ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম: বেওয়ারিশ লাশদের অভিভাবক

বিশ শতকের শুরুতে উপমহাদেশের মানুষের জীবনের মূল্য আরও ঠুনকো হয়ে যায়। বঙ্গভঙ্গের কারণে দাঙ্গা হয়ে দাঁড়ায় খুব নিয়মিত বিষয়। মানুষ মারা পড়তে থাকে সেইসব অনর্থক দাঙ্গায়। এত এত লাশ চারিদিকে কিন্তু কেউ স্পর্শ করে না। সেটা যদি মুসলমানের লাশ হয় তাহলে হিন্দুরা স্পর্শ করবে না। মুসলমানরা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় গিয়ে সেই লাশ নিয়ে এসে দাফনের সাহসও রাখে না। ধর্মের দাঙ্গায় যে মারা যেত রাস্তায় পড়ে থাকত তার লাশ। কারও কারও লাশ যদিওবা রাস্তায় পড়ে থাকত না, তাকে ছুঁড়ে ফেলা হতো নদীতে।

শেঠ ইব্রাহিম মুহাম্মদ ডুপ্লে নামে সুরাটের একজন ব্যবসায়ী প্রথম উদ্যোগ নেন। ১৯০৫ সালে ‘আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম’ নামে একটি সংস্থা দাঁড় করান তিনি। সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় ছিল কলকাতায়। সেই সময়ের দাঙ্গায় যেসব মুসলমানের লাশ পড়ে থাকত রাস্তায় কিংবা অন্য কোথাও, ডুপ্লে ব্রিটিশ সরকারের কাছে সেসবের ইসলামিক নিয়মনীতি মেনে দাফনকার্য করার অনুমতি চান। তিনি অনুমতি পেয়ে যান, বেওয়ারিশ লাশ দাফন করবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। সেই থেকে ১১৩ বছর ধরে সংস্থাটি বেওয়ারিশ লাশের সৎকার কাজ করে আসছে।

১৯৪৭ সালের পার্টিশনের পর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের শাখা সম্প্রসারণ করা জরুরী হয়ে পরে। কলকাতা থেকে ঢাকাতেও একটি শাখা স্থাপন করা হয় এবং সেসময়ের সংস্থাটির একজন ব্যবস্থাপককে ঢাকার দায়িত্ব দেয়া হয়। ’৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে বাংলাদেশেও বেওয়ারিশ লাশ দাফন করার কার্যক্রম শুরু করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। প্রতিষ্ঠার একশ’ বছর পরে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম কেবল বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কাজ নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সামাজিক উন্নয়নমূলক নানা কার্যক্রমের সংস্থাটির সফল বিস্তার ঘটেছে বছরের পর বছর।

অন্যান্য কার্যক্রমে জড়িত থাকলেও এই দেশের মানুষের কাছে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের পরিচিত মূলত বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কাজে সম্পৃক্ত থাকার কারণে। পুলিশ, স্থানীয় জনগণ কিংবা মেডিকেল কলেজের মর্গ থেকে বেওয়ারিশ লাশের খোঁজ পায় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কর্তৃপক্ষ। বছরে এক থেকে দুই হাজার বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে সংস্থাটি। ড্রাইভার এবং সংস্থার কর্মচারীরা লাশ সংগ্রহ করে ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার-আচরণ মেনে লাশকে দাফনের জন্য প্রস্তুত করে। ঢাকার জুরাইন কবরস্থানে কিংবা আজিমপুর কবরস্থানে এই লাশগুলো দাফন করা হয়। লাশ যাতে দাফনের পর চুরি হয়ে না যায় এজন্য সংস্থা থেকেই পাহাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

