আমির খান, যিনি তথাকথিত একজন সুপারস্টারই শুধু নন। বরং তিনি এমন একজন অভিনেতা ও চলচ্চিত্র-ব্যক্তিত্ব, যার হাত ধরে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। কেননা একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বলিউডের ছবিকে দুইটি মোটা দাগে বিভক্ত করা যেত। হয় একটি ছবি হবে ইন্টেলেকচুয়াল ঘরানার। গল্প বা কাহিনীই যে ছবির প্রাণ। অথচ খুব বেশি দর্শক টানতে পারবে না সেই ছবি। অথবা ছবিটি হবে নিছকই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নির্মিত। নির্দিষ্ট কিছু ফর্মুলা মেনে তৈরি ছবিটিতে কোন যুক্তিসঙ্গত কাহিনী থাকুক বা না থাকুক, বক্স অফিসে ঠিকই সফলতার দেখা পাবে সে ছবি। আর তার ফলে দর্শক সে ছবি দেখে তৃপ্তি পাক বা না পাক, হাসি ফুটবে সেই ছবির সাথে সংস্লিষ্ট সকলের মুখেই। কিন্তু ‘মিস্টার পারফেকশনিস্ট’ আমির খানই হলেন সেই ব্যক্তি যিনি বদলে দিয়েছেন বলিউড ছবির এই চিরাচরিত সংজ্ঞা।

অনেকটা আমির খানের অবদানেই আজ বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এমন একটি অবস্থানে এসে পৌঁছেছে যে এখান থেকে নির্মিত ছবির কথা শুনলেই মানুষ আর নাক সিঁটকায় না, বরং বিশ্বাস করে এখান থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির মধ্যেও রয়েছে বিশ্বের অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রির ছবির সাথে সমানে সমানে টক্কর দেবার সামর্থ্য। কিন্তু এভাবে যে তাঁর হাত ধরেই বদলে যাবে বলিউডের ছবির গতিপথ, তা কি নিজেও জানতেন আমির খান? মোটেই না। বরং ক্যারিয়ারের এক পর্যায়ে তিনি নিজেই হয়ে পড়েছিলেন দারুণ হতাশ। এবং সেই হতাশা কাটিয়ে উঠতে তিনি নিয়েছিলেন এমন যুগান্তকারী কিছু সিদ্ধান্ত, যা কেবল তার জীবন ও ক্যারিয়ারকেই খোলনলচে পাল্টে দেয়নি, পাল্টে দিয়েছিল গোটা ইন্ডাস্ট্রিকেই। কী ছিল সেই সিদ্ধান্তগুলো? চলুন জেনে আসি।

আমিরের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের সূচনা ঘটে ১৯৮৮ সালে, কায়ামাত সে কায়ামাত তাক ছবির মাধ্যমে। চাচাতো ভাই মনসুর খান পরিচালিত সেই ছবিটি দর্শকমহলে সাংঘাতিক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। আর তার বদৌলতে আমিরও রাতারাতি বনে গিয়েছিলেন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা। কিন্তু তিনি এই হঠাৎ পাওয়া জনপ্রিয়তা খুব বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি। কায়ামাত সে কায়ামাত তাক হিট হওয়ার পর আমির বেশ কিছু ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হন। কিন্তু প্রায় সবগুলো ছবিই মুখ থুবড়ে পড়ে বক্স অফিসে। এমন অবস্থা দাঁড়ায় যেন ক্রমেই পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে শুরু করে আমিরের। ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য।

