আমার মনে আছে, ব্রুস রিওকের (১৯৯৫-৯৬ মৌসুমের আর্সেনাল কোচ) তখন সদ্য চাকরি গেছে। কোন একটা পত্রিকা যেন তার সম্ভাব্য বদলি হিসেবে চার-পাঁচ জনের নাম ছাপিয়েছিল। টেরি ভেনেবলস, ইয়োহান ক্রুয়েফ, এবং সবশেষে আর্সেন ওয়েঙ্গার। আর্সেনাল ভক্ত হিসেবে সেদিন মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম যে আমাদের পরের কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারই হতে যাচ্ছে। কারণ বাকি দুজন আমার কাছে পরিচিত নাম ছিল, আর্সেন তেমনটা ছিল না। বিরক্তিকর ফুটবল খেলিয়ে থাকে এমন একটা অপরিচিত কাউকেই সে আর্সেনাল নিয়োগ দেবে এই ব্যাপারে বিশ্বাস রাখাই যেত।

উপরের কথাগুলো ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক, গীতিকার এবং বহুকালের আর্সেনাল অনুরাগী নিক হর্নবির। হর্নবিকে যদি কেউ তখন বলত, এই প্রায় অজানা, চশমা-আঁটা, মাস্টারমশাইসুলভ হাবভাবওয়ালা ফরাসি ভদ্রলোকই আর্সেনাল কোচের দায়িত্ব পালন করবে পাক্কা ২১ বছর, হর্নবি নিশ্চয়ই ভাবতেন বক্তা নেহাৎ শ্লেষ করছে।

ফুটবলে কোচদের ব্যাপারে একটা কৌতুক চালু আছে। কোচ নাকি দুধরনের হয়। এক, যার চাকরি গেছে, দুই, যার চাকরি যেতে চলেছে। এইরকম একটা পেশায় ইংল্যান্ডের প্রথম শ্রেণির একটা ক্লাবে দুই দশক ধরে টিকে থাকাই কারো মহত্ত্ব বোঝানোর জন্য যথেষ্ট। কিন্তু স্রেফ সময়ের মাপকাঠি দিয়ে আর্সেন ওয়েঙ্গারকে মাপলে আর্সেনাল ফুটবল ক্লাবে বা ব্রিটিশ ফুটবলে তাঁর অবদানটা বোঝা যাবে না। হালের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দিকে তাকালে বহু বড় দলেরই অ-ব্রিটিশ কোচ দেখা যাবে। পেপ গার্দিওলা থেকে শুরু করে হোসে মোরিনহো, অথবা পোচেট্টিনো থেকে শুরু করে ইয়োগেন ক্লপ। এই চিত্র দেখে আমাদের পক্ষে কল্পনা করা কঠিন বিশ বছর আগে বিদেশী ম্যানেজারদের স্বাগত জানানোর ব্যাপারে ব্রিটিশ ফুটবল মোটেই এতটা আন্তরিক ছিল না। অন্য কোনো বড় ইউরোপীয় ক্লাবকে সামলিয়ে আসার অভিজ্ঞতা থাকলে তাও বিবেচনা করা যেত, কিন্তু ফরাসি লিগ থেকে একখানা প্রায় অচেনা ফরাসি কোচকে আর্সেনালের মতো স্বনামধন্য ক্লাব যখন নিয়ে এলো ইংল্যান্ডের মিডিয়া পুরোপুরি তাজ্জব বনে গিয়েছিল। দ্য ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড শিরোনাম করেছিল, “আর্সেন, হু?”। বাংলা করলে দাঁড়ায়, “এই আর্সেনটা আবার কে?” এই একুশ বছরে ইভনিং স্ট্যান্ডার্ডসহ গোটা ফুটবল দুনিয়াই সেই প্রশ্নের উত্তর জেনে গেছে।

