দিব্যি সুস্থ-স্বাভাবিক, দৃঢ় মানসিকতার একটা ছেলে সাদমান। তাকে রোগে-শোকে ভুগতে কিংবা অবসাদগ্রস্ত হতে খুব কমই দেখা গেছে। এমনকি গত বছর যখন দীর্ঘ তিন বছরের রিলেশনের পর তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে ব্রেক-আপ হয়ে গেল, তখনও বিন্দুমাত্র ভেঙে পড়তে দেখা যায়নি তাকে। নিজে তো একদম স্বাভাবিক ছিলই, এমনকি এর পরে ব্রেক-আপ হয়েছে এমন কয়েকজন বন্ধুরও কাউন্সেলিং করে দিয়েছে সে। দুঃসময়ে তাদের পাশে থেকেছে, মেন্টাল সাপোর্ট দিয়েছে।

সেই সাদমানকেই গত কয়েকদিন ধরে কেমন যেন ভীষণ আনমনা, বেখেয়ালি মনে হচ্ছে। কোন কাজেই মন বসাতে পারছে না। যে কাজটাতেই হাত দিচ্ছে সে, একটা না একটা ভুল করেই ফেলছে। নিজের ইমোশনকেও ঠিকঠাক কনট্রোল করতে পারছে না। আগে যেখানে প্রচন্ড বিরক্তিতেও কারও উপর গলা চড়াত না, সেখানে আজকাল খুব সামান্য কোন ঘটনার জের ধরেই অন্যদের সাথে রুড বিহেভ করছে সে। প্রায়শই রাতের বেলা হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় তার। বাকিটা রাত বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে কাটাতে হয়। চোখে আর ঘুম ধরা দেয় না।

অথচ আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে সাদমানের এমন আচরণের পেছনে কোন কারণই নেই। তার লাইফে সবকিছু তো ঠিকঠাকই চলছিল। ফ্রেন্ড সার্কেলে খুবই পপুলার সে। পড়াশোনাতেও যথেষ্ট ভালো। সিজিপিএ সবসময়ই ৩.৭৫ এর আশেপাশে থাকে। ফ্যামিলিতেও কোন সমস্যা নেই তার। বাবা-মা থেকে শুরু করে সবার সাথেই খুবই ভালো রিলেশন।

তাহলে সমস্যাটা কী সাদমানের? সে নিজে যেমন এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে পারল না, তেমনই তার আশেপাশের মানুষেরাও কোন সমাধান বাতলে দিতে পারল না। ফলে নিতান্ত বাধ্য হয়েই সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হলো সে। সাইকিয়াট্রিস্ট ভদ্রলোক খুব মনোযোগ সহকারে সাদমানের প্রতিটি কথা শুনলেন। তার জীবনকাহিনীর প্রতিটা ডিটেইলস শুনলেন, আর নোট ডাউন করে রাখলেন। এবং শেষমেষ তিনি একটা অব্যর্থ সিদ্ধান্তে আসলেন।

‘তুমি কি খেয়াল করেছ সাদমান, এখন চলছে মে মাস। এই মে মাসের সাথেই কিন্তু তোমার লাইফের একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা জড়িত। সেটা তুমি স্বীকার করো কিংবা না-ই করো। কারণ গত বছর এই মে মাসেই তোমার ব্রেক-আপ হয়েছিল তিন বছর ধরে রিলেশন করা মেয়েটার সাথে। এখন হয়ত তুমি সকলের সামনে প্রেটেন্ড করো যে সেই মেয়েটাকে তুমি একেবারেই ভুলে গেছ, কিন্তু আসলে কি তাই? ভালোবাসার মানুষকে কি এত সহজে ভোলা যায়? আর তার সাথে যে তোমার মে মাসে ব্রেক-আপ হয়েছে, এত বড় সত্যিটাও তুমি এতদিন নিজের কাছে নিজে আড়াল করার চেষ্টা করে এসেছ। কিন্তু কী লাভ তাতে! তোমার সাবকনশাস মাইন্ড কিন্তু এই তথ্যটা ঠিকই সংরক্ষণ করে রেখেছে যে মে মাস হলো তোমার ব্রেক-আপের মাস। তাই তো মে মাস আসার সাথে সাথেই তুমি এইসব সাইকোলজিকাল ডিজ-অর্ডারে আক্রান্ত হলে। তোমার এই সাইকোলজিকাল ডিজ-অর্ডারটার নাম হলো অ্যানিভার্সারি রিয়েকশন।’

