খেলা ও ধুলা

অ্যাশেজ সিরিজ: ক্রিকেটযুদ্ধের সাতকাহন!

ক্রিকেট খেলাটার জন্ম হয়েছে ইংল্যান্ডে। আর সব ধরনের ক্রিকেট মিলিয়েই সর্বকালের সবচেয়ে সফলতম দলটার নাম অস্ট্রেলিয়া। ১৮৭৭ এই দুই দলই খেলেছিল ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচটা, ১৯৭১ সালে প্রথম স্বীকৃত ওয়ানডে ম্যাচও অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই দুই দলের মধ্যেই। ক্রিকেটীয় ঐতিহ্য কিংবা গৌরব মিশে থাকে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার লড়াইতে, এই দুই দল পরস্পরের মুখোমুখি হলেই বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। একটা ছাইভস্ম থেকে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, সেটাই বজায় আছে উত্তরসূরীদের মধ্যে, সেই যুদ্ধের নাম অ্যাশেজ। অ্যাশ বা ছাইয়ের সঙ্গে ক্রিকেটের সম্পর্কটা কি, কেনই বা এই দুই দলের লড়াই পরিচিতি পেয়েছে অ্যাশেজ নামে- সেটা জানেন না অনেকেই। দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটা অ্যাশেজ সিরিজ, এবার স্বাগতিক দেশ অস্ট্রেলিয়া, আর সফরকারী ইংল্যান্ড। আর তাই এগিয়ে চলোর পাঠকদের জন্যে অ্যাশেজের সাতকাহন নিয়ে এসেছি আমরা।

গল্পের শুরুটা আজ থেকে প্রায় ১৩৫ বছর আগের। ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচটা অনুষ্ঠিত হয়েছিল মেলবোর্নে, জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া। এরপর অস্ট্রেলিয়া দুইবার ইংল্যান্ড সফর করেছে, কিন্ত জিততে পারেনি। ইংল্যান্ডের দলটাও তখন দুর্ধর্ষ, ওদেরই মাঠে ওদেরকে হারানোটা তখব প্রায় অসম্ভব। সেই অসম্ভব ঘটনাটাই ঘটে গেল ১৮৮২ সালে। সেবছর আগস্টে ওভালে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া, চতুর্থ ইনিংসে অজিদের দেয়া ৮৫ রানের লক্ষ্যমাত্রা তাড়া করতে গিয়ে ফ্রেড স্পফোর্থের বোলিং তোপের সামনে নাকাল হলেন ইংরেজ ব্যাটসম্যানরা। ইংল্যান্ড অলআউট হয়ে গেল ৭৭ রানে, ম্যাচ শেষ হলো দুইদিনে। অথচ অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৩ রানে অলআউট করে দিয়ে ৩৮ রানের লিড নিয়েছিল ইংল্যান্ড। বলা হয়, ক্ষোভে, দুঃখে নাকি সেই ম্যাচের স্ট্যাম্পের বেল পুড়িয়ে দিয়েছিলেন এক নারী। সেখান থেকেই ‘অ্যাশ’ বা ছাইয়ের আবির্ভাব।

নিজেদের সামর্থ্য নিয়ে মারাত্মক গর্ব ছিল ইংলিশ মিডিয়ার, সেই অহমে ঘা লাগলো এই পরাজয়ে। ম্যাচের পরদিন স্পোর্টিং টাইমসের সাংবাদিক রেজিন্যাল্ড শার্লি ব্রুকসের একটা ব্যাঙ্গধর্মী লেখা প্রকাশিত হয়েছিল পত্রিকায়, ইংলিশ ক্রিকেটের অবিচুয়ারী(মৃত্যু সংবাদ) শিরোনামে। সেখানেই ব্রুকস লিখেছিলেন- ‘ভগ্ন হৃদয়ে জানানো যাচ্ছে, ১৮৮২ সালের ২৯ আগস্ট ওভালে ইংলিশ ক্রিকেটের মৃত্যু হয়েছে। গভীর দুঃখের সঙ্গে আমাদের বন্ধু এবং শুভাকাঙখীরা এই বাস্তবতা মেনে নিয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে শোকবার্তা জানাচ্ছি। ইংলিশ ক্রিকেটকে ভস্মীভূত করা হয়েছে এবং ছাইগুলো অস্ট্রেলিয়াকে প্রদান করেছে।’

