পাকিস্তান হবার পর প্রথম আঘাতটা এসেছিল ভাষার উপর, ছোট্টবেলায় মায়ের মুখে শুনতে শুনতে যে মিষ্টি মধুর ভাষায় কথা বলতে শিখেছি আমরা, মাথামোটা পাকিস্তানিগুলো সেই বাঙলাকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল, চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল উর্দু। বাঙলা মায়ের দামাল ছেলেরা সেটা মানেনি, বুকের তাজা রক্ত অকাতরে রাজপথে ঢেলে রক্ষা করেছিল মায়ের মুখের মিষ্টি বুলির অধিকার। তাদের সেই অসামান্য আত্মত্যাগকে স্মরণ করে লেখা হয়েছিল সেই অমর পঙক্তিমালা, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?

সুর দিয়েছিলেন মানুষটা, পরম যত্নে গভীর বিষাদমাখা সুরের বাঁধনে বেঁধেছিলেন কথাগুলোকে, সৃষ্টি হয়েছিল এক অবিস্মরণীয় গানের। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটায় খুব ভোরে উঠে প্রভাতফেরির সাথে হাঁটতে হাঁটতে শহীদমিনার যেতেন, ঠোঁটের হারমোনিকায় বাজতো সেই কালজয়ী সুর। বাঙ্গালীদের উপর পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে সবসময়ই তার কণ্ঠ ছিল প্রতিবাদী, একাত্তরের ২৫শে মার্চের বর্বরতম পৈশাচিকতা নিজের চোখে দেখার পর যেটা পরিণত হয় চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায়।

খালেদ মোশাররফের ফোর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করে বেরিয়ে আসার খবর পেয়ে আশায় বুক বাঁধেন, তার বাসায় তখনো বাঙ্গালী পুলিশের অস্ত্র পড়ে আছে, পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে  সেই কালো রাতে রুখে দাড়িয়েছিল যারা। তারপর দুই নম্বর সেক্টর গঠিত হলে তার বাসাটা পরিণত হয় মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম তীর্থে, অগণিত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়া, তাদের থাকা-খাওয়া, তাদের মেলাঘরের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া, আলতাফ মাহমুদ সবই করতেন। খালেদ মোশাররফের নির্দেশে শাহাদাৎ চৌধুরী প্রায়ই আসতেন তার কাছে, স্বাধীন বাঙলা বেতার কেন্দ্রের গান রেকর্ড করে তার হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন আলতাফ। একদিন ক্র্যাক প্লাটুনের কয়েকজন এসে বললেন, ঢাকায় প্রচুর পরিমানে আর্মস আনতে হবে, সেইগুলা রাখার জায়গা নাই। তার বাসায় রাখতে হবে। আলতাফ বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলেন না, তার বাসা পরিনত হল এক বিশাল দুর্গে। এভাবে ঢাকা শহরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আতংক হয়ে ওঠা ক্র্যাক প্লাটুনের অন্যতম প্যাট্রোনাইজার হয়ে উঠলেন তিনি, জানতেন মাথার উপর মৃত্যু ঝুলছে… কিন্তু তিনি ভয় পাননি… ভয় শব্দটা তার অভিধানে ছিল না…

৩০ শে আগস্ট ভোরে যখন পাকিস্তানী সেনারা মোটা শুয়োরের মত ঘোঁৎ ঘোঁৎ করতে করতে বাড়িতে ঢুকে গেল, চিৎকার করে বলতে লাগলো, মিউজিক ডিরেক্টর কৌন হ্যায়, তখনো তিনি ভয় পাননি। বলো বীর, বলো বীর, বলো উন্নত মম শির… নজরুলের সেই অসামান্য পঙক্তিমালার মতই নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে শির উচু করে বেরিয়ে এলেন বীর, ভোরের পবিত্র আলোয় তাকে যেন অপার্থিব লাগছিল, বুকটা টান টান করে জবাব দিলেন, আমিই আলতাফ মাহমুদ, কি চাও তোমরা?

— হাতিয়ার কিধার হ্যায়?