আর্সেন ওয়েঙ্গারের বেড়ে ওঠা ফ্রান্সের স্ত্রাসবুর্গ শহরে। আর্সেনের বাবা-মার একটা ছোট্ট বিস্ট্রো (ক্যাফের মতনই একধরনের খাবারের দোকান) এবং একটা মোটরগাড়ি মেরামতের দোকান ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে আর্সেনের বাবা ফরাসি ফৌজে যোগ দিয়ে যুদ্ধে যান। এই অনিশ্চিয়তার মধ্যে কাটানো সময়টাই পরবর্তী জীবনের প্রতিকূলতা সামলানোর জন্য ওয়েঙ্গারকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তুলেছিল। ২০০৭ সালে ফরাসি পত্রিকা এল ইকুইপকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়েঙ্গার নিজের শৈশব প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “আমার বাবা আর মা প্রচণ্ড পরিশ্রম করতেন। একটু বড় হওয়ার পর আমিও বিস্ট্রো আর মোটরগাড়ি মেরামতের দোকানের কাজে তাদের সাহায্য করতে শুরু করি। সৎ এবং পরিশ্রমী হওয়ার শিক্ষাটা খুব অল্প বয়সেই বাবা-মা আমার ভেতরে একদম গেঁথে দিয়েছিলেন। আমরা বড়লোক ছিলাম না, তবে আমাদের দিন ভালোই চলে যেত। স্কুল আর ফুটবল ছেলেবেলা থেকেই আমাকে খুব টানত।”

প্রাইমারি স্কুলে থাকতে আর্সেন প্রায় প্রতিবারই ক্লাসে প্রথম হতেন, সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমেও ছিলেন বেশ আগ্রহী। ছেলেবেলায় আর্সেন ওয়েঙ্গারের অসম্ভব পছন্দের একটা কাজ ছিল দাবা খেলা। খুব অল্প বয়স থেকেই আর্সেন চিন্তা করতে ভালোবাসতেন।

খেলোয়াড় হিসেবে আর্সেন ওয়েঙ্গার কখনোই খুব আহামরি কিছু হতে পারেননি। ফুটবলার হওয়ার জন্য যে প্রকৃতিদত্ত প্রতিভা লাগে তা আর্সেনের ছিল না। কিন্তু, ফ্রান্সের দ্বিতীয় সারির বিভিন্ন ক্লাবে খেলতে খেলতেই আর্সেন তৈরি করেন তাঁর ফুটবল-দর্শন। খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে তিনি ছিলেন দলের নেতা। মাঠে কোচের অর্ধেক কাজ নাকি তিনিই করে দিতেন। ট্যাকটিকস বিষয়ে তাঁর সচেতনতা যে তাঁর সতীর্থদের থেকে বহুগুণ বেশি ছিল কোনো সতীর্থও এই ব্যাপারে দ্বিমত করত না। ছেলেবেলা থেকেই জার্মান ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট ওয়েঙ্গার তখন বোঝার চেষ্টা করছেন কোন ছোট ছোট বিষয়গুলো একটা সাধারণ দলকে ভালো, আর একটা ভালো দলকে অসাধারণ দলে পরিণত করে। খেলোয়াড়েরা যে খাবার খাচ্ছে তাতে কী ধরনের পুষ্টি-উপাদান আছে, কী ধরনের অনুশীলন পদ্ধতি অনুসরণ করলে খেলোয়াড়দের শরীর সর্বোচ্চ ফিট রাখা সম্ভব, অথবা খেলার ঠিক আধা ঘন্টা আগে একজন খেলোয়াড়ের কী মানসিক অবস্থায় থাকা উচিত এই নিয়ে তখন ওয়েঙ্গার রাতদিন ভাবছেন। এইসব ছোট্ট ছোট্ট ডিটেইলের প্রতি গভীর মনোযোগই পরবর্তীতে নির্মাণ করবে কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারকে।

