই চেনে। সহযোদ্ধা খোন্দকার নূরন্নবীকে প্রায়ই হাসতে হাসতে বলতো আশফি, কবে যেন খরচা হয়ে যাই ভাই!

আরও পড়ুন- একজন কিশোরী মুক্তিযোদ্ধা কিংবা নাদের গুন্ডা’র মুক্তিযুদ্ধ! 

নুরুন্নবী অবাক হতেন। পাকিস্তানীদের প্রবল প্রচন্ড আক্রমণের মুখে দেশের ভেতর টিকতে পারছে না মুক্তিযোদ্ধারা, তাই দুই বছরের আর্মি ট্রেনিং নিতে হচ্ছে মাত্র ৩ মাসে। পরিশ্রমটা তিনগুনেরও বেশি। নুরুন্নবী ভাবেন এই প্রচন্ড কষ্টেই সম্ভবত আশফির এই মতিবিভ্রম!

কিন্তু আশফির সেই হাসতে হাসতে বলা কথাটা যে মোটেও মতিবিভ্রম ছিল না, সেটা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল ১৯৭১ সালের ২০শে অক্টোবর। প্রতিদিনই মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে একের পর এক অসমসাহসী অভিযান চালিয়ে যাওয়া লেফট্যানেন্ট আশফি এবং লেফট্যানেন্ট আব্দুল্লাহর দুটো দল রায়গঞ্জের দখল নিতে এগিয়ে যাচ্ছিল মধ্যরাতে। হঠাৎ করেই তারা পাকিস্তানীদের ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটি শক্তিশালী দলের মুখোমুখি হলো। 

আশফাকুস সামাদ আশফি, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ লেফট্যানেন্ট আবু মঈন মোহাম্মদ আশফাকুস সামাদ বীরউত্তম

রায়গঞ্জ কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার অন্তর্গত। উপজেলা সদর থেকে উত্তর দিকে। এই ঘটনার বিবরণ আছে সহযোদ্ধা মুসা সাদিকের লেখায়। তিনি লিখেছেন:

“লেঃ সামাদ আর লেঃ আবদুল্লাহ ২৫ মাইল রেঞ্জের ওয়্যারলেস হাতে দুই গ্রুপ কমান্ডো নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন পাকিস্তানিদের শক্ত ঘাঁটি দখলের জন্য। সবার হাতে একটা করে স্টেন আর কিছু গ্রেনেড। রায়গঞ্জে অবস্থিত ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টকে লক্ষ্য করে দুই গ্রুপ দুই দিক থেকে যাত্রা করে।

জাঙ্গল সু পায়ে, চাদর গায়ে জড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধারা রাত নয়টায় নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়েন। সোয়া ঘণ্টা যাত্রার পর রায়গঞ্জ ব্রিজের সন্নিকটে পৌঁছে লে. সামাদ সহসা দেখলেন তাঁর গ্রুপের সবাই ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ট্র্যাপে পড়ে গেছেন। তিনি বুঝলেন ভুল রেকি হয়েছে। রায়গঞ্জ ব্রিজের নিচে ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এলএমজি বাঙ্কার রয়েছে এ খবর তিনি পাননি। সংকেত দিয়ে তিনি সবাইকে শুয়ে পড়তে বললেন।

শুরু হয়ে গেল ক্রস ফায়ারিং। সেই সঙ্গে পাকিস্তানি সেনারা তাদের ওপর আর্টিলারি ও ৩ ইঞ্চি মর্টার চালাতে লাগল। বীর সামাদ বললেন, “কেউ এক ইঞ্চি পিছু হটবে না। মরলে সবাই মরবো। বাঁচলে একসঙ্গেই বাঁচব।” শুরু হয়ে গেল মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন-মৃত্যুর লড়াই। অনেক শক্তিশালী ও দক্ষ এবং অনেক ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ২৫ পাঞ্জাব বাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে বাংলার তরুণ বীরেরা ফুলের মতো ঝরে পড়তে লাগল। কিন্তু কেউ সামাদের আদেশ অমান্য করেনি।

নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে থেকে মুহুর্মুহু মর্টার শেল ও বুলেটের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা কেউ এতটুকু দমেনি। নিজের শেষ বুলেটটি শত্রুর প্রতি নিক্ষেপ করে নিজে শহীদ হয়েছেন। আমাদের ১৫-২০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা সেদিন ২৫ পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে যে অসম সাহস ও বীরত্ব নিয়ে লড়াই করেছে, পৃথিবীর যেকোনো বীরত্বব্যঞ্জক লড়াইয়ের সঙ্গে তার তুলনা হতে পারে।’’

হ্যাঁ, সিনেমার কল্পকাহিনীতে এমন দুঃসাহসী অভিয়ান হয়তো অনেকবারই দেখেছি আমরা, কিন্তু ২০শে অক্টোবর দিবাগত মধ্যরাতে আশফির নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা মৃত্যুমুখেও লড়ে গিয়েছিলেন অসামান্য দৃঢ়তায়! একটি মাইন বিষ্ফোরণের শব্দে পাকিস্তানীরা সজাগ হয়ে গিয়েছিল, শুরু হয়েছিল সামাদের দলের উপর তীব্র মেশিনগ্যান ফায়ার এবং গোলাবর্ষণ। কতটা অকুতোভয় দুঃসাহসী কমান্ডার হলে তখন কেউ বলতে পারে “কেউ এক ইঞ্চি পিছু হটবে না। মরলে সবাই মরব। বাঁচলে একসঙ্গেই বাঁচব।” আমরা কি এখন এই সময়ে বসে কল্পনাও করতে পারি সেই বীরত্বটুকু?