যখন একের পর এক ছবি মুক্তি পেতে থাকে আমিরের, এবং সেগুলো সবই চরম আকারের ব্যর্থ হতে থাকে, তখন আমিরের মধ্যে এই উপলব্ধি জন্মায় যে কোথাও খুব বড় কোন ভুল করছেন তিনি। কিন্তু সেটি যে ঠিক কী, তা প্রথমে বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার নিয়ে আরও এগিয়ে যাওয়ার আগে তাঁকে কিছুদিন আত্ম-মূল্যায়ন করে কাটাতে হবে। কোথায় কী ভুল হয়েছে সে সব কিছু পর্যালোচনা করতে হবে। এবং এই পর্যালোচনা করতে গিয়েই তিনি আবিষ্কার করলেন যে ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে অভিনয় করাকে তিনি যতটা উপভোগ করতেন, এখন তার সিকিভাগও করছেন না।

কায়ামাত সে কায়ামাত তাক ছবির শুটিং চলাকালীন তিনি ছবিটির সাথে মানসিকভাবে এতটাই জড়িয়ে পড়েছিলেন যে সারাক্ষণ তার মনের মধ্যে এই ছবি সংক্রান্ত চিন্তাভাবনাই ঘুরপাক খেত। সারাদিন তিনি চিন্তা করতেন কীভাবে নিজের শতভাগেরও বেশি উজাড় করে দেয়া যায়। আর এ ধরণের মানসিকতার কারণেই তিনি অনেক বেশি আনন্দ নিয়ে কাজটি করেছিলেন, আর তার ফলও পেয়েছিলেন হাতেনাতে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি একদমই ভিন্ন। এই মুহূর্তে তিনি আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ব্যস্ত। একসাথে কাজ করছেন অনেকগুলো ছবিতে। কিন্তু কোন কাজেই ঠিকমত মনোনিবেশ করতে পারছেন না তিনি। কোন কাজ ভালো করে করার জন্য চাই সেই কাজে পূর্ণ মনোযোগ, আর নিজের সামগ্রিক সত্ত্বাকে সেই কাজে উৎসর্গ করে দেয়া। কিন্তু একসাথে অনেকগুলো কাজ করার ফলে সেটি সম্ভব হচ্ছিল না তার পক্ষে। একটি প্রজেক্টের সাথেও মানসিক সংযোগ স্থাপন করতে পারছিলেন না। সব কাজই করছিলেন কেমন যেন ছাড়া ছাড়া ভাবে। আর তার প্রভাব পড়ছিল তার কাজ ও কাজের ফলে।

সুতরাং এখন আমির জেনে গেছেন যে প্রকৃত সমস্যাটা কোথায়। কেন তিনি কাজ করে মানসিক তৃপ্তি ও সন্তুষ্টি লাভ করতে পারছেন না। আর কেনই বা তার ছবিগুলো বক্স অফিসে সাফল্য পাচ্ছে না। সমস্যা চিহ্নিতকরণ তো হয়ে গেছে। এখন তাঁকে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। এজন্য তিনি আবার নতুন উদ্যমে ভাবনাচিন্তা শুরু করলেন। এবং বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছুদিন ভাবনাচিন্তা চালিয়ে যাওয়ার পর তিনি এমন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন, যা পরবর্তী সময়ে বদলে দেয় তার গোটা ক্যারিয়ার ও সামগ্রিক জীবনকেই।

আমিরের নেয়া সিদ্ধান্তটি কিন্তু খুব বেশি জটিল ছিল না। বরং সেটি ছিল খুবই সোজাসাপটা একটি সিদ্ধান্তঃ এখন থেকে তিনি একবারে কেবল একটি ছবিই করবেন। ছবিটি করতে কত সময় লাগল, তা নিয়ে তিনি একদমই ভাবিত হবেন না। তার মনোযোগ থাকবে কেবল ওই একটি ছবির প্রতিই। তিনি তাঁর সমস্ত মনোযোগ আর শক্তি ব্যয় করবেন ওই একটি ছবি যথাযথভাবে শেষ করার জন্যই। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এ সিদ্ধান্তকে অনেকের কাছেই অনেক সহজ মনে হতে পারে। কেননা ইদানিং তো প্রায় সব বড় অভিনেতাই একবারে স্রেফ একটি ছবিতেই কাজ করেন। তাদেরকে তো একসাথে একাধিক ছবিতে কাজ করতে দেখা যায় না। কিন্তু পাঠক, ভুলে যাবেন না আমরা কথা বলছি আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগেকার একটি সময়ের ব্যাপারে। সেই সময়ে কোন অভিনেতাই শুধু একটি ছবি নিয়েই পড়ে থাকতেন না। বরং এমন অনেক প্রথম সারির অভিনেতাও ছিলেন যারা একই সময়ে ৫/৭টি ছবিতে কাজ করছেন। অথচ সেই সময়ে দাঁড়িয়ে আমির সিদ্ধান্ত নিলেন একবারে একটিমাত্র ছবি করার।

