অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছ

ট্রেনের নীচে পা হারিয়েও এভারেস্ট জয় করেছিলেন যে নারী!

আমরা অনেকেই জীবনের যেকোন ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে পড়ি। প্রবল বিষণ্ণতা আমাদের ঘিরে ধরে, জীবনের প্রতি সব আশা-আকাংখা হারিয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে অনেকেই আত্মহত্যা করতে সব হিসেব চুকিয়ে দিতে চান। অথচ যখন আমরা নিজেদের জীবন শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবছি, তখন আমাদের আশেপাশেই ভেঙ্গেচুরে গুঁড়িয়ে গিয়েও অনেকেই নতুন করে উঠে দাঁড়াচ্ছেন স্রেফ প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছায়, শক্ত করে হাল ধরে গড়ে চলেছেন ইতিহাস। অরুনিমা সিনহা এমনই একজন!


উত্তর প্রদেশের আম্বেদকার নগরের বাসিন্দা অরুনিমা সিনহা ছিলেন ভারতের জাতীয় নারী ভলিবল দলের সদস্য। ফুটবলও খেলতেন তিনি। আর দশজন মানুষের মতই তার স্বাভাবিক জীবনটা পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে যায় ২০১১ সালের ১২ এপ্রিল। পদ্মাবতী এক্সপ্রেস ট্রেনে করে লক্ষৌ থেকে দিল্লিতে যাচ্ছিলেন অরুণিমা, উদ্দেশ্য সিআইএসএফ-এর পরীক্ষা।ভাবতেও পারেননি কি অপেক্ষা করছে তার জন্য। পথিমধ্যে ট্রেনে হামলা করে ছিনতাইকারীরা। লুটপাট চালায় তারা, যখন অরুণিমার গলার সোনার হার ছিনতাই করতে আসে তখন সাহসী অরুণিমা প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন, ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে পেরে উঠলেন না আর, তুলে ট্রেনের বাইরে রেল ট্র্যাকের উপর ছুঁড়ে ফেলে ছিনতাইকারীরা। রেললাইনে পড়ার পরেই উল্টোদিক থেকে ঠিক সে মুহুর্তে ছুটে আসা আরেকটি ট্রেনের সাথে ধাক্কা খেয়ে গুরুতর আহত হন অরুণিমা। বাম পা চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যায় তার। প্রায় ৭ ঘন্টা অচেতন অবস্থায় পড়েছিলেন রেললাইনের উপর। বাঁচার আশা ছিল না একেবারেই। জীবন বাঁচাতে ডাক্তারেরা হাঁটুর নিচের অংশ কেটে ফেলে দেন অরুনিমার।

প্রিয় পাঠক, একবার নিজেকে কল্পনা করুন তো অরুণিমার জায়গায়, কি করতেন আপনি তখন? যদিও ‘মিনিস্ট্রি অব স্টেট ফর ইয়ুথ অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড স্পোর্টস’ অরুণিমাকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল, একটা চাকরীর ব্যবস্থাও করে দিয়েছিল, কিন্তু পা হারিয়ে ভলিবল কিংবা ফুটবল খেলার সুযোগ চিরতরে হারিয়ে মানুষজনের টিটকারী আর করুণা সহ্য করে বেঁচে থাকাটা অরুণিমার জন্য খুবই কঠিন হবার কথা ছিল। এমন অবস্থায় অনেকেই হয়তো আর কখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারতেন না। কিন্তু অরুণিমা এক মুহুর্তের জন্যও হাল ছাড়েননি। শুরু হয় অরুণিমার জীবনযুদ্ধ!

২০১১ সালে অরুনিমার চিকিৎসা শুরু হয় অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সে। টানা চার মাস চিকিৎসার পর একটি বেসরকারি সংস্থার সাহায্যে প্রস্থেটিক পা বা কৃত্রিম পা সংযোজন করা হয়। অরুণিমা আবার উঠে দাঁড়ান।

পরে টিভি চ্যানেলে দেয়া সাক্ষাৎকারে অরুনিমা বলেছিলেন,

জীবনের এমন কঠিন অবস্থায় চারপাশের মানুষ আমাকে নিয়ে যখন চিন্তিত, তখন বুঝতে পারলাম কিছু একটা করতে হবে যেন লোকেরা আমার দিকে করুণার দৃষ্টিতে না তাকায়। মাউন্ট এভারেস্টে মানুষ হরদম উঠছে, তা খবরের কাগজে পড়েছিলাম। এটা ভেবেই আমার বড় ভাই ও কোচের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলি। কোচ আমাকে সব সময় উৎসাহ দিয়েছেন। এবারও তার কাছ থেকেই এভারেস্ট জয়ের সাহস অর্জন করলাম।

