আনতারা তন্বী

শিরোনাম দেখে ভাবছেন সুদূর ভবিষ্যতে ভীনগ্রহে মানুষ একদিন বসবাস করবে সেই কাল্পনিক গল্প শোনাতে বসেছি? মোটেই কিন্তু তা নয়! বরং সত্যি সত্যি ঘটতে যাওয়া বিশ্বের প্রথম মহাশূন্যের দেশ ‘আসগার্ডিয়া’র কথাই বলব আজকের এই লেখা। ধুলো-দূষণ আর স্বার্থপর পৃথিবীতে ভালো লাগছে না ? ভাবছেন কোথায় যাবেন? আসগার্ডিয়া আছে তো! পৃথিবী ফেলে সোজা চলে যান আসগার্ডিয়ায়। মহাশূন্যের প্রথম দেশে!

আসগার্ডিয়ার শুরুর দিকের গল্প:

রাশিয়ান বিজ্ঞানী ড. আইগোর আশুরবেইলি অক্টোবরে ২০১৬’র দিকে পৃথিবীর বাইরে প্রথম একটি স্বাধীন রাষ্ট্র (স্পেস নেশন) প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা দেন। ড.আইগোর আশুরবেইলি বলেন, একটি শান্তিপ্রিয় জাতি হবে স্পেস নেশন। তিনি আসগার্ডিয়া নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্মরণ করেন ২০১৩ সালে ঘটে যাওয়া রাশিয়ায় উল্কাপাতের দুর্ঘটনাটি। উল্কাপাতের ফলে প্রাণ হারায় বেশ কিছু সাধারণ মানুষ। তিনি মনে করেন পৃথিবীর কাছাকাছি বসবাসরত এরকম গ্রহাণু বা ছোট ছোট মহাকাশীয় বস্তুর সাথে যেকোন সময় সংঘর্ষ হতে পারে পৃথিবীর। তাতে অনিবার্যভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে পৃথিবী। তখন মানুষ যাবে কোথায়? কারণ পৃথিবী ছেড়ে মানুষের তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই!

আসলেও তাই। প্রায় বিশ হাজার মহাকাশ বর্জ্য পৃথিবীর কক্ষপথের খুব কাছাকাছি বিচরণ করছে। এগুলো যেকোন সময় আঘাত হানতে পারে পৃথিবীতে। এছাড়া আছে সূর্য ঝড়, অগ্নিতরঙ্গ, সূর্য বিকিরণ থেকে সৃষ্ট জলবায়ুর পরিবর্তন, সুপারনোভা এসব কিছুতেই পৃথিবীর ক্ষয়ক্ষতি মানবজাতির টিকে থাকার জন্য হুমকি ডেকে আনবে।

ডাঃ আইগোর হংকংয়ের সংবাদ সম্মেলনে বলেন তিনি সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন যে উন্নতির প্রয়োজনে এমন কিছু করতে হতে পারে।

কাজেই ডঃ আইগোর একটি শান্তিপূর্ণ মানবিক জাতি গঠনের উদ্দেশ্যেই তৈরি করার কথা ভেবেছেন এমন দেশ যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ বিবেচ্য হবে না বরং প্রতিভা ও মানবিকতার বিচারে হবে পরিচিয়।

আসগার্ডিয়ার ধারণা

আসগার্ডিয়া একটি Space Nation (মজাকাশের দেশ)। পৃথিবীর বাইরে মানবজাতির বসবাসের প্রথম উদ্যোগ। আসগার্ডিয়া একটি স্বাধীন সত্তা।অর্থাৎ এটি কোন স্পেস এজেন্সির অধিভুক্ত নয়। এই প্রকল্পটির ধারণার তিনটি অংশ রয়েছে – দার্শনিক, আইনী ও বৈজ্ঞানিক / প্রযুক্তিগত।

