গত ২১ আগস্ট ঘটে গেল দ্য গ্রেট আমেরিকান সোলার এক্লিপস (আমেরিকান মিডিয়া এই নামেই ব্যাপারটাকে হাইপ আপ করেছে)। ১৯১৮ সালের পর এই প্রথমবারের জন্য আমেরিকার এক উপকূল থেকে অন্য উপকূল পর্যন্ত পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণটি দেখা গিয়েছে। এটি এই দশকের সবচেয়ে বড় জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত ঘটনাগুলির মধ্যে একটি। মার্কিনীরা ব্যাপারটা নিয়ে একটু বেশি উদ্বেলিত, তার কারণ এটি ছিলো ট্রানস-আমেরিকান, অর্থাৎ পুরো আমেরিকা ক্রস করে গিয়েছে।

আমরা জানি, পৃথিবী সূর্যের এবং চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে প্রদক্ষিন করছে। এই ঘোরাঘুরির মাঝে কখনো কখনো পৃথিবী এবং চাঁদ এমন পজিশনে আসে, যখন চাঁদ থাকে সূর্য আর পৃথিবীর মাঝখানে, চাঁদের ছায়ার কারণে পৃথিবীর কিছু অঞ্চল থেকে সাময়িকভাবে সূর্যকে দেখা যায় না। একে বলে সূর্যগ্রহণ। আবার যখন সূর্য আর চাদের মধ্যে পৃথিবী চলে আসে, তখন পৃথিবীর কারনে চাদের কোন অংশে সূর্যের আলো পরতে পারে না। একে বলে চন্দ্রগ্রহণ। এর মধ্যে সূর্যগ্রহণ তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত, দেখাও যায় একটি সংকীর্ণ এলাকা থেকে। সর্বোচ্চ অনুকূল পরিস্থিতিতে একটি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ সর্বোচ্চ ৭ মিনিট ৩১ সেকেন্ডের স্থায়ী হতে পারে এবং ২৫০ কিলোমিটার চওড়া পর্যন্ত একটি এলাকা জুড়ে দেখা যাবে। তবে একটি আংশিক গ্রহন দেখতে পাওয়া যায় এমন অঞ্চলটি বেশ বড় হয়। সূর্যগ্রহণ সাধারনত প্রতি আঠার মাসে একবার ঘটে।

২০১৭ সালের ৭ আগস্টের চন্দ্রগ্রহনের টাইম ল্যাপ্স ভিডিও, ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরি থেকে ধারণ করা।

স্পেস টেলিস্কোপ একটি অকাল্টর বা ঢাকনা (কেন্দ্রে) দিয়ে উজ্জ্বল সোলার ডিস্কটি ঢেকে সূর্যের চতুর্দিকের “করোনা” এলাকাটি দেখতে পারে. ছবিতে ২০০২ সালের সোহো অবজার্ভেটরি থেকে পর্যবেক্ষণ করা একটি ঘটনা (ক্রোনাল মাস ইজেকশন, ছবির উপরে এবং ডানদিকে) দেখানো হয়েছে। কিন্তু এই ধরনের অচ্চুলতরগুলো সূর্যের চারপাশের চারপাশের একটি অঞ্চলে আবার ঢেকে দেয়, যা শুধুমাত্র সৌর গ্রহনের সময়ই দেখা যায়।

সমস্ত গ্রহণ একই নয়, কখনও কখনও সূর্য সম্পূর্ণরূপে আচ্ছাদিত হয়, যাকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ বলা হয় এবং অন্য সময় চাঁদ শুধুমাত্র আংশিকভাবে সূর্যকে ঢেকে দেয়, যাকে আংশিক সূর্যগ্রহন বলে।

পাঠক হয়তো চিন্তা করছেন, “ইয়ার্কি করেন? চাঁদ সূর্য তুলনায় বহুত ছোট। এইটুকু একটা পিচ্চি সূর্যকে ঢেকে ফেলবে মানে?” হ্যাঁ, চাঁদ সূর্যের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ ছোট, কিন্তু আবার সূর্যের তুলনায় পৃথিবী ৪০০ গুণ কাছাকাছি। তাই যখন চাঁদ পৃথিবীর কাছাকাছি থাকে, তখন পুরো সূর্যটাকেই ঢেকে দেয়। আর দূরত্ব যদি খানিকটা বেশি হয়, তাহলে পুরো সূর্যকে না ঢেকে মাঝখানের অংশটাকে ঢাকে, ফলে সূর্যের বাইরের অংশ একটা রিং এর মত দেখায় যায়, যাকে এনুলার এক্লিপস বলে।