১৯৭১ সালে আর্সেন ওয়েঙ্গার স্ত্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হন অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করার জন্য। চিরকালের মেধাবী ওয়েঙ্গারের অভিভাবকেরা ভেবেছিলেন ছেলেকে বোধ হয় এবারে ফুটবলের ভূত ছেড়েছে। তাঁদের আশা ছিল ছেলেটা এবার একটা চাকরি বাকরি করবে। কিন্তু আর্সেন ধরলেন অন্য পথ। অর্থনীতি বিষয়ে আর্সেন ওয়েঙ্গারের জ্ঞান তাঁর ফুটবল দর্শনকে করে তুলল আরো শাণিত। খেলোয়াড় হিসেবে বিভিন্ন ক্লাবে অল্প সময়ের জন্য খেলে বেড়ানো শেষ হলে আর্সেন মনোযোগ দেন কোচে পরিণত হওয়ায়। ১৯৮১ সালে প্যারিসে তিনি ম্যানেজার হিসেবে ডিপ্লোমাটাও পেয়ে যান। এর আগেই অবশ্য আঞ্চলিক ক্লাব আর.সি. স্ত্রাসবুর্গের রিজার্ভ দলকে সামলিয়েছেন কিছুদিন।

এরপরের গল্পটুকুকে একটু ‘ফাস্ট-ফরোয়ার্ড’ করে দেওয়া যাক। প্রথমে ন্যান্সি, তারপর মোনাকো হয়ে ১৯৯৬ সালে এসে পৌঁছোলেন আর্সেনালে। মোনাকোর হয়ে ফ্রেঞ্চ লিগ শিরোপা জিতে ফেলেছেন ততদিনে। সেই সময়টায় ফ্রেঞ্চ লিগ ‘ম্যাচ ফিক্সিং’ কেলেংকারিতে জর্জরিত। ফলে দর্শকদের আনাগোণা গেছে কমে। বিনিয়োগকারীরা ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে মুখ। প্রায় সব ক্লাবই অর্থনৈতিক দৈন্য-দশায় জর্জরিত। অর্থনীতির ডিগ্রিধারী আর্সেন ওয়েঙ্গার এই প্রতিকূলতাকে সামলাতে ধরলেন নতুন রাস্তা। বাইরের বড় খেলোয়াড় কেনার যেহেতু সামর্থ্য নেই কাজেই আমাদের গড়ে তুলতে হবে তরুণদের, এই ছিল আর্সেনের মোনাকোর মূল চিন্তাপদ্ধতি। এই চিন্তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তৈরি করা শুরু হলো একাডেমির দিকে চূড়ান্ত মনোযোগ দেওয়া। একাডেমির তরুণ খেলোয়াড়দের খ্যাদ্যাভ্যাস ও অনুশীলন পদ্ধতির উপর রাখা শুরু হলো সার্বক্ষণিক নজর। ফ্রান্সের অন্য ক্লাবগুলোও এই দর্শনকে ক্রমাগত অনুসরণ করতে শুরু করল, ইংরেজিতে যাকে বলে ডমিনো এফেক্ট। এর ফল যতদিনে আসল ততদিনে ওয়েঙ্গার অবশ্য আর্সেনালকে সামলাচ্ছেন। ২০০০ এর ইউরো জেতা ফ্রান্স দলের প্রায় সব নায়কই (ডেভিড ত্রেজাগে, থিয়েরি অঁরি, প্যাট্রিক ভিয়েরা বা মার্সেল দেসাই) তৈরি হয়েছিলেন ঐ আমলের কোনো না কোনো ফ্রেঞ্চ ক্লাবের একাডেমিতে। আর্সেন ওয়েঙ্গার যেন প্রাইমারি স্কুলের সেই কড়া মাস্টারমশাই শৈশবে যার শৃংখলাপরায়ণতার কারণে বিরক্ত হওয়া ছাত্ররা মধ্যবয়সে এসে ঠিকই যাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে তাদের ‘ভিত’ গড়ে দেওয়ার জন্য।

