অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া এক অসীম সাহসী নারী পাইলটের গল্প!

[et_pb_section bb_built=”1″][et_pb_row][et_pb_column type=”4_4″][et_pb_text]

এমেলিয়া এয়ারহার্ট এক জীবনের যাত্রী, যিনি নিজের জীবনের গন্তব্যটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তার একটা কথা আছে এরকম যে,

“There’s more to life than being a passenger”!

কথাটার অর্থ বেশ গভীর। আপনি যদি জীবনে শুধু প্যাসেঞ্জারের চরিত্রে অভিনয় করেন তাহলে কি অর্থ দাঁড়ায় জীবনের? গভীর কোনো ভাবনা আপনার নেই, জন্ম হলো, একটা রাইডে চড়লেন, মৃত্যু হলো, যাত্রা শেষ হলো। মাঝের সময়টাকে একঘেয়ে একটা যাত্রায় পেরিয়ে গেলো। নতুন কিছু করা হলো না, জীবনের একটা মূল্যবান টিকেট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ধরাবাধা গন্তব্যে যেতে যেতে। অথচ, এমেলিয়া ইয়ারহার্ট উপলব্ধি করেছেন, এর বাইরে জীবনে কিছু করার আছে।

তিনি এমন সময়ের প্রতিনিধি যে সময়ে একজন নারী বিমানে চড়বে এটাই বিশাল ঘটনা। কিন্তু, ওই যে শুধুই যাত্রী হওয়ার জীবন তিনি বেছে নিতে চাননি, এর চেয়ে বেশি অর্থপূর্ণ কিছু করে যেতে চেয়েছেন। এই চাওয়াটাই তাকে ইতিহাসে ঠাই দিয়ে দিয়েছে। এমেলিয়া বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম নারী বৈমানিক, যিনি উড়েছেন আটলান্টিকের মুক্ত আকাশে, পাখির চোখে দেখেছেন জাগতিকতাকে। ভিন্ন চোখে দেখতে শিখেছেন জীবনকে। একজন নারী মনে মননে কতটা মুক্ত হলেই কেবল মুক্তি পেতে পারে, ইচ্ছা পূরণের সৌন্দর্যের সমুদ্রে ভেসে বেড়াতে পারে তার উদাহরণ এমেলিয়া ইয়ারহার্ট।

তার পূর্ণ নাম এমেলিয়া ম্যারি ইয়ারহার্ট। ১৮৯৭ সালে জুলাইয়ের একদিন তার জন্ম।

লালনের একটি গান আছে।

এমন মানব জনম আর কি হবে,
মন যা করো ত্বরায় করে এ ভবে…

এমেলিয়ার মনে ছিলো আকাশে উড়বার বাসনা। তিনি তার মানব জনম স্বার্থক করে গেছেন, তিনিই প্রথম নারী যিনি প্রথমবারের মতো একাই আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়েছেন বিমানচালক হিসেবে। ১৯৩২ সালে তিনি এই গৌরব অর্জন করেন। এই মাহাত্ম্যকে বড় করে দেখার অবশ্যই কারণ আছে। প্রথম নারী হিসেবে আটলান্টিক তিনি পাড়ি দিয়েছেন মানে এই না এই কাজটি পুরুষ পাইলটদের জন্য ডালভাতের ব্যাপার, এমেলিয়া এয়ারহার্টের আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন মাত্র একজন পুরুষ পাইলট, যার নাম চার্লস লিন্ডবার্গ। সে হিসেবে সময় এবং সাহস বিবেচনা এমেলিয়ার এই কীর্তি অবশ্যই নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার হয়ে থাকবে সবসময়।

নারী পাইলটদের কথা ভেবে তিনি একটি সংগঠন করেন। “দি নাইনটি নাইন” নামে সংগঠনটি বিশ্বের প্রথম নারী পাইলটদের সংগঠন যার উদ্যোক্তা এমেলিয়া এয়ারহার্ট।

পাইলট হওয়ার গল্প

এমেলিয়া গতানুগতিক কিছু হতে চাননি জীবনে কিন্তু তা-ই বলে যে তিনি একেবারে পরিকল্পনা করে পাইলট হয়েছেন তেমনও না। লেখালেখিতেও এমেলিয়ার হাত বেশ পোক্তই ছিলো। তার “লাস্ট ফ্লাইট” বই থেকে জানা যায়, দশ বছর বয়সে তিনি জীবনে প্রথমবার বিমান দেখেন, তার মতো আরো অনেকে সেদিন বিমান দেখে বেশ আপ্লুত হয়েছিলো কিন্তু তিনি ভেবেই পেলেন না, বিমান দেখে এতো আনন্দিত হওয়ার কি মানে আছে! সেই এমেলিয়া এয়ারহার্টের জীবনটাই বিমানের সাথে মিশে গেছে কোথাও হয়ত, সেই এমেলিয়ার পরের জীবনের আবেগজুড়ে বিমানের ডানা, যে ডানায় ভর করে এমেলিয়া উড়েছেন মুক্ত আকাশে।

