মারুফুর রহমান অপু

প্রশ্নটির উত্তর জানা নেই। ওর কি হয়েছে জানেন? ওকে আমরা মেরে ফেলছি, হ্যাঁ আমি আপনি, আমাদের মত মানুষেরাই। আমাদের পাপের ভার পড়েছে ৪ বছরের শিশুটির উপর।

বাচ্চাটি ক্লেবশিয়েলা নিউমোনি নামক একটি গোবেচারা টাইপ জীবানু দ্বারা আক্রান্ত। কিন্তু তার প্রস্রাব পরীক্ষা করে দেখা গেলো জীবানুটি আর গোবেচারা নেই। পরিচিত সব রকম এন্টিবায়োটিক দিয়ে জীবানুটিকে পরীক্ষাগারে মারার চেষ্টা করে দেখা গেলো জীবানুটির কিছুই হয়নি, তাই রিপোর্টে শক্তিশালী এন্টিবায়োটিকগুলোর নামের পাশে R অর্থাৎ রেজিস্টেন্ট বসে গেলো। এর মানে কি জানেন? এর মানে হলো এই এন্টিবায়োটিকগুলো দিয়ে বাচ্চাটিকে সুস্থ করা যাবে না, যার মাঝে ১০টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকার এন্টিবায়োটিকও আছে।

আমাদের দোষটা তাহলে কোথায় জানেন? আমরাই এই জীবানুটি তৈরি করেছি। অর্থাৎ বাচ্চাটি হয়তো এর আগে কোনদিনও কোন এন্টিবায়োটিক নেয়নি, সে সরাসরি আক্রান্ত হয়েছে এই মাল্টি ড্রাগ রেজিস্টেন্ট জীবানু দিয়ে। এই জীবানুটি কি করে মাল্টিড্রাগ রেজিস্টেন্ট হলো শুনবেন? এই ক্লেবসিয়েলা জীবানুটি কোন একসময় নিরীহ ছিলো। সে কোন একজনকে আক্রান্ত করেছিলো। সেই বেকুব লোক তখন দোকানে যেয়ে দুইটা এমোক্সিসিলিন খেয়ে দেখলো সুস্থ লাগছে, তাই বন্ধ করে দিলো। এখন দুইটা মাত্র খাবার কারণে অনেক ক্লেবশিয়েলা মারা গেলো কিন্তু কিছু বেঁচে রইলো, যেহেতু সে ডোজ কমপ্লিট করে নাই। এরা নিজেদের জেনেটিক মডিফিকেশন করলো যেন এমোক্সিসিলিন এদের মারতে না পারে যেহেতু এরা জানে এমোক্সিসিলিন দেখতে কেমন। ফলে তারা হয়ে গেলো এমোক্স রেজিস্টেন্ট। এদের বংশধর যেয়ে আরেক বেকুবকে আক্রান্ত করলো সে সেফিক্সিম দুইটা খেয়ে বন্ধ করে দিলো ফলে বেঁচে যাওয়া ব্যাক্টেরিয়া হয়ে গেলো সেফিক্সিম+এমোক্স রেজিস্টেন্ট। এভাবে তারা অন্যদের আক্রান্ত করতে থাকলো এবং ভুলভাল ডোজের কারনে ক্রমান্বয়ে সব ড্রাগের বিরুদ্ধে রেজিস্টেন্ট হয়ে উঠলো। এটাই মূল প্রক্রিয়া।

ফলে দেখা যাচ্ছে এই জীবানু তৈরিতে বাচ্চাটির হয়তো কোন ভূমিকা নেই। দোষ করেছে অন্য কেউ, শাস্তি পাচ্ছে বাচ্চাটি। সেই অন্য কেউ তার বাবা মা হতে পারে, নিকটাত্নীয় হতে পারে বা অপরিচিত কেউও হতে পারে, আমি, আপনিও হতে পারি।

এই বাচ্চাটিকে এখন বাঁচানো কঠিন। যেহেতু সব এন্টিবায়োটিক অকার্যকরি আর একটি শেষ ভরসা এন্টিবায়োটিক আছে যা হয়তো জীবানুটিকে মারতে পারবে কিন্তু কিডনির ক্ষতি করে ফেলবে, এমনকি এই শেষ ভরসা এন্টিবায়োটিকও হয়তো রেজিস্টেন্ট হতে পারে। এসব রোগী সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা আর নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জোরে বাঁচলেও বাঁচতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাঁচানো কঠিন।

পাপ মোচনের এখনো সময় আছে। হয়তো সব জীবানু রেজিস্টেন্ট হয়ে যায়নি। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দোকান থেকে ইচ্ছামত এন্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া বন্ধ করুন। আপনার চিকিৎসক যে ডোজে যতদিন খেতে বলেছে ততদিন সেই ডোজেই খান, না কমলে আবারো সেই চিকিৎসকের কাছে যান। জীবানুমুক্ত থাকার চেষ্টা করুন, হাত ধুয়ে খাওয়া, মাস্ক ব্যবহার, হাচি কাশির ভদ্রতা মেনে চলা- এগুলো পালন করুন। শুধু নিজে করলেই হবে না, অন্যকেও উৎসাহিত করুন, আপনি ফার্মেসী ব্যবসায়ী হলে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধ করুন, ফার্মেসীতে অন্য কাউকে এভাবে ওষুধ কিনতে দেখলে তাকে বোঝান, ভুয়া ডাক্তারদের চিহ্নিত করে ধরিয়ে দিন, চিকিৎসা পরামর্শ ফেসবুকে বা পাড়াপ্রতিবেশী থেকে নেবার প্রবনতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। কারণ-

এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবেন আপনি,
নবজাতকের কাছে এ আপনার দৃঢ় অংগীকার।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-