ধনীদের জন্য আঞ্জুমানের ‘দাফন সেবা প্রজেক্ট’ নামের একটি কার্যক্রম আছে। মৃতদের ইসলামিক আচার অনুসারে গোসল করানো এবং দাফনের জন্য প্রস্তুত করে দেওয়া এই কার্যক্রমের অংশ। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জরুরী এম্বুলেন্স সার্ভিসও আছে আঞ্জুমান মুফিদুলের। লাশবহন করার জন্য কয়েকটি এম্বুলেন্সও আছে। সাধারণত রাজধানী ঢাকার ভেতরে নির্দিষ্ট পরিমাণে টাকা পরিশোধ করে সে এম্বুলেন্স ব্যবহার করা যাবে। ঢাকার বাইরে গেলে রাস্তাঘাট-সেতুর টোল, ফেরি খরচ এবং জ্বালানী খরচ বহন করতে হয়। একদম অস্বচ্ছল পরিবারকে আঞ্জুমান এম্বুলেন্স সার্ভিস বিনামূল্যে দেওয়া হয়। সকল ধর্মের লোক আঞ্জুমানের এম্বুলেন্স সার্ভিসটি পেতে পারে।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম তিনটি এতিমখানা পরিচালনা করে। দুইটি ঢাকার গেন্ডারিয়ার এবং আরেকটি নারায়ণগঞ্জে। তিনশ’রও বেশি শিশু এতিমখানাগুলোতে থাকে। অন্যান্য এতিমখানাগুলো থেকে আঞ্জুমানেরগুলো ব্যতিক্রম। এখানে বাচ্চাদের জন্য খেলার মাঠ রয়েছে, প্রত্যেক শিশুর জন্য আলাদা বিছানা এবং পড়ার টেবিল রয়েছে। সাধারণত পাঁচ থেকে সাত বছরের অভিভাবকহীন শিশুরা এতিমখানায় ভর্তি হতে পারে এবং ষোল বছর বয়স পর্যন্ত সেখানে তাদের পড়াশোনা এবং দেখভাল করা হয়। ভবিষ্যত কর্মসংস্থানের ব্যাপারটিও আঞ্জুমান মুফিদুল দায়িত্ব সহকারে পর্যালোচনা করে। সেখানে অবস্থানকালীন সময়ে ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেলাই প্রশিক্ষণ কিংবা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রভৃতি সংস্থাটির নিজস্ব উদ্যোগে হয়।

এতসব দাতব্য কার্যক্রম চালানোর জন্য আঞ্জুমানের তহবিল গঠন করা হয় বহুমুখীভাবে। সরকারী অনুদান, ব্যক্তিগত দান, জাকাত তহবিল, বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অর্থ সংগ্রহ, নিজস্ব বিভিন্ন স্থাপনা থেকে উত্তোলিত ভাড়ার অর্থ প্রভৃতি থেকে একরকম মোটা অংকের তহবিল আছে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের। ঢাকাসহ অন্যান্য শহরের বিভিন্ন জায়গায় সংস্থাটির নিজস্ব মালিকানায় বেশ কিছু জমি-জমা, দোকান ফ্ল্যাট কিংবা ভবন রয়েছে। আঞ্জুমানের হৃদয়বান দাতাব্যক্তিগণ বিভিন্ন সময়ে এইসব সংস্থার তহবিলে দান করে। এছাড়া কিছু কিছু সংস্থা থেকেও কিনে রাখা হয়। সেসব থেকে আগত অর্থ সংস্থার তহবিলে যোগ হতে থাকে।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের বেওয়ারিশ লাশ সৎকার নিয়ে একটা খটকা লেগে থাকে যে আঞ্জুমান কি কেবল মুসলমানদের লাশ হলেই সৎকার করে? বেশ কয়েক বছর আগে একটি পত্রিকাকে আঞ্জুমান থেকে জানানো হয়, আঞ্জুমান যদি কোনো ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের লাশ সনাক্ত করে তাহলে তারা সেই ধর্ম সংশ্লিষ্ট কোন সংগঠনের সাথে যোগাযোগ করে যারা সেই লাশটির সৎকার কার্যক্রম সম্পন্ন করবে। তবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম কেবল মুসলমানদের বেওয়ারিশ লাশ নিয়ে কাজ করে, এমন ধারণা নিয়ে থাকার কারণে অন্যান্য ধর্মের সৎকার সংগঠনগুলো আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সাথে কাজ করতে আগ্রহ বোধ করে না।

 
Comments

Tags

Related Articles