বলুন তো মানুষের হৃদপিন্ড কোথায় থাকে? প্রশ্নটি দেখেই হয়ত অনেকে মুখ বাঁকাচ্ছেন। মনে মনে বলছেন, কি সব বোকা বোকা প্রশ্ন! হৃদপিন্ড তো বুকের বাঁ পাশে থাকে। আর কোথায় থাকবে! কিন্তু এখন যদি আপনাদেরকে বলি, হৃদপিন্ড থাকতে পারে মানুষের পিঠের ব্যাগেও? অনেকেই হয়ত এমন দাবি হেসেই উড়িয়ে দেবেন। ভাববেন অবিশ্বাস্য, আজগুবি কথা বলছি। কিন্তু বাস্তবেও এমনই একটি দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেটির কথা জানার পর আপনাদের ধারণা বদলে যেতে বাধ্য।

আর যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে সম্ভব হয়েছে এমন অবিশ্বাস্য একটি ঘটনা, তার নাম সেলওয়া হুসাইন। যুক্তরাজ্যের অধিবাসী ৩৯ বছর বয়সী এই ভদ্রমহিলা দুই সন্তানের জননী। এবং একই সাথে তিনি সম্ভবত এই পৃথিবী নামক গ্রহের সবচেয়ে আলাদা আর ভাগ্যবান মানুষও বটে। কারণ হৃদপিন্ডের যে অসুখে অধিকাংশ মানুষেরই নিয়তি হয় মৃত্যু, সেখানে এই ভদ্রমহিলা শুধু বেঁচেবর্তেই নেই, দিব্যি নিজের হৃদপিন্ডটাকে কাঁধে ঝোলানো রুকস্যাকে করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন!

সম্প্রতি সেলওয়ার হৃদপিন্ডের একটি অস্ত্রোপচার হয়। এবং তারপর থেকেই বুকের বাঁ পাশে নয়, তার হৃদপিন্ডের ঠাঁই হয়েছে ১৫ পাউন্ড ওজনের একটি ব্যাকপ্যাকে, যেখানে আরও রয়েছে কয়েকটি ব্যাটারি, একটি ইলেকট্রিক মটর, আর একটি পাম্প – যেটির সাহায্যে বাতাস পুশ করে পাঠিয়ে দেয়া হয় তার বুকে স্থাপিত পাওয়ার প্লাস্টিক চেম্বারে। তারপর এই চেম্বারটি রক্ত সঞ্চালিত করে তার পুরো শরীরে। আর এর মাধ্যমে তিনি পরিণত হয়েছেন কৃত্রিম হৃদপিন্ডের সাহায্যে বেঁচে থাকা ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয়, আর ব্রিটেনের একমাত্র ব্যক্তিতে।

সবমিলিয়ে অবিশ্বাস্য এই মেডিকেল কেস স্টাডির সূত্রপাত হয় আজ থেকে মাস ছয়েক আগে। হঠাৎ একদিন প্রচন্ড অসুস্থ অনুভব করতে থাকেন এসেক্সের ক্লেহলে বসবাসকারী সেলওয়া। শ্বাস নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল তার। পারছিলেনই না বলতে গেলে। কিন্তু সেই অবস্থাতেও নিজেই গাড়ি চালিয়ে তিনি পৌঁছে যান তাদের পারিবারিক চিকিৎসকের চেম্বারে। সেখান থেকে তাকে অতিসত্ত্বর পাঠিয়ে দেয়া হয় স্থানীয় একটি হাসপাতালে, কেননা চিকিৎসক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তার হার্ট ফেইলিয়র সনাক্ত করেন।

চারদিনের মাথায় সেলওয়া মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হন। কার্ডিওলজিস্টরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তাকে বাঁচিয়ে রাখার। এবং ওই অবস্থায়ই তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয় বিশ্ববিখ্যাত হেয়ারফিল্ড হসপিটালে। তার অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে সাপোর্ট পাম্পের সাহায্যে তার হৃদপিন্ডের কার্যক্রম সচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। এবং অমন রোগা শরীরে হৃদপিন্ড প্রতিস্থাপন করাও সম্ভব ছিল না। সেই মুহূর্তে চিকিৎসকদের সামনে একটিই রাস্তা খোলা ছিল, তা হলো তাকে একটি কৃত্রিম হৃদপিন্ড প্রদান। অন্য কোন উপায় না দেখে তার স্বামীও এতেই রাজি হয়ে যান।

