ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ওদের এই ভয়ংকর ক্রোধ কিভাবে মুছবেন আপনি?

গত চারদিন ধরে চারপাশের সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে অনেকগুলো মানুষ হেলমেট দিয়ে একটার পর একটা বাড়ি মেরে যাচ্ছে মাথায়। মাঝখানে টানা ৪৫ ঘন্টা জেগে ছিলাম, তারপর অল্প কিছু সময় হয়তো ঘুমোতে পেরেছিলাম, কিন্তু মাথার তীব্র যন্ত্রণা আর দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙ্গে গেছে। চোখের সামনে আপনজন, সহযোদ্ধাদের ক্রোধ দেখছি, রাগে-দুঃখে-অক্ষম আক্রোশ আর যন্ত্রণায় অভিশাপ দিতে দেখছি। প্রতিবার একেকজনকে অভিশাপ দিতে দেখছি আর প্রতিবার মনে হয়েছে কেউ মাথায় হেলমেট দিয়ে প্রচন্ড জোরে একটা আঘাত করলো। এই যন্ত্রণা এই হাহাকার অচিন্তনীয়!

এদের অনেককেই আমি অনেকদিন ধরে চিনি, জানি, ২০১৩’র গণজাগরণে এদের সাথেই অনলাইনে-অফলাইনে যুদ্ধ করেছি একাত্তরের পরাজিত শকুন, পাকিপ্রেমী বেঈমানদের প্রতিরোধ করেছি, ৫ই মে যখন হেফাজত-জামায়াতের উগ্র ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের ভয়ংকর অপপ্রচার আর মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে যুক্তি আর প্রমাণ দিয়ে যুদ্ধ করেছি। এরা জামায়াতী না, বামাতি না, শুষিল শয়তানও না, এরা একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুকে অন্তরের ভেতরে ধারণ করে, এদের অনেকেই হয়তো কখনো আওয়ামীলীগের সমর্থক হিসেবে নিজেকে জাহির করেনি, কখনো কোন সুবিধা নেয়নি; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এই মানুষগুলোর ২০১৩-২০১৪ সালের প্রত্যেকটা লেখা, প্রত্যেকটা শব্দ, প্রত্যেকটা যুক্তি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এই সরকারের, আওয়ামীলীগের পক্ষে গেছে, ঢাল হিসেবে ঠেকিয়েছে বাশেরকেল্লা আর বখতিয়ারের ঘোড়ার মত প্রোপ্যাগান্ডা মেশিনের মিথ্যাচার। গত চারদিন ধরে আমি এই মানুষগুলোকে রাগে-ক্ষোভে-দুঃখে-ঘেন্নায় চিৎকার করতে দেখছি, হাহাকার করতে দেখছি, অভিসম্পাত দিতে দেখছি। তাদের ভেতরটা পর্যন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে গত কয়েকদিনে, উৎকট বিশ্রি পোড়া গন্ধ বের হচ্ছে কেবল এখন।

বাংলাদেশ পুলিশ, ছাত্রলীগ, নিরাপদ সড়ক চাই

আপনারা অনেকেই বলছেন গত চারদিনে যে শিক্ষার্থীরা মার খেল, তাদের ভোটটা চিরকালের মত হারালো এই সরকার। অতদূর ভাবার মত রাজনৈতিক বিশ্লেষণক্ষমতা এই অধমের নাই। আমি সামান্য মানুষ, ভোটের বাজারে আমার মত তরুণদের চেয়ে লাখ লাখ পরিবহন শ্রমিকেরা অনেক বেশি মূল্যবান। তাই আমার চিন্তা কেবল আমার কাছের মানুষগুলোকে নিয়ে, যাদের ভেতরটা পুড়ে গেছে গত ক’দিনে, যারা আর কখনো এই দেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখবে না, যাদের চিন্তা করার ক্ষমতাটা পর্যন্ত হেলমেট পড়া কিছু ছাত্রলীগার পিটিয়ে আধমরা করে দিয়ে গেছে।

