আপনি-ই সাংবাদিকইনসাইড বাংলাদেশ

একজন মুক্তিযোদ্ধাকে এভাবে ‘অপমান’?

পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগে রাঙামাটির ঘাগড়া বাজারে পতিত খাস জমিতে ঘর তুলে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেছিলেন অনিল সেন। বয়স হয়েছে তার, শরীর ভেঙে পড়েছে এখন অনেকটা। নিজে নিজে হাঁটাচলা করতেও কষ্ট হয় তার। দেখে বোঝার উপায় নেই, এই মানুষটাই সাতল্লিশ বছর আগে দেশমাতৃকার টানে হাতে রাইফেল তুলে নিয়েছিলেন, হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে একাত্তরে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীনতা।

বৃদ্ধ অনিল সেন গত পরশু অবাক চোখে তাকিয়ে দেখলেন, যে দেশটাকে তিনি স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন অনেকগুলো বছর আগে, সেই দেশের সরকারের কিছু কর্মচারী, সেই দেশেরই আদালতের নির্দেশ দেখিয়ে তার বসত বাড়ীটাটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলো! পূজোর ঘর, ঠাকুরের ছবি, সব ভেঙে চুরমার করে দিলো তারা। অসহায় চোখে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি অনিল সেন। তার ছেলেরা প্রতিবাদ করেছিল, কিন্ত উচ্ছেদ করতে আসা সরকারী কর্মকর্তারা বলেছেন, এই জায়গায় নাকি বেআইনীভাবে বসবাস করছেন তারা! আদালতের নোটিশ পেয়েই তাদের উচ্ছেদ করতে এসেছেন পুলিশ আর প্রশাসনের কর্তারা। অনিল সেন অশ্রুসজল চোখে তাকিয়ে রইলেন, দেখলেন, যে দেশের জন্যে তিনি জীবন বাজী রেখেছিলেন, সেই দেশের কিছু মানুষ কেমন করে তাকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করলো! 

মুক্তিযোদ্ধা, ভিটেবাড়ি, উচ্ছেদ, রাঙামাটি, আদালত

সেমি-পাকা ঘরটা ভেঙে পড়লো চোখের সামনেই। জিনিসপত্র সব সরানোর সময়টাও পাওয়া গেল না ঠিকমতো। মাটিতে লুটোপুটি খেতে দেখা গেল অনিল সেনের মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র আর সম্মাননাগুলোকে। সেগুলোর একটা হাতে নিয়ে খোলা আকাশের নীচে বসে ছিলেন অনিল সেন, দুই চোখে অসহায়ত্ব। একাত্তরে যে হাতে বন্দুক ধরেছিলেন, সেই শীর্ণকায় হাত আজ আঁকড়ে ধরে আছে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়পত্রটা। এই ছবিটায় যে কতখানি অপমান আর অবহেলা মিশে আছে, সেটা অনেকেই হয়তো বুঝবেন না।

এত বছর এই জায়গাটায় নির্বিঘ্নেই বসবাস করে আসছিলেন অনিল সেন, ঝামেলা ছিল না কোন। কয়েক বছর আগে রাজ্যমনি আর বিশ্বজিৎ নামের স্থানীয় দুই ব্যক্তির সঙ্গে জমি নিয়ে অনিল সেনের বিরোধ দেখা দিয়েছিল। এর জের ধরেই অনিল সেনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন রাজ্যমনি ও বিশ্বজিৎ। সেই মামলায় আদালতের রায়ে গত বৃহস্পতিবার তাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে স্থানীয় প্রশাসন। এ সময় অনিল সেনের মাথা গোঁজার ঠাঁই একমাত্র ইটের তৈরি সেমি-পাকা ঘরটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। থাকার আর কোন জায়গা না থাকায় পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নীচেই আশ্রয় নিতে হয়েছে অনিল সেনকে। 

