মানুষটা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। মাত্র পনেরো বছর বয়স তখন তার। সেই কিশোর বয়সেই দেশকে হানাদারমুক্ত করার জন্যে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। জীবনের মায়া ত্যাগ করে দাঁড়িয়েছিলেন পাকিস্তানী সেনাদের রাইফেলের সামনে। হয়তো সেটাই তার ভুল ছিল।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে তখন দেশ উত্তাল। শাহবাগে তরুণেরা একত্রিত হয়ে কাদের মোল্লার বিচারের আইন পরিবর্তন করিয়ে নিয়েছে। এই মানুষটা সেই উত্তাল সময়ের বছরখানেক আগে ১৯৭১ সালে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার জেলে ঘটে যাওয়া জঘণ্য গণহত্যার ঘটনায় সাক্ষ্য দিতে দাঁড়িয়েছিলেন ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায়। সাতচল্লিশ বছর আগের সেইই ঘটনার দিনে প্রাণে বেঁচে যাওয়া পাঁচ ভাগ্যবানের একজন ছিলেন তিনি। হয়তো এই বেঁচে থাকাটাই তার জন্যে কাল হয়েছিল, অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে যাওয়াটাই তার ভুল ছিল…

মানুষটার নাম আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। বিখ্যাত সুরকার, গীতিকার। তারচেয়ে বড় পরিচয়। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে দেশটাকে যখন খুবলে খাচ্ছে পাকিস্তানী জান্তারা, তখন মাতৃভূমিকে রক্ষার তাগিদে মাত্র পনেরো বছরে কিশোর ইমতিয়াজ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। বয়স কত, ছোট্ট শরীরটা নিয়ে বন্দুক ধরতে পারবেন কিনা, এসব কিছুই তখন ভাবেননি তিনি। শুধু মাথায় ছিল, যেভাবেই হোক, দেশকে হানাদারমুক্ত করতে হবে।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া গণহত্যা, গোলাম আজম

এই মানুষটাকে প্রথম দেখেছিলাম ক্লোজআপ ওয়ান তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ নামের একটা অনুষ্ঠানে। সেখানে তিনি বিচারক। মাথায় উশকো খুশকো লম্বা চুল, কি মিষ্টি করে আর প্রচণ্ড মমতা নিয়ে তিনি কথা বলেন প্রতিযোগীদের সঙ্গে। প্রত্যেকটা মেয়েকে তিনি ‘মা’ বলে ডাকেন। জানলাম, সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ কিংবা ‘সেই রেললাইনের ধারে’ গানগুলোর সুরকার তিনি। এগুলো ছাড়াও অনেক বিখ্যাত সিনেমার সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন তিনি। তারও অনেক পরে তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়টা জেনেছিলাম।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল গতকাল ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেই স্ট্যাটাসের প্রতিটা শব্দে ঝরে পড়েছে একজন মুক্তিযোদ্ধার অসহায়ত্ব, একজন অসুস্থ শিল্পীর বেদনা। তিনি লিখেছেন- “একটা ঘরে ছয় বছর গৃহবন্দী থাকতে থাকতে আমি আজ উল্লেখযোগ্যভাবে অসুস্থ। আমার হার্টে আটটা ব্লক ধরা পড়েছে। এর মাঝে কাউকে না জানিয়ে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক(বারডেম) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। সেখানে সিসিইউতে চারদিন ছিলাম। আগামী ১০ দিনের মধ্যে হার্টের বাইপাস সার্জারী করানোর জন্যে প্রস্তুত আছি আমি।” 

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া গণহত্যা, গোলাম আজম

“আমি এখন চব্বিশ ঘন্টা পুলিশি পাহারায় গৃহবন্দী থাকি, একমাত্র সন্তানকে নিয়ে। সরকারের নির্দেশে ২০১২ সালে যুদ্ধাপরাধীর ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় সাক্ষী হিসেবে দাঁড়াতে হয়েছিল। সাহসিকতার সঙ্গে সাক্ষ্যপ্রমাণ দিতে হয়েছিল ১৯৭১ সালে ঘটে যাওয়া ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জেলখানার গণহত্যার সম্পূর্ণ ইতিহাস। ওই গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে আমি একজন। সেদিন একসঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল ৪৯ জন মুক্তিযোদ্ধাকে। কিন্ত এই সাক্ষ্য দেয়ার কারণে আমার নিরপরাধ ছোট ভাই মিরাজকে হত্যা করা হবে, তা কখনও বিশ্বাস করতে পারিনি।”

একাত্তরের পঁচিশে মার্চের ক্র‍্যাকডাউনের পরে বিহারীদের অস্ত্র ছিনতাই করে পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েছিলেন কিশোর আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। জিঞ্জিরায় পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধও করেছিলেন সেই সময়। পরে বড় ভাই এবং ক্র‍্যাক প্লাটুনের গেরিলা ইফতেখার উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে ঢাকার ভেতরে কয়েকটা গেরিলা অপারেশনে অংশ নেন তিনি। বয়সে কিশোর হওয়ায় শহরে চলাফেরায় একটা বাড়তি সুবিধা পেতেন তিনি। ঢাকা থেকে পরে ভারতে চলে গিয়েছিলেন তিনি, নিয়েছিলেন প্রশিক্ষণ।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া গণহত্যা, গোলাম আজম

