সিনেমা হলের গলি

এবার অলোক নাথের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের অভিযোগ!

ভারতের মিডিয়া জগতে তনুশ্রী দত্তের হাত ধরে মোটামুটি বড় রকমের একটা ঝড়ের আগমন ঘটে গেছে। সেই ঝোড়ো বাতাসে এখন উত্তাল বলিউড। অভিনেতা নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে মুখ খোলার পর থেকে একে একে আরও অনেকেই সাহস করে উঠতে পারছেন, নিজেদের জীবনে ঘটে যাওয়া দুঃসহ স্মৃতিগুলো তারা সামনে নিয়ে আসছেন, অভিযোগের আঙুল উঠছে অনেকের দিকেই। ইতিমধ্যেই ‘কুইন’ সিনেমার পরিচালক বিকাশ ভেলের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছেন দুজন নারী, চেতন ভগত এবং রজত কাপুর ক্ষমা চেয়েছেন অন্য দুই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে। তবে এবার এমন একজনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে, যেটা শুনে বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে সবার। এই লোকটাকে যারা চেনেন, তারা অন্তত আকাশ থেকে পড়েছেন নিশ্চিত।

তার নাম অলোক নাথ। ভারতীয় সিনেমা এবং টিভি ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয় মুখ। অভিনয় করেছেন অজস্র সিনেমায়, টেলিভিশনের পর্দায়ও বছরের পর বছর ধরে দেখা গেছে তাকে। বাবা/চাচা/মামা বা দাদা/নানার রোলে তার চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী। ইদানিং অবশ্য বয়সের ভারে কাজ কমিয়ে দিয়েছেন। অগ্নিপথ, দিওয়ানা, পরদেশ, তাল, হাম সাথ সাথ হ্যায়, কাভি খুশি কাভি গাম, বিবাহ- এর মতো দারুণ সব সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন অলোক নাথ, সবশেষ তাকে দেখা গেছে লাভ রঞ্জনের ‘সনু কি টিট্টু কি সুইটি’ সিনেমাতে। ইন্ডাস্ট্রিতে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির জন্যে তাকে অনেকেই ‘সংস্কারী বুড়ো’ নামে ডাকেন, সেই অলোক নাথের বিরুদ্ধেই কিনা ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন ভারতীয় চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক এবং পরিচালক বিন্তা নন্দা। 

বিন্তা নন্দা- ইনিই যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন অলোক নাথের বিরুদ্ধে

ফেসবুকে দেয়া বিশাল এক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু রোমহর্ষক ঘটনার কথা বর্ণনা করেছেন নন্দা। এক কালরাত্রিতে তার জীবনটা কিভাবে তছনছ করে দিয়েছিল পুরুষরূপী এক জানোয়ার, সেই ঘটনাটাই সবার সঙ্গে শেয়ার করেছেন তিনি। অভিযুক্ত ব্যক্তিটির নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি তিনি, তবে যেসব ক্লু দিয়েছেন, তাতে অনুমান করে নিতে কষ্ট হয়নি, তিনি কে হতে পারেন। যেসব সিরিয়াল আর চরিত্রের নাম নন্দা তার লেখায় এনেছেন, তাতে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, লোকটি অলোক নাথ ছাড়া আর কেউ নন। লেখার শেষ পর্যায়ে পাঠকদের জন্যে কাজটা আরও সহজ করে দিয়ে নন্দা বলেছেন, ভারতের টিভি আর সিনে মিডিয়া সেই লোকটাকে ভীষণ ‘সংস্কারী’ হিসেবে জানে। তাতেই শতভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে, নন্দার অভিযোগের তীর অলোক নাথের দিকেই।

আজ থেকে বিশ বছর আগে কি ঘটেছিল নন্দার জীবনে? তার সঙ্গে কি অন্যায় আচরণ করেছিলেন অলোক নাথ? সেটা নন্দা’র ভাষ্যমতেই শোনা যাক-

“তার স্ত্রী ছিলেন আমার খুব ভালো বন্ধু। সেই সূত্রে তার সঙ্গেও আমার ভালো সম্পর্ক ছিল, তাছাড়া আমরা একই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতাম। একসঙ্গে থিয়েটার করেছি সবাই। নব্বইয়ের পরে যখন স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো তুমুল জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করলো, তখন থেকেই তার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।”