অভিযোগ আছে, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার আগে নাকি অনিল সেনের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন নোটিশই দেয়া হয়নি। নুরুল আমিন নামের স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন- “বৃহস্পতিবার দুপুরে আমরা ভাংচুরের খবর পেয়ে অনিল সেনের বাড়িতে আসি। এখানে এসে দেখি তার বাড়ি ভাঙা হচ্ছে। তখন আমরা দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্ত তারা আমদের সঙ্গে কথাই বলতে চাননি। আমরা শুনেছি নোটিশ না দিয়েই অনিল সেনের বাড়ি ভাঙা হয়েছে।” 

মুক্তিযোদ্ধা, ভিটেবাড়ি, উচ্ছেদ, রাঙামাটি, আদালত

অনিল সেনের বড় মেয়ে রুমা বাবার বাড়ি ভাঙার খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন শ্বশুরবাড়ি থেকে। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন- “খবর পেয়ে আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে এসে দেখি আমাদের সাজানো সংসার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার বাবা বাইরে বসে কান্না করছেন। আর মা অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন। এই জায়গায় আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই বাস করছেন, তখন আমাদের সবার জন্মও হয়নি। ইটের ঘর তো উঠেছে আরও অনেক পরে। এভাবে কেন আমাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে আমরা কিছুই জানিনা।” ঘটনাস্থলে উপস্থিত রাঙামাটির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পল্লব হোম দাশ শুধু বলেছেন- ‘আদালতের নির্দেশে পেয়েই আমরা কাগজ দেখে উচ্ছেদ করেছি।’

এদিকে মুক্তিযোদ্ধা অনিল সেনকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের খবর শুনে সেখানে ভীড় জমায় এলাকার মানুষ। প্রশাসনের এমন হটকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক মানববন্ধনের আয়োজন করে তারা। অনিল সেনের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের কথা শুনে দুপুরেই ঘটনাস্থলে এসেছেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক। তিনি বলেছেন- “মুক্তিযোদ্ধা অনিল সেন দীর্ঘদিন ধরে ওই জমিতে বসবাস করে আসছিলেন। তার বাড়ি নিয়ে আদালতে একটা মামলা হয়েছিল। সেই মামলায় রায় তার বিপক্ষে গেছে, এজন্যেই আদালতের আদেশে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।” তবে জেলা প্রশাসন অনিল সেনের পাশে থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মামুনুর রশীদ, অচিরেই ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারটির পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। অনিল সেনকে এককালীন দশ হাজার টাকা অর্থসাহায্যও দেয়া হয়েছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। 

মুক্তিযোদ্ধা, ভিটেবাড়ি, উচ্ছেদ, রাঙামাটি, আদালত

প্রশ্নটা হচ্ছে, একজন মুক্তিযোদ্ধা অনিল সেনকে যেভাবে দিনে দুপুরে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হলো, যেভাবে তাকে অপমান করা হলো, সেই অপমানের ক্ষতিপূরণটা কি দশ হাজার টাকায় দেয়া সম্ভব? কোন অঙ্কের টাকা দিয়ে কি অনিল সেনের চোখের জলের মূল্য চুকিয়ে ফেলা যাবে? যে মানুষটা বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্যে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন একদিন, স্বাধীন বাংলাদেশ সেই মানুষটার বাড়িঘর ভেঙে দিয়ে সেখান থেকে তাকে উচ্ছেদ করেছে, তাকে খোলা আকাশের নীচে এনে দাঁড় করিয়েছে। এই কষ্টটার, অবর্ণনীয় এই যন্ত্রণাটার ক্ষতিপূরণ কি কেউ দিতে পারবেন?

এদেশে যখন কোটা সংস্কারের কথা উঠলো, তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাইকোর্টের রায়ের কথা বলেছিলেন, রায়ে আছে, সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে ত্রিশ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখতে হবে। সেই দেশেই আদালতের রায়ে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে তার বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হলো, ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হলো তার এত বছরের সাজানো সংসার, তার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের সম্মাননাগুলো পড়ে রইলো ধ্বংসস্তুপের ভীড়ে! মাথার ওপরে ছাদ আর পায়ের নিচে মাটিই যদি না থাকে, অনিল সেনের মতো মুক্তিযোদ্ধারা ত্রিশ পার্সেন্ট কোটা নিয়ে করবেনটা কি, কেউ বলতে পারেন?

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close