১। নামকরণে দর্শন

এই নতুন দেশটির নাম নির্বাচন করার ক্ষেত্রে একটি দর্শন রয়েছে- আসগার্ডিয়া। আসগার্ডিয়ার অর্থ আকাশের শহর। প্রাচীন নর্স পুরাণে আসগার্ড আকাশের একটি শহরের কথা ছিল, যেটি ইশ্বর শাসন করত অর্থাৎ ইশ্বরের দেশ। আসগার্ডিয়া হবে একটি পূর্ণাঙ্গ এবং স্বাধীন জাতি মজার ব্যাপার হচ্ছে ডঃ আইগোর ঘোষণা দিয়েছেন আসগার্ডিয়া হবে জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ সদস্য। এই সব বৈশিষ্ট্যগুলির সাথে সাথে একটি সরকার এবং দূতাবাস, একটি পতাকা, একটি জাতীয় সংগীত এবং প্রতীক ইত্যাদি রাষ্ট্রীয় ব্যাপারগুলোও চলে আসে। পৃথিবী থেকেই সর্বস্তরের মানুষের নির্বাচনের ভিত্তিতে ঠিক করা হবে পতাকা-প্রতীক-সঙ্গীত। এই লক্ষ্যে ১৮জুন ২০১৭ কে ইউনিফাইড ভোটিং ডে নির্ধারণ করা হয়েছিল। সকল দেশের মানুষ সেখানে অংশ নিয়েছিল।

আসগার্ডিয়া সারা বিশ্বে শান্তি বজায় রাখবে এবং পৃথিবীর সাথেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখবে। আসগার্ডিয়া মহাকাশে মানবতার আয়না তৈরি করবে, কিন্তু পৃথিবীর কোনও রাজ্য, ধর্ম ও জাতির মধ্যে বিভেদ না করে। এমনকি আসগার্ডিয়াতে আমরা সবই পৃথিবী!

২। আসগার্ডিয়ারের আইনী দিক

আসগার্ডিয়ায় প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সমান আইন থাকবে। নতুন স্পেস আইন পৃথিবীর প্রতি মানুষের স্বার্থকে সমানভাবে সুরক্ষিত রাখবে। নাগরিকত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই, প্রথমে উপগ্রহ প্রবর্তনের পূর্বে প্রয়োগ করা হাজার হাজার লোককে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করা হবে – এবং পৃথিবীতে ব্যবহৃত সকল সাধারণ নাগরিকত্ব পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। এর মানে এই নয় যে আসগার্ডিয়ান নাগরিকত্ব পৃথিবীর সমস্ত মানুষদের কাছে উপলব্ধ হবে না, তাদের পার্থিব আধিকার প্রযোজ্য হবে না। একটি মূল আইনি নীতি হল যে আসগার্ডিয়া পৃথিবীর রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে হস্তক্ষেপ করবে না।

৩। প্রকল্পের বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত উপাদান মাত্র তিনটি শব্দে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে- শান্তি, অ্যাক্সেস এবং সুরক্ষা

প্রথমত, স্পেস শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের নিশ্চিত করা। দ্বিতীয় স্পেস হুমকি থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করা। তৃতীয় লক্ষ্য, স্পেস একটি জ্ঞানহীন এবং বিনামূল্যে বৈজ্ঞানিক বেসিক বেস জ্ঞান তৈরি করা।  এটি সকলকে বিনামূল্যে অ্যাক্সেস প্রদান করবে, বিশেষত যেসব উন্নয়নশীল দেশগুলির কাছে এখনো অ্যাক্সেসের স্থান নেই এবং এই ধরনের অ্যাক্সেস বিনামূল্যে এবং সরাসরিই হবে। আসগার্ডিয়ার প্রযুক্তিগত কাঠামো আবার তিনটি অংশে গঠিত।

আসগার্ডিয়ায় কাজ করছেন যারা:

আসগার্ডিয়ার নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে জানা যায় প্রকল্পটি এখনো ব্যক্তিগত তহবিল থেকেই অর্থায়ন করা হচ্ছে। কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে একটি পয়সা (সেন্ট!) ও নেয়া হয়নি এই প্রকল্পটির জন্য। সম্পূর্নটাই ডঃ আইগোর এর সম্পদ থেকে অর্থায়ন করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিশেষজ্ঞদের একত্র করে তৈরি হয়েছে প্রোটোটাইপ স্যাটেলাইট।

মহাকাশের উদ্দেশ্যে আসগার্ডিয়ার যাত্রা:

বিশ্বের প্রথম স্পেস নেশনের মহাকাশে যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ গতবছর নভেম্বরে সফলভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। মহাকাশ স্টেশনটি তার গোড়া পত্তন করেছে আসগার্ডিয়া -১ স্যাটেলাইট উড্ডয়নের মাধ্যমে। খুবই ছোট একটি স্যাটেলাইট এটি।জেনে অবাক লাগবে যে আকারে প্রায় ছোট এক টুকরো রুটি যেমন হয় ঠিক তেমন এটি। এই ছোট দিয়েই যাত্রা শুরু হলো প্রথম মহাকাশ স্টেশনের। এই ন্যানোস্যাটটি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় অবস্থিত নাসার ওয়ালপস ফ্লাইট ফ্যাসিলিটি থেকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (আইএসএস) দিকে ছুটে গেছে। heavens-above.com/ এ গিয়ে দেখে নিতে পারেন স্যাটেলাইটটির বর্তমান অবস্থান।

আসগার্ডিয়ার নাগরিক হতে পারেন আপনিও

২০১৬ সালে আসগার্ডিয়ার প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষনা দেয়ার  মাত্র চল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে আসগার্ডিয়ার ওয়েবসাইটে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন জমা পড়ে ১ লাখেরও বেশি আগ্রহী মানুষদের। অল্প কদিনে তা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ লাখে ! বয়স ১৮ হলেই জাতি, ধর্ম, বর্ণ , অর্থনৈতিক ও লিঙ্গ বৈষম্যের ঊর্ধ্বে  গিয়ে যে কেউ আবেদন করতে পারবেন আসগার্ডিয়ার নাগরিকত্বের জন্য। ২০৪ টি দেশের ১ লক্ষ ১৪ হাজার লোক আছেন এখন আসগার্ডিয়ানে! সুত্রঃ সিএনএন।

নতুন আন্তর্জাতিক এই দেশের নাগরিকরা ধর্ম, বর্ণ কিংবা ভাষা দিয়ে পরিচিতি পাবে না।  পৃথিবীর যাবতীয় সামাজিক নিয়মকে উপেক্ষা করে প্রতিভা ও মানবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন এআইআরসি। তবে আসগার্ডিয়ায় থাকতে চাইলে স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে ওখানকার অর্থাৎ পৃথিবীতে ফেরার রাস্তা বন্ধ চিরতরে! তো স্পেস নেশন আসগার্ডিয়ার নাগরিক হতে চান?এখনি চলে যান ওদের নিজস্ব ওয়েবসাইট asgardia.space এ।এই ওয়েবসাইটে ফর্ম পূরণ করতে পারেন আপনিও!

বর্তমানে বিশ্বের ২০৪ টি দেশের মোট ১৮০০০০ মানুষ ‘সার্টিফিকেট অভ আসগার্ডিয়া লাভ করেছেন’।

আসগার্ডিয়ায়র পর্যটক হতে চান?