বলাই বাহুল্য, সিদ্ধান্তটি ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এবং সেই সাথে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিংও। এমন একজন অভিনেতা, যার সাম্প্রতিক প্রায় সব ছবিই বক্স অফিসে ব্যর্থ, তাঁর জন্য হুট করে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া নিতান্তই বিলাসিতা। তাই অনেক শুভান্যুধায়ীই আমিরকে সাবধান করে দিলেন এই বলে যে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া খুবই আত্মঘাতি হয়ে যাচ্ছে। তিনি যেন এমন বালখিল্য সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। কিন্তু আমির জানতেন, এমন সিদ্ধান্তের সাথে অনেক বেশি ঝুঁকি জড়িয়ে থাকলেও, ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এটিই সর্বোৎকৃষ্ট উপায়ে। তাই যত ঝুঁকিই থাকুক, এই চ্যালেঞ্জটুকু তাঁকে নিতে হবেই।

যেহেতু আমির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে এখন থেকে তিনি একবারে কেবল একটি ছবিই করবেন, তাই তাঁর সামনে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ এসে উপস্থিত হলো। আর সেটি হলো সঠিক স্ক্রিপ্ট বেছে নেয়া। আগে স্ক্রিপ্ট বাছাইয়ের কাজটিকে অত বেশি গুরুত্ব না দিলেও চলত। হয়ত তিনি একসাথে তিনটি ছবি করছেন। সেই তিনটির মধ্যে একটির স্ক্রিপ্ট কোনভাবে যদি খারাপ হয়েও যেত, তবু বাকি দুইটি ছবির সাফল্য দিয়ে একটির ব্যর্থতাকে সহজেই পুষিয়ে নেয়া যেত। কিন্তু এখন তো আর সে সুযোগ নেই। একবারে একটি ছবিই করবেন তিনি। অথচ সেই ছবিটিই যদি ভালো না হয়, তবে তো আম-ছালা দুই-ই যাবে। তাই এখন থেকে তাঁকে স্ক্রিপ্ট নির্বাচনে আগের চেয়েও অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। যদি স্ক্রিপ্ট পছন্দসই না হয়, তবে সেই ছবির পরিচালক, প্রযোজক বা সহ-অভিনেতা যে-ই হোন না কেন, সরাসরি ‘না’ বলে দিতে হবে তাঁকে। অর্থাৎ এখন ইন্ডাস্ট্রির অনেকের সাথে সম্পর্কেও অবনতি ঘটবে তাঁর।

এমনই একটি পরিস্থিতিতে খুব বড় ধরণের একটি পরীক্ষার সম্মুখীন হলেন আমির। বরাবরই তিনি চেয়ে এসেছেন মহেশ ভাটের ছবিতে কাজ করতে। সেই সময়ে মহেশ ভাট ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিচালকদের একজন। অন্যদিকে আমিরের সাম্প্রতিক সব ছবিই ব্যর্থ। এমন একটি সময়ে তিনি যদি মহেশ ভাটের ছবিতে কাজ করেন, শতকরা নব্বই ভাগ সম্ভাবনা যে তাঁর ক্যারিয়ার আবারও প্রাণ ফিরে পাবে। তাই তিনি যখন মহেশ ভাটের ছবিতে কাজের প্রস্তাব পেলেন, সকলেই ভেবেছিলেন সাথে সাথেই রাজি হয়ে যাবেন তিনি। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে মহেশ ভাটের মত একজন নির্মাতার মুখের উপর ‘না’ বলে দিলেন তিনি। কিন্তু কেন? কারণ মহেশ ভাটের প্রস্তাবিত ছবিটির স্ক্রিপ্ট তাঁর মনোঃপুত হয়নি। আর স্ক্রিপ্ট পছন্দ না হলে যে সে ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হবেন না তিনি!