ইয়াং প্লাটুনের এই বীর যোদ্ধা কয়েকবার পাকিস্তানী সৈন্যদের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন, শিকার হয়েছিলেন অমানবিক নির্যাতনের। রমনা থানায় আটকের পরে তাকে নির্যাতন করতে করতে পিঠ আর পায়ের পেছনের চামড়া তুলে ফেলা হয়েছিল। ব্রাক্ষণবাড়িয়া কারাগারে তিনি যখন আটক ছিলেন, তখন সেখানে ঘটেছিল এক মর্মান্তিক গণহত্যা। ঈদের দিন রাতে শহীদ সিরু মিয়া দারোগা এবং তার সন্তান শহীদ কামাল আনোয়ার এবং শহীদ নজরুল সহ আটত্রিশজন বন্দীকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানী সেনারা। গণকবরে পুঁতে রাখা হয়েছিল সবার লাশ। সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, তার চোখের সামনেই জেলখানার সেল থেকে এই মানুষগুলোকে বের করে নিয়ে গিয়েছিল হানাদার আর রাজাকারেরা। ওদের কেউ আর ফিরে আসেননি।

যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমের মামলার চৌদ্দ নম্বর সাক্ষী ছিলেন তিনি। নির্মম আর নিষ্ঠুর এই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ট্রাইব্যুনালে কেঁদেছিলেন তিনি, কাঁদিয়েছিলেন সবাইকে। এই সাক্ষ্য দেয়াটাই কাল হয়েছিল তার জীবনে। তার ছোটভাই মিরাজকে আততায়ীরা খুন করেছিল, এর পেছনে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষ্য দেয়াটাই মূল কারণ হতে পারে বলে জানিয়েছিল পুলিশ।

তার ওপর হামলার ঝুঁকি থাকায় সরকারের তরফ থেকে তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তার বাসায় সার্বক্ষণিক পুলিশি প্রহরা বসানো হয়। যখন যেখানে খুশী যেতে পারেন না তিনি, জরুরী প্রয়োজনে কোথাও গেলেও সাথে থাকে পুলিশ। সর্বক্ষণ একটা আতঙ্ক থাকে, আশেপাশেই কোথাও বুঝি লুকিয়ে আছে আততায়ী! অস্ত্র হাতে যে দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, সেই দেশেই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন না তিনি, গত ছয় বছর ধরে। আর যে রাজাকারদের বিরুদ্ধে একাত্তরে অস্ত্র ধরেছিলেন তিনি, যে নরপিশাচগুলো সেই সময়ে পাকিস্তানীদের সাহায্য করেছিল ত্রিশ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিতে আর দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত লুট করতে, তাদের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দেয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মতো মুক্তিযোদ্ধাকে!

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, মুক্তিযোদ্ধা, রাজাকার, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া গণহত্যা, গোলাম আজম

নিজের অবস্থা জানিয়ে ফেসবুকে তিনি স্ট্যাটাস দিয়েছেন, কিন্ত কারো কাছে সাহায্য চাননি তিনি। মানুষটার আত্মসম্মানবোধ এখনও প্রখর। দেশের জন্যে জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করেছিলেন, কোন বিনিময় পাবার আশায় নয়। সবার কাছে তিনি শুধু দোয়াই চান, সাহায্যের দরকার নেই তার। জোর গলায় বলেছেন- “কোন সরকারী সাহায্য কিংবা শিল্পী বা বন্ধুবান্ধবের সাহায্য আমার দরকার নাই। আমি একাই যথেষ্ট। শুধু অপারেশনের আগে দশ সেকেন্ডের জন্যে বুকের মাঝে বাংলাদেশের পতাকা আর কোরআন শরীফ রাখতে চাই। তোমরা আমার জন্যে শুধু দোয়া করবে। কোন ভয় নাই।”

এদেশে রাজাকারের গাড়িতে জাতীয় পতাকা ওঠে, তারা এমপি-মন্ত্রী হয়! এদেশে রাজাকারের ফাঁসির রায় হলে মিথ্যে গুজব ছড়িয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়, লোক ভাড়া করে এনে রাজাকারের জানাজা পড়ানো হয় দেশের জাতীয় মসজিদে, রাজাকারের কবরে ‘শহীদ’ লেখা ফলক লাগানো হয়! অথচ সেই দেশের সূর্যসন্তান, একজন মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে গৃহবন্দী হয়ে থাকতে হয় এই স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির কারণে! আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, আপনি আমাদের ক্ষমা করবেন না প্লিজ। আমরা আসলে ক্ষমা পাবার যোগ্য নই। যে দেশটাকে আপনারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছিলেন, সেই দেশে স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগটা আমরা আপনাকে দিতে পারিনি। আমরা আপনার জন্যে সবক’টা জানালা খুলে দিতে পারিনি….

Comments
Spread the love