বর্ষণ কবির-

তিন বছর আগে সিডনি নামার আগে বিমানের ঝাঁকিটা এখনো কাঁপিয়ে তোলে। ল্যান্ড করার আগে কোন এক কারনে মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদল করে পাইলট। আবারো সাগরের ওপর চলে যায় নিমিষে। হঠাৎ করেই পেটের ভেতর দলা পাকিয়ে উঠলো সবকিছু। কয়েকশ ফুট নিচে না বলেই নেমে গেলো বিমান। তারপর আবার। এবং সবশেষ যখন থিতু হলো, তখন পাশের যাত্রীর দেখলাম মুখ বিবর্ণ। আমি নিজেও বুঝলাম আমার অবস্থাও তেমন হবে।

মৃত্যু হঠাৎ আসবে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ওই যে বসে থেকে যে কাঁপুনি, অস্থিরতা, মেরুদন্ড বেয়ে বরফের চাঁই নেমে যাওয়া এবং বুঝতে পারে হয়তো পরের সেকেন্ডে দুনিয়াটা শেষ হয়ে যাবে; এই অনুভূতি বর্ণনাহীন।

ত্রিভূবন বিমানবন্দরে যে ভাগ্যাহতরা এখন চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন কোন হিমাগারে, তাদের অবস্থা তেমনই ছিল।

কল্পনা করছি। আর প্রেসবক্সেও ঘামছি। হয়তো ছোট বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে মা-বাবা কাঁদছিলেন। চিৎকার করছিলেন। আল্লাহকে ডাকছিলেন। মিরাকলের আশায় ছিলেন।

মধুচন্দ্রিমায় যে জুটি গিয়েছিল, তারা দুজনের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিল। কখন অজান্তে চামড়া কেটে রক্ত বেড়িয়েছে সে খেয়াল নেই কারও। হয়ত শেষ চুম্বন, শেষবার মাথাটা বুকে টেনে নেয়া।

জানি না কতটা সময় পেয়েছে তাঁরা। শেষ মুহূর্তগুলো কি মর্মান্তিক। জীবনের শেষ পাতা। যাদের জীবনের শেষভাগ হঠাৎই চিন্তার চেয়ে কাছে চলে এসেছে, তারা বিস্মিত হয়ে দেখছিলেন নিজের জীবনটা বড় একটা কক্ষে ৬০ জন যাত্রীর সঙ্গে শেষ হচ্ছে। কিভাবে, কেমন ভাবে সেটা ভেবে আতঙ্কে তারা ডুকরে কেঁদেছেন। এভারেস্ট দেখতে এসে তাঁদের আরো অনেক উঁচুতে যেতে হবে সেটা কল্পনাসীমার ভেতরেই আসেনি কখনো।

আমি এই চিন্তা করতে গিয়ে অভিভূত হয়ে যাচ্ছি। বিমানটা নামছে। জীবনের সব লাগাম আলগা হয়ে যাচ্ছে। এক মূহুর্তের মধ্যে তাতে আগুন লাগলো। পুড়তে থাকলো অনেক জীবন। স্বপ্ন।

আহ স্বপ্ন। স্বপ্নেরা যদি আজ ডানা পেলে বিমানের আহত ডানায় বা চাকায় যদি হাওয়া দিতো তবে এ দিনটা বাংলাদেশকে দেখতে হতো না। অনেক পরিবারের ভেতর কি যাচ্ছে তা স্বয়ং ওপরওয়ালা ছাড়া আর কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তাঁর ওপর এ কারনে বড় অভিমান হয়। কেনোই বা আনো আর কেনোই বা নিয়ে যাও?

আজ বাংলাদেশের শোকে তলিয়ে যাওয়ার দিন। নিজের দেশে পথে রওয়ানা দিয়ে যে নেপালি ছাত্র-ছাত্রীরা এক ফুঁতে জীবন হারালেন, তাদের জন্য শোক গাথা। সবার জন্য। সবার বিদেহী আত্মার জন্য প্রার্থনা।

আহ বাচ্চাটা, কি মায়া মুখে চোখে পানি নিয়ে তাকিয়ে ছিল একটা সুপারম্যান এসে বিমানটা ঠিকক নামাবে এ আশায়!

Comments
Spread the love