বিখ্যাত প্লেবয় ম্যাগাজিন ২০০৪ সালে ৫০টি পণ্যের তালিকা করেছিলো। বিশ্বকে বদলে দিয়েছে এমন সেই পণ্যগুলোর তালিকার জায়গা করে নিয়েছিলো একে-৪৭!

হ্যাঁ, একে-৪৭ রাইফেল, যাকে ধরা হয় বিশ্বের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত অস্ত্র হিসেবে, বিশ্বের মারাত্মক এক আগ্নেয়াস্ত্র হিসেবে।

পৃথিবীজুড়ে কত রকমের অস্ত্র! কত মডেল, কত ধ্বংসাত্মক একেকটা অস্ত্র। তাদের অধিকাংশই আমাদের অচেনা হলেও একে-৪৭ রাইফেলটির কথা মোটামুটি সবাই জানে। এতোটাই কুখ্যাত এই ও পরিচিত এই অস্ত্র!

১৯১৯ সালের কথা। রাশিয়ার এক গরীব ঘরে জন্ম মিখাইল কালাশনিকভ। রোগা এই ছেলেটার জীবনে মৃত্যু কড়া নেড়ে গিয়েছিলো একবার, ছয় বছর বয়সেই। রোগা শরীর নিয়ে তার দুঃখের অন্ত ছিলো না। বন্ধুরা খেলতো, তিনি চেয়ে দেখতেন। কি আর করবেন! সময় কাটাতে হবে তো! তাই হাতের কাছে যেসব যন্ত্রপাতি পেতেন, ওগুলো নিয়ে গবেষণায় বসে যেতেন। অনেকটা বাঙ্গালি শিশুদের ছোটবেলায় ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র খুলে চুম্বুক খুলে আবার জোড়া লাগানোর চেষ্টা টাইপ গবেষণা। কিন্তু, কাজটা করে ভালোই মজা পেতেন কালাশনিকভ।

১৯৩০ এ যখন সংসারের টানাপোড়েনে এই পরিবারটির সার্বিয়ায় চলে যেতে হলো, তখন মিখাইলের একটা বদঅভ্যাস হলো। বাবার রাইফেল নিয়ে সে প্রায়ই শিকারে বের হয়ে যেতো। রাইফেল এর সাথে তার একাত্মতার শুরু তখন থেকেই। ৯৪ বছর বয়সে যখন তিনি মারা গেলেন,তখন এই রাইফেলের কারণেই তিনি বিখ্যাত! আলোচিত ও মারাত্মক এক অস্ত্র একে-৪৭ রাইফেলটি যে তিনিই তৈরি করেছিলেন!

১৯৩৮ সালে কালাশনিকভকে বাধ্যতামূলক রেড আর্মিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়েছিলো। দুই বছর পর ১৯৪১ সালে এক যুদ্ধে জার্মান বাহিনীর গুলিতে তিনি মারাত্মক রকম আহত হয়েছিলেন। হাসপাতালের বিছানাতেও তার মনের মধ্যে ঘুরতো অস্ত্রকল্পনা। ভদ্রলোক, হাসপাতালে বসেই ডিজাইন করে ফেললেন একটি অটোমেটিক রাইফেলের! রাইফেলটিকে যতটা বিধ্বংসী রূপ দেয়া যায় ততটুকুই দিলেন।

সাতবছর সাধনা করে ১৯৪৭ সালে তৈরি হলো রাইফেলটি। রাইফেলটির নামকরণের পালা এবার। নাম দিলেন Avtomat Kalashnikova । রুশ এভটোমাট শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘অটোমেটিক’ বা স্বয়ংক্রিয়। Avtomat Kalashnikova – এর সংক্ষিপ্ত রুপ AK এবং ১৯৪৭ সালে তৈরি হয়েছিলো বলে নামের শেষে দেয়া হলো ৪৭! ব্যাস, তারপর থেকেই রাইফেলটি পরিচিতি পেলো একে-৪৭ হিসেবে।

এ.কে ৪৭, মিখাইল কালাশনিকভ, ওসামা বিন লাদেন, রাইফেল, বিশ্বের সবচেয়ে দামী অস্ত্র

কিন্তু কেনো এই রাইফেলটি এতো জনপ্রিয় হলো?