সেলওয়া হুসাইন, কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড, ব্যাগের ভেতর হৃৎপিণ্ড

সার্জনরা প্রথমেই সেলওয়ার অচল প্রাকৃতিক হৃদপিন্ডটি খুলে ফেলেন, এবং সেটিকে প্রতিস্থাপিত করেন একটি কৃত্রিম হৃদপিন্ডের মাধ্যমে। সেই সাথে একটি স্পেশালিস্ট ইউনিট লাগিয়ে দেন তার পিঠে। সেলওয়ার ব্যাকপ্যাকে রয়েছে সেই স্পেশাল ইউনিটটি, যেটির মটর চালিত হয় দুই সেট ব্যাটারির সাহায্যে। পাশাপাশি তার ব্যাকপ্যাকে একটি বাড়তি ইউনিটও রেখে দেয়া হয়েছে, যদি প্রথমটি কোন কারণে কাজ করা বন্ধ করে দেয় কেবলমাত্র তবেই সচল হবে দ্বিতীয়টি।

কোন কারণে যদি দুইটি ইউনিটই একইসাথে কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তবে সেলওয়ার দেহে প্রাণ থাকবে বড়জোর ৯০ সেকেন্ড। তাই চিকিৎসকরা বলে দিয়েছেন, তার স্বামী বা অন্য কেউ যেন সবসময় তার সাথে সাথে থাকে, এবং যেকোন এমার্জেন্সি পরিস্থিতিতেই যেন তারা ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে যেকোন একটি স্পেশাল ইউনিটকে সচল করে দেয়। এর অন্যথা হলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে সেলওয়াকে।

বিশেষজ্ঞরা, যারা সেলওয়ার হৃদপিন্ড নিয়ে গবেষণা চালিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে তিনি এমন একটি মেডিকেল কন্ডিশনের শিকার, যাকে বলা হয়ে থাকে কার্ডিওমায়োপ্যাথি। এটি খুবই বিরল একটি অবস্থা, যা সাধারণত নারীদের গর্ভধারণের সময় দেখা দিতে পারে। অথচ বছরের শুরুতে যখন সেলওয়া বুকের ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হয়েছিলেন, তারা এটিকে চিহ্নিত করেছিলেন নিছকই হজমের সমস্যা হিসেবে।

সেলওয়া নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে করতে পারেন যে একদম শেষ মুহূর্তে হলেও তার আসল সমস্যাটি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। অবশ্য ভাগ্য শুধু এই একভাবেই তার সহায় হয়নি। তিনি যদি ব্রিটেনের মত আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পন্ন একটি দেশের অধিবাসী না হতেন, এবং তাকে হেয়ারফিল্ড হসপিটালেই নেয়া না হতো, তাহলেও আজ তিনি বেঁচে থাকতে পারতেন না। কেননা তার শরীরে আমেরিকায় নির্মিত ৮৬,০০০ পাউন্ড মূল্যমানের যে কৃত্রিম হৃদপিন্ডটি স্থাপন করা হয়েছে, সেটি গোটা যুক্তরাজ্যে কেবল ওই একটি হাসপাতালেই রয়েছে।

সেলওয়ার অস্ত্রোপচার ও কৃত্রিম হৃদপিন্ডের সাহায্যে বেঁচে থাকা যুক্তরাজ্যের চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক ইতিহাস সৃষ্টিকারী ঘটনা। ছয় ঘন্টার এই ঐতিহাসিক অস্ত্রোপচারটি সম্পাদিত হয়েছে যার হাত ধরে, তিনি সার্জন ডায়ানা গার্সিয়া সেজ। আর তাকে সাহায্য করেছিলেন হেয়ারফিল্ডের হেড অফ ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন সার্জারি, আন্দ্রে সাইমন।

Comments
Spread the love