২০৫০ সালে পৃথিবীতে প্রতি ৩ সেকেন্ডে ১ জন মারা যাবে; কিন্তু কেন?

Ad

১.

মেঘনা নদীর ওপাড়ে আমার চেম্বার। শুক্রবার, রোগী দেখছি। প্রেসক্রিপশনের উপর নিউমোনিয়া (CAP) ডায়াগনোসিস লিখে Cap. Amoxicillin সহ আরো দুইটা Symptomatic ড্রাগ দিয়ে রোগী বিদায় করলাম।

প্রায় সাথে সাথেই হুড়মুড় করে চেম্বারে দু’জন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ ঢুকলেন, তাদের চেহারা অন্ধকার। কথোপকথনের নমুনা দেইঃ

— স্যার, নিউমোনিয়ায় Amoxicillin দিলেন!!!
— হুম, Uncomplicated case, কেন কি সমস্যা?
— না, মানে, স্যার, গত কয়েক বছরে কাউরে দিতে দেখিনাই। আপনারেই খালি দেখি। সবাইতো স্যার Cefixime লিখে….

— আমি একটু হেসে বললাম, সবাই যেহেতু Cefixime লিখে, কাজেই এর রেজিস্ট্যান্স হবার চান্স বেশী- আমি না হয় Amoxicillin ই লিখলাম। Uncomplicated case এ Third generation ড্রাগ দেবার কারণ দেখি না। তাছাড়া গাইডলাইন তাই বলে…

–স্যার, আমাদের Cefixime এর র’মেটারিয়েল কিন্তু দেশের বাইরে থেকে আনা, দিয়ে দেখতে পারেন। খালি নিউমোনিয়া না, টাইফয়েড- স্কিন ও সফট্ টিস্যু ইনফেকশন- UTI( প্রসাবের রাস্তায় ইনফেকশন)-তে আমাদের Cefixime এর সাফল্যের হার ৯৯%..

— বলেন কি! এইটা অ্যান্টিবায়েটিক না এটম বোম?

— (চোখে চকচক ও হাত কচলানো শুরু )হে হে স্যার, এতক্ষণ তবে আর কি বললাম….

–মিজান সাহেব, আপনার এটম বোম আপনার কাছে রাখেন। রোগ ডায়াগনোসিস করতে পারলে এটম বোমা লাগে না, থ্রি-নট-থ্রি রাইফেলই যথেষ্ঠ…..

২.

এবারের ঘটনা পদ্মাপাড়ের চেম্বারে। এক বাচ্চা ছেলে মাসখানেক আগে সাইকেল চালাতে গিয়ে সাইকেলের চেইনে পা কেটে ফেলেছে। পায়ে দগদগে ঘাঁ।

বিভিন্ন জায়াগায় বিভিন্ন ডাক্তারের কাছে নাকি চিকিৎসাও নিয়েছে, নাম না জানা আউল-ফাউল কোম্পানির Ceftriaxone ও চলেছে।

প্রেসক্রিপশন দেখলাম, দুঃখজনক হলেও সত্যি- যারা প্রেসক্রাইব করেছে, তাদের একজনও MBBS ডাক্তার নয়। আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লাম, কিছুটা গর্বিতও হলাম- MBBS পাশ করা কেউ এ ধরণের উদ্ভট কোম্পানির অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক লিখবে না–সে ধারণাটা আরো বদ্ধমূল হলো।

বিশ্বাস করুন আর নাই করুন- মাসখানেকের মাঝে সেই দগদগে ঘাঁ শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির ৬ টাকার Flucloxacillin ক্যাপসুলে ভালো হয়ে গেল।

ঘটনাটি বছর খানেক আগের। বাচ্চার বাবা কিছুদিন আগে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন, টেবিলে মিষ্টির প্যাকেট রাখতে রাখতে বললেন, “স্যার, নিজে সামনে দাঁড়াইয়া মিষ্টি বানাইতে কইছি। আমার সামনে আপনে খাইবেন। ধইরা দেখেন, এহনও গরম…..”