হ্যাঁ পাঠক, শুনতে অদ্ভূত মনে হতে পারে বটে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষেই এই ধরণের একটা মানসিক রোগ রয়েছে, যাতে বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিনিয়ত ভুগছে। প্রতিটা মানুষের জীবনেই কিছু আনন্দের ঘটনা ঘটে, আবার কিছু দুঃখের ঘটনা ঘটে। আনন্দ-বেদনার উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো মানুষ তার মস্তিষ্কের একটা বিশেষ কুঠুরিতে সযত্নে লুকিয়ে রাখে। এবং বছরান্তে আবার যখন সেই ঘটনাটার সময় ফিরে আসে, মানুষ সেই ঘটনাটাকে পালন করে। সাদামাটা ভাষায় বছরান্তে কোন ঘটনার সময়কাল ফিরে আসাকে বলে অ্যানিভার্সারি।

এবং এই অ্যানিভার্সারির সাথে জড়িত ঘটনাগুলো মানুষের মনে বড় ধরণের একটা ছাপ ফেলে। সাধারণত ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি বা বার্থডে অ্যানিভার্সারিতে মানুষ খুব আনন্দ করে। তেমনই ডেথ অ্যানিভার্সারিতে তারা শোকাচ্ছন্ন থাকে। এমন আচরণকে নিছকই রিচুয়াল বা সামাজিক প্রথা মনে করলে ভুল হবে। এগুলো আসলে মানুষের মনোজগতের অভ্যন্তরে হতে থাকা ক্রিয়া-বিক্রিয়ারই বহিঃপ্রকাশ, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় অভিহিত করা হয় অ্যানিভার্সারি রিয়েকশন নামে। ভালো ঘটনার অ্যানিভার্সারি রিয়েকশনে ক্ষতির কিছু নেই, কিন্তু যেসব ঘটনার সাথে দুঃখ বা বেদনা জড়িত, সেগুলোর অ্যানিভার্সারি রিয়েকশনের ফল মারাত্মক হতে পারে; এমনকি প্রাণঘাতিও।

২০১৫ সালে স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে এ সংক্রান্ত একটা রিসার্চ করা হয়। সেই রিসার্চের আওতাভুক্ত ছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার বাবা-মা, যারা ১৯৭৩ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে তাদের সন্তানকে হারিয়েছেন। এই সময়কালের মধ্যে সন্তানকে হারিয়েছেন এবং পরবর্তীতে নিজেও মারা গেছেন, এমন মহিলাদেরকেও এই রিসার্চে রাখা হয়েছিল। দেখা গেছে, যে মাসে সন্তানেরা মারা গেছে, সেই মাসেই বাবা-মায়েরা অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশি রোগে ভুগেছেন, উদ্বিগ্ন থেকেছেন বা অবসন্ন ছিলেন। আবার যেইসব মায়েরা সন্তানের শোক সহ্য করতে না পেরে মারা গেছেন, তাদের মধ্যেও বেশিরভাগেরই মৃত্যু হয়েছে পরবর্তী কোন বছরের ঠিক সেই মাসের সেই সপ্তাহে, যখন তাদের সন্তান মারা গিয়েছিল। অর্থাৎ প্রতিটা ক্ষেত্রেই অ্যানিভার্সারিন রিয়েকশন প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।

