ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

আল জাজিরার প্রশ্নের মুখে জেরবার তথ্যমন্ত্রী

গত রবিবার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে ডিবি পুলিশ আটক করে প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার শহিদুল আলমকে। ফেসবুকে জিগাতলায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর সন্ত্রাসীদের হামলা সংক্রান্ত একটি পোস্ট দেয়ার ফলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয় বলে জানিয়েছিল ডিবি পুলিশ। তবে অনেকেরই ধারণা, মূলত আল জাজিরায় আন্দোলন প্রসঙ্গে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারের কারণেই আটক করা হয় তাকে। পরবর্তীতে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করা হয় তার নামে, এবং হাইকোর্টের নির্দেশে ৭ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয় তাকে।

আলমের পরিবারের কথা অনুযায়ী, ডিবি পুলিশের কাস্টডিতে তার উপর শারিরিক অত্যাচার চালানো হয়েছে। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে হাইকোর্টের নির্দেশ মোতাবেক বুধবার সকালে তাকে শাহবাগের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চেক-আপ করানো হয়। সেখান থেকে আশংকামুক্ত ঘোষণা দেয়া হলে ফের তাকে নিয়ে যাওয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে। এদিকে তাকে আটক ও পরবর্তীতে ৭ দিনের রিমান্ডে নেয়া প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য আল জাজিরার সংবাদের লাইভে উপস্থিত হন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। সেখানে সংবাদপাঠকের সাথে তার যে আলাপচারিতা হয়, তা এগিয়ে চলোর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

* মাননীয় মন্ত্রী, আপনি কি আমাদের নিশ্চিত করতে পারেন যে এই ফটোসাংবাদিককে (শহিদুল আলম) কি আসলেই আজকে পুলিশ কাস্টডি থেকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হবে?

– শহিদুল আলম একজন প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার এবং একটি ফটো গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা। তাকে আটক করা হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ সত্য একটি তথ্য। কিন্তু তাকে কাস্টডিতে মারধোর করা হয়েছে বলে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তা মোটেই সত্য নয়। কারণ আমাদের আইন অনুযায়ী, তাকে যদি কাস্টডিতে সত্যিই মারধোর করা হয়ে থাকে, তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারকে অবশ্যই আদালতে জবাবদিহি করতে হবে।

* এর মানে তাকে আজকে হাসপাতালে নেয়া হবে কি না?

– আসলে এ ব্যাপারে আমার আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলে দেখতে হবে। এই মুহূর্তে এ ব্যাপারে আপনাকে আমি বিস্তারিত কিছু জানাতে পারছি না। তবে এটুকু আমি জানাতে পারি যে কোর্টের তরফ থেকে যদি এ-ধরণের কোন নির্দেশ থেকে থাকে, তবে সরকার তা মান্য করবে।

* আপনার সরকার কি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে? কারণ আমরা যেসব ভিডিও টেপ পেয়েছি, তাতে তো দেখা যাচ্ছে এই ব্যক্তি কোন ভুল বা অপরাধই করেননি। তিনি কেবল দূর থেকে কিশোর আন্দোলনকারীদের ছবি তুলছেন। এছাড়া আর কিছু তো তিনি করেননি।

– হ্যাঁ, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম পুরোপুরি স্বাধীন। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই প্রফেশনাল হ্যাজার্ডের বিষয়টি জানেন। যখনই বিশ্বের কোথাও এ-ধরণের সংঘর্ষ বা আন্দোলন চলতে থাকে, একজন সাংবাদিককেও আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু সরকারের এটি সরকারের পরিকল্পনার অংশ ছিল না। পুলিশ কখনোই সাংবাদিকদের গায়ে হাত তুলতে পারে না। কারণ তাদের উপর সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া আছে যে সাংবাদিকদের পূর্ণ স্বাধীনতার সাথে কাজ করতে দিতে হবে। সাংবাদিকদের গায়ে হাত তোলা সরকারের চোখে অবশ্যই একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি লিখেছি যেন সাংবাদিকদের মারার সাথে জড়িতদেরকে বিচারের আওতায় আনা হয়।

* এই মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য ছবি পাওয়া যাচ্ছে যেখানে আমরা দেখতে পারছি আপনাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কীভাবে আন্দোলনকারীদের উপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে। আপনার কি গত সপ্তাখানেকের মধ্যে একবারও মনে হয়েছে যে সরকার চাইলে বিষয়টি আরও ভালোভাবে সামলাতে পারত?