৩.

আমাদের দেশে যে হারে ‘বিভিন্ন ফরম্যাটে’ অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হয়–তার নজির বোধ হয় এই ওয়ার্ল্ডের অন্য কোথাও নেই। ‘বিভিন্ন ফরম্যাটে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার’–কথাটা Elaborate করি। এর অর্থ- যে যোগ্য নয়- এদেশে সে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করছে, যে ইনফেকশনে যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন তা ব্যবহার না করে না বুঝে অন্য অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স ডিউরেশন ঠিক না থাকা ইত্যাদি।

জীবাণু যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হচ্ছে- তার পিছনে এগুলোই কিন্তু কারণ। এর ফলাফল কিন্তু ভয়াবহ।

কতটুকু ভয়াবহ?

একটা তথ্য দেই- ২০৫০ সালে প্রতি ৩ সেকেন্ডে ১ জন মানুষ মারা যাবে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিন্ট্যান্সের কারণে। ভয়াবহতার প্রকোপটা বুঝে নিন..

৪.

বছর ৩-৪ আগের কথা। রাউন্ডে কাশির কোন রোগী পেলেই হলো- স্যাররা নানা কথায় ঘুরে ফিরে XDR TB( Extensively drug-resistant TB) তে এসে থামেন। কী যন্ত্রণা!

একদিন বাসায় এসে নেট সার্চ দিলাম। দেখি, XDR TB তো পুরোনো ইস্যু, দুনিয়ায় তখন তোলপাড় চলছে TDR TB ( Totally drug-resistant tuberculosis) নিয়ে। ইন্ডিয়া, ইরান ও ইটালী এই ধরনের রোগী নিয়ে Case report করেছে।

আমাদের দেশে TB এর যে ব্যাপকতা এবং যে হারে এদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার চলে–তা চিন্তা করে আমি ভয়ে ঢোঁক গিললাম..

৫.

বাঙালি কতটা করিৎকর্মা, আসেন তার একটা উদাহরণ দেই….

১৯৮৭ থেকে ২০১৬, প্রায় ৩০ টা বছর লেগেছে একটি নতুন জাতের অ্যান্টিবায়োটিক(Teixobactin) উদ্ভাবন করতে। এর পেছনে রয়েছে মিলিয়ন ডলারের গবেষণা আর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কিছু ডেডিকেটেড লোকের অক্লান্ত সাধনা।

বিদেশীরা উদ্ভাবন করেন, তা, বাঙালি কি করে? বাঙালি অ্যান্টিবায়োটিককে রেজিস্ট্যান্ট করে।

কিছুদিন আগে ICDDR’B এর একটা রিপোর্ট দেখলাম, ১৭ টা অ্যান্টিবায়োটিকের মাঝে Escherechia coli- ১৬ টাতেই রেজিস্ট্যান্ট। Proteus- ব্যাটা এক ধাপ উপরে, সে সবই রেজিস্ট্যান্ট!

i

যেখানে একটি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবন করতে ৩০ বছর লাগে, সেখানে বাঙালি প্রতি ৩ বছরে একটি করে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট করে! ভালোই….

৬.

কিছুদিন আগে একটা বিদেশী আর্টিকেল পড়ছিলাম।জঙ্গিরা নাকি এখন অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু খুঁজছে।

বন্দুক-পিস্তল-গুলির হাঙ্গামায় তারা আর যেতে চায় না, তাদের এখন দরকার অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট জীবাণু, কোনো জনবহুল এক এলাকায় কয়েক কোটি এরকম জীবাণু ছেড়ে দিয়ে চুপেচাপে কেটে পড়লেই হয়।

ইন্টারেস্টিং টপিক, কৌতূহল নিয়ে পড়ছিলাম, জঙ্গিরা বোধহয় এখনও বাংলাদেশের জীবাণুর খবর পায় নাই।

যাই হোক, যেটা বলতে চাচ্ছি সেটা ক্লিয়ার করি। অযাচিতভাবে যে মূর্খ দোকানদারগুলো অ্যান্টিবায়োটিক বিলাচ্ছে- তাদেরকে জঙ্গিদের উৎসাহদাতা হিসেবে গ্রেফতার করার কোন সুযোগ আছে কি? দু’একটা ক্রসফায়ার হলে কেমন হয়?