কি বললেন, ওরা ছাত্রলীগার ছিল কিনা সেটা কিভাবে নিশ্চিত হলাম? আচ্ছা বেশ, আপনার কথাই রাখলাম। ওরা হেলমেট পড়া দুষ্কৃতিকারী, যারা ছাত্রলীগের বদনাম করার চেষ্টা করছে। সেক্ষেত্রে জিগাতলায় ছাত্রদের উপর, সায়েন্সল্যাবে সাংবাদিকদের উপর হামলা চালানো এই দুষ্কৃতিকারীরা এখনো ধরা পড়েনি কেন? টানা পাঁচদিন ধরে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় থাকলে সেখানে শিবির এসে ঢুকবে, আলুপোড়া খেতে আসা দরকারবিরোধী নানাপক্ষ ঢুকবে, এটা ঢাকার ১৮ জন জনপ্রতিনিধিরা কেউ ভাবলেন না? কেন তারা রাজপথে নেমে ৯ দফা মেনে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে জানিয়ে শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরাবার উদ্যোগ নিলেন না? কেন তারা ছাত্রদের ইউজ করার সুযোগ দিলেন? শিবির যে ছাত্রদের মধ্যে ঢুকে গুজব ছড়িয়ে আওয়ামীলীগের অফিসে হামলা চালানো থেকে যে কোন কিছু করাতে পারে, জামায়াতের প্রোপ্যাগান্ডা মেশিন যে আওয়ামীলীগের কার্যালয়ে মেয়েদের তুলে রেপ করা হচ্ছে, চারটা খুন হয়েছে এমন মিথ্যাচার ছড়াতে পারে, এই সামান্য কমনসেন্সটা কি এতোদিনেও প্রশাসনের কর্তাদের হয়নি?

জিগাতলা, সায়েন্সল্যাব, হামলা, ছাত্রলীগ, পুলিশ, ছাত্র আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই

এবং এতে আল্টিমেটলি যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিরীহ ছাত্ররা, চড়া মাশুল গুনতে হবে তাদের, কেউ বোঝেনি এটা? যে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জীবনটা ফেসবুক চেকইন, সেলফি, হ্যাংআউট ইত্যাদিতে আটকে ছিল, পরিবার থেকে গোঁড়া কিংবা দলকানা কিংবা ধর্মান্ধ ব্রেনওয়াশের পরেও যে ছেলে-মেয়েরা এখনো কোন রাজনৈতিক দল, পথ কিংবা মতে যায়নি, কোন দল ভালো আর কোন দল খারাপ সেই হিসাব-নিকাশ না করেই যে ছেলে-মেয়েগুলো রাস্তায় নেমে গিয়েছিল একটা পরিবর্তন আনতে, সেই ছেলেমেয়েগুলো যখন আপনাদের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন স্ট্রাটেজি আর ডোন্ট কেয়ার এটিচিউডের ফলে ইনফ্লিট্রেশনের শিকার হয়ে আন্দোলনের কন্ট্রোল হারালো এবং পুলিশ ও হেলমেট পড়া ছাত্রলীগারদের মার খেয়ে তাকে রাস্তা থেকে উঠে যেতে হলো, বাকী জীবন কি সে এই অপমান ভুলতে পারবে? দল হিসেবে আওয়ামীলীগের প্রতি তার ভয়ংকর ক্রোধটা কিভাবে মুছবেন আপনি?

শুরু থেকেই পুলিশের সর্বোচ্চ ধৈর্য্য আর সহযোগিতা, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশে থাকা ও সরাসরি সমর্থন যোগানোর পরেও এই যে শেষ মুহুর্তে ওদের মার খেতে হলো, এর দায় কার? এর ফলে পুলিশ আর ছাত্রলীগের প্রতি ঘৃণাটা কি কখনো মুছবে? যদি হেলমেট পরা সন্ত্রাসীগুলো ছাত্রলীগার না-ই হয়, তাহলে পুলিশ কেন এখনো তাদের ধরছে না? কেন সাংবাদিকদের উপর হামলা চালানো হেলমেটধারী যুবকদের ছবি ফেসবুক, পত্রিকায় এভেইলেবল হবার পরেও তারা ধরা পড়ছে না? কেন তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না? এদের শাস্তি না হলে সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ কাছে কি বার্তাটা যাবে? বাংলাদেশের চেয়েও বেশি বয়স যে সংগঠনটার, সেই গৌরবজ্জ্বল ছাত্রলীগকে মানুষ চিনছে হেলমেটধারী কিছু যুবকের সাপ মারার মত সাংবাদিক, শিক্ষার্থীদের পেটানো সন্ত্রাসী হিসেবে! একবারও ভেবে দেখেছেন?

