ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

আপনাদের ট্রল-নোংরামি এবার কোপাকুপিতে গড়ালো!

গত কয়েকদিন আগে ফুটবল বিশ্বকাপে বিভিন্ন দলকে সমর্থন করার নামে আমাদের চিরাচরিত গালাগালি আর নোংরামির প্রতিবাদে একটা লেখা লিখেছিলাম। তারপরেই যেন ঝড় বয়ে গেল সবর্ত্র। দলে দলে ব্রাজিল আর্জেন্টিনাসহ নানা দলের সমর্থকেরা এসে বোঝাতে শুরু করলেন, খেলার মধ্যে ট্রলের নামে এই যে নোংরামিগুলো হচ্ছে, এগুলো হচ্ছে ফান, এর সাথে সিরিয়াসনেস মেশাবেন না। এদের বোঝাতেই পারলাম না যে জাতি হিসেবে আমাদের চিন্তাচেতনা চরম নোংরা, আমাদের দ্বারা সুস্থ বিনোদন, মজা করা কিংবা গঠনমূলক সমালোচনা আশা করা অতি অবাস্তব কষ্টকল্পনা! আমরা সবকিছু মাখিয়ে ফেলতে পছন্দ করি, মজা-রসিকতা থেকে শুরু করে স্বাভাবিক যে কোন কিছুকেই আমরা অতিরিক্ত উগ্রতা আর বাড়াবাড়িতে নোংরামিতে নিয়ে যাই, তারপর ভেতরের কুৎসিত ধারালো দাঁত-নখ বের করে ঝাঁপিয়ে পড়ি। জাতীয় জীবনের প্রত্যেকটা ইস্যুতেই ঠিক এইভাবে আমরা এর আগেও বহুবার নিজেদের নির্লজ্জ ও নোংরা চেহারার প্রমাণ দিয়ে এসেছি, তাই যখন ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে গত দেড় দুই মাস ধরে তর্ক-বিতর্ক আর স্বাভাবিক মজাকে ছাড়িয়ে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে নিয়ে গালাগালি আর মেসি-রোনালদোকে নিয়ে নোংরামিতে গড়াচ্ছিল, অনেক শিক্ষিত, বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষগুলোও যখন স্রেফ ফানের দোহাই দিয়ে এই নোংরামিকে আস্কারা দিচ্ছিলেন, তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে এটার ফল ভালো হবে না। প্রমাণ হাতেনাতেই পাওয়া গেল!

গত সোমবার (১৮ জুন) সকাল ১০টার দিকে খুলনা মহানগরীতে দুই আর্জেন্টিনা সমর্থককে কুপিয়ে জখম করেছেন এলাকার ব্রাজিল সমর্থকরা। মহেশ্বরপাশা গাজির মোড় এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে হামলার শিকার হন তারা। আহতরা হলেন- মো. শুকুর হাওলাদার (৩৫) ও তার স্ত্রী মিনু আক্তার (২৫)। বিশ্বকাপ ফুটবলে দুই দলের পারফরমেন্স নিয়ে বিতর্কের জের ধরে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরে আহতদের উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের ড্র’য়ের পর থেকে।

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা নিজেদের প্রথম ম্যাচে ড্র করলে ওই এলাকায় ব্রাজিলের সমর্থকরা আজেন্টিনা সমর্থকদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। রোববার (১৭ জুন) মধ্যরাতে একইভাবে ব্রাজিল তাদের প্রথম ম্যাচে ড্র করলে আর্জেন্টিনা সমর্থকরাও পাল্টা ব্রাজিল সমর্থকদের তিরস্কার করে। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

এ ঘটনার জের ধরে সোমবার সকালে ব্রাজিল সমর্থক মো. লিটন ও আরও কয়েকজন আজেন্টিনা সমর্থক শুকুর আলীকে মোবাইল ফোনে বাড়ি থেকে ডেকে আনে। পরে বাড়ির অদূরে হোটেলের সামনে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শুকুরকে কুপিয়ে জখম করা হয়। এসময় শুকুরের স্ত্রী মিনু বাধা দিতে গেলে হামলাকারীরা তাকেও কুপিয়ে জখম করে। পরে আহত অবস্থায় দু’জনকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দুইজনেরই মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের ক্ষত রয়েছে। এছাড়া শুকুরের শরীরেও পেটানোর মারাত্মক জখম রয়েছে।