এভাবেই ঘরের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলে দিলেন আমির। এবং শেষ পর্যন্ত এটিই পরিণত হলো তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্টে। একজন স্ট্রাগলিং অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও সেদিন মহেশ ভাটের মুখের উপর ‘না’ বলে দিয়ে যে অসীম সাহসিকতা তিনি দেখিয়েছিলেন, তা বলিউডের ইতিহাসে আজও কিংবদন্তীতুল্য হয়ে আছে। আর এ ঘটনার মাধ্যমেই ইন্ডাস্ট্রির সকলের চোখে আমির এক নতুন ইমেজ নিয়ে আবির্ভূত হলেন। সকলেই বুঝতে পারল যে তিনি অন্যদের মত নন। তিনি একেবারেই আলাদা। আর এ ঘটনায় আমির নিজেও নিজের উপর আত্মবিশ্বাস ও আস্থা ফিরে পেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে তাঁর মনের জোর ঠিক কতটা, যে-কারণে নিশ্চিত সাফল্যের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও স্রেফ স্ক্রিপ্ট পছন্দ না হওয়ায় তিনি ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় নির্মাতাদের মধ্যে একজনকে প্রত্যাখ্যান করে দিতে পারেন।

এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি আমিরকে। একবার সাহস করে মহেশ ভাটকে ‘না’ করে দেয়ার পর আর কাউকেই ‘না’ করতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হয়নি তাঁকে। যখনই কোন ছবির স্ক্রিপ্ট নিজের পছন্দসই হয়নি, সে ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি। আবার কোন ছবির স্ক্রিপ্ট যদি পছন্দ হয়ে থাকে, তবে সে ছবির পরিচালক কে, প্রযোজক কে, কিংবা সে ছবি এর আগে কোন কোন সুপারস্টারের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে এসেছে – সেসব কোনকিছু নিয়েই মাথা ঘামাননি তিনি। ছবির স্ক্রিপ্টকেই তিনি সবসময় ঈশ্বরজ্ঞান করে এসেছেন। এবং সবসময় সেরা স্ক্রিপ্টটিকেই বেছে নিয়ে, একবারে স্রেফ একটি ছবিই করে গেছেন তিনি। তাই তো তাঁর প্রতিটি ছবিতেই এখন যত্নের ছাপ থাকে স্পষ্ট। তিনি মিস্টার পারফেকশনিস্ট। তাই দর্শক নির্দ্বিধায় তাঁর ছবি দেখতে যেতে পারে। কারণ সবাই জানে, ছবির গুণ ও মান নিয়ে আপোষ করার মত লোক নন তিনি। তাই তো সারাবছর তিনি আলোচনার মধ্যমণি হয়ে না থাকলেও, যখন তাঁর নতুন কোন ছবি আসে তখন ঠিকই দর্শকের ঢল নামে প্রেক্ষাগৃহে।

এভাবেই গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে নিজেকে একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করেছেন আমির খান, যার সাথে তুলনা চলে না আর কারোরই। আর এই সবকিছুরই মূলে রয়েছে সেই ছোট্ট একটি সিদ্ধান্ত। কথায় আছে, ‘অ্যান আইডিয়া ক্যান চেইঞ্জ ইয়োর লাইফ’। বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ বোধহয় আমির খানই।

Comments
Spread the love