এবং এর ফলশ্রুতিতে গত পরশু যে চারটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে ছাত্ররা বিক্ষোভ নিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইল, সেখানে এইভাবে লুঙ্গি পড়া সন্ত্রাসীদের সাথে নিয়ে চড়াও হয়ে আসলে লাভটা কার হলো? পরিস্থিতি কন্ট্রোলে আনতে ক্যাম্পাসের ভেতর আটকে একটার পর একটা টিয়ারশেল আর রাবার বুলেটের বৃষ্টিতে আহত করে কত হাজার শিক্ষার্থীর ভেতরে ভয়ংকর বিক্ষোভের দাবানল জ্বালিয়ে দিলেন একবারও খেয়াল করেছেন? যে ছেলেটা হয়তো দেশের রাজনীতি নিয়ে কখনো মাথা ঘামায়নি, যে ক্যুল ড্যুড সবসময় দেশের যে কোন পরিস্থিতিতেই নিরপেক্ষ মতামত জানিয়ে নিজস্ব ভুবনে থাকতে পছন্দ করেছে, গতকাল তার ক্যাম্পাসে তার ওপর টিয়ারশেল মেরে আপনি কি হিসেবে নিজেকে পরিচিত করালেন? এমন কত শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক দর্শন গত এক সপ্তাহে চিরকালের মত ‘আই হেইট পলিটিক্স’ থেকে ‘আই হেইট আওয়ামীলীগ’ হয়ে গেছে একবারও ভাবতে চেষ্টা করেছেন?

অনেকগুলো কথা বলে ফেললাম। কথাগুলো বলতে হলো আমার সহযোদ্ধাদের কারণে, যারা গত কয়েকদিন ধরে অতি অবিশ্বাস্য সব ঘটনা দেখছে আর একটু একটু করে স্তব্ধ পাথরে পরিণত হচ্ছে। একাত্তরের পরাজিত পাকিপ্রেমী শকুনগুলো প্রতিমুহুর্তে একটার পর একটা ষড়যন্ত্রে এই দেশটাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলার চেষ্টা করছে, যে ডুমসডে আর আমাদের মধ্যে আপনি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একমাত্র বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু এই চরম সত্যটা হয়তো চরম মার খাওয়া ঐ স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির নিরীহ ছাত্রটাকে আমরা আর কখনই বোঝাতে পারবো না। গেম অফ থ্রোনসের ভাষায় উইন্টার যদি সত্যিই আসে, আবার যদি কখনো ধর্মান্ধ মৌলবাদীগোষ্ঠী ৫ই মে’র মতো আরেকবার দেশটা দখল করে নেবার চেষ্টা করে, পারিবারিকভাবে খুব সামান্য ক্ষুদ্র আওয়ামী সমর্থক হিসেবে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ হিসেবে সেদিনও আপ্রাণ লড়াই চালাবো, ওদের ঠেকাতে না পারলে একটা সময় হয়তো নিজেই বিলীন হয়ে যাবো। কিন্তু সেদিন হয়তো আমার পাশে আমার এই আপনজনগুলোকে পাবো না। কারণ তাদের ভেতরটা যে মরে গেছে এই কয়েকদিনেই! নৈতিক জায়গা থেকে বিবেকের দংশনে জীবন্মৃত এই সহযোদ্ধারা হয়তো সেদিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ধ্বংসের অপেক্ষা করবে।

সেদিন আমি তাদের দোষ দিতে পারবো না। সেদিন আমি তাদের দোষ দেবো না।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close