মূলত, অস্ট্রেলিয়া তখনও স্বাধীন কোন রাষ্ট্র ছিল না, ইংল্যান্ডের অধীনে একটা উপনিবেশ ছিল, তাদের শাসন করতো ইংল্যান্ডই। একটা উপনিবেশের খেলোয়াড়েরা তাদেরই দেশে এসে তাদেরকে হারিয়ে যাবে, এভাবে নাস্তানাবুদ হওয়াটা মেনে নিতে পারেনি নাকউঁচু বৃটিশরা। কাজেই পরের বছর যখন ইংল্যান্ড আবার ফিরতি সফরে অস্ট্রেলিয়া গেল, চারপাশে ‘প্রতিশোধ! প্রতিশোধ!’ গুঞ্জনে তখন কান পাতা দায়! ইংলিশ অধিনায়ক ইভো ব্লাই’ও দেশ ছাড়ার আগে সবাইকে আশ্বাস দিয়ে গেলেন, অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েই ঘরে ফিরবেন তারা।

অ্যাশেজ সিরিজ, ক্রিকেটযুদ্ধ, ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট সিরিজ, শেন ওয়ার্ন, ইয়ান বোথাম, জিম লেকার, ডন ব্র‍্যাডম্যান

ইভো ব্লাই আর তার দল নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন। ১৮৮৪ সালে তিন ম্যাচের সিরিজে ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল ইংল্যান্ড। সিরিজ শেষ হবার পরে মেলবোর্নে এক পানশালায় উৎসব করছিল ইংল্যান্ড দল, সেখানে ব্লাইকে একটা ছাইভর্তি ভেলভেটের বাক্স উপহার দেন ফ্লোরেন্স মার্ফি নামের এক নারী আর তার কয়েকজন বান্ধবী। এখান থেকেই সূত্রপাত হয় অ্যাশেজের। যদিও উইজডেন ‘অ্যাশেজ সিরিজ’কে স্বীকৃতি দিয়েছে ১৯০৫ সালে। বলে রাখা ভালো, ফ্লোরেন্স মার্ফির সঙ্গে পরে ইভো ব্লাইয়ের বিয়েও হয়েছিল। ১৯২৭ সালে ইভো ব্লাই মারা যান, তবে মৃত্যুর আগে তিনি স্ত্রীকে বলে গিয়েছিলেন, তাকে উপহার দেয়া সেই ছাইয়ের বাক্সটা যেন এমসিসিকে দেয়া হয়। সেই মোতাবেক লর্ডসের এমসিসি মিউজিয়ামে সংরক্ষণ করা হয় সেই ছাইভর্তি বাক্স। অ্যাশেজজয়ী দলকে যে ট্রফিটা দেয়া হয় সেটা আসলে ছাইদানির মতো দেখতে একটা রেপ্লিকা।

অ্যাশেজ জন্ম দিয়েছে কত ধ্রুপদী লড়াইয়ের, কত রূপকথার, কত ক্রিকেটীয় উপাখ্যান আর রোমাঞ্চের! অ্যাশেজ দেখেছে ডন ব্র‍্যাডম্যানকে, অ্যাশেজের হাত ধরে ক্রিকেট পেয়েছে শেন ওয়ার্ন নামের এক ঘূর্ণী জাদুকরকে, অ্যাশেজ পার করেছে ‘বডিলাইন সিরিজ’ নামের ক্রিকেটীয় কলঙ্কের এক অধ্যায়কে, অ্যাশেজেই দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পরে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন ইয়ান বোথাম, অ্যাশেজ সাক্ষী হয়েছে জিম লেকারের এক ম্যাচে উনিশ উইকেট শিকারের এক অতিমানবীয় কীর্তির। অ্যাশেজ দেখেছে একচেটিয়া আধিপত্য, অ্যাশেজ সাক্ষী হয়েছে ফেবারিটকে হঠিয়ে আন্ডারডগদের জ্বলে ওঠার দুর্লভ আর দারুণ কিছু মূহুর্তের। অ্যাশেজ মানেই তো ক্রিকেটের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের আনাগোনা, অ্যাশেজ মানে সিংহের এলাকায় ক্যাঙারুর হানা!