“টেলিভিশনে তখন আমি একটা সিরিয়াল করছি, সেটার নাম ছিল তারা। সেই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় শো ছিল সেটা, আর সেই লোকটা ছিল সেই সিরিয়ালের অন্যতম মূখ্য চরিত্র। আমার সিরিয়ালের নায়িকার পেছনে লেগে ছিল ও। যদিও নায়িকা পাত্তা দিতো না তাকে। ও ছিল মাদকাসক্ত, নির্লজ্জ, আর কাণ্ডজ্ঞানহীন একজন মানুষ। কিন্ত সেই সময়ে টেলিভিশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকাদের একজন হওয়ায়, আমরা ওকে বেশিকিছু বলতেও পারতাম না। সেই নায়িকাকে কয়েকবার হেনস্থা করেছিল ও। ইচ্ছে করেই তার সাথে ঝামেলা পাকানোর চেষ্টা করতো ও। নায়িকা তখন আমাদের কাছে অভিযোগ জানায়। আমরা ঠিক করেছিলাম, সিরিয়ালটা থেকে ওকে বাদ দেবো। একটা পর্বের অল্প কিছু অংশের শুটিং বাকী ছিল, সেটা হয়ে গেলেই ওকে বিদায় বলে দেবো, এরকমটাই ভেবেছিলাম।” 

“কিন্ত ও বুঝতে পেরেছিল, আমরা ওকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরের দিন ও শুটিঙে এলো পুরোপুরি মাদকাসক্ত হয়ে। এমনকি শুটিং শুরু হবার সময়ও ও টলছিল। ক্যামেরা চালু হবার সাথে সাথেই নায়িকার গায়ের ওপরে পড়ে গেল ও। আমার মনে হলো, যথেষ্ট হয়েছে। তাকে আমরা বললাম, তোমাকে ছাড়াও শো চালিয়ে নিতে পারবো আমরা। আর কোন ঝামেলা চাই না, তোমাকে বাদ দেয়া হলো। শো চলতে লাগলো, ওকে ছাড়াই। টিআরপি কমে গেল, কিন্ত তাতে আমার মাথাব্যথা ছিল না।”

“কিন্ত টেলিভিশন চ্যানেলের মাথাব্যাথা ছিল। তারা কয়েকদিন পরেই আমাকে ডাকলেন। বললেন, সিরিয়ালের কাহিনীটা যাতে বদলে দেয়া হয়। তারা নায়িকা পরিবর্তন করতে চাইলেন, আমি রাজী হলাম না, তবে তাদের কথামতো গল্পে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হলাম। নতুন গল্পের শুটিং শুরু করার আগের দিন আমাকে জানানো হলো, যে অভিনেতাকে আমরা বাজে আচরণের জন্যে বাদ দিয়েছিলাম, তাকে নাকি আবার ফেরানো হচ্ছে! নইলে নাকি এই সিরিয়াল আর কেউ দেখবে না! আমার আর কিছু করার ছিল না। তাছাড়া তখন পর্যন্ত তার সঙ্গে আমার কোন সরাসরি শত্রুতাও ছিল না।”

“সেই অভিনেতাকে নিয়ে একসপ্তাহে শ্যুট করলাম। সাতদিনের মাথায় টিভি চ্যানেল থেকে আমাকে জানানো হলো, এই সিরিয়াল বন্ধ করে দেয়া হবে। শুধু এটাই নয়, একই চ্যানেলে আমার মোট চারটা শো চলছিল, সবগুলোই বন্ধ করে দেয়া হলো কয়েকদিনের ব্যবধানে! কার ইশারায় এসব ঘটেছে, সেটা বুঝতে কষ্ট হলো না। আমি ভীষণ স্বাধীনচেতা একজন নারী, সবসময় শুধু কাজ করে যেতে চেয়েছি। সেই কাজ হারিয়ে আমি পুরোপুরি ডিপ্রেশানে পড়ে গেলাম। রোজ রাতে ড্রিঙ্ক করতাম।” 

“হঠাৎ একদিন সন্ধ্যায় সেই লোকের বাড়িতে পার্টির নেমন্তন্ন এলো। তার স্ত্রী আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের একজন, তাছাড়া পার্টিতে সব আমাদের বন্ধুরাই থাকবে, এরকম পার্টি এর আগেও অজস্র হয়েছে, কাজেই ‘না’ বলার কোন কারণ ছিল না তখন। আমি গেলাম, দুইপেগ গেলার পরেই মাথা কেমন যেন চক্কর দিতে শুরু করলো। আমি বুঝতে পারিনি যে আমার ড্রিঙ্কের মধ্যে শয়তানটা কিছু মিশিয়ে দিয়েছে! অনেকক্ষণ সোফায় শুয়ে ছিলাম। অতিথিরা যখন একে একে বিদায় নিতে শুরু করেছে, তখন আমিও উঠলাম, যদিও হাঁটতে পারছিলাম না। সেই লোক বললো, তার বাড়িতে রাতে থেকে যেতে। কিন্ত তার স্ত্রী বা সন্তানেরা বাড়িতে ছিল না সেদিন। আর আমি নিজেও সেখানে এক মূহুর্তও নিরাপদ বোধ করছিলাম না। রাত তখন দুটো বাজে, রাস্তায় কাকপক্ষীও নেই। তবুও আমি বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে, হাঁটা শুরু করলাম নিজের বাড়ির দিকে।”