আলতাফ বুঝে গেলেন ওরা সব জেনেই এসেছে। তার মাথায় একটাই ভাবনা ঘুরতে লাগলো, যেভাবেই হোক ক্র্যাক প্লাটুনের যোদ্ধারা(যারা তার বাসায় তখন ছিল), তার পরিবার-পরিজন সবাইকে বাঁচাতে হবে। বললেন, এসো আমার সাথে। পাকিগুলো তার হাতে কোদাল তুলে দিল, মাটি খুঁড়তে বললো। একটু দেরি হয়েছিল হয়তো, একজন রাইফেলের বাট দিয়ে সাথে সাথে মুখে মারলো, আরেকজন বেয়োনেট চার্জ করলো। একটা দাঁত ভেঙ্গে মাটিতে পড়ে গেল, কপালের চামড়া ফালাফালা হয়ে কেটে ঝুলতে লাগলো চোখের উপর… নর্দমার কীটের চেয়েও নিকৃষ্ট ছিল ওরা, ওরা মানুষ ছিল না, সভ্যতার নৃশংসতম প্রানী ছিল…

সেদিন কাউকেই ওরা ছাড়েনি। সবাইকেই মারতে মারতে গাড়িতে তুলেছিল, ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে চালিয়েছিল অকথ্য নির্যাতন। পৈশাচিকতার সব সীমা পেরিয়ে গিয়েছিল ওরা, কিন্তু ক্র্যাক প্লাটুনের অন্য সবার মত আলতাফ মাহমুদের মুখ থেকেও একটা শব্দ বের করতে পারেনি। আলতাফ মাহমুদ আর ফিরে আসেননি, উন্নত মম শিরের সেই অসামান্য বীর আর কোনদিন দেখতে পাননি তার ছোট্ট শাওনের মুখটা… মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার শিরটা উঁচু ছিল, নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তিনি ভয় পাননি। একটা স্বাধীন দেশের জন্য আলতাফ মাহমুদের মত এরকম ৩০ লাখ মানুষ অকাতরে প্রানটা বিসর্জন দিয়েছিলেন, তারা মরতে ভয় পাননি…

আজ এই মহান সুরস্রষ্টার জন্মদিন, আজ এই উন্নত শিরের চিরসবুজ বীরযোদ্ধার জন্মদিন।

আলতাফ মাহমুদের ডাকনাম ছিল “ঝিলু”। তিনি যখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন তখন উঠোনের কাঁঠাল গাছে খোদাই করে লিখেছেন ‘ঝিলু দি গ্রেট’। নিজেকে তিনি ঠিকই চিনেছিলেন। আসলেই তিনি গ্রেট ছিলেন। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ গণসঙ্গীত শিল্পী আবদুল লতিফ বলেছিলেন , “আলতাফ মাহমুদের কণ্ঠ ছিল অদ্ভুত সুন্দর। যত না সুরকার হিসেবে নাম, তার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর কণ্ঠশিল্পী হিসেবে। ওর ছেলেবেলার কণ্ঠ শুনেই বুঝতে পেরেছিলাম ছেলেটা বিখ্যাত হবে। আমার ওই গানটি… ‘ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়/কথায় কথায় তারা আমায় হাতকড়া লাগায়’, আলতাফের মতো করে আর কেউ গাইতে পারেনি কোনোদিন, এমনকি আমি নিজেও না। তার সুরে যে আবেগ এবং অর্থ প্রকাশ পেত, তা না শুনলে বোঝানো যাবে না”…

আমাদের খুব সৌভাগ্য যে আমরা আলতাফ মাহমুদের দেশে জন্মেছি, আলতাফ মাহমুদ আমাদের দেশের সন্তান। আলতাফ মাহমুদকে আমরা ভুলি নাই, তিনি বেঁচে আছেন আমাদের মধ্যে, তিনি বেঁচে আছে আমাদের বুকের ভেতর, হৃদয়ের খুব গভীরে। একদিন আমরা চলে যাব, কিন্তু আলতাফ মাহমুদ বেঁচে থাকবেন, যুগের পর যুগ, বিশ্বাস করো… প্রজন্মের পর প্রজন্ম আলতাফ মাহমুদকে চিনবে এক অকুতোভয় বীর হিসেবে, যার শির উন্নত ছিল চিরকাল…যিনি ভয় পেতেন না, ভয় শব্দটা তার অভিধানে ছিল না…

ছবিগুলো পেয়েছি শহীদ বুদ্ধিজীবী সুরকার সঙ্গীতজ্ঞ আলতাফ মাহমুদের কন্যা শাওন মাহমুদ-এর কাছ থেকে। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা!

তথ্য কৃতজ্ঞতাঃ ফাতেমা জোহরা

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-