অ্যাশেজ সিরিজ, ক্রিকেটযুদ্ধ, ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট সিরিজ, শেন ওয়ার্ন, ইয়ান বোথাম, জিম লেকার, ডন ব্র‍্যাডম্যান

আগামীকাল বাংলাদেশ সময় ভোরে ব্রীসবেনের গাব্বায় মুখোমুখি হবে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড। সাম্প্রতিক ফর্মের বিচারে অবশ্যই এগিয়ে থাকবে ইংরেজরা, তবে নিজেদের মাটিতে ছেড়ে কথা বলবে না অস্ট্রেলিয়াও। কিভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, সেটা অজিদের চেয়ে ভালো আর কে জানে! স্টিভেন স্মিথ আর জো রুট টস করতে নামবেন আগামীকাল, তবে তার আগে দারুণ একটা সমীকরণে দাঁড়িয়ে আছে দুই দলই। এখন পর্যন্ত হওয়া ৬৯টি সিরিজের মধ্যে সমান বত্রিশবার করে অ্যাশেজ ঘরে তুলেছে ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া। তবে ম্যাচের হিসেবে অনেকটাই এগিয়ে ডন ব্র‍্যাডম্যানের দেশ, তারা জিতেছে ১৩০ টি টেস্ট। ইংল্যান্ডের জয় ১০৬ ম্যাচে, বাকী ৮৯ টেস্ট কোন ফলাফলের মুখ দেখেনি। তবে গত একযুগে অ্যাশেজের পরিসংখ্যান অস্ট্রেলিয়ার জন্যে বেশ হতাশাজনক। এই সময়ে অনুষ্ঠিত সাতটা অ্যাশেজের পাঁচটাই গেছে ইংল্যান্ডে, যে দু’বার অস্ট্রেলিয়া জিতেছে, প্রতিবারই অবশ্য প্রতিপক্ষকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে ধবলধোলাই করেছে তারা। অ্যাশেজের ট্রফির মালিকানা এখন ইংল্যান্ডের হাতে, নিজেদের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ানরা সেটা পুনরুদ্ধার করতে চাইবে- এটাই স্বাভাবিক। ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানে অবশ্য অস্ট্রেলিয়ারই জয়জয়কার, এখানে সর্বোচ্চ রানের মালিক ডোনাল্ড ব্র‍্যাডম্যান, সবচেয়ে বেশী উইকেটশিকারীর নাম শেন ওয়ার্ন(১৯৫)।

অ্যাশেজে এখন শেন ওয়ার্ন বা জিম লেকারের ঘূর্ণি নেই, পন্টিঙের প্রতিরোধ নেই, নেই ফ্লিনটফের ব্যাট-বলের সব্যসাচী পারফরম্যান্স। কিন্ত তাতেও আবেদন কমে না এই ছোট্ট ছাইদানিটার, ক্রিকেটের অনেকটুকু রহস্য আর রোমাঞ্চকে বাক্সবন্দী করে অদ্ভুত এক মায়াজালে বেঁধে রাখে ক্রিকেটপ্রেমীদের। যুগে যুগে কিংবদন্তীরা এসেছেন, রেকর্ডবুক সমৃদ্ধ করেছেন, মাতিয়েছেন মাঠ, এরপরে একটা সময়ে বিদায়ও নিয়েছেন, তাদের জায়গা দখল করেছে অন্য কেউ। কিন্ত অ্যাশেজ তার উদ্ভিন্নযৌবনা রূপে বিদ্যমান আজও, যেমনটা ছিল শতবর্ষ আগে, কিংবা কয়েক বছর আগেও… অ্যাশেজ এক রূপকথার পাণ্ডুলিপির নাম, ক্রিকেটের অদ্ভুত উন্মাদনা জড়িয়ে থাকে যার পাতায় পাতায়!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close