প্রিয় পাঠক, শব্দগুলো একটু খেয়াল করুন। আর্জেন্টিনা ম্যাচ ড্র করবার পর ফেসবুকে হাসাহাসি কিংবা ট্রলের নামে নোংরামিই যথেষ্ট ছিল না, ব্রাজিলের সমর্থকরা সরাসরি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে, টিটকারী দিয়েছে আর্জেন্টিনার ভক্তদের। তো, যেহেতু বাঙ্গালী, স্বভাব তো আর বদলাবে না, তাই আর্জেন্টিনা সমর্থকেরাও ব্রাজিল ড্র করবার পর দৌড়ে গিয়ে ব্রাজিল সমর্থকদের পাল্টা টিটকারী আর তিরষ্কার করে আসলেন। আর এতেই ক্ষেপে গিয়ে পরের দিন একেবারে মোবাইলে ফোন করে আর্জেন্টাইন সমর্থককে ডেকে এনে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে উপযুক্ত জবাবটা বুঝিয়ে দিলেন ব্রাজিল সমর্থক মোঃ লিটন। একদম বাঘের বাচ্চার মত সাহস দেখিয়েছেন, কত বড় সাহস আমার দলের হারে তিরস্কার করে! কুপিয়েই মেরে ফেলতে হবে!

কতটা ভয়ংকর স্যাডিস্ট হলে এরা ফুটবলে সমর্থনের মত অতি সাধারণ একটা বিষয়কে এতোটা ভয়ংকর হিংস্রতায় নিয়ে যেতে পারে ভাবতে পারেন? এটা কিন্তু একদিন দুইদিনে হয়নি। ধীরে ধীরে প্রতিদিন সেভেন আপ খাইছে, ৩২ বছর কাপ জিতে নাই, পেনালদো কিংবা মাছি, ব্রা-জিল কিংবা আরজিতেনা এসব থেকেই কিন্তু সীমালঙ্ঘনের চক্রটা শুরু। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও ট্রল হয়, মজা হয়, খেলা নিয়ে একে অন্যকে পচায়, কিন্তু কোথাও সেটা নামতে নামতে গালাগালি কিংবা নোংরামিতে পরিণত হয় না, স্রেফ ভিন্ন দল সমর্থন করছেন বলে কেউ কারো বাপ-মা তুলে গালাগালি করে না, কুৎসিত কদর্য ভাষায় নোংরা করে না অনলাইন স্পেস, ধারালো অস্ত্র তুলে মারতেও যায় না। কিন্তু আমাদের দেশে সবই সম্ভব! কারণ ওই যে বললাম, আমরা সবকিছুকেই অতি আবেগে চরম উগ্রতার পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে নোংরা করে ফেলি। সুতরাং আমাদের দেশে এসব সারকাজম, সারকাস্টিক ফান একপ্রকারের বিলাসিতা, খুবই বিপদজনক এক উসকানি। কেউ জানে না কখন একগাদা অকালকুষ্মান্ডের দল এই ফানকেই কোপাকুপির পর্যায়ে নিয়ে যাবে!

ঠিক এই কারণেই বারবার অনুরোধ জানিয়েছিলাম যেন কোনভাবেই আমরা বাড়াবাড়ি না করে ফেলি। কারণ সমাজের বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে যখন ১০ ভাগ বাড়াবাড়ি পাওয়া যাবে, সেটার বাটারফ্লাই ইফেক্ট হবে পুরো সমাজে ১১০ ভাগ। সেখানে বিশ্বকাপ শুরুর এক মাস আগে থেকেই আমার চেনা-অচেনা অসংখ্য মানুষ রীতিমত উৎসব করে আস্কারা আর উসকানি দিয়ে গেছেন, নিজেরাই কুৎসিত ভাষা আর কদর্য নোংরামিতে খুলে দিয়েছেন নীচতার আর্গল! ফলে সেটার বাটারফ্লাই ইফেক্টে আজ রাইভাল ড্র করায় সমর্থকদের সরাসরি তিরস্কার আর গালিগালাজ করে আসার সাহস দেখাচ্ছে কিছু উগ্র ফুটবলদ, তার বদলা সব সীমা ছাড়িয়ে রীতিমত ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে কুপিয়ে আহত করে তার জবাব দিচ্ছে বিপক্ষ দলের সমর্থকেরা! এরপর কি হবে? কোপানোর পর মৃত্যু নিশ্চিত করে যাবে সমর্থক নামের এই জানোয়ারগুলো?

