লেখালেখি

আপনার সাথে বুঝি কেউ কথায় পারে না?

আমাদের আশেপাশে এমন মানুষ সব সময় দেখা যায়। ইনফ্যাক্ট কয়েক বছর আগে আমারও নিজের সম্পর্কে এমন একটা ধারণা ছিল, ধারণা না বলে বলা উচিত অহংবোধ ছিল, “আমার সাথে কেউ কথায় পারে না!” বড় হতে হতে জীবনে যে শিক্ষাগুলো পেয়েছি তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে “আমার সাথে কেউ কথায় পারে না।” এমন করে যারা ভাবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করে।

সহজে বোঝাই। আপনার পরিচিত ভালো বিতর্কিক যদি কেউ থেকে থাকে তাহলে তাকে জিজ্ঞাসা করবেন। এরকম প্রায়ই হয় যে একই টপিকে কোন একটা প্রোগ্রামে পক্ষে, আবার অন্য আরেকটা প্রোগ্রামে বিপক্ষে বলতে হয়। এরকম অনেক দেখেছি একটা বিতর্ক টুর্নামেন্টে একই টপিক নিয়ে একটা দল একবার পক্ষে বলেও জিতেছে, আরেকবার বিপক্ষে বলেও জিতেছে। মোদ্দাকথা একজন বিতার্কিক যখন বিতর্ক করে তখন সে যেই পক্ষটা নেয়, সবসময় সে যে সেই পক্ষের কথাটাকেই সত্য মনে করবে, এমন নয়। বরং তার কাজ হচ্ছে টপিকের সাথে ভিন্নমত হলেও নিজের “অন্যান্য স্কিল” যেমন লজিক, ডাটা, প্রেজেন্টেশন, আক্রমণ, আবেগ ইত্যাদি ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত বিজয় ছিনিয়ে আনা। আবারও বলছি, টপিকের সাথে তার মতের অমিল থাকতে পারে, কিন্তু তবুও একজন ঝানু বিতার্কিক জিতে আসতে পারে।

আমাদের বাস্তব জীবনে আমরা যে তর্ক করি, যে বিরুদ্ধতা করি, যে মতের মিল আমাদের হয় তার সবক্ষেত্রেই আমাদের একটা পক্ষ থাকে। আমরা সেই পক্ষের হয়ে লড়ি। আমরা কখনোই ভাবি না আমার বিপক্ষে যে লড়ে যাচ্ছে সে কি ভাবছে? যুক্তিবিদ্যার বেসিক লেভেলের পড়ালেখা থাকলে আপনি জানবেন আমাদের অধিকাংশ বিতর্কগুলোতেই দুই পক্ষ উভয়েই ভুল কিংবা দুই পক্ষ উভয়েই ঠিক এমন হয়ে থাকে। কারণ তর্কের সময় আমরা উপর থেকে দেখি না, আমরা দেখি মুখোমুখি অবস্থা থেকে। অধিকাংশ সময় দেখা যায় আমরা যেই বিষয়টা নিয়ে তর্ক করছি সেই বিষয়টা নিয়ে আমরা নিজেরাই ঠিকঠাক জানি না। দেখার বিষয় হচ্ছে আপনি যেই মুহূর্তে ধরতে পারছেন যে আপনি জানেন না, আপনার কাছে কোন একটা তথ্য নেই, সেই মুহূর্তে আপনি তর্কটা বন্ধ করে দেন কি না?

বিতর্ক, মতামত, নাস্তিক, ছাগু

কাউকে পাল্টাতে চাইলে এক সিটিং-এ, একটা আড্ডায় ধুমধাম তর্ক করে পাল্টাতে পারবেন না। শ্রোতার মগজে যেমন আপনাকে পাকাপাকিভাবে ঢুকে যেতে হবে, আপনার মগজেও তেমনি শ্রোতাকে জায়গা করে দিতে হবে।

আপনি কি জানেন কারো সাথে মুখোমুখি খুব বড়সড় তর্ক করে এসে যখন অন্য কাউকে জানান দেন- “অমুক আমার সাথে কথায় পারে নাই” ঠিক সেই সময়েই অমুকও তার বন্ধুদের কাছে গিয়ে একই ঘটনা ১৮০ ডিগ্রি এঙ্গেল থেকে বলে, “তমুকরে আজকে হারাইসি!” কারণ আসলেই মুখোমুখি দাঁড়ালে ১৮০ ডিগ্রি এঙ্গেল তৈরি হয়।

ফেইসবুকে আমরা যখন একগ্রুপ অন্যগ্রুপের উপর চড়াও হই, তখন একজন অন্যজনের ওয়াল ঘেঁটে স্ক্রিনশট তুলে “নাস্তিক” বানাই, অন্যজন “ছাগু” বানায়। এই বনিবনার সমাধান অধিকাংশ ক্ষেত্রে “ব্লক” করে দিয়ে শেষ হয়। দিনের শেষে প্রগতিশীলদের ১০০ “গুরু সেলেব্রেটি” তৈরি হয়, প্রতিক্রিয়াশীলদের ১০০০ “গুরু সেলিব্রেটি” তৈরি হয়। প্রত্যেক গুরু নিজের ওয়াল থেকে বাণী দিতে থাকেন, আর সাগরেদরা “আহা… উহু…” করতে থাকেন। প্রত্যেক গুরুকেই কেউ হারাতে পারে না।

মোদ্দাকথা কাউকে কিছু বোঝাতে চাইলে (হোক তা কোন মতবাদ, সমাজতন্ত্র, বিবর্তন, কোন ধর্ম কিংবা ধরেন নিধর্ম) আপনাকে “আমার সাথে কেউ কথায় পারে না” এই পজিশন থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আপনার তর্ক, আপনার যুক্তি, আপনার দলিল যে সঠিক সেটা তর্ক-যুক্তি-দলিল দিয়েই বলুন। “আমার সাথে কেউ কথায় পারে না” টাইপ অহংকারী মানুষজনকে কেউ পছন্দ করে না।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close