ওদিক্বে সময়ের সাথে বাড়তে থাকে পাকিস্তানীদের আক্রমনের তীব্রতা, সেই সাথে বাড়ে আহতদের পাল্লাও। সামাদ নির্দেশ দেন তার দলকে পিছু হঠবার। কিন্তু নিজে পড়ে রইলেন সামনে, একটি বাঁশ ঝাড়ের আড়ালে হালকা মেশিনগ্যান নিয়ে কাভারিং ফায়ারের লক্ষ্যে। একই সাথে তিনি ইতিমধ্যে ওয়ারল্যেসের মাধ্যমে আর্টিলারী সহযোগীতাও চান মিত্রবাহিনীর কাছ থেকে।

তার কাভারিং ফায়ারে তার দল নিরাপদে পিছিয়ে গেলেও, সামাদ পড়ে থাকেন পাকিস্তানীদের সম্মুখে। একের পর এক আক্রমণ আসতে থাকে তার দিকে। এভাবেই একা পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রবল বিক্রমে লড়ে গেলেন বিশ মিনিট। কিন্তু এক সময় একটি গোলা এসে আঘাত করলো আশফির মাথায়! মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরেও বেঁচে রইলেন আশফি। চিৎকার করতে থাকলেন পানি, পানি বলে।

আরও পড়ুন- যে মানুষটা হারিয়ে গিয়েছিলেন বিজয়ের মাত্র একদিন আগে! 

তার রানার মাহাবুব হোসেন অশ্রুসজল চোখে প্রিয় স্যারের দিকে পানির একটি পাত্র নিয়ে যেতে চাইলে গুলী লাগে তার পায়েও। মৃত্যুর পূর্বে এভাবেই পানি না পেয়ে স্বাধীনতার চেতনায় তৃষ্ণার্ত সামাদ তৃষ্ণা নিয়েই দেশের মাটিতে ঢলে পড়েন। বেঁচে যায় তার দল, কিন্তু ইতিহাস হন সামাদ। যত সহজে তিনি বলতেন ‘খরচ’ হয়ে যাবেন, ঠিক তত সহজেই দেশের জন্য খরচ হয়ে যান তিনি।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অবস্থান খুব কাছাকাছি থাকায় সেদিন তার মৃতদেহ উদ্ধার করা যায়নি।পরে দিনের বেলায় ২০শে নভেম্বর তার মৃতদেহ উদ্ধার করে ভূরুঙ্গামারীর জয়মনিরহাট মসজিদের সামনে যথাযোগ্য মর্যাদায় একই যুদ্ধে শহীদ সহযোদ্ধা সহোদর আলী হোসেন, আবুল হোসেন এবং আব্দুল আজিজকে সমাহিত করা হয়। পরবর্তীতে জয়মনির হাটের নাম রাখা হয় সামাদ নগর।

মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ সাহস ও বীরত্বের জন্য শহীদ আবু মঈন মোঃ আশফাকুস সামাদকে মরণোত্তর বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বসূচক নম্বর ২৮। গেজেটে তাঁর নাম আবু মঈন মোঃ সামাদ। তাঁর আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁর স্মরণে রংপুর সেনানিবাসে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে “বীর উত্তম শহীদ সামাদ উচ্চ বিদ্যালয়’’।স্রেফ এটুকুই! এরপর আর আজ ৪৭ বছরে তার নামে হয়নি কোন স্মৃতিস্তম্ভ, তাকে স্মরণ করবার এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মাতরে ছড়িয়ে দেবার জন্য নেওয়া হয়নি কোন উদ্যোগ!

যে দেশের স্বাধীনতা আনতে অতি সহজে খরচা হয়ে গিয়েছিলেন আশফির মত অমিতসাহসী যোদ্ধা, মরার আগে এক চুমুক পানিও জোটেনি তার কপালে,তৃষ্ণায় ধুঁকে ধুঁকে এই মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন আশফি, সে দেশে শহীদ লেঃ আশফির তাজা রক্তে সিক্ত এই জমিনে কিভাবে কিছু মানুষ পাকিস্তান সমর্থন করে? পাকিস্তানকে ভালোবাসে? খেলার সাথে রাজনীতি মেশাতে মানা করে? কিভাবে?

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-