আশঙ্কার বিষয় হলো, সমাজের প্রতিটা মানুষই অ্যানিভার্সারি বলতে কেবল প্রতি বছরের একটা নির্দিষ্ট দিনকেই মনে করে না। অনেকের কাছে অ্যানিভার্সারি বলতে প্রতি সপ্তাহের একটা বিশেষ দিন, কিংবা প্রতি মাসের একটা নির্দিষ্ট তারিখও হতে পারে। যেমন কোন একজন ব্যক্তি হয়ত কোন এক শনিবারে তার প্রিয় কফি মগটা ভেঙে ফেলেছিল। এরপর থেকে প্রতি সপ্তাহে শনিবার এলেই তার সেই কফি মগটার কথা মনে পড়তে থাকে, অর্থাৎ তার ভেতরে অ্যানিভার্সারি রিয়েকশন কাজ করতে থাকে। এই ধরণের অতিরিক্ত সেন্সিটিভ বা অনুভূতিপ্রবণ মানুষের পক্ষে বেশিদিন সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কঠিন। একটা পর্যায়ে গিয়ে তাদের বড় ধরণের শারীরিক বা মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। একবার চিন্তা করে দেখুন সাদমানের কথা। প্রেমিকাকে হারানোর স্মৃতি বছরে একবার তার মনে বড় করে হানা দিয়েছে। তাতেই তার জীবনে কত বড় বড় পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু সেই স্মৃতি যদি প্রতি মাসে একবার করে, বা প্রতি সপ্তাহে একবার করে তাকে তাড়া করে বেড়াত, তবে কতদিন তার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হতো?

অ্যানিভার্সারি রিয়েকশনের লক্ষণ: বিশেষ কিছু লক্ষণের মাধ্যমে চিহ্নিত করা সম্ভব যে কোন ব্যক্তি অ্যানিভার্সারি রিয়েকশনে ভুগছে কি না। এর মধ্যে প্রধান লক্ষণ হলো পুরনো স্মৃতিচারণ। প্রিয়জনের মৃত্যুর দিনে অনেকে হয়ত সেই দিনটিতে ঠিক কী কী হয়েছিল সেগুলো একে একে মনে করতে থাকবে। এবং কী না করে কী করলে প্রিয়জনকে বাঁচানো যেত, সেগুলো ভেবে হা-হুতাশ করতে থাকবে। এছাড়াও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো আশেপাশের মানুষের সংসর্গ এড়িয়ে চলা। নাটক-সিনেমায় যে একটা খুবই কমন ডায়লগ আছে, ‘আমাকে একটু একা থাকতে দিন’, এটা আসলে সেরকমই। আক্রান্ত মানুষটার কাছে আশেপাশের সব মানুষকে অসহ্যকর লাগতে আরম্ভ করবে, আর সে মনে করবে একা থাকলেই বোধহয় সে ভালো থাকবে।

পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তি প্রচন্ড মাত্রায় প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়বে। খুব অল্পতেই সে প্রতিক্রিয়া দেখাতে থাকবে। কেউ হয়ত তাকে উদ্দেশ্য করে অতি নিরীহ কোন জোক করল, কিন্তু দেখা যাবে তাতেই সে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠছে। তার প্রচন্ড রকমের মুড সুইং হতে থাকবে। সকালবেলা হয়ত মেজাজ ভালো আছে। একটু বেলা হতেই মেজাজ খুব খারাপ। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে আবারও মেজাজ ফুরফুরে তো সন্ধে থেকে আবার বাজে। আর সর্বশেষ লক্ষণটি হলো সবসময়ে একটা ভয়ের ভিতর থাকা যে খারাপ ঘটনাগুলো হয়ত আবারও তার সাথে ঘটতে পারে। এর ফলে প্রতিটা মুহূর্ত সে ভয়ে ভয়ে থাকবে যে এই বুঝি কিছু একটা হয়ে গেল। রাতে ঠিকমত ঘুম হবে না। কোন কাজেও মন বসবে না। যে কাজটাই করতে যাওয়া হবে, একটা না একটা ভুল হয়েই যাবে।