– দেখুন, আপনি যদি আন্দোলনের প্রথম পাঁচ দিনের চিত্র খতিয়ে দেখেন, কোথাও কিন্তু কোন সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ শুরু থেকেই বাচ্চাদের সাথে ছিল, তাদেরকে নিরাপত্তা দিচ্ছিল ও যানবাহনের লাইসেন্স যাচাই করার কাজে সাহায্য করছিল। কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে, যখন আমাদের সরকার ইতিমধ্যেই সব দাবি মেনে নিয়েছে ও সেগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে, কিছু মহল থেকে এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক স্বার্থে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়।

* মাননীয় মন্ত্রী, এখানে আমি আপনাকে একটু থামাতে চাই। আপনি এখানে কিছুটা অসত্য কথা বলছেন। শুরু থেকেই কিন্তু অতি যৌক্তিক একটি আন্দোলন হয়ে আসছিল নিরাপদ সড়কের দাবিতে, যখন থেকে বেপরোয়া বাসের আঘাতে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘটে। এটি কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। কিন্তু এরপর বিতর্কের শুরু হয় যখন আপনাদের এক মন্ত্রী এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই ঘটনা যদি ভারতে ঘটত তাহলে এ ধরণের কোন প্রতিবাদই সেখানে হতো না। এরপর বেরিয়ে আসে যে বাসটি এ ঘটনা ঘটিয়েছে, সেটির মালিকের সাথে তার পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। তখনই কিন্তু আন্দোলনকারীদের মনে হয়েছে যে তাদের কর্মসূচী সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, এবং তা কেবল নিরাপদ সড়কের জন্যই নয় বরং সরকারের বিরুদ্ধেও।

– হ্যাঁ, এটি সত্য যে আমার সহকর্মী, মন্ত্রী শাজাহান খান ওই দুর্ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় হেসে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিনই তাকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়, এবং তিনি প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশ করেছিলেনও। এরপর তিনি ওই বাচ্চাদের বাসায়ও যান তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানাতে। এখানে আমার পয়েন্ট হচ্ছে, আন্দোলনকারী বাচ্চারা তাকে (শাজাহান খান) ক্ষমা চাইতে বলেছিল, এবং তিনি ক্ষমা চেয়েছিলেনও। তাই এ ব্যাপারটি ওখানেই মিটে যায়। এবং তখন সরকার মনোনিবেশ করে আন্দোলনকারীদের নয় দফা দাবি পূরণের উপর। আমরা মনে করি প্রতিটি দাবিই খুবই যৌক্তিক। তাই আমাদের প্রধানমন্ত্রী রাজি হয়েছিলেন প্রতিটি দাবিই মেনে নিয়ে তা বাস্তবায়িত করার। সুতরাং বাচ্চাদের পুলিশের মুখোমুখি হওয়ার মত কোন পরিস্থিতিই তৈরী হয়েছিল না। মূলত যা ঘটেছে, সেগুলো সবই রাজনৈতিক ঘটনা ছিল। আন্দোলনের পঞ্চম দিন, আমার যতদিন মনে পড়ে, ঢাকার তিনটি জায়গায় সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে একটি ছিল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে। তাই আমি বলতে পারি সেখানে যে সংঘর্ষ ঘটেছিল, তা আন্দোলনকারী বাচ্চাদের বিরুদ্ধে নয়। বরং এক মহল রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এ আন্দোলনের ফায়দা লুটতে চাইছিল, তাদের বিরুদ্ধে। সেখানেও কিছু শিক্ষার্থী হয়ত আহত হয়েছে। কিন্তু আমার হাতে যে প্রতিবেদন এসেছে তা হলো, দুই পক্ষেরই যারা যারা আহত হয়েছিল, প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাদের সবাইকেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

* আমি আসলে এই আলোচনায় যেতে চাই না যে এসব ঘটনার পেছনে আসলে কাদের হাত ছিল এবং কাদের হাত ছিল না। তবে আমি আপনাকে এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের রিপোর্ট থেকে একটি লাইন পড়ে শোনাতে চাই। সেখানে তারা আপনার সরকারকে অভিযুক্ত করছে আসল মৃতের সংখ্যা লুকানোর জন্য। তারা বলছে আপনার সরকার আড়াল থেকে চেষ্টা করেছিল যাতে এই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে বড় কোন আন্দোলন সৃষ্টি হতে না পারে। এভাবে প্রথম দিন থেকেই আপনারা আন্দোলন বানচালের জন্য কাজ করে এসেছেন।

– আমার সেটি মনে হয় না। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনটি ছিল বিশাল, এবং সরকার কখনোই এটিকে বানচালের চেষ্টা করেনি। বাচ্চাদের সকল দাবিদাওয়া মেনে নেয়া হয়েছে এবং তারা খুশিমনে স্কুলে ফিরে গেছে। আপনি যে অভিযোগের কথা বলছেন আন্দোলন বানচালের, আমার মনে হয় সেটি আসলে সত্য নয়। বাচ্চারা সবাই খুশি, আর সরকারও তাদের দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে।

* আচ্ছা মাননীয় মন্ত্রী, শেষ ত্রিশ সেকেন্ডে আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই। আপনি হ্যাঁ কিংবা না-তে উত্তর দেবেন। গত কয়েকমাস ধরেই ছাত্রসমাজ শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে আসছে। কারণ তারা আপনাদের দেশে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা নিয়েও সন্তুষ্ট নয়। কিন্তু আপনারা তাদের গায়েও হাত তুলেছেন। হ্যাঁ কি না?

– হ্যাঁ, কোটা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, কিন্তু…

* মাননীয় মন্ত্রী, আপনাকে এখানেই থামাতে বাধ্য হচ্ছি, আমাদের আর সময় নেই। কিন্তু আমাদের সাথে থাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close