সে যাই হোক, আমরা ফিরে আসি ১৯৯৬ সালের গ্রীষ্মে। ব্রুস রিওকের তখন সদ্য চাকরি গেছে। তাঁর বদলি হিসেবে এসেছেন আর্সেন ওয়েঙ্গার। এই রুগ্ন মাস্টারমশাইকে দেখে যে আর্সেনালের খেলোয়াড়েরা খুব আহ্লাদিত হয়ে উঠেছিল এমন বললে মিথ্যা বলা হবে। আর্সেনালের তখনকার ক্যাপ্টেন টনি এডামস যেমন পরবর্তীতে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, এই ফরাসি লোকটা আবার ফুটবল নিয়ে কী জানে? এই লোকটা তো চশমা পরে ঘোরে এবং দেখতে স্কুল শিক্ষকের মতো। আর যাই হোক সে জর্জ গ্রাহামের মানের কেউ হবে না। উনি কি আদৌ ঠিকঠাক ইংরেজিটা বলতে পারেন?”

ইংলিশ ফুটবল তখন আর্সেনকে দেখত ভিনদেশী অনুপ্রবেশকারী হিসেবে। একে তো জাতে তিনি ফরাসি, তারপর আবার বহুদিন ধরে চলা আসা বহু ‘ইংরেজ ফুটবলীয় সংস্কৃতি’কে তিনি ছেঁটে ফেলতে শুরু করলেন নির্দ্বিধায়। ক্রীড়াবিজ্ঞানের উপর দেওয়া শুরু হল গুরুত্ব, খেলোয়াড়দের খাদ্যাভ্যাসে নিয়ে আসা হলো পরিবর্তন। আর্সেন পূর্ব যুগে খেলার আগে খেলোয়াড়রা খেতেন চিপস আর বিন জাতীয় খাবার। আর্সেন বললেন এইসব আর চলবে না। একজন খেলোয়াড়ের কোন পুষ্টি উপাদান কতটুকু দরকার তার উপর ভিত্তি করে তৈরি হলো খাদ্যতালিকা। খেলার পরে খেলোয়াড়েরা একসঙ্গে বসে মদ খাওয়ার একটা রেওয়াজ চালু ছিল আর্সেনালে। যুক্তিটা ছিল এতে করে দলীয় বন্ধনটা আরো গাঢ় হয়। আর্সেন ওয়েঙ্গার এই পানাহারের আসরগুলোকে নিষিদ্ধ করে দিলেন।

ওয়েঙ্গার আর্সেনালে এসে বেশ গোছানো একটা দলই পেয়েছিলেন। একটা গোছানো রক্ষণভাগের সঙ্গে ছিল ডেনিস বার্গক্যাম্পের মতো প্রতিভাবান আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়ও। কিন্তু ড্রেসিংরুমে সমস্যাও ছিল বিস্তর। ক্যাপ্টেন টনি এডামস তখন রীতিমত মদ্যাসক্ত। এখানেও জীবনলব্ধ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগালেন আর্সেন। ছেলেবেলায় যখন নিজেদের বিস্ট্রোতে কাজ করতেন তখন দেখেছেন মদ্যাসক্ত ফুটবলভক্তরা কীরকম অল্পতেই লাগিয়ে দিত বাকবিতণ্ডা, প্রায়শই যা রূপ নিত মারামারিতে। একদম ঠিকঠাক মানুষও আসক্ত অবস্থায় কেমন আচরণ করতে পারে তা ওয়েঙ্গারের জানা ছিল। ওয়েঙ্গার যেমন করে সামলেছিলেন টনিকে, তা থেকে বোঝা যায় আর্সেন স্রেফ একজন কোচের নয়, পালন করেছিলেন একজন মনোবিদের ভূমিকাও। ১৯৯৭-৯৮ মৌসুমে আর্সেনের নেতৃত্বে আর্সেনাল প্রথম প্রিমিয়ার লিগ জেতে। ঐ মৌসুমে শিরোপা নিশ্চিত হওয়া ম্যাচটাতে গোল করার পর চোখ বুজে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা টনি এডামসের বিখ্যাত যে ছবিটা এখনো আর্সেনাল ভক্তদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল তা কোনোদিনই বাস্তবে পরিণত হত না, যদি না মদ্যাসক্ত টনিকে আর্সেন ফুটবলে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারতেন।