এই রাইফেলটি আসলে কল্পনার চেয়েও বেশি বিধ্বংসী। এই রাইফেলের গুলিতেই এই পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বড় কামান, বিমান হামলার চেয়েও এই অস্ত্রটি বেশি কার্যকর মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য। প্রতিবছর এই একে-৪৭ এর বুলেটে আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ মারা যায়! মারাত্মক লক্ষ্য ভেদ করার ক্ষমতা এই রাইফেলটিকে করেছে অনন্য। এতে কাস্টমাইজ বুলেটও ব্যবহার করা যায়। যে বুলেট নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করা বডি আর্মারও ভেদ করার ক্ষমতা রাখে। শুধু তা-ই নয়, এটি ৭.৬২*৩৯ মি.মি বুলেটকে ৭১৫ মিটার/সেকেন্ডে ছুড়ে যা ৮ ইঞ্চি ওক কাঠের এবং ৫ ইঞ্চি কংক্রিটের দেয়ালও ভেদ করতে পারে।

আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, এই রাইফেলটিকে যেভাবে খুশি ওভাবেই ব্যবহার করা যায়। এটি পানিতে ভিজিয়ে রাখলেও কিছু হয় না, স্যাতস্যাতে আবহাওয়া এর কিছুই করতে পারে না,ধুলা বালি এর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। এর উপর দিয়ে রোলার চালিয়ে দিলেও এটি কাজ করে। তাছাড়া, এটি যে কেউ সহজেই ব্যবহার করতে পারে! একটা শিশুকেও বুঝিয়ে দিলে এক ঘন্টার মধ্যে সে রাইফেলটি চালনা করতে পারবে। রাইফেলটির মজার আরেকটি দিক হচ্ছে, এর অংশগুলো খুলে আবার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই জোড়া দেওয়া সম্ভব!

এই যাবত কাল অবধি রাইফেলটির অনেক সংস্করণ বের হয়েছে। বিশ্বের ১০৬টি দেশের সামরিক বাহিনীতে এই রাইফেলটি ব্যবহৃত হয়। বাংলাদশ সেনাবাহিনীতেও একে-৪৭ এর ব্যবহার আছে।

আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন সব সময় তাঁর পাশে একে-৪৭ রাইফেলটি রাখতেন। এই নিয়ে কিছুটা দুঃখ ছিলো কালাশনিকভের। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার তৈরি অস্ত্র দিয়ে যখন সন্ত্রাসীদের গুলি চালাতে দেখি, তখন কষ্ট পাই।’

রাইফেলটি কতটা জনপ্রিয় তার একটা উদাহরণ হচ্ছে, কয়েকটি দেশের জাতীয় পতাকাতে এই রাইফেলটির ছবি রয়েছে। মোজাম্বিক, জিম্বাবুয়ে, বুরকিনা ফাসো এবং পূর্ব তিমুরের পতাকায় একে-৪৭ আগ্নেয়াস্ত্রের ছবি আছে। এমনকি লেবাননের জঙ্গি সংগঠন হিজবুল্লাহর পতাকায়ও আছে একে-৪৭ এর ছবি।

শেষ করার আগে একটা তথ্য দেই। বেচারা কালাশনিকভকে অস্ত্র নির্মাতা হিসেবে ভিলেন ভাবার দরকার নেই। এই ভদ্রলোক কিন্তু একজন কবি ছিলেন। কিশোর বয়স থেকেই কবিতার চর্চা ছিলো তার। প্রচুর কবিতা লিখেছেন। তার ছয়টা কবিতার বই প্রকাশিতও হয়েছিলো। কিন্তু, জীবনের বিচিত্র খেয়াল। কবিতার মানুষটা পরিচিত হলেন অস্ত্র নির্মাতা হিসেবে।

Comments
Spread the love