যদি কোন ব্যক্তি নিবন্ধিত হওয়ার পরও আসগার্ডিয়ান এর সংবিধান মেনে না নেন, তবু সে নিবন্ধিত অ্যাসগ্রার্ডিয়ান থাকবেন এবং ফোরাম আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন, উদাহরণস্বরূপ। সংবিধান মেনে নেয়া রেজিস্টার্ড ব্যক্তি ও সংবিধান না মানা রেজিস্টার্ড ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্যটি হচ্ছে  ‘আমি একজন নাগরিক হব’ ও ‘আমি একজন পর্যটক হিসাবে আপনার আসগার্ডিয়ান জাতির পরিদর্শন করব’! বোঝাই যাচ্ছে আসগার্ডিয়া রাষ্ট্র হিসেবে অতি মহান! যদিও পর্যটন নিয়ে এখনো সুস্পষ্ট স্বিদ্ধান্ত হয়নি তবে ডঃ আইগোর জানিয়েছেন এ নিয়ে তিনি কাজ করবেন।

আসগার্ডিয়া-১ স্যাটেলাইটটির ছবি তুলে আলোড়ন তোলা এক মার্কিন কিশোর

এতো বড় একটা বিল্পব ঘটতে যাচ্ছে আর তাকে কেন্দ্র করে হৈ চৈ পড়বে না, পিকিউলিয়ার সব কান্ড ঘটবে না তাই কি হয়? তেমন ই আশ্চর্য কান্ড করে বসেছে এক মার্কিন কিশোর। নাম তার জন কারুস। তো কি করল সেই জন কারুস যার বয়স মাত্র ১৭ বছর!

চাঁদ আর পৃথিবীর মাঝখান দিয়ে চোখের নিমেষে ছুটে যাচ্ছিল আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন।  গতি ঘণ্টায় ২৮,২০০ কিলোমিটার। সেই মুহূ্র্তকেই ক্যামেরায় বন্দি করলেন মার্কিন ফটোগ্রাফার জন কারুস। মাত্র ১৭ বছর বয়সীর এই কীর্তিতে অবাক হয়ে গিয়েছেন বিশ্বের বাঘা বাঘা মহাকাশ ফটোগ্রাফারও।

গত ৪ নভেম্বর,শনিবার দিনটিতে ছিল ঝকঝকে পূর্ণিমা। সেদিনই নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে যান জন। ইন্টারনেটে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনের কক্ষপথের আগাম তথ্য থাকে। সেই সঙ্গে চন্দ্র সূর্যের অবস্থার তুলনা করে ঠিক কোথা থেকে এবং কখন এই দৃশ্য দেখা যাবে তা বলে দেয় একটি ওয়েবসাইট। এই ওয়েবসাইটেই বেশ কয়েকসপ্তাহ ধরে নিয়মিত নজর রেখেছিলেন জন। শনিবার ভোরে পৌঁছে যান ফ্লোরিডার টিটুসভিলেতে। ছবিটি তোলার জন্য Nikon D500 ক্যামেরা ব্যবহার করেছেন জন। ফটোগ্রাফি ম্যাগাজিন পেটাপিক্সেলে জন লিখেছেন, “এমনকি এক সেকেন্ডও সুযোগ ছিল না আমার সামনে। তাই ইকুয়েটরিয়াল মাউন্টে ক্যামেরা বসিয়ে ঘড়ির সময় মিলিয়ে বসে ছিলাম।” সত্যিই সঠিক হিসেবে দেখা গেছে ন্যানোস্যাটটি চন্দ্রকে অতিক্রম করেছে মাত্র ০.৯ সেকেন্ডে। অর্থাৎ এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে।

অবশেষে ঘুচে যাচ্ছে মানুষের সাথে মহাকাশের দুরত্ব। সেই যে সায়েন্স ফিকশন বইতে রোমাঞ্চকর মহাশূন্যে ভেসে বেড়াবার গল্প পড়তাম তা বুঝি আমাদের একবিংশ শতাব্দীতে এসে সত্যিই হয়ে গেলো! পৃথিবী ছাড়িয়ে মানুষ বসতি গড়ে তুলছে মহাশূন্যে। এই ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে মানবজনম সার্থক হল আমাদের, তাই নয় কি?

তথ্যসূত্রঃ

  1. space
  2. com
  3. com
  4. co.uk
  5. com

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-