১৯১৫ সালের কথা। এমেলিয়া তখন কানাডার টরেন্টোতে। সেখানে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত সৈনিকদের দেখা পান। মানবিক বোধ থেকে তিনি রেডক্রসের হয়ে নার্স হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। আহত সৈনিকদের সেবা দিতে গিয়ে পরিচিত হন বৈমানিকদের। বৈমানিকদের গল্প শুনতে শুনতে তার মধ্যে বিস্ময় জন্মায়, এমেলিয়া উড়োজাহাজের ব্যাপারে এই সময় কিছুটা কৌতুহলী হয়ে উঠেন। হয়ত গল্প শুনতে শুনতে আকাশে উড়ে যেতেন কল্পনায়। তার এই কৌতুহল রীতিমতো আগ্রহে পরিণত হবে সেটা তিনি বুঝেছিলেন ১৯২০ সালের একটা ঘটনায়।

সেবার তিনি লং বিচ এয়ার শো’তে একটি এরোপ্লেন রাইডে অংশ নেন। মাত্র দশ মিনিটের রাইড দিয়ে তিনি বুঝতে পারেন এমন কিছুই আসলে তিনি খুজছিলেন এতোদিন, এমন অদ্ভুত এডভাঞ্চারাস কিছু, এমন কোনো কাজ যা এই মাত্রার অসাধারণ অনুভূতির সন্ধ্যান দিবে। তিনি বুঝলেন তাকে বৈমানিকই হতে হবে।

এরপর নিজের স্বপ্নের জায়গাটায় পৌছুতে তিনি নিজের সঞ্চিত অর্থ খরচা করতে লাগলেন, জমানো টাকা খরচ করে বিমান চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে থাকলেন।

১৯২১ সাল। এমেলিয়া “কিনার এয়ারস্টার বাইপ্লেন” কোম্পানির একটি  ছোট হলুদ রঙ এর ব্যবহৃত বিমান কেনেন। মাত্র এক বছরের মাথায় তিনি প্রথম বিশ্বরেকর্ড করেন, বিশ্বরেকর্ডটি হচ্ছে তিনি ভূমি থেকে ১৪ হাজার ফুট উচুতে উঠে যান বিমান নিয়ে,যেটি ছিলো নারী বৈমানিকদের তখনকার সর্বোচ্চ রেকর্ড। এমেলিয়া এরপর আরো বেশ কিছু বিশ্বরেকর্ড করেন যার মধ্যে প্রথম নারী হিসেবে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেবার ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় সর্বত্র। কারণ, এই ঘটনার পর তিনি ভীষণ জনপ্রিয় হন এবং সর্বত্রই পরিচিতি পান। একজন নারীর হার না মানা মানসিকতা, অসীম সাহসিকতা, নিজের স্বপ্নের প্রতি অবিচল থাকা শুধু নারী না, সেই সময় প্রায় সকলকেই অনুপ্রাণিত করে।

এডভেঞ্চার কন্যার ট্র্যাজিক সমাপ্তি

নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার বাসনা এমেলিয়ার সহজাত। ইতিপূর্বে বিশ্বরেকর্ড করে, আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে তিনি সম্ভাব্য সব রেকর্ড প্রায় নিজের করে ফেলেছিলেন। একজন পাইলট হয়ে যে সেলিব্রেটি হয়ে উঠা যায় তার উজ্জ্বল প্রমাণ এমেলিয়া।

কিন্তু, এমেলিয়া থেমে থাকতে চাননি, নির্দিস্ট প্রাপ্তি দিয়ে জনমভরে উপভোগ করতে চাননি। তিনি তো পুরোটা জনমই উপভোগ করতে চান, নতুন করে দেখতে চান অদেখাকে, তাই এমেলিয়া পূর্বের সব চ্যালেঞ্জের মাত্রাকে অতিক্রম করে আরো কঠিন এক চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফেললেন। তার নবতম এডভেঞ্চার হলো, দুই আসন বিশিস্ট বিমান দিয়ে বিশ্বভ্রমণে বের হওয়া। অর্থাৎ, তিনি বিমানে করেই সারা পৃথিবী প্রদক্ষিণ করবেন!