৭.

কাজের কথায় আসি। অবস্থাটা প্রতিকূল -তা স্বীকার করছি। নিচের Triad যদি বাস্তবায়ন করা যায়, তবে ৯০% সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করি, ১০% সমস্যা সব দেশেই থাকেঃ

(ক) ন্যূনতম MBBS/BDS ডাক্তার ব্যতীত অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা উচিত। মানেন কিংবা নাই মানেন–প্রবলেম ৭০% সলভড্।

(খ) আমাদের মত জুনিয়র ডাক্তারদের জন্য একটা গাইডলাইন তৈরি করা, ভারিক্কী কোন গাইডলাইন না, একদম পানির মত সহজ গাইডলাইন। কোন্ জায়গায় ইনফেকশন -সে অনুসারে একটা Preferred antibiotic, কাজ না হলে সেকেন্ডারী আরেকটা, তাতেও কাজ না হলে Specialist Referral….. মানেন কিংবা নাই মানেন, প্রবলেম আরও ১০% সলভড্…..

(গ) মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা, প্রয়োজনে ছোটখাটো ডকুমেন্টারি। প্রবলেম আরও ১০% সলভড্। এখানে একটু সমস্যা আছে। মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার অধিকাংশই আউল-ফাউল কাজে অধিকতর আগ্রহী। অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু- এটি বুঝে সেই রেসপন্সিবিলিটি নিয়ে কোন মেইনস্ট্রিম মিডিয়া নায়কোচিত ভাবে এগিয়ে আসবে কিনা, আমার তা জানা নেই…..

৮.

লেখা বড় হচ্ছে, শেষ করার আগে অ্যান্টিবায়োটিকের অগ্রহণযোগ্য ব্যবহার নিয়ে Centers for Disease Control and Prevention এর পরিচালক Dr. Tom Frieden এর দুটি উক্তি বলিঃ

“It would take the world back to a time when there were no antibiotics….”

“It is the end of the road for antibiotics unless we act urgently…..”

রাতে সন্তানকে বুকে নিয়ে ঘুমাতে যাই, উপরের উক্তি দুটো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ঘুমন্ত সন্তানের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকি। ২০৫০ সালে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর জন্য প্রতি ৩ সেকেন্ডে ১ জন করে মারা যাবে। আমি অস্থিরতা অনুভব করি। এ কোন পৃথিবীতে আমি আমার সন্তানকে রেখে যাচ্ছি! অসময়ে মৃত্যুর ভয়াল হাত থেকে কে তাকে রক্ষা করবে?

এই যখন অবস্থা, তখন হঠাৎ দেখি কিছু তরুণ-তরুণী অ্যান্টিবায়োটিকের অযাচিত ব্যবহার নিয়ে মানুষকে সচেতন করছে! ফেসবুকে স্ক্রলিং করি। কী অদ্ভুত! “আমি অ্যান্টিবায়োটিক সচেতন”–প্ল্যাকার্ড লিখে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে, সাদা বোর্ডে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে নিজের সচেতনতার কথা লিখে, সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে উৎসাহিত করে। আমি আনন্দিত হই। এরা কিভাবে যেন নিজের প্রোফাইল পিকচারও চেইন্জ করে, নিচে লেখা থাকে, “I Am Antibiotic Guardian”…

আমি আশান্বিত হই, চোখের কোনে আনন্দাশ্রু চিকচিক করে। মনে মনে বলি,

“You are not only antibiotic guardian….You are the guardian of the galaxy”

ডাঃ মোঃ আসাদুজ্জামান
MBBS (DMC), BCS (Health)

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (4 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
Ad

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

Ad