সিনেমা হলের গলি

কেমন আছেন অর্ণব?

হেডফোনে রিপিট মুডে বাজছে একটাই গান। কাল রাত থেকে চলছে। শায়ান চৌধুরী অর্ণবের গান।

কষ্টগুলো শিকড় ছড়িয়ে,
ওই ভয়ানক একা চাঁদটার সাথে,
স্বপ্নের আলোতে যাবো বলে-
যখন চোখ ভিজে যায় রাতে!

কি অদ্ভুত বিষণ্ণতার সঙ্গী এই গানটা। যতবার শুনি ততবার নিজের স্বত্তার সাথে একাত্ম হয়ে যাই। এত অদ্ভুত মাদকতা গানটার সুরে, এত অসাধারণ লিরিক। শুধু এটাই না, শায়ান চৌধুরী অর্ণবের নিজস্ব কিছু গান শুনলেই মনে হয় একটা মানুষের জীবনের কত কানাগলি হাতড়ে বেড়ালেই এমন গান বাঁধতে পারেন। আচ্ছা, অনেকদিন শুনি না অর্ণবের নতুন কোনো গান। খুব জানতে ইচ্ছে করে মানুষটা এখন কোথায়? কেমন আছেন তিনি?

অর্ণব অন্তরালে থাকতে ভালবাসেন এতো পুরানো খবর। থাকুক না কিছু মানুষ, নিজের মতো করে। ক্ষতি কি তাতে। কিন্তু, আমরা যাদের ভালবাসি কোনো কোনো সময় অনেক যুগ পর হঠাৎ করে আমাদের জানতে ইচ্ছে করে কোথায় আছে মানুষগুলো, কি করছে তারা এই মুহুর্তে।

অর্ণবের বেলায় এই খোঁজগুলো পাওয়া আরো কঠিন। তিনি এমনিতে মিডিয়ায় কম সাক্ষাৎকার দেন, আগের মতো তাকে দেখা যায় না গানের শো’গুলোতে। কিন্তু, ভাগ্যক্রমে তিনি সম্প্রতি অতিথি হয়ে এসেছিলেন, বাংলাভিশনের ‘আমার আমি’ প্রোগ্রামে। এই অনুষ্ঠানটি অনেক বছর যাবতই প্রচারিত হচ্ছে বাংলাভিশনে। মিথিলা উপস্থাপক হয়ে এসেছেন এবারে। আর এই পর্বেই এসেছেন শায়ান চৌধুরী অর্ণব।

অনুষ্ঠানটিতে অর্ণব মিথিলা শৈশবের অনেক স্মৃতিচারণ করেছেন। আর জানা গেছে শৈশবের কিছু গল্প। গল্পগুলো এত জীবন্ত, কারণ মিথিলা এমনিতেই শায়ানের আপন মামাতো বোন। ছোটবেলায় তারা মগবাজারেই এক বাড়িতে থাকতেন। ফলে অনুষ্ঠানটিকে এক মুহুর্তের জন্যে ফরমাল কোনো কথোপকথন মনে হয়নি। স্বতঃস্ফূর্ত আড্ডা মনে হয়েছে। হয়ত, একারণেই অর্ণব এসেছিলেন এই অনুষ্ঠানে।

কিন্তু, অর্ণবকে দেখে ভীষণ হাহাকার হলো৷ কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছিলো অর্ণবের। যদিও অর্ণবের কথা এভাবেও শুনতে খারাপ লাগেনি একটুও। ইউটিউবেও কেউ কেউ জানতে চাচ্ছিল, কেউ জাজমেন্টাল হচ্ছিল কেন অর্ণব এভাবে কথা বলছেন। প্রথমত, অর্ণবের এটাই স্বকীয়তা, আর দ্বিতীয়ত অর্ণব কিছুটা হয়ত অসুস্থতার মধ্যেও দিন কাটাচ্ছেন।

কিন্তু, গায়ক অর্ণব এখন কোথায়? অর্ণব ক্লাস থ্রিতেই চলে গিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। সেখানে তিনি আর্টস নিয়ে পড়েছেন আর দিনে দিনে তিনি কলকাতায় পরিচিত হয়েছিলেন শায়ান চৌধুরী হিসেবে। রবীন্দ্র সংগীতকে নতুন ভাবে উপস্থাপন করেছেন। কি ভীষণ জনপ্রিয়তা এখনো কলকাতায়।