সমস্যা আসলে আমাদের রক্তে। হিংসা, রেষারেষি আছে আমাদের রন্ধ্রে। অহংকার, পরশ্রীকাতরতায় আমরা সহসা মুখরিত থাকি। আমার তো মনে হয়, ফুটবলের ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থন আসলে একটা উছিলা। আসল উদ্দেশ্য হলো এই গালাগালি, টিটকারি, হেয় ও শ্লেষ, ব‍্যক্তিগত বিদ্বেষ, নোংরামি, পরিহাসে অংশগ্রহন করা।

আমরা আসলে মানসিকভাবে বিকারগ্ৰস্ত ও বিকৃত মস্তিষ্কের অধিকারী একটা জাতি। এই ধরনের আচরণ আমাদের মানসিকতার একটা বহিঃপ্রকাশ মাত্র। যারা এইসব করছে, তাদের জন্ম‌ই হয়েছে শুধু কুৎসিত ও অসুস্থ মন্তব্য করার জন‍্য। এরা সামনে যাকে পায়, তাকেই বেছে নেয়। আমাদের নিজেদের খেলোয়াড়দের‌ও ছাড়ে না। সাকিব-তামিমকে নিয়েও ট্রল কম হয়নি।

দুঃখজনক ব‍্যাপার এই যে, এদের সংখ‍্যাই বেশি আমাদের চারপাশে।

আমি আসলে হতাশ। দুদিন আগে লিখেছিলাম, গত দুই মাস ধরে হোমফিডে ফুটবল উত্তেজনার এইসব প্যাথেটিক বুলি আর ব্রেইনলেস ষ্টুপিডদের যে অসহ্য নোংরা ট্রল/গালাগালি/টিটকারি/পরিহাস আর নোংরামি দেখছি, এটাই যদি ফুটবল উপভোগের উপায় হয়ে থাকে, তাহলে আমি ট্রেন্ডের সাথে তাল মেলানো কুউউল ড্যুড হতে পারলাম না বলে দুঃখিত। ধুয়ে দিয়েছিলেন অনেকেই, “ফানের মধ্যে কেন সিরিয়াস হচ্ছি’ বলে চিল্লাচিল্লি করছিলেন। আমি ফুটবলও বুঝি না, ফানও বুঝি না, তাই সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছি বলে নিরস সিরিয়াস আঁতেল বানিয়ে দিচ্ছিলেন। আজ নিজের চোখেই অবস্থাটা দেখেন। এরা না বোঝে ফুটবল, না বোঝে সমর্থন, না বোঝে ফ্রেন্ডলি ফান! এদের হাতে দুই টাকায় সারাদিন ফ্রি ইন্টারনেট চালানোর সুযোগ দেওয়া অর্থ বানরকে মাথায় চড়ে বসতে দেওয়া। তার ফলাফলটা হাতেনাতে পেলাম আমরা। একটা দলের সমর্থকেরা যদি আরেক দলের সমর্থকদের সাথে রংবাজ হয়ে গালাগালি আর নোংরামিতে নামে, নিজেদের আরো নীচে নিয়ে যায়, একজন সুপারস্টারের ভক্ত হিসেবে রাইভাল সুপারস্টারকে নিয়ে নেড়ি কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করাটা ফুটবল উপভোগ বলে মনে করে, তাহলে এর চেয়ে বড় লজ্জার আর কিছু হতে পারে না। আর এগুলো করে আমরা আসলে উসকে দিচ্ছি এই দেশের উগ্র নোংরা মনমানসিকতার বিশাল এক দল জনগোষ্ঠীকে!

এই সামান্য বিবেচনাবোধটা আমাদের কবে হবে?

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close