আপনি ব্যাপারটা কল্পনা করুন, একজন নারী সারা পৃথিবী ঘুরবেন, সারা পৃথিবী উড়বেন বিমানে করে, মাত্র দুই সিটের সে বিমান, কত দীর্ঘ  যাত্রা, কতদিন লাগবে তাও জানা নেই, এরকম অনিশ্চিত একটা যাত্রাকেই বেছে নিয়েছেন এমেলিয়া। দুই সিটের সেই “দ্যা ইলেক্টা” নামক বিমানে তার সহযাত্রী হয়েছিলেন ফ্রেড ন্যুনান।

কিন্তু, এই যাত্রার শুরুতেই কিছু গলদ হয়। যেমনঃ বিমান থেকে যোগাযোগ রাখার কিছু যন্ত্রপাতি এমেলিয়া সাথে নেননি। যেহেতু এটি দীর্ঘযাত্রা তাই জ্বালানি অবশ্যই অনেক বেশি লাগবে, অতিরিক্ত বাড়তি জ্বালানির জায়গা দিতেই হয়ত তিনি যোগাযোগ সরঞ্জাম নিতে পারেননি।

যাত্রা শুরু হলো। ২২ হাজার কিলো মিটারের অসীম সেই যাত্রার প্রথম বিরতি নিউগিনিতে, তাও ২১ দিন পর! এই সময়টায় এমেলিয়া ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েন। যাই হোক, তাদের পরের গন্তব্য প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের দ্বীপে।

১৯৩৭ সাল। ২ জুলাই এমেলিয়ার কন্ঠ শেষবারের শুনতে পায় কেউ। নিকটস্থ কোস্টগার্ড শিপের রেডিও অপারেটরের সাথে এমেলিয়া শেষবারের মতো যোগাযোগ করেন। হওল্যান্ড দ্বীপে এমেলিয়ার অবতরণের কথা ছিলো। কিন্তু, বিমান কিংবা এমেলিয়া কারোই আর অবতরণের খবর পাওয়া গেলো না।

আশ্চর্যজনকভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের সেই জায়গাটার কোথাও হারিয়ে যায় এমেলিয়ার বিমানটি!

এমেলিয়ার বিমানটিকে খুজে বের করার অনেক চেস্টা চালানো হয়। সেই সময় এমেরিকার অর্থনীতি ভালো যাচ্ছিলো না, মন্দা চলছিলো। কিন্তু, এমেলিয়ার হারিয়ে যাওয়া বিমান খুজে পেতে প্রেসিডেন্ট রুজবেল্ট কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ করেন উদ্ধার অভিযানের জন্যে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে হারিয়ে যাওয়া বিমান অনুসন্ধ্যান সফল হয় না। এমনও দ্বীপ আছে যেই দ্বীপ জোয়ারের সময় একেবারেই ডুবে যায়, ভাটার সময় জাগে। তাছাড়া এতো বড় পরিসরে কোথায় খুজলে যে পাওয়া যাবে তা কেউ বলতে পারে না। আড়াই লক্ষ বর্গমিটারের বিস্তৃত জায়গা জুড়ে অনুসন্ধ্যান চালিয়েও এমেলিয়াকে খুজে পাওয়া যায়নি। অদ্ভুত ভাবে হাওয়া হয়ে যায় এমেলিয়ার বিমানটি।

১৯৩৯ সালে এমেলিয়া ও ফ্রেডকে মৃত ঘোষণা করা হয়, তবে এখন পর্যন্ত মেলেনি এমেলিয়ার বিমানের খোজ, মেলেনি এই বিখ্যাত বিমান নিখোজের রহস্যজট।

তবে এমেলিয়া ডানা মেলতে শিখেছিলেন বলেই অনেক নারীই পরবর্তীতে রানওয়েতে যাবার স্বপ্ন দেখে। তাই তিনি এখনো এক অনুপ্রেরণার নাম অনেকের কাছেই।তার একটি উক্তি দিয়ে শেষ করছি-

“Some of us have great runways already built for us. If you have one, take off! But if you don’t have one, realize it is your responsibility to grab a shovel and build one for yourself and for those who will follow after you.”

তথ্যসূত্র-

http://www.notablebiographies.com/Du-Fi/Earhart-Amelia.html

http://www.ameliaearhartmuseum.org/AmeliaEarhart/AEBiography.htm

[/et_pb_text][/et_pb_column][/et_pb_row][/et_pb_section]

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close