মাঠের ফুটবলেও আর্সেন ওয়েঙ্গার বিপ্লব নিয়ে আসলেন। জর্জ গ্রাহামের আমলে যেই আর্সেনালকে বলা হত “বোরিং, বোরিং আর্সেনাল” তারাই প্রিমিয়ার লিগকে উপহার দিতে শুরু করল চমকপ্রদ সব গোল। প্রতিপক্ষের হাফে প্রেস করার মাধ্যমে বল কেড়ে নেওয়ার যে ট্যাক্টিকস আর্সেনের হাত ধরেই তা ইংলিশ ফুটবলে এসেছিল।

ওয়েঙ্গার বানাতে শুরু করলেন নিজের দল, নিজের মনের মত করে। ১৯৯৬ তেই চলে এসেছিল প্যাট্রিক ভিয়েরা, আগে থেকেই ছিল ডেনিস বার্গক্যাম্প। তার সঙ্গে ধীরে ধীরে যুক্ত হলো থিয়েরি অঁরি, রবার্ট পিরেস, কলো টুরে ও এশলি কোলের মতো খেলোয়াড়েরা। গোলে আসলেন জেন্স লিমেন। ২০০২ সালে আর্সেন একবার দাবি করে বসলেন, তাঁর ধারণা আর্সেনাল গোটা মৌসুম অপরাজিত থাকতে পারবে। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে কোনো ইংলিশ দলই কখনো গোটা মৌসুম লিগে অপরাজিত থাকতে পারেনি। ফলে, আর্সেনের এই উক্তিকে দম্ভের প্রকাশ ছাড়া মিডিয়া অন্য কিছু হিসেবে দেখেনি। ২০০২-০৩ মৌসুমে ওয়েঙ্গারের ভবিষ্যৎবাণী সফল হয়নি। কিন্তু তার পরের মৌসুমেই ঘটে যায় সেই অলৌকিক ঘটনা। একটা গোটা মৌসুম লিগে অপরাজিত থাকে আর্সেনাল। ঐ মৌসুমে অঁরি, বার্গক্যাম্প, ভিয়েরারা সময় সময় এমন ফুটবল খেলেছিল যা এর আগে এবং পরে প্রিমিয়ার লিগ দেখেনি। ২৬ টা জয় আর ১২টা ড্র দিয়ে আর্সেনাল নিশ্চিত করে লিগ শিরোপা। অনেক বোদ্ধাই মনে করেন ঐ আর্সেনাল দলের মতো অসাধারণ কোনো দল প্রিমিয়ার লিগ দেখেনি। ‘অপরাজেয়’ বা ‘ইনভিন্সিবলস’ নামে যাদেরকে চেনে ফুটবলবিশ্ব।

ওয়েঙ্গারের আর্সেনাল জীবনকে যদি দুই দশকে ভাগ করা যায় তবে শেষের দশ বছরকে প্রথম দশ বছরের তুলনায় ব্যর্থতাই মনে হবে। গোটা দুয়েক এফএ কাপ ছাড়া যে এই সময়ে আর্সেনাল কিছুই জিততে পারেনি। কিন্তু, খুব অল্প কিছু জিনিস এদিক ওদিক হলেই ইতিহাস হতে পারত অন্যরকম। ২০০৬ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে যদি সেদিন লিমেনকে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে না হত হয়তো বার্সেলানোর বদলে ট্রফিটা উঠত আর্সেনালের হাতে। দশ জন নিয়ে দেখানো সেই চূড়ান্ত লড়াকু পারফর্ম্যান্স অন্তত তেমনটাই ইঙ্গিত দেয়।