দুই বছর আগে কলকাতায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,

“এই জনপ্রিয়তাটা আমাকে একটা শেকলে বেঁধে ফেলেছে৷ শুধু অন্যের কথা ভেবে গাইছি৷ মুখোশ পরে স্টেজে উঠছি, স্টুডিওতে গান কম্পোজ করছি৷ শুধু অন্যের কথা ভেবে যাচ্ছি৷ শান্তিনিকেতনে পাঠভবনে যা গান শিখেছি, তাই ভাঙিয়ে খাচ্ছি৷ গানটা তো সমুদ্র৷ আমি তো হাঁটুজলেও নামিনি৷ অথচ জনপ্রিয়তার ফরমাসে আমাকে গান গেয়েই যেতে হচ্ছে৷ আমি পালিয়ে যেতে চাই এই চাহিদা থেকে৷ আমি সত্যিকারের মিউজিক করতে চাইলে এই পেশাগত মিউজিক আমাকে ছেড়ে দিতে হবে৷ আমার অনেক শেখার বাকি৷ অনেক পড়াশোনার প্রয়োজন৷ ফের কীর্তনাঙ্গ, ভাটিয়ালি কি লালনের গানের ভেতরে ঢুকতে চাই৷ কয়েকটা বছর শুধু নিজের জন্যে সঙ্গীতে ডুবে থাকব আমি, গভীরভাবে শিখব৷ কিন্তু মঞ্চে গাইব না৷ শুধু ছবি আঁকব৷ ছবি আঁকা আমাকে টানছে৷ আমি ছবি আঁকছি প্রচুর৷ ছবি আঁকার সময় আমি আর আমার ছবি ছাড়া আর কেউ নেই৷ কাউকে কৈফিয়ত দিতে হবে না আমার৷ কাউকে সন্তুষ্ট করতে হবে না৷”

দুই বছর আগের চিন্তা এখনো বোধহয় তেমন পালটে যায়নি। তিনি এখন গান করেন। গান নিয়ে ভাবেন। কিন্তু, তার কথা হলো, গান গাইলেই কেনো মানুষকে শোনাতে হবে? গান না শোনানো মানেই কি গান ছেড়ে দেয়া?

অভিমানটুকু স্পষ্ট। অর্ণব গান ছেড়ে দিতে পারবেন না, গানটাই তার প্রাণ। কিন্তু, তিনি কি হারিয়ে যেতে চান? মানুষটা এমনিতেও যোগাযোগ রক্ষা করে চলার কাজে খুব একটা ভাল না। সবাই খুঁজে অর্ণবকে৷ কিন্তু, কোথাও তিনি নেই। তিনি নিজের ভুবনে থাকতে চান।

অথচ, অর্ণব একটা নতুন গান গাইবেন এই অপেক্ষায় থাকেন কত মানুষ। জানি না অর্ণব কোনো অভিমান থেকে গান প্রকাশ করা ছেড়ে দিয়েছেন কি না, হয়ত এই স্বেচ্ছা-অবসরটুকু অর্ণব না নিলে আমরা অনেক চমৎকার কিছু গান পেতে পারতাম। কিন্তু, অর্ণব নিজে ভাবেন, গান শেখার কোনো শেষ নেই। তিনি এখনো গানের জগতটাকে এক্সপ্লোর করে যাচ্ছেন, যে জগতের কোনো তল নেই।

কিন্তু, বর্তমানে অর্ণব ডুবে আছেন স্টপ মোশন এনিমেশন নিয়ে। স্টপ মোশন এনিমেশন দিয়ে গল্প বলতে চান। তার ভাষায় তিনি এখন রীতিমতো পুতুল খেলছেন। একটা ঘরে অনেক অনেক পুতুল। তিনি এগুলো দিয়ে স্টপ মোশন এনিমেশনের কাজ করছেন।

কেউ তাকে খুঁজে পায় না, কারণ তিনি নিজের স্টুডিওতে নিজের মতো পড়ে থাকেন। নিজেই সব কাজ করেন, ধোয়া মোছা থেকে শুরু করে সব কিছু। পাশাপাশি মানুষটা ছবি আঁকেন। খুব ডুব অ্যালবামে নিজের ছবি বিক্রি বান্দরবানের আদিবাসী স্কুলের জন্য অর্থ যোগাড় করেছেন। আবার একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। “ঢাকা পুরাণ” নামের সেই ছবিতে বাস্তব অবাস্তব মিথের একটা সংমিশ্রণ থাকবে।

এইসব নিয়েই আছেন অর্ণব। সুযোগ পেলেই তিনি অন্তরালে ডুবে যেতে ভালবাসেন, অনেক আগে এক সাক্ষাৎকারে এমন কথাই বলেছিলেন।

“আমি নিজেকে কোন টাইপে বাঁধতে চাই না, যদি কোনদিন দেখেন অর্ণব কোন একটি নির্দিষ্ট ফর্মে আটকে পড়েছে সেদিন ভাববেন আমার জারিজুরি শেষ। তবে আমি চাইনা ছকের মাঝে পড়তে। নিজেকে ভেঙ্গে আবার গড়ে ফিরে আসি প্রতিবার। ডুব দিতে আমার তাই খুব ভালোলাগে। হয়তো এরই মধ্যে ডুব দেব।”

তাই অর্ণবকে কোনো প্রত্যাশার ছকে বাঁধতে ইচ্ছে করে না। তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কোনো জাজমেন্টে যেতে ইচ্ছে করে না। হারিয়ে যাননি মানুষটা, এটাই তো জরুরী খবর। নির্দিষ্ট ছকে আটকাতে হবে না অর্ণব আপনাকে। আপনি নিজের মতো থাকুন, সৃষ্টিশীল স্বত্তাটুকু দিয়ে আপনি যতটা কাজ করবেন, সেইটুকুর জন্যই আমরা অপেক্ষায় থাকবো..

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close