“মোটামুটি অর্ধেক রাস্তা কিভাবে হেঁটে এসেছিলাম, আমি নিজেও জানিনা। অনেকখানি পথ অতিক্রম করার পরে একটা গাড়ি এসে থামলো আমার পাশে। সেই লোকটা, ড্রাইভ করে এসেছে আমাকে খুঁজতে, হায়েনা যেভাবে গন্ধ খুঁজে শিকার ধরে। আমাকে গাড়িতে উঠতে বললো, আমার পা একদমই চলছিল না তখন। সে নিজেই আমাকে ধরে গাড়িতে ওঠালো, বোতলের মুখ খুলে পানি খেতে দিলো। সেই পানিতেও যে কিছু একটা মেশানো ছিল, সেটা বোঝার মতো শক্তিও ছিল না তখন আমার। কখন আমি বাড়িতে এসেছি, কিভাবে গাড়ি থেকে নেমে ঘরে ঢুকেছি, আমি কিছুই জানিনা।”

“পরদিন সকালে যখন আমার ঘুম ভাঙলো, তখন পুরো শরীরে প্রচণ্ড ব্যাথা অনুভব করলাম। আমি বুঝতে পারলাম, আমাকে শুধু ধর্ষণই করা হয়নি, অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয়েছে আমার ওপর। বিছানা থেকে ওঠার মতো শক্তিও ছিল না আমার। কয়েকজন বন্ধুকে সব খুলে বললাম আমি, তারা সবাই একটাই কথা বললো, এসব কথা কাউকে না বলতে। কেউ নাকি বিশ্বাস করবে না, উল্টো আমাকেই হেনস্থা করবে সবাই। কারণ সে বিরাট তারকা, তার তুলনায় আমি কিছুই না।” 

“আমি চেপে গিয়েছিলাম, এবং আবারও ভুল করেছিলাম। এরপরে যেখানেই কাজ করেছি, সবসময় সেই লোক একটা মানসিক অত্যাচার চালিয়েছে আমার ওপরে। আমাকে অফার দেয়া হয়েছে, তার বাড়িতে যেতে, নইলে আমি কাজ পাবো না। সত্যিই আমার চাকুরি কেড়ে নেয়া হয়েছে। এতসব ঘটনায় আমি ভেঙে পড়েছিলাম পুরোপুরি, আমি আর নিতে পারছিলাম না। বছরের পর বছর ধরে আমার ওপর মানসিক অত্যাচার চালানো হয়েছে, প্রচণ্ডরকমের একটা মেন্টাল ট্রমার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে আমাকে। সেই ট্রমা কাটিয়ে বের হতেই আমার দশ বছর সময় লেগে গেছে। এখন আমি সুস্থ, স্বাভাবিক। কিন্ত আমার জীবনের ওই দশটা বছরের অবর্ণনীয় যন্ত্রণার কথা তো আমি ভুলে যাবো না, ভুলতে পারবোও না। তনুশ্রীর ঘটনাটা সামনে না এলে হয়তো আমি আমার গল্পটা বলার মতো সাহসও করে উঠতে পারতাম না কোনদিন…”

বিন্তা নন্দার বর্ণনায় এই ঘটনাটাই ঘটেছিল তার সঙ্গে। আর দায়ী ব্যক্তিটি যে অলোক নাথ ছাড়া আর কেউ নন, সেটা নিশ্চিত। নন্দা তো কয়েকটা অকাট্য ক্লু দিয়েই রেখেছেন। নন্দার অভিযোগ সত্যি না মিথ্যা, সেটা আমরা জানিনা। এসবের নিশ্চয়ই তদন্ত হবে, সেখানেই সাব্যস্ত হবে কে দোষী আর কে নির্দোষ। তবে অলোক নাথ দোষী সাব্যস্ত হলে বহুল প্রচলিত একটা কথা তো সত্যি প্রমাণীত হবে- ‘মুখ দেখে না যায় মানুষ চেনা’। আর নন্দার কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে বলতেই হবে, অলোক নাথের সরল চেহারাটার আড়ালে ভয়ানক একটা পশু লুকিয়ে আছে, সুযোগ পেলেই যে পশুটা ক্ষতি করতে পারে মানুষের। এই লোকের বিরুদ্ধে যে এমন অভিযোগ উঠতে পারে, এটা তো সবার কাছেই পুরোপুরি অকল্পনীয় ছিল। এবার দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়ায়। 

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close