Indian mountaineer Arunima Sinha, the first female amputee to summit Mount Everest, demonstrates removing her prosthetic leg near an indoor climbing wall after a press conference in Kathmandu on May 28, 2013. Twenty-six year old Sinha from the northern state of Uttar Pradesh, who lost her leg after she was thrown from a moving train two years ago, became the first female amputee to climb Everest on May 21. AFP PHOTO/ Prakash MATHEMA (Photo credit should read PRAKASH MATHEMA/AFP/Getty Images)

কি, অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে না? হ্যাঁ, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, শারীরিক অক্ষমতা আর মানুষের করুণার দৃষ্টির বিরুদ্ধে যেন যুদ্ধই ঘোষণা করলেন অরুণিমা। সমাজ আর জীবন তাকে পায়ের তলে দাবিয়ে রাখতে চেয়েছিল, অরুণিমা সিদ্ধান্ত নিলেন মাউন্ট এভারেস্টের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠেই তার দাঁতভাঙ্গা জবাব দেবেন।

জীবনযুদ্ধের এই সংকটাপন্ন সময়ে তিনি পাশে পান ক্যান্সারজয়ী ভারতীয় অলরাউন্ডার যুবরাজ সিং-কে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন,

ভারতীয় ক্রিকেটার যুবরাজ সিং আমার অনুপ্রেরণার অন্যতম একজন মানুষ। তিনি আমাকে এক লাখ রুপির একটি চেক পাঠান এবং আমার সঙ্গে কথা বলেন। আমি তখন জানতে পারি, তিনি ক্যান্সার থেকে সেরে উঠে ভারতীয় দলে আবার খেলছেন। তখন আমি নিজেকে বললাম, যদি তিনি পারেন তাহলে আমি কেন পারব না?”

এদিকে আত্মবিশ্বাসী অরুনিমার দেখা হয় ভারতের প্রথম এভারেস্ট জয়ী নারী বাচেনদ্রি পালের সঙ্গে। বাচেনদ্রি টাটা স্টিল অ্যাডভেঞ্জার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। এরপর অরুনিমা উত্তর কাশীর ‘টাটা স্টিল অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশনের’ ক্যাম্পে নাম লেখান। এখানে অরুনিমা বাচেন্দ্রি পালের কাছে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। শুরু হয় সব প্রতিকূলতা, করুণার দৃষ্টি আর বাঁধাকে পায়ে দলে এক অনবদ্য যাত্রা।

২০১২ সালে অরুনিমা জয় করেন আইল্যান্ড পিক (৬১৫০ মিটার)। এরপর শুরু হয় এভারেস্টে ওঠার প্রস্তুতি। ২০১৩ অরুনিমা চামসের কাংরি (৬৬২২ মিটার) উত্তরণ করেন। এরপরেই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ২০১৩ সালের ২১ মে সকালে দীর্ঘ ৫২ দিনের বিশাল সঙ্কটাপন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পথ অতিক্রম করে এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখেন অরুনিমা। আরেকবার এভারেস্ট চুড়ায় অঙ্কিত হয় হার না মানা অদম্য মানবসন্তানের বিজয়চিহ্ন।

শুধু যে পা হারানো শারীরিক প্রতিবন্ধী এক নারীই ছিলেন অরুণিমা, তাইই নয়, ছিলেন সমাজের পশ্চাৎপদ অংশের প্রতিনিধি। যে ভারতে কিংবা উপমহাদেশের সমাজব্যবস্থা আজো নারীরা প্রাপ্য সম্মান আর মর্যাদা পান না, সেখানে এতো ভয়াবহ অবস্থার ভেতরে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাওয়ার পরেও প্রবল বিক্রমে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন অরুণিমা, সৃষ্টি করেছেন ইতিহাস, প্রথম অন্ধ হারানো নারী হিসেবে এবং ভারতীয় নারী হিসেবে দেশকে এনে দিয়েছেন এভারেস্ট জয়ের সম্মাননা, তৈরি করেছেন নারী সমাজ এবং সবার জন্যই অনন্য এক উদাহরণ। অরুণিমার এই অর্জন অনুপ্রেরণায় আন্দোলিত করুক সবাইকে, এটাই কামনা!

তথ্য কৃতজ্ঞতাঃ Overcoming the past and how! Meet Arunima Sinha, the first woman amputee to conquer Mount Everest

Comments

Tags

Related Articles