নিচের ছবিতে দেখুন-

বহু প্রাচীন কাল থেকে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষনের রেকর্ড পাওয়া যায়। ইউগ্যারিটিক ভাষায় লেখা একটি সিরিয়ান কাদামাটির ট্যাবলেট থেকে ৫ই মার্চ, ১২২৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সৌর গ্রহন দেখার রেকর্ড পাওয়া যায়। তবে ডক্টর পল গ্রিফিনের দাবী যে আয়ারল্যান্ডে একটি পাথরের ফলকে ৩০ নভেম্বর, ৩৩৪০ বি.সি. তে সূর্যগ্রহনের কথা উল্লেখ আছে। প্রায় ক্ষেত্রেই সূর্যগ্রহনের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে একটি চন্দ্রগ্রহণ হয় – একটি কাকতালীয় ঘটনা, যা প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি গ্রহন সম্পর্কে “পূর্বাভাস” করতে সাহায্য করেছে. প্রাচীন ব্যাবিলনীয়রা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সৌর গ্রহনের সূত্রপাতের পূর্বাভাস দিতে পারতো, এবং প্রাচীন গ্রিকরা প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে. আজকের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এক সেকেন্ড মার্জিনের মধ্যেই সূর্যগ্রহনের ব্যাপারে পূর্বাভাস দিতে পারেন। এই নিখুত নির্ভুলতার কারনেই “এক্লিপস চেজিং” নামের ক্রেজ তৈরি হয়েছে, যাতে বিজ্ঞানী এবং অবিজ্ঞানীরা তথ্য যোগার করা বা কেবল এই দিনে দুপুরে হঠাৎ দেখা দেয়া সংক্ষিপ্ত অন্ধকারবস্থার অভিজ্ঞতার স্বাদ নেয়ার জন্যেই বহু দূরবর্তী সব অঞ্চলে গ্রহনের পিছু নিয়ে থাকেন। একটি এক্লিপ্সের স্থায়ীত্বকাল মাত্র কয়েক সেকেন্ড থেকে সর্বোচ্চ সাত মিনিট পর্যন্ত হতে পারে। কাজেই একটি এলাকায় এক্লিপস শেষ হওয়া মাত্র তার পিছু পিছু পরবর্তী, এরপর তার পরবর্তী, এভাবে ধাওয়া করার শখ কারো কারো হতেই পারে! ১৯২৫ সালে বিজ্ঞানীরা প্লেনে করে সাথে একটি গ্রহণকে অনুসরণ করে; ১৯৭৩ সালে ধাওয়া করা হয় কনকর্ডে করে, সুপারসনিক স্পিডে!

সৌর গ্রহনের তুলনায় চন্দ্রগ্রহন অতটা বিরল নয়, প্রায় পুরো একটি  গোলার্ধ থেকে চাঁদের একটি গ্রহন দেখা যেতে পারে। চন্দ্রগ্রহণ চলেও বেশ লম্বা সময় ধরে, প্রায় কয়েকঘন্টা, এবং পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহন সাধারনত আধাঘন্টা থেকে এক ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

উপরের ছবিতে দেখানো ধুসর দাগের অংশটি জুড়ে পূর্ণগ্রাস গ্রহণ দেখা গিয়েছে। এছাড়া আমেরিকার বাকি সব জায়গা থেকেও আংশিক গ্রহণ দেখা গিয়েছে , সেই সাথে উত্তর ও দক্ষিন আমেরিকার বেশ কিছু অংশ, এমনকি ইউরোপ ও আফ্রিকার কিছু স্থান থেকেও। একুশে আগস্টের গ্রহণে দুই মিনিটের জন্যে ছিলো পূর্ণগ্রহণ, এবং আরো নব্বই মিনিটের জন্যে আংশিক গ্রহণ।

সূর্যের দিকে তাকানো চোখের জন্য ক্ষতিকর। তাই মহাজাগতিক এই ইভেন্টটি দেখতে হলে আপনাকে সোলার ফিল্টার সানপগ্লাস জোহাড় করতে হবে, যা ৯৯.৯৯ শতাংশের বেশি সূর্যালোকের পাশাপাশি অতিবেগুনী এবং ইনফ্রারেড বিকিরণকে ব্লক করে। এই চশমা পরলে সূর্যকে আকাশে একটি  ফেডেড কমলা বা সাদা ডিস্ক হিসাবে দেখায়। নাসা এবং আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির এপ্রুভড এ ধরনের চশমা নির্মাতাদের তালিকা রয়েছে যা সূর্য দেখার জন্য নিরাপদ এবং মানসম্মত চশমা তৈরি করে। এবার আমাজন থেকে চশমা কেনার আগে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছিল, তার কারন এবার এক্লিপসকে সামনে রেখে এমাজনের বিক্রি করা কিছু চশমা স্ট্যান্ডার্ড কোড মেনে তৈরি করা হয়নি বলে সেগুলো অনিরাপদ ঘোষনা করে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

তো, জেনে নিলেন প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো। এবার হয়ে যাবেন নাকি এক্লিপস চেজার?

ছবি- এক্লিপস ২০১৭

Comments
Spread the love