অ্যানিভার্সারি রিয়েকশন মোকাবিলায় করণীয়: পাঠকের মনে এতক্ষণে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জেগেছে, কীভাবে এই কঠিন সময়গুলোকে মোকাবিলা করা সম্ভব। সেরকমই চারটা সমাধান তুলে ধরছি আপনাদের সামনে।

১. আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন। প্রথম প্রথম হয়ত আপনি টের পাবেন না যে আপনি অ্যানিভার্সারি রিয়েকশনে ভুগছেন। কিন্তু পরপর কয়েকবার এমন হলে, এক সময়ে আপনি ঠিকই বুঝে যাবেন যে কেন আপনার সাথে এমন হচ্ছে। তারপর থেকে অগ্রিম বা পূর্ব সতর্কতা ব্যবস্থা নিতে ভুলবেন না। এই সময়টায় নিজের উপর কাজের চাপ বেশি দেবেন না। বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সদস্যদের সাথে বেশি সময় কাটাবেন। আপনি যদি কোন থেরাপিস্টের সাহায্য নিয়ে থাকেন, তবে এই সময়ের আগে-পরে তার কাছে একটু ঘন ঘন যাওয়ার চেষ্টা করবেন।

২. দুঃসহ স্মৃতিকে যেন ভুলে যেতে পারেন, সে উদ্দেশ্যে এ সময়ে নতুন কোন ভালো স্মৃতি তৈরির চেষ্টা করুন। যেমন এই সময়টায় আপনি দূরে কোথাও ট্যুরে যেতে পারেন। বন্ধুবান্ধবের সাথে পার্টি দিতে পারেন। আপনার যদি অনেক টাকা থাকে, সেখান থেকে কিছু টাকা গরিব-দুঃখীদের দান করতে পারেন। এমনকি কোন ভলান্টারি টিমের সাথে কাজ করাও শুরু করতে পারেন।

৩. এ সময়ে আপনাকে ধৈর্যশীল হতে হবে। মনে রাখতে হবে এই সময়টা সাময়িক। অ্যানিভার্সারি রিয়েকশনকে ইগনোর করা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ এটার কথা আপনি হয়ত মনে করতে চাইছেন না, কিন্তু আপনার অবচেতন মনে এটা ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই অযথা এটাকে ইগনোর করতে গিয়ে মনের উপর বাড়তি চাপ দেবেন না। স্রেফ ধৈর্য সহকারে এই সময়টাকে পার করুন। হুট করে এমন কিছু করে বসবেন না যাতে পরে পস্তাতে হয়।

৪. এমন কাউকে খুঁজে বের করুন যে এ ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করতে পারে। যেমনটা আগেই বলেছি, এক্ষেত্রে আপনার প্রথম পছন্দ অবশ্যই হবে কাছের বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সদস্যরা। তারা আপনাকে জানে, বোঝে। তাই সহজেই তারা আপনাকে মানসিক সমর্থন যোগাতে পারে। কিন্তু মাঝেমধ্যে হীতে বিপরীতও হতে পারে। তাদের যদি এসব ব্যাপারে নিজস্ব অভিজ্ঞতা না থাকে, তাহলে হয়ত তারা আপনার সমস্যাটার সাথে ঠিকঠাক রিলেট করতে পারবে না। তাই কীভাবে আপনাকে সমর্থন যোগাবে সেটাও তারা বুঝে উঠতে পারবে না। নিজেদের অজান্তেই তারা আপনাকে আঘাত দিয়ে বসবে। তাই সবচেয়ে ভালো হয় যদি আপনি এমন কোন বন্ধুকে খুঁজে বের করতে পারেন যার নিজেরও এ ধরণের সমস্যার ব্যাপারে অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে। একমাত্র সে-ই পারবে আপনাকে পুরোপুরি বুঝতে, আর সেই মোতাবেক আপনাকে সাহায্য করতে।

Comments
Spread the love