এছাড়াও রয়েছে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক। ২০০৬ সালে হাইবরি থেকে এমিরেটসে স্থানান্তরিত হতে আর্সেনালের যেই পরিমাণ অর্থনৈতিক চাপ নিতে হয়েছে তার প্রভাব পড়েছে ট্র্যান্সফার মার্কেটে ক্লাবটার আচরণেও। ইচ্ছেমতো খরচ করার স্বাধীনতা ওয়েঙ্গারের তখন মোটেই ছিল না। বড় খেলোয়াড় না ভেড়াতে উৎসাহ হারাতে শুরু করে দলের ভেতরের খেলোয়াড়েরাও। জমা পড়তে থাকে ট্র্যান্সফারের অনুরোধ। সেস ফ্যাব্রেগাস, সামির নাসরি, এলেক্স সং বা সবশেষে রবিন ফন পার্সি, এই খেলোয়াড়দের ধরে রাখতে সক্ষম হলে আর্সেনাল ইউরোপে ছড়ি ঘোরানোর স্বপ্ন দেখতেই পারত। বাজেটের সীমাবদ্ধতা আর্সেনের দোষ ছিল না। ২০০৬ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত এই সীমাবদ্ধতা নিয়েও আর্সেনাল সেরা ৪ এ থাকতে পেরেছে প্রত্যেকটা মৌসুমেই। চ্যাম্পিয়নস লিগে কোয়ালিফাই করলে ক্লাবের আয়ের খাতায় যে বড় একটা অংক যোগ হয় অর্থনীতিবিদ ওয়েঙ্গার তা কখনোই ভুলতেন না।

ট্র্যান্সফার মার্কেটের রক্ষণশীলতা অবশ্য কখনোই মাঠের ফুটবলে রূপান্তরিত হয়নি। শিরোপাহীন এই বছরগুলোতেও আর্সেনাল মাঝে মাঝেই উপহার দিয়েছে সম্মোহনী ফুটবল। ইউরোপ থেকে না ছিটকে, সুন্দর ফুটবল খেলেও ক্লাবটি যে অর্থনৈতিকভাবে আগের জায়গায় ফিরে আসতে পেরেছে এক দশকের মধ্যে সেই কৃতিত্বকে খাঁট করে দেখা ঠিক হবে না। রেফারেন্স হিসেবে নিউক্যাসল বা লিভারপুলের( যদিও লিভারপুলও ক্লপের হাত ধরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে) উদাহরণ দেখলেই তা পরিষ্কার হয়ে যায়।

তবে গত তিন বছর ধরে আর্সেনাল ফুটবল ক্লাবে যা চলছে তা স্রেফ স্থবিরতার লক্ষণ। দীর্ঘদিন ধরে ‘হিসাবের খাতা’ বজায় রাখার চর্চার ফলে ক্লাবটার চিন্তাপদ্ধতিই হয়ে গিয়েছে রক্ষণশীল। নিজের ক্যারিয়ারে কখনোই বড় বাজেট না পাওয়া ওয়েঙ্গার এই নব্যপ্রাপ্ত স্বাধীনতাকে কাজে লাগাতে একরকম ব্যর্থ হয়েছেন এমনটা বলাই চলে। “ওয়েঙ্গার আউট” এর মতো প্ল্যাকার্ড তাই এমিরেটসে বেড়েই চলছিল। এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যুগে কারো কি স্থবিরতা সহ্য হয়!  শেষমেশ তাই ছেড়ে দিলেন ওয়েঙ্গার। বাধ্য হয়ে নাকি ইচ্ছা করেই এই নিয়ে আছে নানা কানাঘুষা।

তবে সময়টা তিনি ঠিকই বেছে নিয়েছেন। ব্যাটম্যান ট্রিলোজির ‘দ্য ডার্ক নাইট’ এর একটা বিখ্যাত সংলাপ আছে, “হয় তোমাকে নায়ক থাকতে থাকতেই মরতে হবে, নতুবা একদিন খলনায়ক হয়ে বেঁচে থাকতে হবে।” চিরকালের প্রাজ্ঞ আর্সেন যে নায়কের মৃত্যুই বেছে নেবেন তা একরকম অনুমিতই ছিল।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-